বাংলা সাহিত্যে কবিতার অবস্থান - একটি পর্যালোচনা

in আমার বাংলা ব্লগ2 years ago (edited)

বাংলা কবিতার জয় হোক


🌱🌱🌱🌱🌱🌱🌱🌱🌱


বিশ্লেষণ


pexels-photo-267495.jpeg
সোর্স

☘️ সকলকে স্বাগত জানাই ☘️

কবিতা আমার জীবন। বলতে পারেন আদ্যোপান্ত এক কবিতা পাগল৷ আর ছেলেবেলা থেকেই তাই এই কবিতার সাথে আমার গুছনো সংসার। বাকি কোন সংসারই এমন গুছানো নয়। কবিতা এমন এক মৌলিক ও বিমূর্ত ভাবনা ও চর্চা যার মধ্যে স্বকীয়তা এক মূল বিষয়বস্তু। শব্দচয়নের দক্ষতা এবং বলিষ্ঠ উপস্থাপন, এই দুই হল কবিতার প্রধান দুই স্তম্ভ। ভালো কবিতা ও খারাপ কবিতা আসলে আপেক্ষিক একটি বিষয়। কবিতার ভালো মন্দ বিষয়ে বিবেচনা করতে বসলে সম্মুখ হতে হয় এক পর্বত সমান কাব্যরাশির। যেখানে উজ্জ্বল অক্ষরে দেখা যায় বহু কিংবদন্তীর নাম। বাংলা কবিতা হালফিলের নতুন সাহিত্য সৃষ্টি নয়। এর কালের ধারা আবহমান। বাংলার মধ্যযুগীয় সাহিত্য ভাবনা নিয়ে সামান্য বিশ্লেষণ করলেও বাংলা কবিতা অভিমুখ এবং পট পরিবর্তন সম্বন্ধে পূর্ণ ধারণা লাভ করা সম্ভব। এ বিষয়ে প্রথমেই বলতে হয় মৈথিল কবি বিদ্যাপতির কথা। বাংলা কবিতার আদিরস গুণ ও রাধাকৃষ্ণের প্রেমলীলা বিস্তারে বিদ্যাপতির জুড়ি মেলা ভার। তাঁর লিখন শৈলীর অনুপ্রেরণায় রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত বিমুগ্ধ ছিলেন। তিনি কিশোর বয়সে বিদ্যাপতির কাব্য প্রেরণায় অনুপ্রাণিত হয়ে লিখে ফেলেছিলেন ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলী। কিন্তু আধুনিক বাংলা কবিতার চালচলন ও বিস্তার বোঝাতে আমি কেন বিদ্যাপতির প্রসঙ্গ আনছি? নিশ্চয়ই একটু বলা দরকার। বাংলা ভাষা তুলনামূলকভাবে নবীন ভাষা। ইন্দো ইউরোপিয়ান ভাষা বেল্টের সমস্ত আর্য ভাষাগুলির মধ্যে বাংলা এমন একটি উপভাষা যার মাধ্যমে বর্তমানে একটি বিস্তীর্ণ অঞ্চলের জনজাতি কথা বলে। আর আমরা সেই ভাষাভাষীর অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাই এই ভাষার সূত্র ধরে একটু টানাটানি করলে সেখান থেকে সহজেই পৌঁছে যাওয়া যায় চন্ডীদাস, বিদ্যাপতি কিংবা জয়দেবের কাব্য রচনায়৷ এক্ষেত্রে বিদ্যাপতিকে ভাষাবিদরা চিরকালই একটু বেশি প্রাধান্য দিয়ে এসেছেন। কারণ বিদ্যাপতির যে কাব্য ভাষা তা আধুনিক বাংলার সঙ্গে সব থেকে বেশি সম্পর্কিত। যদিও খ্রিস্টীয় দশম থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যিখানে রচিত চর্যাপদগুলি এক্ষেত্রে এক জীবন্ত দলিল। তাও বাংলা ভাষার প্রধান বাঁক সেই বিদ্যাপতির হাতেই।

তবে যাই হোক, আমার আলোচনার মূল বিষয়টি হল কবিতার উৎসমুখ অন্বেষণ। আর সেক্ষেত্রে সমস্ত আদি কাব্যগ্রন্থ কবিতা বা পদ্য আকারেই রচিত। কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায় তাঁর কবিতাকে পদ্য বলে উল্লেখ করতেন। পদ্য এবং গদ্যের মধ্যে পদ্যই হল কাব্যের আদি ও প্রধান রূপ। কবিতা তার বাঁক বদলেছে বহুবার। মধ্যযুগের আগল ভেঙে কবিতা এগিয়ে এসেছে আধুনিক যুগে। এক্ষেত্রে যাঁর নামটি সবথেকে জোরালোভাবে উচ্চারিত হয় তিনি হলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। রবীন্দ্রনাথ বাংলা সাহিত্যের ব্যাপৃত আধার। তিনি প্রথম আধুনিকভাবে গদ্য কবিতার রূপ ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন, গদ্য কবিতাও একটি ছন্দে লিখিত হয়, যা গদ্য ছন্দ রূপে পরিচিত। এরপর থেকে শুরু হয় বাংলা কবিতা নিয়ে বিভিন্ন গবেষণা ও তার আধুনিকীকরণ। তাই কবিতা হলো বাঙালির সাহিত্যের একটি মূল ধারা।

বাংলা কবিতার একটি উল্লেখযোগ্য সময় হলো জীবনানন্দ দাশের রবীন্দ্র বিরোধিতা। বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে বাংলা সাহিত্য সিংহভাগ রবীন্দ্র নির্ভর হয়ে গেলে তিনি চেয়েছিলেন রবীন্দ্র ঘরানার বাইরে বেরিয়ে কবিতা রচনা করতে। আর এই কাজটিতে তিনি সফল হয়েছিলেন চূড়ান্তভাবে। আধুনিক বাংলা কবিতার জনক তিনি। তাই বাংলা কবিতায় এক অসামান্য উচ্চতা প্রদান করে তিনি দুর্ভাগ্যবশত কলকাতা শহরে ট্রামে চাপা পড়ে মারা যান। দক্ষিণ কলকাতার হাসপাতালে তিনি যখন মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছিলেন, তখনই যেন ধীরে ধীরে সাবালক হচ্ছিল বাঙালির কবিতা ভাবনা। কিন্তু আমরা কজন চিনি আধুনিক জীবনানন্দকে? আমরা তাকে এক পল্লী প্রতিভার মধ্যে বেঁধে রাখতে চেষ্টা করি। কিন্তু তার আধুনিক কাব্য ভাবনা ও লিখন শৈলী রবীন্দ্রনাথকে পর্যন্ত ভাবতে বাধ্য করায়। তাই পরবর্তী সময়ে প্রচুর কবি বাংলা সাহিত্যে কলম ধরলেও জীবনানন্দের ভূমিকা এক্ষেত্রে প্রণম্য। কিন্তু জানেন কি মৃত্যুর আগে জীবনানন্দ কোনোদিন তাঁর কাজের দাম পাননি। বরং ইহলোক ত্যাগ করার পর মানুষ তাঁকে চিনতে পারে ও তাকর লেখার ভাবনার আধুনিকতা ছুঁয়ে যায় আপামর বাঙালিকে।

বর্তমানে বাংলা কবিতার রূপ অন্যভাবে বর্ণিত। এখন কবিতা অনেক বেশি কাব্য বিন্যাসের কথা বলে। কলমের অভিঘাত ভয়ানক। তাই সাহিত্য ভাবনার রাষ্ট্রচিন্তার দিকটি ভীষণ সচেতন। এক্ষেত্রে কবিতার বলিষ্ঠতা অন্যমাত্রায় উন্নীত হওয়া বড় প্রয়োজন। ছন্দ কবিতা আজ ভেঙেছে বারবার। বিদ্যাপতি থেকে শুরু করে আজকের দ্বিতীয় দশকের কবিদের ভাবনা কোথাও যেন মিলে যায় একবিন্দুতে। কবি ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর বলেন

আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে

আবার তার সূত্র ধরেই বর্তমানের কবি শঙ্খ ঘোষ লিখছেন

আমার সন্ততি স্বপ্নে থাক।

দেখুন কি আশ্চর্য মিল। অবাক করে না? মাঝের এই কয়েকশো বছরের দীর্ঘ সময়কালটা যেন বাংলা সাহিত্য ও কবিতার এক নির্মীয়মান অধ্যায়। যেখানে বারবার গড়েছে ও ভেঙেছে বাংলা কবিতার শরীর। কিন্তু কাব্য ভাবনায় কী আশ্চর্য মিল। এটাই বাংলা কবিতার মাহাত্ম্য।

পৃথিবীতে বহু ভাষা আর তাদের বহু রূপ। কিন্তু বাংলা ভাষার অস্তিত্ব বড় প্রকট। যে ভাষায় লেখা হয় দুই দেশের জাতীয় সংগীত, যে ভাষায় গাওয়া হয় বন্দেমাতরম - এর মত স্বাধীনতার অগ্নিমন্ত্র, সেই ভাষার অস্তিত্ব হরণ করে কার সাধ্য? সমস্ত বিপন্নতার মাঝখানেও আমরা কি পারিনা বাংলা সাহিত্য, কবিতা এবং ভাষার নির্যাসটুকু ধরে রাখতে? সব পাঠক কুলের উচিত বাংলা কবিতা পড়া এবং আপন চিন্তায় তা বিশ্লেষণ করা। বাংলা কবিতার অত্যাবশ্যক পট পরিবর্তন দেখতে হলে চোখ রাখতে হয় অন্তরের আয়নায়। সেখানে কেউ যেন প্রতিধ্বনি করে বলে, - বাংলা কবিতাকে আরো ভালোবাসো, যতটা পারো ভালোবাসো এবং ভালোবাসতে শেখাও। তবেই সব পাবে।

জয়তু বাংলা ভাষা।
জয়তু বাংলা কবিতা।



1720541518267-removebg-preview.png

Onulipi_07_27_10_21_22.jpg


new.gif

1720541518267-removebg-preview.png


--লেখক পরিচিতি--

IMG_20240303_181107_644.jpg

কৌশিক চক্রবর্ত্তী। নিবাস পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলায়। পেশায় কারিগরি বিভাগের প্রশিক্ষক। নেশায় অক্ষরকর্মী। কলকাতায় লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলনের সাথে দীর্ঘদিন যুক্ত৷ কলকাতা থেকে প্রকাশিত কবিতার আলো পত্রিকার প্রধান সম্পাদক। দুই বাংলার বিভিন্ন প্রথম সারির পত্রিকা ও দৈনিকে নিয়মিত প্রকাশ হয় কবিতা ও প্রবন্ধ। প্রকাশিত বই সাতটি৷ তার মধ্যে গবেষণামূলক বই 'ফ্রেডরিক্স নগরের অলিতে গলিতে', 'সাহেবি কলকাতা ও তৎকালীন ছড়া' জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। সাহিত্যকর্মের জন্য আছে একাধিক পুরস্কার ও স্বীকৃতি। তার মধ্যে সুরজিত ও কবিতা ক্লাব সেরা কলমকার সম্মান,(২০১৮), কাব্যলোক ঋতুভিত্তিক কবিতায় প্রথম পুরস্কার (বাংলাদেশ), যুগসাগ্নিক সেরা কবি ১৪২৬, স্রোত তরুণ বঙ্গ প্রতিভা সম্মান (২০১৯), স্টোরিমিরর অথর অব দ্যা ইয়ার, ২০২১, কচিপাতা সাহিত্য সম্মান, ২০২১ তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য।



কমিউনিটি : আমার বাংলা ব্লগ

ধন্যবাদ জানাই আমার বাংলা ব্লগের সকল সদস্যবন্ধুদের৷ ভালো থাকুন, ভালো রাখুন।

44902cc6212c4d5b.png


Sort:  

Upvoted! Thank you for supporting witness @jswit.

Your post has been rewarded by the Seven Team.

Support partner witnesses

@seven.wit
@cotina
@xpilar.witness

We are the hope!

 2 years ago 

জয়তু বাংলা ভাষা। জয়তু বাংলা কবিতা।

কবিতার পরিবর্তন আসুক কবিতায় এগিয়ে যাক। কবিতা ছাড়া আর আছে কি?

বাংলা কবিতা অবস্থান সংক্রান্ত কথাগুলি গল্পের মধ্যে বেশ সুন্দর করে বর্ণনা করলে। বিদ্যাপতি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। শুধু আজ বলে আজ নয় সাহিত্য যতদিন থাকবে ততদিনই।

জীবনানন্দের কথার জায়গাটুকু খুব সুন্দর বিশ্লেষণ করেছ। ভীষণ ভালো লাগলো তোমার আজকের ব্লগটি।

Coin Marketplace

STEEM 0.04
TRX 0.33
JST 0.093
BTC 63994.60
ETH 1797.39
USDT 1.00
SBD 0.39