এলাকার সবাই মিলে ইফতার করার অভিজ্ঞতা।
রোজার মাসের বিকেল বেলায় আসর নামাজের পরে আমি সাধারণত এলাকার বন্ধু-বান্ধবের সাথে কিছুটা সময় কাটাই। তেমনি কয়েকদিন আগে বিকালে আমরা কয়েকজন বসে গল্প করছিলাম। হঠাৎ করেই তখন কথা প্রসঙ্গে এক বন্ধু বলল আমরা এলাকার সবাই মিলে একদিন ইফতার করলে কেমন হয়? কথাটা সবারই পছন্দ হলো। তাছাড়া গত দু-তিন বছর হল প্রতি রোজায় এলাকার ছোট বড় সবাই মিলে একদিন মসজিদে ইফতার করা হয়। আমাদের ছোট ভাই ব্রাদার যারা আছে তারাই সাধারণত এগুলোর দায়িত্বে থাকে।
যাইহোক কথাটা ওঠার পর তখনই মোটামুটি একটা সিদ্ধান্ত হয়ে গেলো। যে পরবর্তী শুক্রবারে আমরা এলাকার ভাই ব্রাদার মিলে মসজিদে ইফতার করবো। তারপর আলোচনা হল সেই ইফতারের কি কি খাওয়ানো হবে আর টাকা-পয়সার ব্যবস্থা কোথা থেকে হবে? ইফতারের মেনু ঠিক করা হলো খিচুড়ি মাংস, সেই সাথে কয়েক রকমের ফল আর শরবত। আর টাকা পয়সার জন্য বলা হলো আমরা যারা একটু বড় আছি তারা সকলেই কম বেশি করে অংশগ্রহণ করবে। যাই হোক এরপরই শুরু হয়ে গেল ইফতার মাহফিলের যোগাড়যন্ত্র। যদিও সমস্ত পরিশ্রম করেছে আমাদের এলাকার কয়েকজন ছোট ভাই। আর তাদেরকে নানা রকম বুদ্ধি পরামর্শ দিয়ে সাহায্য করেছি আমরা কয়েকজন বন্ধু-বান্ধব এবং আমাদের কিছু বড় ভাই।
যখন মোটামুটি সবকিছু ঠিকঠাক হয়েছে তখন আমাদের এক ছোট ভাই (সে আবার রাজনীতির সাথে কিছুটা জড়িত)। সে বলল ইফতার মাহফিলটা রবিবার করলে ভালো হয়। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে সে এ কথা বলার আগেই অনেককে দাওয়াত দেয়া হয়ে গিয়েছিল। যার ফলে ইফতার মাহফিলের দায়িত্বে যে ছোট ভাই ছিল সে তাকে বলল। এখন আর ইফতার মাহফিলের ডেট পেছানো সম্ভব না। কারণ প্রায় সবাইকে দাওয়াত দেয়া হয়ে গিয়েছে। যাই হোক শেষ পর্যন্ত সেও বিষয়টা বুঝতে পারল। এরপরে শুরু হলো সবচাইতে কঠিন কাজ। এলাকার ছোট ভাই ব্রাদার বড় ভাইদের কাছে যেতে লাগলো টাকার জন্য। কারণ আমরা হিসাব করে দেখেছিলাম এই ইফতার মাহফিলের আয়োজন করতে প্রায় ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা লাগবে। আর এই টাকাটা এলাকার ছোট ভাইদের পক্ষে জোগাড় করা একেবারেই সম্ভব না।
যার ফলে এই টাকা জোগাড় করতে আমাদেরকে সহায়তা করতে হবে। আমরা বন্ধু-বান্ধবেরা টাকা দিয়ে বুদ্ধি পরামর্শ দিয়ে নানাভাবে তাদেরকে সাহায্য করতে লাগলাম। মাঝে মাঝেই আয়োজকদের সাথে আমাদের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা হচ্ছিলো। যাইহোক সব রকম দ্বিধা দ্বন্দ্ব কাটিয়ে আজকে সকাল থেকে সবকিছু আয়োজন শুরু হয় গিয়েছিলো। যেখানে রান্নার ব্যবস্থা করা হয়েছিল আমরা সেখানে গিয়ে দেখতে পেলাম রান্নার চুলা করা হয়েছে একটি খোলা জায়গায়। কিন্তু আজকে সকাল থেকে আকাশে প্রচুর মেঘ ছিল। এজন্য আমরা কিছুটা দুশ্চিন্তায় ছিলাম। সবাই আলোচনা করছিলাম যদি হঠাৎ বৃষ্টি শুরু হয়ে যায় তাহলে কি করা যায়।
তখন আমি পরামর্শ দিলাম যদি বৃষ্টি শুরু হয়ে যায়। তাহলে আমাদের চুলার পাশেই একটি শেড রয়েছে। সেখানে রান্না করার ব্যবস্থা করে রাখতে হবে অল্প কয়েকটি ইট আর বালি হলেই সেখানে রান্নার ব্যবস্থা হয়ে যাবে। বাবুর্চির সাথে কথা বললে সেও আমার সাথে সহমত পোষণ করলো। তবে বাবুর্চির চেহারা দেখে আমি কিছুটা সংশয়ে পড়ে গিয়েছিলাম। কারণ দেখতে পেলাম ছেলেটি একেবারেই কম বয়সি। বাবুর্চি হিসেবে আমরা সাধারণত এতদিন দেখে এসেছি একটু বয়স্ক মানুষ। যার ফলে এই অল্পবয়সী বাবুর্চির উপর ঠিক ভরসা করতে পারছিলাম না। তবে আমার এলাকার ছোট ভাইদের দেখলাম তার ওপরে বেশ আস্থা। তারা আমাকে বলল ভাই নিশ্চিত থাকতে পারে ও বয়সে ছোট হলে কি হবে। ওর রান্নার হাত খুবই ভালো।
ওদের কথা শুনে আমি কিছুটা আশ্বস্ত হলাম। কিছুক্ষণ পরেই খেয়াল করে দেখলাম আকাশের মেঘের ঘনঘটা আরো বেড়েছে। তখন চিন্তা করছিলাম রান্নার মাঝ পথে যদি বৃষ্টি শুরু হয়ে যায় তাহলে কি হবে। এই কথা চিন্তা করার কিছুক্ষণ পরেই হালকা এক পশলা বৃষ্টি হলো। যদিও তাতে রান্নার খুব একটা সমস্যা হয়নি। তবে ভারী বৃষ্টিপাত হলে হয়তো খাবারটা নষ্ট হয়ে যেতো। শেষ পর্যন্ত রান্নাবান্না যখন প্রায় শেষের দিকে তখন আমি বাসায় ফিরে গেলাম। তারপর তৈরি হয়ে ইফতারের আগ দিয়ে মসজিদে গেলাম। সেখানে গিয়ে দেখতে পেলাম এলাকার অনেক ছোট ছোট ছেলে পেলে খাবার পরিবেশন এর কাজ করছে। প্রথমে ওয়ান টাইম প্লেটে ফল গুলো দিয়ে সাজিয়ে রেখেছিলো। তারপর গামলাতে করে খিচুড়ি নিয়ে সেই প্লেট গুলিতে দেয়া হয়েছিল।
তবে মসজিদে যেতেই খিচুড়ির সুঘ্রান নাকে এসেছিলো। ঘ্রান নাকে যেতেই বুঝতে পারলাম রান্নাটা খারাপ হয়নি। আমি মসজিদে ঢুকেছিলাম কয়েকজন বন্ধু বান্ধবের সাথে। আমরা কয়েকজন এক পাশে গিয়ে বসেছিলাম। ইফতারের আয়োজন হয়েছিল মসজিদের দোতালায়। আয়োজন ছিল প্রায় ১০০ লোকের। আমরা যখন মসজিদে পৌঁছলাম তখন দেখলাম অনেকেই ইতিমধ্যে প্লেট নিয়ে বসে গিয়েছে। আমরাও এক পাশে বসে নিজেদের ভেতর গল্প করতে লাগলাম। এর ভিতরে হুজুর মাইকে ঘোষণা করল এখন সবাই কথা বলা বন্ধ করেন। এখন দোয়া হবে। মূলত এই ইফতার মাহফিলের উদ্দেশ্য ছিল এলাকার যে সমস্ত মানুষজন মারা গিয়েছে বা আমাদের ভেতর থেকে চলে গিয়েছে। তাদের জন্য দোয়া করা। যাই হোক হুজুর বেশ কিছুক্ষণ সময় নিয়ে আন্তরিকতার সাথে বেশ দীর্ঘ মোনাজাত করল। মোনাজাত শেষ হতেই আমরা আজান শুনতে পেলাম। তারপর সকলে ধীরেসুস্থে ইফতার করা শুরু করল। আমি ইফতার করা শুরু করেছিলাম খেজুর দিয়ে। তারপর একটু পানি খেয়ে শরবত খেলাম। তারপরে খিচুড়ি খাওয়া শুরু করলাম। খিচুড়িটা মুখে দিতেই বুঝতে পারলাম বাবুর্চির বয়স কম হলে কি হবে? রান্নায় তার যথেষ্ট মুন্সিয়ানা রয়েছে। আশেপাশের সবাই খিচুড়ির প্রশংসা করছিল। খিচুড়ি আমার এমনিতেই বেশ পছন্দের খাবার। তাছাড়া এই ধরনের অনুষ্ঠানের রান্না করা খিচুড়ি দারুণ সুস্বাদু হয়। আর সেখানে যদি বাবুর্চি হয় ভালো মানের। তাহলে সেই খিচুড়ি স্বাদ বেড়ে যায় আরো বহুগুণ। আমি সাধারণত ইফতারে ভাত বা খিচুড়ি এ ধরনের খাবার কম খেয়ে থাকি। তবে আজকের মাহফিলের খিচুড়িটা এতটাই মজা হয়েছিল যে আমি বেশ অনেকটা খেয়েছিলাম। যাইহোক খাওয়া দাওয়া শেষ করে আমরা উঠে মাগরিবের নামাজের জন্য প্রস্তুত হতে লাগলাম।
আজকের মত এখানেই শেষ করছি। পরবর্তীতে আপনাদের সাথে দেখা হবে অন্য কোন নতুন লেখা নিয়ে। সে পর্যন্ত সবাই ভালো থাকুন সুস্থ থাকুন।
| ফটোগ্রাফির জন্য ব্যবহৃত ডিভাইস | হুয়াই নোভা 2i |
|---|---|
| ফটোগ্রাফার | @rupok |
| স্থান | ফরিদপুর |
Support @heroism Initiative by Delegating your Steem Power
| 250 SP | 500 SP | 1000 SP | 2000 SP | 5000 SP |
Support @Bangla.Witness by Casting your witness vote
Support @Bangla.Witness by Casting your witness vote
VOTE @bangla.witness as witness
OR
রোজাদারের জন্য সবথেকে বড় খুশির বিষয় হলো দুইটা একটি হলো ইফতারের সময় আরেকটি হল যেদিনকে আল্লাহ নিজ হাতে রোজার পুরস্কার আমাদেরকে দেবেন।।
এরকম আয়োজন গুলা করতে খুবই ভালো লাগে কেননা গ্রামের ছোট বড় সবাই মিলে একসাথে বসে ইফতারি করার সুযোগ পেলে।।
অনেক ভালো লাগলো আপনাদের এই উদ্যোগটি দেখে ধন্যবাদ ভাইয়া।।
Upvoted! Thank you for supporting witness @jswit.
আসলে বন্ধুদের সাথে নিয়ে ইফতারের মুহূর্তটা সত্যিই অসাধারণ। আপনি এলাকার সবাইকে নিয়ে এবং বন্ধুদের সাথে নিয়ে অনেক আনন্দময় সাথে ইফতারের আয়োজন করেছেন।দেখে ভাল লাগলো। আমরাও আয়োজন করবো কিছু দিনের মধ্যেই।
রোজা থাকার সব থেকে আনন্দদায়ক মুহূর্ত হলো ইফতারির সময়। ভাই আপনাদের মত আমরাও প্রতি বছরে ইফতারির আয়োজন করে থাকি। তবে আমরা ২৯ রোজায় আয়োজনটা করে থাকি। আর ইফতারির জন্য টাকা পয়সা জোগাড় করা খুব একটা অসম্ভব নয় খুব সহজেই এটা সম্ভব হয়। ইফতারি মেনুতে খিচুড়ি মাংস কয়েক রকম ফল এবং শরবত রেখেছিলেন। তবে মেঘলা দিন ছিল ভারী বৃষ্টি হয়নি এটা আপনাদের জন্য সৌভাগ্য আল্লাহর ইচ্ছা। তবে বাবুর্চির উপরে আপনার যে মনোভাবটা ছিল রান্না করে খাওয়ার পরে সেটা পুরোটাই পাল্টে গেছে। তার রান্নাটার সবাই প্রশংসা করেছিলো। আমরাও আপনাদের মতই প্রত্যেক বছরে ৩৫০ জন লোকের আয়োজন করে থাকি ইফতার পার্টিতে।
এলাকার সবাইকে নিয়ে ইফতারের আয়োজনের মুহূর্তটা সত্যিই অসাধারণ। প্রতি রমজানের ২৭ তারিখে আমাদের এলাকায় ও বিশাল বড় ইফতারের আয়োজন করা হয়। অনেক আনন্দের সাথে আমরা সবাই এক সাথে ইফতার করে থাকি।
রোজার সৌন্দর্য হচ্ছে ইফতার। আর একসাথে অনেকে ইফতার করলে সে সৌন্দর্য অনেক বেড়ে যায়। আপনারা সবাইমিলে মসজিদে ইফতার করেছেন যেনে ভাল লাগলো। আর এই ইফতার আয়োজনের পিছনে কতজনের শ্রম-প্রচেষ্ঠা তার আপনার সুলিখনিতে উঠে এসেছে। সংশ্লিষ্ট সবাইকে ধন্যবাদ। আপনার জন্য শুভ কামনা।
১০০ জনের জন্য মসজিদে ইফতারের আয়োজন করা হয়েছিল জেনে সত্যি ভালো লাগলো ভাইয়া। সকলের প্রচেষ্টায় সেটা সফলভাবে করা সম্ভব হয়েছে। বৃষ্টির হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য ভিন্ন পদক্ষেপ নিয়ে রাখাই ভালো। না হলে এতজন মানুষের খাবার নষ্ট হয়ে যেতে পারত। যাই হোক শেষ পর্যন্ত সবকিছু ভালোভাবে হয়েছে এটাই আল্লাহর কাছে লাখ লাখ শুকরিয়া। আর বাবুর্চি ছোট হলেও রান্নার হাত বেশ ভালো একটা বোঝাই যাচ্ছে। ভালো লাগলো ভাইয়া আপনার পোস্ট পড়ে।
আপনার এক বন্ধু এলাকার সবাই মিলে একদিন ইফতার করার কথা বলল বলে আপনারা সকলে মিলে খুব সুন্দরভাবে ইফতার পালন করেছেন দেখছি। এলাকার ছোট ভাইয়েরা তো খুবই সুন্দরভাবে সব জোগাড় করেছে দেখেছি। খিচুড়ির সুঘ্রাণ নাকে আসছিল, এ থেকেই বোঝা যাচ্ছে বাবুজি অল্প বয়সি হলেও খুব সুন্দর রান্না করেছে। খুব জোড়ালো বৃষ্টি না হওয়ায় আপনারা সকলেই খুব মজা করে ইফতার পালন করেছেন বোঝা যাচ্ছে। ইফতারের উদ্দেশ্যটা শুনেও খুবই ভালো লাগলো। বেশ ভালো ছিল খাবারের আইটেম খিচুড়ি মাংস, ফল আর শরবত বাহ্।
রোজা থাকার পুরো আনন্দটাই থাকে ইফতারির মধ্যে। আর এরকম ভাবে গ্রামের সকলে মিলে ইফতারের আয়োজন করাটা সত্যি এক বিশাল ব্যাপার। তবে এরকম আয়োজনে বৃষ্টি হওয়াটা কোন বিষয় না। কারণ এখন আবহাওয়াটা যেহেতু একটু খারাপ। অত্যন্ত চেষ্টার পরে চাদা আদায় করে এলাকার মানুষের সাথে একই জায়গায় বসে ইফতারি করার মজাই আলাদা। এরকম ইফতারিতে নিঃসন্দেহে পরস্পরের মধ্যে সম্প্রীতি বৃদ্ধি পায়।
ভাইয়া প্রথমেই আপনাকে ধন্যবাদ জানাই এমন সুন্দর একটি কাজে অংশ গ্রহণ করার জন্য। কারন আমরা সবাই জানি যে রোজাদার কে ইফতার করানো তে কত সোয়াব। তবে এলাকার ছোট ভাইদের কে নিয়ে আপনারা সবাই বেশ সুন্দর একটি মহতি প্রোগ্রাম করেছেন।