টিউশন জীবনের গল্প-
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারোকাতুহ।
আজকে আপনাদের সাথে আমার টিউশন জীবনের একটা ছোট গল্প শেয়ার করি-
আমার জীবনে বর্তমান সময় পর্যন্ত প্রায় দুইশত এর বেশি ছাত্রকে ব্যাচে অথবা বাসায় গিয়ে পড়িয়েছি। সবাই আমাকে সম্মান এবং ভালেবাসা দু'টোই করতো। এজন্য দিন দিন আমার টিউশনির প্রতি ভালোবাসাটা আরও বেশি জন্মায়। আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার আগেও অনেকগুলো বাসায় টিউশনি করিয়েছি। মানে বাসায় গিয়ে পড়াতাম। সেখানে বিষয়টা ছিল এমন প্রথম দিন সৌজন্যতার ক্ষেত্রে আমাকে নাস্তা দিলেও বেশির ভাগ সময়ই দিত না। আর এতে আমার কোন কিছু মনে হতো না। কারণ আমার সম্পর্ক ছাত্রের পড়ানোর সাথে আর মাস শেষে আমার বেতনের সাথে। তবে বেশ কয়েকটা টিউশনির গার্ডিয়ানগুলো প্রায় আমাকে নাস্তা দিত।
বর্তমান আমি "ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজিপুর ( ডুয়েট) এর একজন প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী। যেহেতু আমার অনেক আগে থেকেই টিউশনি করানোর অভ্যাস, এজন্য বর্তমানে আমও গাজিপুর শহরেও টিউশনি করায়। বর্তমান সময়ে গার্ডিয়ানগুলো হোম টিউটরদেরকে একজন কেনা গোলামও মনে করেন বলে আমি মনে করি। তাদের ব্যবহার আর কথা বার্তা দেখলে মনে হয় আমরা খুব অসহায় হয়ে তাদের সন্তানদের পড়াতে যায়। বেতন দিবে কম, আবার চাহিদা অনেক। আবার শিক্ষকে তো অনেকে মাঝে মধ্যেও নাস্তাও দেয় না। তবে পৃথিবীর সবাই এক হয় না, তার বাস্তব চিত্র আমি আপনাদের সাথে শেয়ার করতে চলেছি।
গত রমজান মাস থেকে আমি গাজিপুর চৌরাস্তায় অষ্টম শ্রেণীর একজন ছাত্রকে পড়াতে যায়। প্রথম অবস্থায় যতটুকু বুঝেছিলাম, তাদের ব্যবহার অনেক ভালো ছিল। আমার ছাত্র ও আমাকে যথেষ্ট সম্মান করত। রমজান মাসে যেহেতু পড়ানো শুরু করি, দুপুরে পড়াতে যেতাম এজন্য নাস্তা দেওয়া সম্ভব হয় নাই, তবে কয়েক দিন আমার ছাত্র আমাকে বলেছিল, স্যার আজকে থাকেন ইফতারি করে তারপর যাবেন। আমি চলে আসতাম। ঈদের পরে যখন আবার পড়ানো শুরু করলাম। তখন প্রথম দিন থেকে আমাকে নাস্তা দেওয়া শুরু করছে। এখনও প্রতিদিন নাস্তা দিয়ে জান। নাস্তা বলতে যে শুধু চা বিস্কুট এমন নয়। প্রতিদিন ভিন্ন ভিন্ন খাবার দিয়ে নাস্তা দেন। পরিবার টা যেহেতু সবাই পর্দাশীল এজন্য আমার ছাত্র বাদে তার পরিবারের লোকদের সাথে তেমন আমার কথা বা দেখা হয় না। জরুরি প্রয়োজন হলে ফোনে কথা বলে নেই। তাদের অর্থনৈতিক দিক যে খুব ভালো এমন নয়, আঙ্কেল বিএসসি ইঞ্জিনিয়ার, একটা কোম্পানির উচ্চপদে আছেন।
প্রতিদিনের মতো আজকেও আমি পড়াতে যায়। তবে আজকে শুক্রবার ১০ই মুহররম ( আশুরা) হওয়ায় আমি রোজা ছিলাম। আমার পড়ানো ছিল আসরের পরে আমি রোজা রেখেও পড়াতে যায়। সচারাচর আমি গুরুত্বর অসুস্থ না হলে কাউকেই পড়ানো বাদ দেয় না। পড়ানো মাঝে প্রতিদিনের মতো আজও যখন আমার ছাত্র নাস্তা আনতে যেতে চায় তখন আমি বলি আমি রোজা আছি৷ এরপর সে বসে পড়তে থাকে। হঠাৎ তার মা তাকে ডাক দেয় সে ভিতরে যায় এবং একটা ভাজ করা কাগজ আমাকে এনে দিয়ে বলে স্যার আজকে আর পড়ানোর দরকার নাই এটা নিয়ে আপনে চলে যান।
আমি তো ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম, মাসও শেষ হয় নাই যে বেতন দিবে, আবার কাগজ হয়ত টাকা, তাহলে কি আমাকে বাদ দিয়ে দিবে।
আমি কয়েকবার আমার ছাত্রকে বিষয়টা জিগানোর পর কাগজটা খুলে দেখি ভিতরে ২০০ টাকার একটা নোট। জিগালাম এটা কিসের জন্য, বললো স্যার আপনে ইফতার করে নিয়েন। অনেক জোরাজোরি করেও টাকাটা ফেরত দিতে পারি নাই। অবশেষে টাকাটা নিয়ে চলে আসি।
গল্পটা বলার উদ্দেশ্যো হলো, তারা কিন্তু চাইলেই অন্য গার্ডিয়ানদের মতো নাস্তা নাও দিতে পারতেন, আমি রোজা আছি শুনে ইফতার করার জন্য টাকা নাও দিতে পারতেন। কিন্তু তারা মহান রবের প্রতি বিশ্বাস আর ভালো মনের মানুষ হওয়ার কারণে কাজগুলো করেন। আমি বলতেছিনা যে অন্য গার্ডিয়ানরা খারাপ, সবাই ভালো কিন্তু এরা সবার থেকে আলাদা। আসলে রিজিক আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে আসে।
আমার জীবন এমন, ছাত্র ও পরিবার এই প্রথমবার পেয়েছি। আমিও মহান রবের নিকট দোয়া করি যেন পরিবারটাকে ইসলামি পরিবার হিসেবে কবুল করেন। (আমিন).
গল্পটার শিক্ষা হলো, একজন টিউশন শিক্ষক হোক বা ঘরের মালি আমাদের সবার উচিত সবাইকে সম্মান করা ও সাধ্যমত খুশি করা। এতে মহান আল্লাহ তায়ালা খুশি হয়ে পরিবারের উপর রহমত বর্ষণ করেন।
আসুন আমরা সবাই একজন ভালো সৎ মানুষ হিসেবে গড়ে উঠি।
ধন্যবাদ এতো ধৈর্য্য সহকারে লেখাটা পড়ার জন্য। ভুল ত্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।
মো: রাসেল আহমেদ।
ইইই, ডুয়েট।
Upvoted! Thank you for supporting witness @jswit.