সূর্য যদি না থাকে ?
source
রাতের আকাশ আমাদের কাছে খুব শান্তিপূর্ণ এবং সুন্দর লাগে । মিট মিট করে জ্বলা নক্ষত্রগুলো দেখতে কার না ভালো লাগে। কিন্তু আসলে নক্ষত্রগুলো তেমন মিটমিট করে জ্বলছে না আর থেমে নেই কোনো নির্দিষ্ট একটি জায়গাতে। গ্যালাক্সি এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে ছুটে চলছে হাজার হাজার কিলোমিটার প্রতি সেকেন্ডে। আরে ছুটে চলা শুধুমাত্র নিজের পথেই নয় বরং আশেপাশের অন্যান্য স্টার সিস্টেমগুলো কে প্রভাবিত করে। সৌভাগ্যক্রমে মিল্কিওয়ে অনেক বড় এবং একটা নক্ষত্র থেকে অন্য নক্ষত্রের যাত্রা পথের দূরত্ব অনেক বেশি। যে কারণে খুব সম্ভবত দূর ভবিষ্যৎ পর্যন্ত সূর্যের যাত্রাপথে অন্য কোন নক্ষত্র এসেই পৃথিবীর উপরে বাধা সৃষ্টি করবে এমন হওয়ার নয়। কিন্তু এখানেও শতভাগ নিশ্চয়তা দিয়ে কিছুই বলা যায় না। পৃথিবীর উপর প্রভাব ফেলার জন্য কোন নক্ষত্রের প্রয়োজন নেই, ছোটখাটো গ্যাস প্লানেট সৌরজগতের ঢুকে পড়লে কিংবা কোন বড় নক্ষত্র সৌরজগতের খুব কাছে চলে আসলে ঘটতে পারে এমন দুর্ঘটনা। কি হবে যদি আমাদের সূর্য আমাদের আকাশে না থাকে ?
source
অন্যান্য নক্ষত্র আমাদের জন্য কতটা ভয়াবহ হতে পারে এটা জানার জন্য আমাদের সর্বপ্রথমে মহাকর্ষ নিয়ে কিছুটা আলোচনা করতে হবে। মহাবিশ্বের প্রতিটি বস্তু একে অপরকে একটি নির্দিষ্ট বলে একটি নির্দিষ্ট পথে আকর্ষণ করে আর তাই হচ্ছে মহাকর্ষ বল। এই বলের পাল্লা অসীম হওয়ায় এখন তোমার উপরে কয়েক লক্ষ আলোকবর্ষ দূরে থাকা একটা ছোট পাথর কোন আকর্ষণ রয়েছে তা যত ছোটই হোক না কেন। ভাগ্যবশত দূরত্ব বৃদ্ধির সাথে সাথে এই বলের ক্ষমতা কমতে থাকে আর এটা কোন বস্তু কত ভারী তার উপরে নির্ভর করে। এইভাবে মহাবিশ্বে ছোট বস্তু বা শুদ্ধ করে বললে কম ভরবিশিষ্ট বস্তু ভরের বস্তুর দিকে আকর্ষিত হয় এবং বেশি ভরের বস্তু ওই ছোট বস্তুগুলোকে মহাকর্ষ বলের মাধ্যমে কোন দিকে যেতে হবে তার দিকনির্দেশনা প্রদান করে। সূর্য সৌরজগতের 99. 97 শতাংশ ভরের উৎস। তাই সৌরজগতের সকল বস্তু কিভাবে কোন পথে ঘুরবে বা থাকবে তা সূর্যই নিয়ন্ত্রণ করে। প্রায় পাঁচ বিলিয়ন বছর আগে যখন সূর্য গঠিত হয়েছিল তখন সূর্যের আশেপাশে এবং তার অরবিটে যে সকল জায়গায় বেশি ভর একত্রিত হয়েছে সেই সব জায়গায় গ্রহ গুলো তৈরি হয়েছে । আর এতদিন পরে বেশিরভাগ গ্রহ উপগ্রহ এবং ধুমকেতু গুলো সূর্যের চারপাশে নিজের নিজের নির্দিষ্ট কক্ষপথে থিতু হয়েছে। আমাদের আছে অভ্যন্তরীণ গ্রহ বা বুধ এবং শুক্র, আমাদের পৃথিবী, বহির গ্রহ বা মঙ্গল, বৃহস্পতি, শনি , ইউরেনাস এবং নেপচুন , আরো আছে মঙ্গল এবং বৃহস্পতির মাঝে অস্তেরয়েড বেলট , নেপচুন পরবর্তী কাইপার বেল্ট এবং সৌরজগতের সর্ববহিঃস্থ ধুমকেতু পাথর এবং বামন গ্রহের সমাহার ওর্ট ক্লাউড। এই সর্বশেষ সীমা সূর্য থেকে প্রায় 270 বিলিয়ন কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত। তার পরেও যদি এই সর্বশেষ সীমার কাছে দিয়ে কোন মাঝারি ভরের নক্ষত্র পাশ কাটিয়ে চলে যায় তাহলে সম্পূর্ণ সোলার সিস্টেম নক্ষত্রের কারণে একদিকে চেপে যাবে। যা সরাসরি সকল গ্রহ উপগ্রহ ধুমকেতু এবং এস্টেরয়েড এর পথকে বিঘ্নিত করবে। এই ঘটনা যে একেবারে ঘটতে পারে না এমন কিন্তু নয় এখন থেকে প্রায় 70 হাজার বছর আগে, লাল বামন এবং খয়রি বামন বাইনারী সিস্টেমের দুটি উপ নক্ষত্র সৌরজগতের পাশ কাটিয়ে চলে যায়। যার ফলে বেশকিছু বামন গ্রহ এবং ধুমকেতু সূর্যের দিকে ছুটে আসছে। হয়তো সেগুলো পৃথিবীতে ধাক্কা খাবে তবে এ পর্যন্ত পৌঁছাতে তাদের আরো কয়েক লক্ষ বছর প্রয়োজন।
source
কিন্তু কয়েক লক্ষ বছরের মধ্যে এই ঘটনাই পৃথিবীর জন্য সবচেয়ে মারাত্মক ঘটনা নয়। গ্লিস ৭১০ নামের একটি বামন নক্ষত্র যার ভর প্রায় সূর্যের অর্ধেক ছুটে আসছে সৌরজগতের দিকে। এখন থেকে প্রায় 1 লক্ষ 20 হাজার বছর পরে পৃথিবীর আকাশে সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্র হিসেবে স্থান পাবে এই নক্ষত্রটি। সৌরজগতের খুব কাছ দিয়ে অতিক্রম করবে। গ্যালাক্সি এত সস্তা জায়গা নয়। আমরা হয়তো এই ফ্লাই বাই পূর্বে ঘোষণা করতে পারছি কিন্তু এমন অনেক নক্ষত্র থাকতে পারে যারা আগামী 1 লক্ষ বছরের মাঝে সৌরজগতের খুব কাছে নয় বরং সূর্যের খুব কাছে দিয়ে অতিক্রম করবে। এরকম ফ্লাই বাই মানব সভ্যতার জন্য খুব বড় আশঙ্কার কারণ হবে যদি তখনও পৃথিবীতে মানুষ থেকে থাকে। ধরে নিচ্ছি পৃথিবীতে মানুষ আছে। আরো বড় আশংকা হচ্ছে এরকম ঘটনার সময় নক্ষত্রটি যদি পৃথিবী থেকে 2 অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল ইউনিট এর মাঝে অবস্থান করে তাহলে তার মহাকর্ষ পৃথিবী কে সরাসরি সূর্যের আকর্ষণ থেকে ছিন্ন করে সৌরজগতের বাইরের দিকে নিক্ষেপ করবে। তবে এরকম ফ্লাই বাই এর সম্ভাবনা আগামী 5 বিলিয়ন বছরে এক লক্ষ ফ্লাই বাই এর মধ্যে একটা। সাধারণত কোন প্লানেটারি সিস্টেম থেকে এভাবে প্লানেট কে উৎখাত করলে সেই প্লানেট কে রোগ প্ল্যানেট বলা হয়। রোগ প্লানেট কথাটার অর্থ হচ্ছে যে গ্রহের নক্ষত্র নেই। যদি এরকম ঘটনা ঘটে যায় কেমন হবে সে সময়ের চিত্র চলুন দেখা যাক,
source
নক্ষত্রটি যখন কাছে আসতে থাকবে আকাশে সবকিছু ছাপিয়ে তাকে দেখা যেতে থাকবে। মাসের পর মাস ধরে বাড়তে থাকবে নক্ষত্রটির আকার। কয়েক বছরের মাঝে দিনের বেলায় তাকে দেখা যাবে। এক সময় রাতের আকাশে চাঁদের থেকেও বেশি উজ্জ্বল হয়ে উঠবে এ নক্ষত্র। যেহেতু নক্ষত্রটি লাল বামন তাই রাতের আকাশ এসময় লাল আলোয় ভরে উঠবে। সূর্য ডুবলো যেন শুরু হয় রাতের বদলে লাল দিন। এর কয়েক মাস পরে এটা ছোট হতে থাকবে। একই সাথে দিনের আকাশের সূর্য ছোট হতে থাকবে। আগামী কয়েক বছরের মাঝে সূর্যের আলো এতই কমে যাবে যে রোদের তাপ বলে আর কিছু থাকবে না। আগামী কয়েক দশকের মাঝে আকাশের দিকে তাকিয়ে ও সূর্য দেখা যাবে না হবেনা দিন-রাতের পরিবর্তন। সমগ্র পৃথিবী জুড়ে থাকবে রাতের অন্ধকার তবে দেখা যাবে আকাশের তারা গুলো। শুরু হবে মানব সভ্যতার চূড়ান্ত শীত। এ ঘটনা হয়ে যাওয়ার কিছু বছরের মাঝে পৃথিবীর গাছগুলো মারা পড়বে এবং সমুদ্র জমে যাবে। জমে যাবে নদী-নালা এবং পুকুর ও । গাছ মরে যাওয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই পৃথিবীর প্রাণীবৈচিত্র্য ধ্বংস হয়ে যাবে। তখনো বেঁচে থাকবে মানুষ কারন মানুষ অর্জন করেছে শক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা। পৃথিবীর সবকিছু স্থবির হয়ে যাবে। থাকবে না অফিস, স্কুল কলেজ কিংবা খেলাধুলা। মানুষ থাকবে ঘরের মধ্যে, চেষ্টা করবে আগুন জ্বালিয়ে যতটা সম্ভব নিজেকে উত্তপ্ত রাখা যায়। হিমায়িত পৃথিবীর মৃত জন্তুগুলো এবং জমিয়ে রাখা শেষ ফসল কয়েক দশক পর্যন্ত মানুষের খোরাকির ব্যবস্থা করবে। বৃহস্পতি পার করা পর্যন্ত হয়তো পৃথীবির সাধারণ মানুষ কিছু হলেও বেঁচে থাকবে কিন্তু তার পরবর্তী সময়ে পৃথিবীর তাপমাত্রা হবে - 150 ডিগ্রি সেলসিয়াস। আন্টার্টিকায় এখন পর্যন্ত পাওয়া সর্বনিম্ন তাপমাত্রা হচ্ছে -126 ডিগ্রি সেলসিয়াস। ঠান্ডায় সাধারন মানুষ মারা পড়বে বেঁচে থাকবে উচ্চবিত্ত এবং ক্ষমতাশালী কিছু মানুষ যারা পারবে নিউক্লিয়ার পাওয়ার কে নিজের দেহের উষ্ণতায় ব্যবহার করতে। কিন্তু অবস্থা খারাপ হওয়ার এখনো বাকি সূর্যের তাপের অভাবে এখন আর কোন মেঘ গঠিত হয় না। কাজী পানিচক্র আর চলে না। আকাশে ঘন মেঘের আস্তরন গোটা পৃথিবী বরফে ঢাকা। নিউক্লিয়ার পাওয়ার দিও আর চলবে না মানুষের জীবন। সনি আসতে আসতে ধরে নেওয়া যায় পৃথিবীর সব মানুষ মারা পড়বে।
source
সকল প্রাণীবৈচিত্র্য এবং মানুষ মারা যাওয়ার পরেও কিন্তু পৃথিবীতে প্রাণের অস্তিত্ব থাকবে। এরকম কন্ডিশন হওয়ার পরেও গভীর সমুদ্রের নিচে আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখের পাশে কিছু স্পঞ্জ এবং নিডারিয়া গোত্রের প্রাণীর দেখা তখনো মিলবে। আর সমুদ্রের নিচের মাটির নিচে যে সকল ব্যাকটেরিয়া এবং সায়ানোব্যাকটেরিয়া থাকে তারা বুঝতেই পারবে না পৃথিবী তার নিজের জায়গায় নেই। তাদের অস্তিত্ব এখন যেমন আছে তখনো তেমনই থাকবে। প্লুটো পার হওয়ার পরে তাপমাত্রা প্রায় -235 ডিগ্রী সেলসিয়াসে পৌছবে যেটা আমাদের বাতাসের হিমাঙ্কের চেয়ে কম। যে কারণে সময় পৃথিবীর বাতাস স্নো ফলের মতো ঝরে পড়বে পৃথিবীপৃষ্ঠে। যদিও পৃথিবীর এটাই শেষ কিন্তু আশা আছে। এই নক্ষত্র যে পৃথিবীর দিকে আসছে তা মানুষ প্রায় কয়েক হাজার বছর আগে বুঝতে পারবে। কয়েক হাজার বছর একটা নক্ষত্র কে কক্ষচ্যুত করা কিংবা পৃথিবীতে এমন ব্যবস্থা করা যেন মানুষের অন্তিম পরিণতি না হয় তার জন্য যথেষ্ট। আর যদি পৃথিবী সত্যি কক্ষচ্যুত হয় আর মানুষ বেঁচে থাকার পেয়ে যায় সেটাই হয়তো হবে মানুষের সভ্যতার স্তরে দ্বিতীয় ধাপে ওঠার প্রধান অনুপ্রেরণা। তাই সব সময় খারাপ দিকের সাথে ভালো দিকটা চিন্তা করা উচিত।
This post is chosen for recommendation for booming curation support today. Continue creating quality content here at Steeming Community. Please read this important announcement.
Thank You.