কষ্ট ভোলার উপায় কি সত্যিই আছে? আমার ভেতরের কিছু এলোমেলো কথা
আহ্, কী একটা কথা মনে এলো জানেন! হঠাৎ করেই মনটা কেমন যেন চুপ হয়ে গেল। ভাবছিলাম... ইশ, যদি মানুষ চাইলেই সব কষ্ট একেবারে ভুলে যেতে পারতো, তাহলে কি আর কাউকে বুকে এতো দুঃখ নিয়ে বেঁচে থাকতে হতো? কথাটা যখন মনে এল, তখন মনে হলো, আরে বাবা, এটা তো শুধু আমার একার ভাবনা নয়। এই পৃথিবীতে কত কত মানুষ আছে, যারা হয়তো এই একই কথা ভাবে!
সত্যিই যদি এমন হতো, একটা সুইচ টিপলেই সব দুঃখ, সব ব্যথা, সব খারাপ লাগা ভ্যানিশ! শুনতে হয়তো দারুণ লাগে, তাই না? একটা দারুণ সমাধান মনে হয়। কিন্তু জানেন, কথাটা যতই ভালো লাগুক, আমার মনে হয় না এটা আসলে ভালো কিছু হতো। কেন বলুন তো?
যখন এই কথাটা আমার মাথায় ঘুরছিল, তখন চোখের সামনে ভেসে উঠলো আমার পরিচিত কিছু মুখ। একজন হয়তো তার খুব কাছের মানুষকে হারিয়েছে। সে কী কষ্ট! আরেকজন হয়তো জীবনে খুব বড় একটা ধাক্কা খেয়েছে, নিজের সব স্বপ্ন কেমন যেন এলোমেলো হয়ে গেছে। তাদের মুখে দেখি একটা চাপা কষ্ট, যেটা কেউ হয়তো বুঝতেও পারে না। যদি তারা সত্যি সত্যি চাইতো আর পারতো যে সব কষ্ট ভুলে যাবে, তাহলে তাদের মুখে হয়তো সব সময় হাসি লেগে থাকতো। তাদের মনে আর কোনো ভার থাকতো না।
কিন্তু তখন আমার মনে হলো, কষ্টগুলো কি শুধু কষ্টই? শুধু কী খারাপ লাগা? আমার কেন যেন মনে হয় না। এই যে ধরুন, একটা বাচ্চা যখন সাইকেল চালানো শেখে, সে কতবার পড়ে যায়, ব্যথা পায়, কাঁদে। সেই ব্যথাগুলোই তো তাকে শেখায় কীভাবে হাতল ধরতে হয়, কীভাবে পা চালাতে হয়। যদি সে ব্যথাই না পেত, তাহলে কি সে কখনো সাইকেল চালানো শিখতো? শিখতো না হয়তো। কষ্টগুলোও ঠিক তেমনই। সেগুলো আসলে আমাদের জীবনের এক একটা পাঠ। কঠিন পরিস্থিতিগুলোই তো আমাদের শেখায়, কীভাবে আরও শক্ত হতে হয়, কীভাবে আবার উঠে দাঁড়াতে হয়। যদি সব কষ্ট মুছে ফেলতে পারতাম, তাহলে এই যে শেখাগুলো, এই যে অভিজ্ঞতা – এগুলোর কোনো মূল্যই থাকতো না। জীবনটা কেমন যেন ফিকে হয়ে যেত, মনে হয়।
আরেকটা কথা কি জানেন? কষ্টগুলোই কিন্তু আমাদের মানুষ করে তোলে। যখন একজন মানুষ অন্য মানুষের কষ্ট বোঝে, তখনই তো তার মনে সহানুভূতি আসে, ভালোবাসা আসে। ধরুন, আপনার কোনো বন্ধু খুব বিপদে আছে। আপনি তার পাশে দাঁড়ালেন, তাকে সাহায্য করলেন। এটা কেন করলেন? কারণ আপনি জানেন কষ্ট কেমন হয়, আপনি তার ব্যথাটা অনুভব করতে পারছেন। যদি আমাদের জীবনে কষ্ট বলে কিছু না থাকতো, তাহলে 'সহানুভূতি' বা 'ভালোবাসা'র মতো শব্দগুলোর মানেই হয়তো এতো গভীর হতো না। আমরা হয়তো একে অপরের প্রতি এতোটা টানও অনুভব করতাম না। কেমন যেন রোবটের মতো হয়ে যেতাম, তাই না?
হ্যাঁ, এটাও ঠিক যে, কিছু কিছু কষ্ট এতটাই গভীর হয় যে, আমরা হাজার চেষ্টা করেও সেগুলো ভুলতে পারি না। সেই কষ্টগুলোই মানুষকে একদম ভেতর থেকে নাড়িয়ে দেয়। জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, মানুষ সেই অসম্ভব কষ্টের ভার নিয়েই কিন্তু বেঁচে থাকে। দিনের পর দিন সেই কষ্টের সাথে লড়াই করে। আর এই লড়াই করার শক্তিটাই তো আসল! এই শক্তিটা কোথা থেকে আসে? আমার মনে হয়, এটা আসে কষ্টকে মেনে নেওয়ার ক্ষমতা থেকে, কষ্ট থেকে শেখার ইচ্ছা থেকে, আর যেকোনো মূল্যে টিকে থাকার জিদ থেকে।
যদি সব কষ্ট একদম মুছে ফেলার জন্য একটা জাদুর কাঠি থাকতো, তাহলে হয়তো আমাদের জীবনের রঙগুলোও কেমন যেন ফ্যাকাসে হয়ে যেত। জীবনটা হয়ে উঠতো একটা একঘেয়ে লম্বা রাস্তা, যেখানে কোনো বাঁক নেই, কোনো চড়াই-উতরাই নেই। কিন্তু হাসি আর কান্নার বৈপরীত্যই তো আমাদের জীবনের সৌন্দর্য! অন্ধকার আছে বলেই তো আমরা আলোর কদর করি। কষ্ট আছে বলেই তো আনন্দের মুহূর্তগুলো এত বেশি মূল্যবান মনে হয়।
শেষের দিকে একটা কথা বলবো। আমার মনে হয়, কষ্টগুলো আসলে আমাদের জীবনের খুব গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আমরা হয়তো চাইলেই সব কষ্ট জোর করে ভুলতে পারি না, আর হয়তো ভোলা উচিতও নয়। বরং আমরা কষ্টকে সঙ্গী করে পথ চলতে শিখি। কষ্ট থেকে শিখে আরও শক্তিশালী হই। এই কষ্টগুলোই যেন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, আমরা রক্ত-মাংসের মানুষ, আর এই কষ্টগুলোই আমাদের মানবিকতার আসল পরিচয়। তাই হয়তো সব কষ্টকে জোর করে ভুলে না গিয়ে, সেগুলোকে জীবনের অংশ হিসেবে মেনে নেওয়াটাই আসল। এতেই আমরা আরও সমৃদ্ধ হতে পারি, আরও বেশি মানবিক হতে পারি, আর জীবনকে তার সবটুকু রঙ আর রূপ নিয়ে উপভোগ করতে পারি।
আশা করি আমার এই ভাবনাগুলো আপনাদেরও ভালো লেগেছে। ধন্যবাদ সবাইকে।

Upvoted! Thank you for supporting witness @jswit.