আজকের সামাজিক পরিস্থিতির জন্য দায়ী কে? একটি সার্বিক আলোচনা।
আজকের সমাজে অবনমনের জন্য দায়ী কে?
আমরা যেন একটা অন্ধকার সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি। যত দিন যাচ্ছে সমাজের একটা কালো অন্ধকার দিক ধীরে ধীরে প্রকট হয়ে উঠছে আরো। আজ এই ব্লগে আলো ছেড়ে একটু অন্ধকারের কথা বলি। মানুষের জীবনে সম্পূর্ণটাই কি আলো? কখনোই নয়। দিন এবং রাত নিয়েই তৈরি হয় পৃথিবীর আবর্তন গতি। একটি সম্পূর্ণ দিনে কখনো অন্ধকার ছুঁয়ে দেয় আশপাশের সবকিছু, আবার তারপর ভোরের সূর্য নতুন করে আলোকিত করে পৃথিবীকে। এই যেন জীবনের নিয়ম। আমরা যে সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি সেখানে যেন কোন কাজেই আর মন বসছে না। কবিতা লিখব? গল্প লিখব? নাকি নিজের পেশাগত জীবনে নিজেকে ব্যস্ত রাখবো প্রতিনিয়ত? বুঝে ওঠার আগেই এক গভীর আচ্ছন্নতা ঢেকে দিচ্ছে মনের অন্দরমহলের কোষগুলোকে। যেদিকে তাকাচ্ছি মানুষের হিংস্রতা, চরম বর্বরতা অথবা এক প্রতিহিংসামূলক আচরণ চোখে ধরা পড়ছে অনবরত। প্রতিদিন কাগজ খুললেই খুন, ধর্ষণ, ছিনতাই বা আর্থিক তছরুপের মতো খবর চারপাশে। হয়তো নিজের ঘরের পাশে থাকা মানুষটিকেও আমরা ঠিক মত চিনতে পারি না। এ যেন এক গাঢ় অন্ধকার দখল করছে আমাদের আশপাশের পৃথিবীটাকে।
মানুষ মানুষকে ঠকাতে পারলে তার থেকে আনন্দের বিষয় আজকে আর কিছু নেই। এটাও যেন এক অসুস্থ প্রতিযোগিতা। প্রতিহিংসার লেলিহান শিখায় মুহূর্তে ছাই হয়ে যাচ্ছে সব কিছু। তার সাথে তীব্র বিদ্বেষমূলক আচরণ। মানুষ আর কতটা মানুষের তরে সেই প্রশ্ন সব সময় কুরে কুরে খায় আমাকে। ভূপেন হাজারিকা তাঁর গানের মাধ্যমে বলেছিলেন -
মানুষ মানুষেরই জন্য
জীবন জীবনেরই জন্য
একটু সহানুভূতি কি মানুষ দিতে পারেনা?
এই প্রাসঙ্গিক প্রশ্নটুকুই আজ বারবার ফিরে আসে মনে। কোথায় সেই সহানুভূতির জায়গা? মানুষ কি আদৌ সহানুভূতিশীল? সহানুভূতির জায়গা থাকলে এত প্রতিহিংসা আসে না। নিজেরটুকুই যখন জীবনের সর্বস্ব হয়ে দাঁড়ায়, তখন তার হাড় কঙ্কালগুলো বেরিয়ে এসে এমনই এক হিংসা সর্বস্ব পৃথিবী তৈরি হয়। তখনই প্রশ্ন আসে মনে। আমরা আদৌ আবার সেই বর্বর যুগে ফিরে যাচ্ছি না তো, যেখানে মানুষ জীবনধারণের জন্য মানুষের মাংস খেয়েই বেঁচে থাকতো। কিন্তু তখন ছিল অস্তিত্বের সংগ্রাম। এখন আমরা কোন অস্তিত্বের জন্য অন্য মানুষকে খুন করছি? সত্যিই বড় অন্ধকার সময়। কোনো শুভ কাজও আর মনে আনন্দ দিতে পারছে না কোনভাবেই।
নিজের স্বার্থটুকু চরিতার্থ করার বশে কখনো আমরা খুন করে ফেলছি সহকর্মীকে। কখনো ঘরে ডেকে হিংসা চরিতার্থ করছি পেটে ছুরি মেরে। আর এই হিংস্র পৃথিবী ধীরে ধীরে গ্রাস করছে অবশিষ্ট আলোটুকু। এখানে প্রাসঙ্গিকভাবে কামিনী রায়ের একটি লাইন মনে পড়ে যাচ্ছে-
সকলের তরে সকলে আমরা
প্রত্যেকে আমরা পরের তরে।
আজকের সমাজকে দেখলে কবিদের এই সব নীতিবাক্যগুলি যেন রূপকথা বলে মনে হয়। সার্বিক ভাবে মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে সমাজটাকে আরেকটু এগিয়ে দেওয়া এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিরাপদ করে তোলার বদলে আমরা আসলে এই সমাজকে ঠেলে দিচ্ছি আরো কয়েক ধাপ নিচে। যেখানে মানুষের নিকৃষ্টতম প্রবৃত্তির উদাহরণগুলি প্রতিদিন ধরা পড়ে চোখে। কিন্তু এসবের জন্য সত্যিই কি দায়ী শুধু সমাজ? নাকি প্রকৃত শিক্ষার অভাব আমাদের মূল পর্যন্ত উপড়ে এনেছে? আজকের সমাজে শিক্ষা বলতে আমরা আসলে কাকে বুঝি? পুঁথিগত শিক্ষায় শিক্ষিত বাঙালি নিজের শিক্ষার বড়াই করতেই পছন্দ করে। প্রকৃত শিক্ষার প্রয়োগের দিকগুলি আজ ভীষণ অবহেলিত। অনেকদিন শিক্ষা জগতের সঙ্গে জড়িত আছি বলে প্রজন্মগুলির নৈতিক অবনমন চোখের সামনে থেকে দেখতে পাই। আজ কোনো অপরাধই আর অপরাধ নয়। বরং তাকে ঢাকা দিতে আমরা সদা সচেষ্ট। ব্যস্ত জীবনে বাবা মায়েরাও ভুলতে বসেছেন তাদের সামাজিক অনৈতিক দায়বদ্ধতাগুলি। জীবন আজ ভীষণ জটিল এবং অদূরদর্শী। শুধুমাত্র কিছু আন্দোলন বা সম্মিলিত প্রতিরোধই কি এই সমস্যাকে সমূলে উৎপাদন করতে সক্ষম? আমার তো কখনোই মনে হয় না। এই সমস্যা আজ সমাজের অনেক গভীরে। একে উৎপাটন করতে হলে দরকার মানুষের মধ্যে প্রকৃত শিক্ষা, যা মানুষকে বিনয়ী করতে সাহায্য করে। রাস্তায় ভুলবশত যেখানে কারও সামান্য পা মাড়িয়ে দিলেও মানুষ এক অদ্ভুত বিদ্বেষমূলক আচরণ করে, সেখানে নিজের স্বার্থে আঘাত লাগলে তারা যে কতটা ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে তা আমরা চোখে দেখতে পাই। তাই সামাজিক এই ব্যাধি আজ যেন এক ভয়ানক ছোঁয়াচে রোগের মত ছড়িয়ে পড়েছে সমাজের আনাচে-কানাচে। করোনা ভাইরাস মানবজাতির কত শতাংশ বিনাশ ঘটিয়েছে? মানুষের উপর মানুষের অসহিষ্ণুতা এবং হিংস্র আচরণ তার থেকে অনেক ভয়ানক। এই রোগের অচিরেই দূরীকরণ না হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অপেক্ষা করছে এক দুর্বিষহ পৃথিবী, যেখানে মৃত মানুষকে জল দেওয়া বা সামান্য মাটি দেওয়ার মতোও হয়তো কোন সহমর্মী মানুষকে খুঁজে পাওয়া যাবে না। এক একটি মৃতদেহ শিয়াল শকুনে ছিঁড়ে খাবে রাস্তায়।
মনের এক তীব্র ক্ষোভ এবং কষ্ট নিয়ে এই পোষ্টের প্রতিটি লাইন লিখলাম। অন্তত এইটুকু অনুরোধ রইল সকলের কাছে, যে মানুষের প্রতি সহমর্মিতা দেখান। যদি মানুষ মানুষের পাশে না দাঁড়ায়, তবে সমাজের সুস্থ বাস্তুতন্ত্র ভেঙে চুরমার হয়ে যেতে বেশি সময় লাগবে না। আসুন না, হাতে হাত রাখি। কবি শঙ্খ ঘোষের উচ্চারণে গলা মিলিয়ে একবার অঙ্গীকার করে বলি,
কিছুই কোথাও যদি নেই
তবু তো কজন আছি বাকি
আয় আরো হাতে হাত রেখে
আয় আরো বেঁধে বেঁধে থাকি ।
🙏 ধন্যবাদ 🙏
(৫% বেনিফিশিয়ারি এবিবি স্কুলকে এবং ১০% বেনিফিশিয়ারি প্রিয় লাজুক খ্যাঁককে)
--লেখক পরিচিতি--
কৌশিক চক্রবর্ত্তী। নিবাস পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলায়। পেশায় কারিগরি বিভাগের প্রশিক্ষক। নেশায় অক্ষরকর্মী। কলকাতায় লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলনের সাথে দীর্ঘদিন যুক্ত৷ কলকাতা থেকে প্রকাশিত কবিতার আলো পত্রিকার প্রধান সম্পাদক। দুই বাংলার বিভিন্ন প্রথম সারির পত্রিকা ও দৈনিকে নিয়মিত প্রকাশ হয় কবিতা ও প্রবন্ধ। প্রকাশিত বই সাতটি৷ তার মধ্যে গবেষণামূলক বই 'ফ্রেডরিক্স নগরের অলিতে গলিতে', 'সাহেবি কলকাতা ও তৎকালীন ছড়া' জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। সাহিত্যকর্মের জন্য আছে একাধিক পুরস্কার ও স্বীকৃতি। তার মধ্যে সুরজিত ও কবিতা ক্লাব সেরা কলমকার সম্মান,(২০১৮), কাব্যলোক ঋতুভিত্তিক কবিতায় প্রথম পুরস্কার (বাংলাদেশ), যুগসাগ্নিক সেরা কবি ১৪২৬, স্রোত তরুণ বঙ্গ প্রতিভা সম্মান (২০১৯), স্টোরিমিরর অথর অব দ্যা ইয়ার, ২০২১, কচিপাতা সাহিত্য সম্মান, ২০২১ তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য।
কমিউনিটি : আমার বাংলা ব্লগ
ধন্যবাদ জানাই আমার বাংলা ব্লগের সকল সদস্যবন্ধুদের৷ ভালো থাকুন, ভালো রাখুন।
Upvoted! Thank you for supporting witness @jswit.
ভূপেন হাজারিকার এই গানটার মধ্যে দারুণ কিছু কথা বলা আছে। মানুষ কখনও কখনও দানবের চেয়েও বেশি হিংস্র হয়ে উঠে। এইটার কারণ ক্রমাগত সমাজের মানুষের অবক্ষয় । যেটা প্রতিনিয়ত ক্রমেই নিচে যাচ্ছে। প্রকৃতপক্ষে এখানে আমাদের কিছু করার নেই ভাই। আমরা শুধু চেয়ে চেয়ে দেখি আর আফসোস করি।
একদম ঠিক বলেছেন৷ শুধু দেখা ছাড়া কিছুই করার থাকে না৷ ভীষণ খারাপ সময় আসছে। আপনি আমার লেখা গুরুত্ব সহযোগে পড়ে সুন্দর মন্তব্য করলেন বলে অনেক ভালোলাগা৷ 🙏