সন্ধ্যা!
অফিসের লাঞ্চ ব্রেক হোক কিংবা ট্রেনে করে ফেরা, সৃষ্টি, পলাশ, সন্ধ্যা, অজয় এবং দিপা;
একেবারে হরিহর আত্মা বললেও কম বলা হয়!
কাজের জায়গায় পরিচয়, সময়ের সাথে সাথে একসাথে যাতায়াত, এরপর ঘুরতে যাওয়া সবকিছু বাকি চারজন একসাথে করলেও,
এই অফিসের চৌহদ্দির বাইরে সন্ধ্যা কোথাও যেনো খানিক দূরত্ব বজায় রেখে চলে বাকি চারজনের সাথে!
এদের মধ্যে অজয় এবং দিপা স্বামী-স্ত্রী! বাকি সৃষ্টি বিবাহিত হলেও তার স্বামী কর্মসূত্রে ভারতের অন্যত্র থাকে।
পলাশ এখনো বিয়ে করেনি, আর সন্ধ্যা? তার জীবনটা যুদ্ধের চাইতে কোনো অংশে কম নয়!
অল্প বয়সে দেখাশোনা করে বিয়ে, তারপর অনেক সংঘর্ষ করে লেখাপড়া শেষ করে, কিন্তু বিয়ের কিছুদিনের মধ্যে একমাত্র পুত্র সন্তানকে কোলে নিয়ে স্বামীহারা হয় সন্ধ্যা!
তারপর থেকে চাকরি শুরু কিন্তু গত বছর তার পুত্র একটি পথ দুর্ঘটনায় মারা যায়!
চাকরি আছে, কিন্তু ঘরে ফেরার তেমন কোনো ব্যস্ততা নেই! কারণ, আজ আর কেউ তার জন্য প্রতীক্ষা করে না!
সন্তানের নাম ধরে ডাকলে কেউ দরজা খুলে হাসিমুখে তার ক্লান্তি দুর করে না!
তবুও মৃত্যুর ডাক আসেনি বলে, আর খানিক ব্যস্ততা তাকে কিছু মুহুর্তের জন্য নিজের ভিতরের ক্ষত গুলোকে লুকিয়ে রাখতে সাহায্য করে বলেই এই চাকরি অব্যহত রাখা!
তবে, ওই অফিসের লাঞ্চ টেবিলে বসে যখন অজয় এবং দিপা তাদের সন্তানকে নিয়ে আলোচনা করে, কেমন যেনো একটা অস্বস্তি কাজ করে সন্ধ্যার মনে!
সে কখনও কখনও উঠে যায় অজুহাত দিয়ে, কখনও বাধ্য হয়ে শোনে, আবার কখনও মনে মনে ভাবে, তার বিষয় সম্পর্কে সবটাই এরা জানে তৎসত্ত্বেও কেনো এরা এই একটি বিষয় নিয়ে তার অনুপস্থিতিতে আলোচনা করে না!
এমন সাত পাঁচ ভাবনা নিয়ে, দিনশেষে সে তার শূন্যতা নিয়েই দিন কাটায়!
কখনও নিজেকে বোঝায়, তার শূন্যতা কেবলমাত্র তার একার, যাদের জীবন সম্পর্কে ঘেরা, তারা কেনো সন্ধ্যার আবেগের তোয়াক্কা করবে?
এই লড়াই তো সন্ধ্যার একার! আর, আনন্দ যাদের ভাগ্যে লেখা আছে, তারা তাদের সেই আনন্দের হাত ধরে জীবন কাটাচ্ছে;
সন্ধ্যার জন্য যা নির্ধারিত সেটা তাকে একলাই বইতে হবে!
তবুও কিছু দুর্বলতা, কিছু ক্ষত কোনোদিন পূর্ণ হয়না!
ঠিক সেই কারণে, সন্ধ্যা অফিসে একসাথে খেতে বসে, একসাথে যাতায়াত করলেও, কারোর বাড়িতে যায় না, কখনো ঘুরতে যাওয়ার সঙ্গী হয়না!
একদিন সন্ধ্যার এই উঠে যাওয়াকে দীপা ঈর্ষার নাম দিয়েছিল! আড়াল থেকে কথাটা কানে এলেও আবেগ লুকিয়েছিল সন্ধ্যা!
পলাশ অনেক পরে এই অফিসে জয়েন করেছে, তাই খুব কৌতূহল নিয়ে ঈর্ষার কারণ জানতে চেয়েছিল দিপার কাছে, সেদিন সৃষ্টি সবটা পলাশকে জানিয়েছিল সন্ধ্যার বিষয়ে!
যদিও সৃষ্টি বুঝে গিয়েছিলো আড়াল থেকে সবটাই শুনে নিয়েছে সন্ধ্যা!
তাই সেদিন অফিস থেকে বাড়ি পৌঁছে সে ফোন করেছিল সন্ধ্যাকে!
তবে, সন্ধ্যা সবটা শুনেছে সেটা স্বীকার করলেও, কোনো অভিযোগ করেনি দিপার নামে, সৃষ্টির কাছে!
এরপর থেকে আরো নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছে সন্ধ্যা! সে একান্তে ভাবে তার জীবনটা যেনো সন্ধ্যার মতোই এই আলো আঁধারির খেলা!
ঠিক যেমন সন্ধ্যা দিবা রাত্রির সংযোগস্থল, তার জীবনটাও আজ সেই জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে!
সবটা আলো সঙ্গে নিয়ে চলে গেছে তার স্বামী এবং সন্তান!
মা, এবং বাবা তো অনেক আগেই পরলোকে পাড়ি দিয়েছেন!
এই ঘটনার পর থেকে একটা সূক্ষ্ম দূরত্ব তৈরি করে নিয়েছিল সন্ধ্যা, সেটা সৃষ্টি এবং পলাশ দুজনেই বুঝেছিল!
সময়ের সাথে সাথে পলাশ লক্ষ্য করত সন্ধ্যা সকলের থেকেই পৃথক!
শান্ত, স্নিগ্ধ কিন্তু পাশাপশি অভিমানী;
আবার মন ভালো করবার মত প্রতিভাময়ী!
নিজের সমস্যা পিছনে ফেলে কারোর দিকে নিঃস্বার্থ ভাবে পাশে থাকার মতো বিষয়গুলো পলাশকে বেশ অবাক করেছিল!
সবার প্রিয়দের তালিকায় সন্ধ্যা! অফিসে হোক কিংবা যাতায়াতের পথে, এটাই হয়তো দিপা এবং অজয় দুজনের কাছে ঈর্ষার কারণ হয়ে ওঠে, তাই তারা সন্ধ্যার কষ্টের জায়গায় খোঁচা দিয়ে আনন্দ পায়!
এক্ শীতে পলাশ উদ্যোগ নিয়ে বনভোজনের আয়োজন করেছিল, আর সন্ধ্যাকে সেবার সে কিভাবে যেনো রাজি করে ফেলেছিল!
সকলে খানিক অবাক হয়েছিল বটে, তবে সঙ্গে আনন্দ পেয়েছিল প্রথমবার সন্ধ্যা বাইরে এসেছে অফিসের বন্ধুদের সাথে।
কি বলেছিল পলাশ সেদিন সন্ধ্যাকে? কি কারণে সে সম্মতি দিয়েছিল অফিস পিকনিকে আসার জন্য?
এক্ শীতে পিকনিকের আয়োজন করা হয়েছিল রবিবার দেখে;
যেদিন অফিস ছুটি থাকে!
তার আগেরদিন পলাশ ইচ্ছে করেই নিজের স্টেশনে না নেমে, গিয়েছিল সন্ধ্যার স্টেশন পর্যন্ত!
বাকিদের সে অন্য কথা বলেছিল, কিছু কেনাকাটা করার আছে পিকনিকের জন্য!
সকলে নেমে যাবার পর, সে সন্ধ্যাকে বলেছিল, তারজন্যই সে নিজের স্টেশনে নামে নি!
খানিক অবাক হয়ে সন্ধ্যা কারণ জানতে চাইলে, সেদিন পলাশ বলেছিল, তোমার সাথে কথা আছে তাই!
কি কথা? সন্ধ্যা জানতে চেয়েছিল! সন্ধ্যাকে পলাশ প্রশ্ন করেছিল, আচ্ছা বলতো পলাশ ফুল কখন ফোঁটে?
হাসি ধরে রাখতে না পেরে সন্ধ্যা বলেই ফেলেছিল এই প্রশ্ন করতে এত কষ্ট করলে? পলাশ ফুল বসন্ত কালে ফোটে!
কি সঠিক বলেছি তো? পলাশ উত্তরে বলেছিল একদম সঠিক! কিন্তু তুমি কি কখনও একটা বিষয় লক্ষ্য করেছো সন্ধ্যা?
শীতের শেষে এই বসন্তের হাত ধরে যখন গাছের সমস্ত পাতা ঝরে যায়, সেই ন্যাড়া ডালে ফোটে এই পলাশ!
মনোযোগ দিয়ে সন্ধ্যা শুনছিল কথাগুলো, এরপর পলাশ বলেছিল, শূন্যতার মাঝে ফোটে বলেই আগুনরাঙা পলাশের সৌন্দর্য মোহময়!
যদি পাতার আড়ালে ঢেকে যেতো তাহলে হয়তো খানিক হলেও ভাটা পড়ত পলাশের সৌন্দর্য্যে!
তোমার শূন্যতা তোমার তুমিকে খুঁজে পেতে সাহায্য করছে সন্ধ্যা! আর পিছন ফিরে না তাকিয়ে মুভ অন করো, সামনে এগিয়ে চলো! শূন্য ডালে ফুটতে দাও পলাশকে!
পড়ন্ত বিকেলের সূর্যালোক পলাশে পড়তে দাও।