জায়গাটি যখন আমার শহর!
আমার অনেক লেখায় আমি নিজের শহরের কথা ইতিপূর্বেও তুলে ধরেছি।
এর অনেক কারণের মধ্যে অন্যতম এই শহরের ইতিহাস! শুধু কি ইতিহাস? নাকি সঙ্গে রয়েছে আবেগ!
হ্যাঁ! উভয় বিষয়ই সত্যি! নিজের বললেই তো আর সবকিছু নিজের হয়ে যায় না, যদি সেই নিজের মধ্যে স্বার্থত্যাগ, আত্মত্যাগ করা মানুষগুলোর প্রতি আবেগ না থাকে!
ঠিক তেমনি, যখন যখন আমার শহরের ঐতিহ্য বাঁচানোর জন্য কিছু মানুষ অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন, তখন আমার বুকটা গর্বে ভরে ওঠে!
কেনো জানেন? আমি মনে মনে সেই মুহুর্তে হারিয়ে যাই আবার সেই ঐতিহ্যবাহী শহরের ইতিকথায়, আর সেই ইতিহাসের হাত ধরে আশায় বুক বাঁধি এই ভেবে যে আবার এই শহর পুনরুজ্জীবিত হবে!
সময়ের সাথে বদলাবে মানুষের গলাপচা চিন্তাধারা, এই শহর গড়ে উঠবে নব নির্মাণের হাত ধরে, পাশাপশি পুরোনো ঐতিহ্যবাহী ইমারত গুলোর মেরামত হবে, যাতে করে এই প্রজন্ম খানিকটা হলেও এই শহরের সৃষ্টির ইতিহাস জানতে সক্ষম হয়।
আজকের ছবিগুলো কলকাতায় অবস্থিত ধর্মতলার, অনেকেই এই জায়গাটি এসপ্লেনড নামেও চিনবেন, বিশেষত যারা এই শহরে বসবাস করেন!
তবে, এই এসপ্লেনড নামকরণটি করেছিলেন তৎকালীন পরাধীন ভারতে থাকা ইংরেজ সরকার!
সালটা ১৯০২ অর্থাৎ পরাধীন ভারত, সেই সময় প্রথম এই এসপ্লেনডে বৈদ্যুতিক ট্রামের সূচনা হয়!
এছাড়াও এই জায়গাটির বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে কারণ, ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামীদের সমাবেশে ব্যবহৃত গিয়েছিল এই এসপ্লেনড খোলা প্রাঙ্গণ, উল্লেখযোগ্য বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের সময়!
বহু প্রতিবাদ, মিছিল ইত্যাদির সাক্ষী হয়ে রয়েছে এই স্থানের প্রাঙ্গণ!
জানিনা কতজন শহরবাসী এই বিষয়গুলো সম্পর্কে ওয়াকিবহল!
মুশকিল কি জানেন? আমরা সমালোচনায় মুখর হতে বেশ সিদ্ধহস্ত, আবার যে বিষয় নিয়ে সমালোচনা করি, দর্পণের দিক একটু ঘোরালেই দেখা যাবে, সেই একই জঘন্য কাজে অধিক মানুষ নিজেরাই সামিল!
অর্থাৎ কোনো সৃজনশীল কাজে নিজেদের ভূমিকা পালন করতে পারুক কিংবা নাই পারুক কিন্তু নিন্দায় সামিল হতে দু'বার ভাবে না!
কি অবাক বিষয় তাই না? সভ্য সমাজে বসবাস করে, সভ্য পোশাক পড়ে সমাজে ঘুরে বেড়ানো মানুষগুলোকে একটু কাছ থেকে নিরীক্ষণ করলেই দ্বিচারিতা সুস্পস্ট হয়ে যায়!
আচ্ছা, একটি শহর যেটি কিছু মানুষকে শুধু আশ্রয় দিয়েছে এমনটি নয়, সঙ্গে দিয়েছে কাজ, দিয়েছে শিক্ষার সুযোগ, সেই শহর থেকে নিংড়ে নিয়েছে সবটাই, সেটা সাধারণ থেকে ক্ষমতাবান সকলেই;
কিন্তু সেই শহরের ঐতিহ্য বজায় রাখতে এগিয়ে এসেছেন কতজন?
কেনো কেউ বলে না আমরা এই শহরকে পুনরুজ্জীবিত করতে চাই, তাই অনুদান নয়, বরং কাজ দিন, আমরা কর প্রদান করে এই শহরের পুরোনো ঐতিহ্যের পাশাপশি নাবো নির্মাণে যোগদান করতে চাই!
নাহ্! কেউ বলবে না, কেনো জানেন? আপনে বাঁচলে, বাপের নাম!
ওরে মূর্খের দল! যদি শহর না থাকে, যদি কর্ম সংস্থান না থাকে, তাহলে যে রাজার গোলাও যে বসে খেলে ফুরিয়ে যায়!
সেটা এরা ভুলতে বসেছে, এই বসে খাওয়ায় প্রবণতা, বৃদ্ধি করে অসামাজিক কার্যকলাপ!
আর যে স্বাধীনতার জন্য এক্ সময় একাধিক প্রাণ গিয়েছিল, আজ সেই স্বাধীনতার বেশিরভাগটাই আত্মস্বার্থে ব্যবহৃত হয়, সামাজিক স্বার্থে নয়!
- এই এসপ্লেনড এই ১৯১০ সালে এক ইহুদী ব্যবসায়ী(ডেভিড এলিয়াস এজরা) তৈরি করেছিলেন এসপ্ল্যানেড ম্যানশনস!
এই ম্যানশন হলো এই শহরের একমাত্র একমাত্র সংরক্ষিত ‘আর্ট নুভো’(শৈলীর ভবন)।
শহর কিন্তু আন্তরিকতা বোঝে, আর আমি নিশ্চিত শহরের প্রতি আমার এই আবেগ নিশ্চই সে অনুধাবন করতে পারবে।
ঠিক এই জায়গায় গড়ে উঠেছিল মেট্রো সিনেমা, তখন সালটি ছিল ১৯৩৫ তৎকালীন মেয়র এই প্রেক্ষাগৃহ তৈরি করেছিলেন, যেটি এই শহরের চলচ্চিত্র-যুগের স্বর্ণালী অধ্যায়ের এক উজ্জ্বল রত্ন।
এমন না জানি আর কত ঐতিহ্য ইতিহাস আত্মস্বার্থের বলি হয়ে গেছে!
তবে, যেটুকু অবশিষ্ট রয়েছে, সেটিকে বাঁচিয়ে রাখতে শহরবাসীকে সমান দায়িত্ব পালন করতে হবে বলে আমি ব্যাক্তিগত ভাবে মনে করি;
কেবলমাত্র প্রশাসন সবটা হাতে তুলে দেবে আর বসে বসে খাবো, এই মানসিকতা সৃজনশীলতার সংজ্ঞা কিংবা উদাহরণ হতে পারে না!