Flower photography
আশালতা'দি,
খুব অলস সময় কাটছে। ইচ্ছে হচ্ছে আপনাকে পাশে বসিয়ে আমার যাপিত একটা বিশ্রী জীবনের গল্প শোনাই। আপনি মনোযোগ দিয়ে সে গল্প শুনবেন। গল্পের শেষে দুঃখ ভাগ করবার অভিনয় নিয়ে মুখে অসুখের ছাপ ফুটিয়ে কাঁধে হাত রেখে বলবেন- জীবনের বিচ্ছিন্ন সব অপ্রত্যাশিত গল্প নিয়েই জীবন। এত আয়োজন করে কাউকে এসব গল্প না বললেও জীবন কেটে যাবে।
তবুও আমি আপনাকে একটি গল্প শোনাবো বলেই চিঠি লিখছি। জানি, এই পৃথিবীতে যার যার গল্পের প্রধান শ্রোতা সে নিজেই; তবুও মাঝে মাঝে নিজের জীবনের গল্প অন্যকে শুনিয়ে সে গল্পের অনুভূতি ভাগ করে দিতে ইচ্ছে হয়। আমি আপনাকে আজ এমনই এক গল্প শোনাতে এসেছি- যে গল্প ক্রমাগত আমাকে ক্ষয় করে দিচ্ছে। আমি নিজের সাথে নিজেই এক গোপন যুদ্ধের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছি। যেন কখনো কখনো নিজের প্রতি জন্মানো গভীর তিক্ততা থেকে নিজেকেই নিজের গুলি করতে ইচ্ছা হয়।
আশালতা'দি
আপনি তো জানেন- আমি জীবনকে খুব গভীর মনোযোগ দিয়ে দেখি। যে দৃশ্য এড়িয়ে যাওয়া যায়, সে দৃশ্যও আমি মনোযোগ দিয়ে দেখতে দেখতে তার আদি ইতিহাস আবিস্কার করে ফেলি। যা নিয়ে না ভাবলেও, জীবনে কোন কিছুর কমতি হবেনা, সেসব মূল্যহীন বিষয় নিয়েও আমার বিশ্লেষনের শেষ নেই। এই চর্চা আমাকে ক্রমাগত ভেঙেচূরে দিচ্ছে। কখনো কারো ভালোবাসা পেলে, আমি সেটুকু এড়িয়ে কেবল খাদটুকু অনুসন্ধানে ব্যস্ত থাকছি। কেউ আমার জন্য সামান্য জায়গা ছেড়ে দিলে, আমি তার কারন জানতে চাইছি। কেউ আমার জন্য তার জীবনের সামান্য সময় বিনিয়োগ করলে, আমার জানতে ইচ্ছে হচ্ছে- তার সুবিধাটুকু। কেউ মনোযোগ দিলে আমি খুঁজছি, ঠিক কি কারনে সে আমাকে অবহেলা করছেনা?
এই জ্ঞানপিপাসা, এই জানবার আগ্রহ, এই অনুসন্ধিৎসা আমাকে ক্রমান্বয়ে একটা ট্রমার দিকে নিয়ে যাচ্ছে। সমস্ত পৃথিবী জুড়ে আমি কোথাও একটা মানুষ খুঁজছি, যার সমস্ত পৃথিবী বলতে কেবল আমি। যদিও এমন লাইফলেস মানুষ কোথাও পাওয়া যায়না। মানুষ তার জীবনের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশ অন্যের জন্য খরচ করতে পারে, পুরো জীবন নয়। এমন কুৎসিত সত্য জানবার পরও আমার মানতে ইচ্ছে হয়না। আমার কেবল মনে হয়- পৃথিবীর কোথাও কি কেউ নেই, আমার জন্য যে তার সমস্ত জীবন ত্যাগ করতে প্রস্তুত? যদিও, আমি নিজেই কখনো কারো জন্য আমার এই অর্জিত জীবনকে ত্যাগ করবো না, তবুও মনে হচ্ছে একটা কেউ হোক।
এই যে অন্যের জীবনে আধিপত্য বিস্তারের গোপন ইচ্ছা, এই যে মানুষের দূর্বলতাকে পুঁজি করে তাকে একটি দাসত্বের জীবন উপহার দেওয়ার লিপ্সা; এসব নিয়ে আমি ভাল নেই।
আশালতা'দি
আপনাকে এসব কথা বলবার জন্য আমি লিখতে বসিনি। আপনাকে অনেক কিছু বলার আছে। বলবার মতন অনেক কথা জমে গেলে, মানুষের আর বলবার কিছু থাকেনা। অনেক শব্দ নিয়ে মানুষ চুপ হয়ে যায়। কাছে আসবার আকুলতা নিয়ে, মানুষ দূরে সরে আসে। বন্ধুত্ব পাওয়ার চেষ্টায়, মানুষ ক্রমাগত নিঃসঙ্গ হয়ে উঠে। আপনাকে অনেক কথা বলবো বলবো করেও, কিছুই বলা হয়ে উঠেনা। মানুষ যে কথা বলবার জন্য আকুল হয়ে উঠে, মৃত্যু পর্যন্ত সে কথা কাউকে বলতে পারেনা। আমি আজ বলবো, বলবার জন্যই আপনাকে লিখছি। নিজের শব্দ নিজে গিলে ফেলবার মতন ভীরুতা নিয়ে বাঁচবার জন্য আমার জন্ম হয়নি। আমি বলতে এসেছি, যে কথা না বলতে বলতে আমার ভেতর ইস্পাতের মতন কঠিন হয়ে আছে।
আশালতা'দি,
আপনাকে আমার জীবনের একটি গল্প বলবো। ক্লান্ত লাগছে ভীষন। এখন আর বলতে ইচ্ছে হচ্ছেনা। একদিন বলবো। পাশে বসিয়ে আপনার দিকে চোখ বড় করে তাকাতে তাকাতে বলবো- আমাদের জীবন এমন কেন?
এত শব্দ নিয়ে কাছের মানুষের সামনে দাঁড়াই, অথচ নৈশব্দ্যে সরে আসি দূরে। চুপচাপ। যেন, আমার কিছুই বলার নেই। আমি কিছু বলতে আসিনি।
আশালতা'দি
ভাল থাকুন।
একদিন আপনাকে আমার যাপিত জীবনের বিশ্রী সব গল্প শোনাবো।
আপনি সেদিন কাঁধে হাত রেখে বলবেন- ভাবিস না, এমন সব না চাওয়া গল্পের জন্যই জীবন এত সুন্দর। এত রোমাঞ্চকর।
আজ যাই। যেতে ইচ্ছে হচ্ছে; যেখানে কখনোই যেতে ইচ্ছে হয়না। যাচ্ছি; শব্দ গিলে ফেলা দূরবর্তী কোন এক নৈশব্দ্যের ঘরে। যেখানে গেলে, আর কোন কথা থাকেনা আমরা আমাদের জীবনকে নির্দিষ্ট একটা গন্ডির ভেতর কেন্দ্রীভূত করে ফেলি। যখন দুঃখ আসে- তখন আমরা খুব মনোযোগ দিয়ে সে দুঃখের দিকে তাকিয়ে থাকি। যখন ব্যর্থতা আসে, আমাদের মনে হয়- এখানেই শেষ। যখন কাউকে ভালোবাসি, তখন সেই ভালোবাসার প্রতিই আমাদের এক ধরনের স্থায়ী মমত্ববোধ জন্মায়।
কোন কিছুর প্রতি তীব্র মনোযোগের প্রয়োজনীয়তা আছে, তবে সেই একই জায়গায় নিজেকে বন্দি করে রাখবার মতন বোকামি আর হয়না। আপনাকে মাঝে মাঝে নির্দিষ্ট গন্ডির বাইরে তাকাতে হবে। তাকালেই আপনি দেখবেন- দুঃখের পাশাপাশি বিছানাতে শুয়ে থাকে আনন্দ। হতাশার পায়ের কাছে মাথা নুইয়ে আছে আশাবাদ। অনুর্বর ভূমির একটু দূরেই কোথাও ফুটেছে ফুল।
আমাদের জীবনকে আমরা সংকুচিত করে রাখি। মূলত যার দেখার চোখ যত দূর যায়; তার জীবন ততো বড়। আমরা কোন এক অজানা কারনে আমাদের পরিচিত আয়তনের বাইরে যেতে চাইনা। যে দুঃখ পাচ্ছে, কোন এক অদ্ভুত কারনে, সে তার দুঃখী দুঃখী জীবনকেই মেনে নিচ্ছে। যে ঘৃণা পাচ্ছে, সে ভেবে নিচ্ছে- হয়তো, এটা তারই প্রাপ্য। যে অপ্রেমে আছে, সে নিশ্চিত হয়ে যাচ্ছে- তাকে ভালোবাসবার মতন কেউ নেই।
আমাদের জীবন কি এতটাই ক্ষুদ্র?
আমরা কেবল আমাদের জীবনের সাথে ঘটে যাওয়া কয়েকটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা দিয়েই এই ব্যক্তিগত জীবনের স্ট্যান্ডার্ড পরিমাপ করে ফেলি। অথচ, একটু দূরে তাকালেই দেখা যায়, জীবন ছুটছে অস্পর্শনীয় দিগন্তের দিকে। যত দূর যাওয়া যায়, কোথাও শেষ নেই। অথচ, আমরা ভাবছি- ওই দূরে, যেখানে আকাশ এসে মাটিতে মিলছে, সেখানেই সব মুছে যায় ধীরে।
মানবজীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হলো- দূরদর্শিতা। যে যত দূর তাকাতে পারে, তার জীবন ততো বেশি রোমাঞ্চকর। যার চোখের দৃষ্টি সীমাবদ্ধ; ক্রমাগত সে জীবনের প্রতি অবসাদগ্রস্থ হতে থাকে।
পা নেই; তাকেও দেওয়া হয়েছে বহুদূর যাওয়ার ক্ষমতা। কেউ কেউ পা থাকতেও; হাটতে পারেনা। নিজেই পায়ে একটি শেকল পরে থাকে। কারন, সে বিশ্বাস করে নেয়- ওই শেকলের প্যারামিটারই তার জীবন।
Upvoted! Thank you for supporting witness @jswit.