গল্প-বধুয়া||

in আমার বাংলা ব্লগ2 years ago

আসসালামু আলাইকুম/নমস্কার


আমি @monira999 বাংলাদেশ থেকে। আজকে আমি ভিন্ন ধরনের একটি পোস্ট আপনাদের মাঝে শেয়ার করতে চলে এসেছি। মাঝে মাঝে গল্প লিখতে আমার খুবই ভালো লাগে। তবে আজকে শরীরটা ভীষণ খারাপ। রমজানে গ্যাসের সমস্যাটা অনেক বেড়ে যায়। তাইতো পেট ব্যথা আর বমি হচ্ছে বারবার। কোন কিছুই করতে পারছি না। আজকে কি কোন পোস্ট করবো ভেবেই পাচ্ছিলাম না। হঠাৎ করে কেন জানি মনে হল একটি গল্প লিখি। আসলে গল্প লিখতে গেলেও মানসিক প্রস্তুতির প্রয়োজন হয়। সকাল থেকে চেষ্টা করছিলাম কোন কিছু লিখার। কিন্তু লিখতে পারছিলাম না। এখন কেন জানি হঠাৎ করে মনে হল গল্প লিখে ফেলি। তাইতো একটি গল্প লিখে আপনাদের মাঝে উপস্থাপন করতে যাচ্ছি। ভুল ত্রুটি সবাই ক্ষমাশীল দৃষ্টিতে দেখবেন।


বধুয়া:

IMG_20240331_161055.jpg


গ্রামের মধ্যবিত্ত ঘরে বেড়ে উঠেছে মায়াবতী। হয়তো বিলাসিতায় তার জীবন কাটেনি কিন্তু সবার ভালোবাসা তার জীবনে পূর্ণতা এনে দিয়েছিল। সেই ডানপিটে মেয়েটি হাসিখুশিতে সবাইকে মাতিয়ে রাখত। মায়াবতীর হাসির মায়ায় সবাই মাতাল হয়ে যেত। ছোট্ট মায়াবতী ধীরে ধীরে বেড়ে উঠলো। মায়াবতী যতই বড় হতে লাগলো বাবা মায়ের চিন্তা ততই বাড়তে লাগলো। কারণ তাদের মায়াবতী যে বেশ চঞ্চল। দুষ্টু, চঞ্চল ছটফটে মেয়েটা এগ্রাম ওগ্রাম দৌড়ে বেড়াতো। মায়াবতীর রূপের মায়ায় মুগ্ধ হয়ে যেত সবাই। ছেলে বুড়ো সবাই মায়াবতীর রূপের মায়ায় পড়েছিল।


মায়াবতীর দিঘল কালো চুল আর খোপায় গোঁজা ফুলের প্রেমে পড়েছিল হাজারো যুবক। গ্রামের মেঠো পথ দিয়ে যখন মায়াবতী ছুটে চলে যেত তখন অবাক নয়নে তাকিয়ে থাকতো মাঠের কৃষকরা। সবাইকে আপন করে নিয়েছিল মায়াবতী। পুরো গ্রাম জুড়ে মায়াবতীর মায়া যেন ছড়িয়ে পড়েছিল। দেখতে দেখতে কখন যে মায়াবতী বড় হয়ে গেল কেউ বুঝতেই পারল না। হঠাৎ একদিন মায়াবতীর সাথে দেখা হয়ে গেল এক রাজকুমারের। পাশের গ্রামের বড় বাড়ির ছেলেটি মায়াবতীর প্রেমে পড়ে গেল। মায়াবতীর চোখের মায়ায় আটকে গিয়েছিল ইমন। ইমন যেদিন প্রথম মায়াবতীকে দেখেছিল তখনই মায়াবতীর প্রেমে পড়েছিল। প্রথম দেখাতেই ভালোবেসে ফেলেছিল তাকে। অন্যদিকে ইমনের বিয়ের জন্য মেয়ে দেখছিল তার পরিবার। কিন্তু ইমন যে মায়াবতীকে ভালোবেসে ফেলেছে।


ইমনের ভালোবাসা মায়াবতীকে কাছে টানেনি। কারণ মায়াবতী নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছিল। মায়াবতী মধ্যবিত্ত ঘরের মেয়ে। তাইতো ইমনের থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছিল। কিন্তু ইমনের পাগলামি তাকে ভীষণ কষ্ট দিত। মায়াবতীকে দেখার জন্য ছুটে আসতো সেই ছেলেটি। ইমনের পাগলামিতে তার পরিবার রাজি হয়ে যায় মায়াবতীকে তাদের ঘরের বউ করতে। মায়াবতীকে নিজের বউ হিসেবে পেয়ে ইমন যেন পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ ছিল। ইমন যেহেতু চাকরির জন্য শহরে থাকতো তাই বিয়ের কিছু দিনের মধ্যেই মায়াবতীকে ছেড়ে ইমনকে চলে যেতে হয়েছিল শহরে। মায়াবতীকে ছেড়ে চলে যেতে তার ভীষণ কষ্ট হচ্ছিল। তবুও তাকে যেতেই হয়েছিল ।মায়াবতী ইমনকে আটকায়নি। কারণ সে তার মায়ায় ইমনকে আটকাতে চায়নি


ইমন চলে যাওয়ার পর মায়াবতীর জীবন যেন নরকে পরিণত হলো। শ্বশুরবাড়ির অত্যাচার তার জীবনটাকে যেন নরক করে তুলেছিল। এরই মাঝে বেশ কয়েকবার ইমন মায়াবতীকে চিঠি পাঠিয়েছে। কিন্তু মায়াবতী উত্তর দেয়নি। কারণ ইমনের পরিবারের কেউ মায়াবতীর চিঠিগুলো ইমনের কাছে পৌঁছাতে দেয়নি। এরপর ধীরে ধীরে ইমনের চিঠি পাঠানো বন্ধ হয়ে গেল। হয়তো ইমন চিঠি পাঠাতো কিন্তু তার পরিবারের মানুষগুলো মায়াবতীকে দিত না। মায়াবতী দিনের পর দিন না খেয়ে অনাহারে কাটিয়ে দিত। মেয়েটির খোঁজ নেওয়ার মতো কেউ ছিল না। সারাদিন দাসির মতো রান্না ঘরে পড়ে থাকতো। বিনিময়ে পেতো সামান্য কিছু খাবার। যেই খাবারগুলো খেতে তার ভিশন কষ্ট হতো। হঠাৎ একদিন মায়াবতী জানতে পারলো ইমন তাকে চিঠি পাঠায় কিন্তু সেই চিঠিগুলো তার হাতে পৌঁছায় না। এবার মায়াবতী চুপি চুপি ইমনের জন্য চিঠি লিখল। কিন্তু সেই চিঠি আর দেওয়া হয়ে উঠলো না। সেই রাতে মায়াবতীর জন্য অপেক্ষা করছিল ভয়ঙ্কর কিছু। মায়াবতীর লম্বা চুলের খোপা ধরে যখন তাকে নির্মমভাবে মারা হয়েছিল তখন সে বারবার চিৎকার করে বলেছিল সৃষ্টিকর্তা আজ যদি আমার চুলগুলো না থাকতো তাহলে হয়তো এতটা কষ্ট পেতাম না। তাহলে অন্তত কেউ চুল ধরে মারতে পারতো না।


সেদিনের পর থেকে মায়াবতীর চিৎকার আর কেউ শুনতে পায়নি। বাড়ির পেছনের এক গাছের সাথে মায়াবতীর মৃতদেহটা ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিল। আর সবাইকে বলা হয়েছিল মায়াবতী গলায় দড়ি দিয়েছে। মায়াবতীর এই নির্মম মৃত্যু সবাইকে কাঁদিয়েছিল। ইমন ছুটে চলে এসেছিল মায়াবতীর মায়া ভরা মুখটা দেখার জন্য। কিন্তু তার বধুয়া যে তাকে ছেড়ে অনেক দূরে চলে গেছে। তার বধুয়ার জন্য কেনা লাল শাড়ি আর লাল কাচের চুড়িগুলো আর তাকে দেওয়া হলো না। তার লম্বা চুলের বেনুনিতে বেলি ফুলের মালা গুঁজে দেওয়ার বড্ড সাধ ছিল ইমনের। কিন্তু মায়াবতী যে তাকে ছেড়ে পরপারে পাড়ি জমালো। নিজ হাতে মায়াবতীকে সাজানোর ইচ্ছেটা পূর্ণ হল না তার। মায়াবতীর জন্য কেনা লাল শাড়িটা বুকে জড়িয়ে ইমন অনেক কেঁদেছিল। এরপর মায়াবতী লিখা শেষ চিঠিটা ইমন পেয়ে যায়। ঈমান জানতে পারে সে বাবা হতে চলেছে। মায়াবতীর হাতের লেখা চিঠিটা ইমনকে ক্ষতবিক্ষত করে দিয়েছিল। সেই কষ্টটা ইমন কিছুতেই মেনে নিতে পারছিল না। কারণ মায়াবতীকে ছাড়া যে তার জীবন অপূর্ণ। তার বধুয়াই যে তার জীবনের অংশ।


তার প্রিয় বধুয়াকে হারিয়ে ইমন যেন দিশেহারা হয়ে পড়েছিল। বুকে জড়িয়ে রাখা লাল শাড়িটা দিয়েই সেই গাছের সাথে পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করেছিল ইমন। আর চলে গিয়েছিল তার বধুয়ার কাছে। ইমন সবকিছুই বুঝতে পেরেছিল। কিন্তু নিজের পরিবারকে কিছু বলতে পারছিল না। পরিবারের উপর অভিমান করে ইমন তার বধুয়ার কাছে চলে গিয়েছিল। যাওয়ার আগে চিঠিতে লিখে গিয়েছিল যেই পৃথিবীতে আমার বধুয়ার জায়গা হয়নি সেখানে আমিও থাকতে চাই না। আমি আমার বধুয়াকে নিয়ে বাঁচতে চেয়েছিলাম। কিন্তু এই নিষ্ঠুর পৃথিবী আমাদেরকে বাঁচতে দিল না। মায়াবতী আর ইমনের এই করুন মৃত্যু সবাইকে কাঁদিয়েছিল। শেষ হয়ে গিয়েছিল দুটি জীবন। শেষ হয়ে গিয়েছিল মায়াবতীর হাসিটা। এভাবে হাজারও মায়াবতী হারিয়ে যায় এই সমাজ থেকে। এভাবে হাজারো বধুয়া বাস্তবতার নির্মমতার শিকার হয়।



আমার পরিচয়

photo_2021-06-30_13-14-56.jpg

IMG_20230828_190629.jpg

আমি মনিরা মুন্নী। আমার স্টিমিট আইডি নাম @monira999 । আমি ইংরেজি সাহিত্যে অনার্স ও মাস্টার্স কমপ্লিট করেছি। গল্প লিখতে আমার ভীষণ ভালো লাগে। মাঝে মাঝে পেইন্টিং করতে ভালো লাগে। অবসর সময়ে বাগান করতে অনেক ভালো লাগে। পাখি পালন করা আমার আরও একটি শখের কাজ। ২০২১ সালের জুলাই মাসে আমি স্টিমিট ব্লগিং ক্যারিয়ার শুরু করি। আমার এই ব্লগিং ক্যারিয়ারে আমার সবচেয়ে বড় অর্জন হলো আমি "আমার বাংলা ব্লগ" কমিউনিটির একজন সদস্য।

Sort:  

Upvoted! Thank you for supporting witness @jswit.

 2 years ago 

কিছু কিছু পরিবারের মানুষগুলো জানোয়ারের চেয়েও নিকৃষ্ট হয়ে থাকে। তারা হচ্ছে মানুষ নামের কলঙ্ক। এই সমস্ত জানোয়ারদের কারণেই মায়াবতী এবং ইমনের মতো শত শত প্রাণ শেষ হয়ে যায়। ইমন শহরে কাজ করে টাকা ইনকাম করে এবং মায়াবতী বাসার যাবতীয় কাজকর্ম করে,এর চেয়ে সুখী পরিবার আর কি বা হতে পারে। কিন্তু সেই অমানুষ গুলো অকারণে এমন ঘৃণিত কাজে লিপ্ত হয়েছিল। যাইহোক বরাবরের মতো এই গল্পটিও চমৎকার ভাবে লিখেছেন আপু। এতো সুন্দর একটি গল্প আমাদের সাথে শেয়ার করার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ আপনাকে।

 2 years ago 

ঠিক বলেছেন ভাইয়া কিছু কিছু পরিবার বাড়ির বউদের সাথে অনেক খারাপ আচরণ করে। মন্তব্যের জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ জানাচ্ছি ভাইয়া।

 2 years ago 

ইমন নামের ছেলেরা সবসময় বেশিই ভালোবাসে। আমি নিজেও তো সেরকম। সেজন্য একটু ভালোভাবে জানি। ভালোবেসে দুজন সুখে থাকতে চাইলেও ইমনের পরিবার সেটা হতে দিল না। দিনের পর দিন অত‍্যাচার। কিন্তু শেষ পযর্ন্ত এইরকম একটা কাজ। ব‍্যাপার টা খুবই কষ্টের। কিন্তু এমন বোকা না। তার মায়াবতী কে ছেড়ে সে নিজেও থাকেনি। পাড়ি দিয়েছে তার কাছে।

Posted using SteemPro Mobile

 2 years ago 

একদম ঠিক বলেছেন ভাইয়া অনেক সময় ভালোবাসা হার মেনে যায় পরিবারের কাছে। ইমন নামের মানুষগুলোর মাঝে ভালোবাসা সত্যি অনেক বেশি।

 2 years ago 

আপনার গল্প পড়ছিলাম আর মনে হচ্ছিল, তৎকালীন সময়ের জমিদার পরিবার এর অত্যাচারের কোন গল্প পড়ছি। তবে ইমনের এই কথাটা কিন্তু বেশ মূল্যবান ছিল , "যেই পৃথিবীতে আমার বধুয়ার জায়গা হয়নি সেখানে আমিও থাকতে চাই না"। মায়াবতীর মৃত্যুর কারণ ইমন জানতে পেরে হয়তো সে আরো বেশি ভেঙে পড়েছিল এবং মৃত্যুর পথ বেছে নিয়েছিল। সত্যি কথা বলতে গল্পটা বেশ হৃদয় বিদারক ছিল আপু।

 2 years ago 

আমার লিখা গল্পটি পড়ে আপনার ভালো লেগেছে এবং মন্তব্য করেছেন দেখে ভালো লাগলো ভাইয়া। পাঠকের ভালোলাগা কোনো লেখাকে সার্থকতা এনে দেয়।

 2 years ago 

আসলে এমন অনেক পরিবার রয়েছে যাদের মত খারাপ মানুষ এই পৃথিবীতে হয় না৷ প্রতিনিয়ত তাদের খারাপ কাজকে অব্যাহত রাখে৷ প্রতিনিয়ত এর ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছেন৷ এই গল্পের মধ্যেও মায়াবতী এবং ইমনের ক্ষেত্রে এই বিষয়টি ঘটেছে৷ ইমন কাজ করে তার বাসায় টাকা পাঠাত এবং মায়াবতী বাসায় কাজ করত৷ এর থেকে সুখের পরিবার আর কি হতে পারে৷ তবে তাদের পরিবার যেভাবে এরকম জঘন্য কাজে লিপ্ত হয়ে গেল তখন থেকে তোদের এই সুন্দর সম্পর্ক নষ্ট হয়ে গেল৷ যাইহোক আপনি সব সময় এর মতো আজকেও খুবই সুন্দর একটি গল্প শেয়ার করেছেন৷ অসংখ্য ধন্যবাদ৷

Coin Marketplace

STEEM 0.04
TRX 0.32
JST 0.100
BTC 64759.21
ETH 1919.99
USDT 1.00
SBD 0.39