এক অসাধারণ গ্ৰামের প্রকৃতির গল্প-ঝাঁপা, দেগঙ্গা, পশ্চিমবঙ্গ
দীর্ঘ সুপরিকল্পিত ভবিষ্যতে বাংলার এই গ্ৰাম ঘুরে দেখার ইচ্ছা প্রবল। তো সেই ইচ্ছার জন্যই আমি পৌঁছালাম এই গ্ৰামে, গ্ৰামটির নাম “ঝাঁপা” ।
গ্ৰাম নিয়ে কিছু বলার আগে প্রথমে যেটা মাথায় আসে তা হলো গ্ৰামটি নামকরণ। “ঝাঁপা” শব্দের আক্ষরিক অর্থ কী? একটু রিসার্চ করে জানতে পারলাম প্রথমে, সেটা হলো—কোনো কিছু ঢাকা দিয়ে রাখাকে ‘ঝাঁপি’ বলে। আর অন্য যেটি জানতে পারলাম তা হলো —কোনো সন্তান জন্মানোর পর সদ্যোজাত শিশু ও প্রসূতি মায়ের পরিচর্যাকারী অভিজ্ঞ ধাত্রী বা আয়া যিনি ৪০ দিন পর্যন্ত দেখাশোনা করেন, তাকে ‘ঝাঁপা’ বলা হয়।
তবে এই ঝাঁপার সঙ্গে গ্ৰামের নাম ঝাঁপার কোনো সম্পর্ক আছে কি না, তার বিচার্য বিষয়।
এই গ্ৰামের ডকুমেন্টারির কাজ শুরু করার আগে আমার জানা দরকার এই গ্ৰামের সীমানা। তাই একদিন বিকালে আমার মোটর চালিত দ্বি-চক্র যান চড়ে রওনা দিলাম অমি আর আমার ছেলে।
গ্ৰামের সীমানা শুরু হয়েছে পশ্চিমে হোসেনপুর থেকে পূর্ব দিকে আমিনপুর পর্যন্ত আর উত্তর দিকে কালিয়ানী থেকে দক্ষিণে মহব্বতপুর পর্যন্ত। তখনও সন্ধ্যা নামতে আধ ঘন্টা বাকি আর আমরা ধরে ছিলাম বাড়ি ফেরার রাস্তা।
এই মাসের প্রথম সপ্তাহের সাপ্তাহিক ছুটির দিন খুব সকালে মোবাইলের এলার্মে ঘুম ভেঙ্গে গেল। চোখটা খুলতেই চাইছিল না। কারণ রাতের ঘুম হয়েছিল সব মিলিয়ে দেড় ঘণ্টার মতো। ঘরের জানালা খুলে দেখি বৃষ্টি হচ্ছে। উঠেই ব্রাশ করে দুটি বিস্কুট আর একটু জল খেয়ে অপেক্ষা করতে লাগলাম। বৃষ্টি যখন থামলো তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। এই ডকুমেন্টারির প্রথম দিনের ভিডিও শুটিংকে স্থগিত করতে হয়েছে। এই সব দিনগুলো আরও বেশি করে বুঝতে পারি যে প্রকৃতির সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতা কতটা গভীর।
ব্যক্তিগত কিছু একটা কাজ করতে এই সপ্তাহের সাপ্তাহিক ছুটি একটু এগিয়ে নিতে হয়েছে। সকাল বেলা ঘুম ভাঙ্গলো ঠিক সকাল ৫ টায়। তৈরি হয়ে পিঠে ট্রায়পট ঝুলিয়ে বেরিয়ে পড়লাম সাইকেল নিয়ে।
মহাব্বতপুর পেরি পৌঁছালাম ঝাঁপা গ্ৰামের সীমান্তে। কিছু ভিডিও শুটিং করতে করতে পৌঁছালাম একটা জমির পাশে সেখানে একজন কৃষক তখন ভিজে জমিতে ভাঁটি টানছেন। ওনার সঙ্গে কিছু কথাপকথন হয়েছে। উনি বললেন যে, আগের বছর ফুল চাষে সাফল্য পেয়েছেন, ভালো উপার্জন করেছে তাই এই বছর তিন বিঘা জমিতে ফুল চাষ করবেন। উনি একজন সরকারি কর্মচারীও।
সময় সকাল ৭ টায় আমি পৌঁছালাম ঝাঁপা অবৈতনিক প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। পৌঁছাতেই একজন শিক্ষক আমায় বসতে দিয়ে বললেন, প্রধান শিক্ষক মহাশয়ের জন্য অপেক্ষা করতে, তখন ৭ টা বেজে ৫ মিনিট হয়েছে। ক্ষুদে শিক্ষার্থীদের দল তখন দোতলায় উঠছে। অনুমান করলাম যে প্রার্থণার সময় হয়ে এসেছে। আমিও কারও অনুমতি ছাড়া যোগ দিলাম প্রার্থনায়। সেই ছোটো বেলার দিন গুলো আরও একবার মনে পড়ে গেল। আমার খুব ভালো করে মনে আছে, আমার জাতীয় সঙ্গীত মুখস্থ ছিল না বলে অন্যদের বলার পরপর বলতাম। তাই এই লাইনে দাঁড়িয়ে দুটো আলাদা আলাদা সুর তৈরি হত আর অনেক বড়ো পর্যন্ত এই “যমুনা গঙ্গা” টা “যমুনায় গঙ্গা” বলেছি। অবশেষে প্রধান শিক্ষক মহাশয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ হল কিন্তু উনি জানালেন শুধু মাত্র স্কুল চত্বরে বাইরে থেকে ছবি তোলার যাবে। আমি ওনার কথা মতো কাজ করলাম।
তারপর আমি পৌঁছালাম একটা আম বাগানে, সেখানে একটা ছেলে জমি থেকে ভিজে মাটির গোল্লা বানিয়ে আম গাছে ছুঁড়ছে আর নিশানা ঠিক হলেই একটা দুটো আম বোঁটা ভেঙ্গে মাটিতে আঁছড়ে পড়ছে। আর ছেলেটি সেই আম কুঁড়িয়ে থলেতে ভরছে। ছেলেবেলার কিছু স্মৃতি আবার মনে পড়ে গেল। পাশে থাকা হলুদ ক্ষেত ও পানের বরজ দেখে বাগানে আম গাছের গুঁড়ি থেকে বেরিয়ে আসা মোটা শিকড়ের উপর বসে ছিলাম। এই জায়গাটি খুবই মনোরম আর উপরে বড়ো বড়ো গাছ থাকায় খুব ঠাণ্ডাও। স্থানীয়রা মাঝে মাঝে এইখানে এসে গল্পে মজেন। তবে এখন অনলাইন গেম আমাদের এই গল্পের সংস্কৃতি আজ অনেকটাই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
এখন সকাল ৮ টা বেজে ১৫ মিনিট হয়েছে। গরমের দিনে এর থেকে বেশি আর ছবি তোলা যাচ্ছে না। ছবির গুলো কেমন যেন প্রাণহীন লাগছে, তাই আজ এখানেই যবনিকা টেনে রওনা হলাম বাড়ি ফেরার পথে। সাইকেল আজ ভালোই চলছে। গত সপ্তাহে পিছনের ডিরেলার টা শব্দ করছিল।
আজকের দিনটা একটু অন্যরকম, রাতের ঘুমটা ঠিক মতো না হলে আমার মাথাটা যেন ঝিমঝিম করে। তবে আজকাল এটা একটা সাধারণ ব্যাপার হয়ে গেছে আমার কাছে। সকালে ঘুম ভাঙ্গলো ঠিক ৫টা বেজে ৫০ মিনিটে। ১০ মিনিটে তৈরি হয়ে বেরিয়ে পড়লাম।
সাইকেল যাত্রায় সব থেকে যে জিনিসটা আমার বেশি ভালো লাগে তা হলো রাস্তা পাশে থাকা নানান রকমের গাছে বসে থাকা পাখির ডাক শুনতে পাওয়া যায় আর কোনো শব্দ না থাকায় কেউ উঁড়ে পালিয়ে যায় না। আমি বসন্তকালে ঠিক স্থির না করতে পারলেও কোকিলের ডাকটা ঠিক স্থির করতে পারলাম। সকালে কোকিলের কুহু কুহু ডাক আমার মাথা ঝিমঝিমকে অনেক অংশ কমিয়ে দিয়ছে।
আজ ঝাঁপায় পৌঁছালাম অন্য দিক দিয়ে, ঠিক যেখানে মহব্বতপুর সীমান্ত শেষ করছে সেই জায়গা থেকে। গ্ৰামে ঢুকতেই আমায় স্বাগত জানিয়েছে পাঠ গাছ। জমিতে তরে তরে চাষ হয়েছে পাট। এতো বড়ো বড়ো পাট গাছ দেখলে একটু ভয় পায় অবশ্যই, তবে এটা আমাদের রাজ্যের অর্থনীতিতে অনেক অংশ প্রভাবিত করে। আমার ছেলেবেলার স্মৃতির ঝোলায় এই পাট গাছ নিয়ে একটা স্মৃতি আছে। ছেলেবেলায় আমার পরিবারের আর্থিক কষ্ট লেগেই থাকত। পাটের সময় মা আমাকে নিয়ে যেতে পাট শাক তুলতে মানে পাটের পাতা তুলতে। মা পাতা গুলোকে সিদ্ধ করে পিয়াঁজ, সর্ষের তেল আর লবন মাখিয়ে ভর্তা বানিয়ে দিতে। হয়তো কখনো বা তার সাথে একটু ডাল থাকত। তো এই পাট পাতা কত নাম না জানা মানুষের অদিনের সঙ্গী তার কুল কিনারা নেই।
আর একটু এগিয়ে জনপদের ছবি তুলতেই অনেকে বাড়ি থেকে বেরিয়ে নানান ধরনের প্রশ্ন করতে শুরু করে দিলেন। কিছু কথা বার্তার পর তাদের কৌতুহলী চোখ গুলো একটু বিশ্রাম পেল। তাদের মধ্যে অনেকেই আমার এই ডকুমেন্টারির কাজকে সমর্থন করে আমার দর্শক পরিবারের সদস্য হলেন। তারপর সদ্য হওয়া কংক্রিটের রাস্তা ধরে এগিয়ে গেলাম।
একজন বয়স্ক মানুষ কুল গাছের পাতা তুলছেন, আমি ওনাকে জিজ্ঞাসা করলাম “এটা কি কাজে লাগবে দাদু?” আধো গলায় আমায় জানালো এই গাছের উপকারিতা আর ব্যাথা কমাতে এর ব্যবহার কি। আরও জানলাম বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কীভাবে শরীরের ব্যাথা যন্ত্রণা বাড়ে। আর সেই যন্ত্রণা খুব নির্মম সত্য কে সামনে নিয়ে আসে। হাত অজুহাত জানি না তবে এটা বলতে শুনেছি “বয়স হয়েছে তো, এখন এগুলো একটু হবেই”। ঘটনাচক্রে আমাদেরও যখন বয়স হবে তখন আমরাও এমন টাই শুনব।
সমতল ভূমিতে বেড়ানোর মজা একটু অন্যরকম, এখানে গাছ-গাছালির অবস্থান, আকৃতির আর প্রকারভেদ জায়গাটির দৃশ্য বদলে দেয়। ঠিক তেমনি ভাবে এই জায়গাটি গুরুত্ব বদলে দিয়েছে। সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে নারকেল গাছ তার একটু দূরে লম্বু গাছের মাথা হাওয়ার তালে তালে দুলছে। একটা কলাগাছ তার প্রায় নিজের সাইজে কাঁধি দিয়েছে। আমার ছবি তোলা দেখে কলা গাছের মালিক বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসে বলল, “এই আপনি কলা গাছের ছবি তুলছেন কেন? ট্যাক্স দিতে হবে নাকি?” আমি শুধু একটুখানি হাসলাম। আমি খুব ভালো করে বুঝতে পারলাম এই প্রশ্ন নতুন সরকারের জন্য ছিল।
পথের পাশে থাকা পুঁই শাকের ঘন সবুজ হয়ে উঠেছে। আর হলুদ বোলাতার দল তখন খাওয়ার বা বাসা বানানোর সরঞ্জাম সংগ্রহ করতে ব্যস্ত। ওদের কাজে বাধা না দিয়ে আগে যাওয়ার রাস্তা ধরলাম।
সকালে রান্না করার তখন ব্যাস্ত ঘরের গৃহীনিরা, সামনে দেখি তাদের একজন আম তলায় বসে রান্না করছেন। তার অনুমতি নিয়ে দুটি ভিডিও ক্লিপ নিলাম।
এখন পৌঁছালাম একটা সুপারি বাগানে। এতো সুন্দর করে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকা সুপারি গাছ গুলোকে দেখলেই মনে হয় একটা অন্য জগতে চলে এসেছি। নিরিবিলি পরিবেশে ঠাণ্ডা হাওয়া বয়ে চলেছে তার সাথে দুই এক টুকরো রোদের খণ্ড গায়ে এসে পড়ছে। এক এক অন্যরকম অনুভুতি। বরাবরই আমি স্থির চিত্র তোলার কথা ভুলে যাই। এই জায়গায় তাই করলাম।সকালে রান্না করার তখন ব্যাস্ত ঘরের গৃহীনিরা, সামনে দেখি তাদের একজন আম তলায় বসে রান্না করছেন। তার অনুমতি নিয়ে দুটি ভিডিও ক্লিপ নিলাম।
এখন পৌঁছালাম একটা সুপারি বাগানে। এতো সুন্দর করে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকা সুপারি গাছ গুলোকে দেখলেই মনে হয় একটা অন্য জগতে চলে এসেছি। নিরিবিলি পরিবেশে ঠাণ্ডা হাওয়া বয়ে চলেছে তার সাথে দুই এক টুকরো রোদের খণ্ড গায়ে এসে পড়ছে। এ এক অন্যরকম অনুভুতি। বরাবরই আমি স্থির চিত্র তোলার কথা ভুলে যাই। এই জায়গায় তাই করলাম।
পৌঁছালাম একটা ক্ষেতে যেখানে এখন গাঁদা ফুলের চাষ শুরু হচ্ছে। আমরা তো ফুলের দোকান থেকে ফুল কেনার সময় কত দর কষাকষি করি কিন্তু এই ফুল চাষের জন্য একজন চাষির পরিশ্রমের মূল্যে কোনো দল কষাকষি মানায় না।
এখানে জানলাম এক বিঘা জমিতে গাঁদা ফুল চাষ করতে খরচ কত হয়। জানলাম আরও কতো খুঁটিনাটি বিষয় নিয়ে । আচ্ছা, গাঁদা ফুলের দানা দেখেছেন কখনও ? যদি না দেখে থাকেন তাহলে চারা গুলো কোথা থেকে হয়? এর উত্তর পেতে হলে ফিরে দেখতে হবে স্মৃতির পাতা নেড়েচেড়ে। আমাদের গ্ৰাম বাংলার স্বাধীনতা দিবসের অনন্দ একটু বেশি মনে হয়। যখন আমরা প্রাইমারী স্কুলে পড়তাম স্বাধীনতা দিবসের দিনে স্কুল সাজানোর জন্য আমরা ফুল তুলে নিয়ে আসতাম, আর সেই ফুল দিয়ে মালা গাঁথতাম ক্ষুদিরাম বসু, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু ও মহাত্মা গান্ধী প্রমুখ ব্যাক্তিদের গলায় দেওয়ার জন্য। আর কিছু ফুলের পাঁপড়ি ছেঁড়া হত ঐ ছবির নিচে বিছিয়ে দেওয়ার জন্য। আর সেই পাঁপড়ি গোঁড়ায় কালো রঙের একটা মোটা অংশ থাকত। যেটা আমাদের ছোট্ট ছোট্ট আঙ্গুল দিয়ে চিরে দিতাম। এই কালো রঙের অংশ যখন পুষ্ট হয়ে আসে তখন সেটা থেকে একটা বিশেষ পদ্ধতিতে গাঁদা ফুলের চারা তৈরি করা হয়।
এখন আমি পৌছালাম একটা পুকুর পাড়ে সেখানে দুই জন বসে খোসা মেজাজে গল্প করছে। তারা নিজেদের গল্প থামিয়ে আমার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে। আমি অপ্রস্তুত হয়ে পৌঁছালাম তাদের কাছে একটু পরিচয় পর্ব সাঙ্গ করে তাদের ছবি তোলার জন্য অনুমতি চেয়ে নিলাম।
গ্ৰাম মানে পুকুরের সবুজ জল আর তার উপর জল ছবির নৃত্য। অজান্তেই মনের ভিতরে তরঙ্গ তৈরি করে।
বাঁশের তৈরি পুকুরের ঘাটে বসে ছিলাম কিছুক্ষণ। বেশ ভালো লাগছিলো। পুকুরের পাড়ে একটা রাস্তা সেখান থেকে একজন সাইকেল চালিয়ে যাচ্ছিল, সেই ব্যক্তি বলে গেলেন সমনে আরও বড়ো বড়ো চারটি পুকুর আছে।
সাইকেল চালিয়ে পৌছালাম চার পুকুরের পাড়ে। পুকুর না বলে ঝিল বলাই ভালো। পুকুরের পাশে দাঁড়িয়ে কয়েকটি ভিডিও ক্লিপ নিয়ে সাইকেল চালিয়ে এগিয়ে চললাম চার পুকুরের মাঝখানে একটা ছায়া ঘেরা ফাঁকা জায়গায়। এক সঙ্গে দুই জন ব্যক্তি পাশাপাশি যেতে পারবে না এইতোটা সুরু পথ এটা। এমন জায়গায় সাইকেল চালানোর অভিজ্ঞতা সাইকেল চালানোর দক্ষতাকে বৃদ্ধি করে।
অবশেষে পৌঁছালাম মাঝখানের ঐ ফাঁকা জায়গায়। প্রকৃতির সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক যে কতটা গভীর এই জায়গায় বসে আরোও অনুভব করলাম। একেবারে নির্জন জায়গা এটা। পাখির ডাক, পাতার কলতান আর তার সঙ্গে একটু মৃদু হাওয়া, সব মিলিয়ে একটা দারুন অনুভুতি হচ্ছিল। আমার জায়গায় কোনো এক কবি থাকলে মনে হয় একটা দারুন কবিতা লিখে ফেলতেন। বকের দল বিক্ষিপ্ত ভাবে এদিক ওদিক ওড়াউড়ি করছিল। কয়েকটির বকের মধ্যে একটু পৃথকীকরণের চেষ্টা করলাম, একটা Brown headed Crane, আমার সামনে দিয়ে উঁড়ে ঝিলের অন্য প্রান্তে গিয়ে বসল, আর একটা Brown backpack Carne একটু দূরে বসে শিকারের জন্য অপেক্ষা করছে, তবে এখানে White Crane আমার চোখে বেশি ধরা দিল। তবে মাছরাঙা যা সবই একি প্রজাতির White Throated Kingfisher বাংলায় এর নাম ধলাগলা মাছরাঙা। একটা মাছরাঙা একটা বাঁশের উপরের চুপচাপ বসে আছে পেটের দায় মেটাতে। মানুষ হিসেবে পৃথকীকরণ করার চেষ্টা করলেও বক বা মাছরাঙাদের প্রজাতি নিয়ে কোন চিন্তা ভাবনা নেই, সবাই এই প্রকৃতিরই সন্তান। আজকের এই পর্যন্ত ঘোরাঘুরি করার পর দেখলাম সূর্যের আলোর তীব্রতা বাড়িয়ে অনেটাই, আজকের মত কাজ শেষ বাড়িতে ফিরলাম।
তৃতীয় দিন, আজকের অল্প কিছু জায়গা দেখতে বাকি আছে, পদ্মপুকুর থেকে ঝাঁপ চৌমাথায় পৌঁছে ডাঁন দিকের রাস্তাটা নিলেই দেখা যায় তিনটি প্লান্ট স্থাপন হয়েছে। এইটা পরিবেশ নষ্ট করলেও রুজি রোজগারের জন্য মেনে নিতে হয়।
প্রথমটা একটা পোল্ট্রি বা ব্রয়লার মুরগির গবেষণা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বেসরকারি উদ্যোগে। তার সামনে সারি বেঁধে গোঁড়ায় চুন রং করা মাঝারি ধরনের নারকেল গাছ আছে। আমি কৌতূহল বশত গেট খোলা পেয়ে পৌছালাম তার অফিসের সামনের দেখলাম ভিতরের গেট বন্ধ আর ভিতরে ছবি তোলা যাবে না এমনি লেখা আছে। আমি সংস্থার বিষয়ে একটু পড়াশোনা করে বুঝতে পারলাম ভিতরটা Bio-secured Zone হওয়ার কারণ। তাই আমি রাস্তায় গিয়ে পুকুর সহ গাছের ছবি তুলছিলাম। ভিতর থেকে একজন এসে জিজ্ঞাসা করলেন আমি কি করছি এখানে। আমি বললাম, আমার কর্মকান্ডের কথা। আমার গ্ৰামের এক ব্যাক্তি ততক্ষণে এসে উপস্থিত হলেন। সবাই ঠিক ছিল কিন্তু সমস্যা হলো তৃতীয় ব্যক্তির আগমনে, আমি কি বলছি, কোথায় কি করছি না জেনে বুঝে সোজা তর্ক আরম্ভ করলেন। আমি নানা ভাবে ওনাকে বোঝানোর চেষ্টা করলাম আমি যেটা করছি তাতে কারও কোনো ক্ষতি না বা খারাপ নেই। আমাকে নানান ভাবে বোঝানোর চেষ্টা করলেন যে আমি ভুল করেছি। আমার ভুল স্বীকার করতে কোনো সমস্যা নেই যেখানে আমি ভুল করেছি। অবশেষে ওনি এটা বোঝালেন আমি সাইকেল টা রেখেছি সেটা ওনার সংস্থার জায়গায় এটাই আমার ভুল। ওনার নাম জিজ্ঞেস করায় সেটাও এড়িয়ে গেলেন। আমি বুঝলাম ওনার উদ্দেশ্য অন্যকিছু। পথ চলতে এমন কত রকমের মানুষ এর সঙ্গে আমার পরিচয় হবে আগামী দিনে। সকালে ভিডিও সংগ্রহ করার কজ দুই ঘণ্টার বেশি ভালো ভাবে করা যায় না। আমি সেখান থেকে বেরিয়ে এলাম পরর্বতী গন্তব্যের জন্য।
একটা প্লাস্টিক ও আরও একটা সেলাইয়ের কারখানা পার হয়ে পৌঁছালাম এই গ্ৰামের খেলার মাঠে। ভারী সুন্দর সেই মাঠ। ছোটো বেলায় এই মাঠে আসতাম খেলা দেখার জন্য। হাজার দর্শকের সামনে গোলের দিকে বল গেলেই দর্শকের উল্লাশ ছিল চোখে পড়ার মতো। কতো ছেলে স্বপ্ন দেখতো এই বার পোস্টের জালে বল জড়ানোর জন্য। আমিও স্বপ্ন দেখেছিলাম একটা ফুটবলার হওয়ার জন্য। কিছু স্বপ্নটা তো আর বাস্তবে মত সহজ নয়, অনেক ঘাত প্রতিঘাতে সব ভেঙে চুরে গিয়ে ছিল। এই মাঠে পৌঁছে মনটা কেমন যেন টলমল করে উঠলো। মাঠের পাশে বসে একটু সামন কাটালাম। এক পাশের আম বাগান অন্য পাশে চাষে ক্ষেত। একটা কংক্রিটের মঞ্চ তৈরি করা হয়েছে।
খেলার মাঠের পাশে একজন ঘাস কাটছিল কাছে পৌঁছালাম, জানলাম নাম তার বাবর আলী। জিজ্ঞেস করলাম এই ঘাসের নাম কি? বললেন, "খড় ঘাস" । কি খাবে জিঞ্জাসা করায় বললেন বিক্রয় হবে। আমি শুনে একটু অবাক হয়েই বললাম, কারা কিনবে এই গুলো? ব্যাক্তিটি বললেন, পানের বরজে কচি গাছের ডগা বাঁধতে কাজে লাগবে প্রতি আটি ৮০-১০০ টাকা দাম পাবেন উনি। সত্যি এই ভাবে রোজগার করতে পারে কেউ তা আমার জানা ছিল না। তবে এই কাজে একটা ঝুঁকিও আছে যা হলো সাপের ভয়। তবে জানলাম উনি সাপের শব্দ চেনেন তাই ভয় কম পান।
এই গ্রাম থেকে অনেক কিছুই শিখলাম। তবে কিছু প্রশ্নের উত্তর বাকি থেকে যায়। আমার সবচেয়ে খারাপ লাগে যখন কোনো একটা গ্ৰামের কাজ শেষ করি, হয়তো এই ভাবে আর দেখার সময় বা সুযোগ কোনোটাই পাব না ভবিষ্যতে এই গ্ৰামকে দেখার। কিছু মনের মধ্যে আর একটা আনন্দও থাকে, সেটা হলো আবার একটা নতুন প্রকৃতি ও সংস্কৃতি সঙ্গে।