ইতি, কাব্য

in আমার বাংলা ব্লগ3 years ago

sunset-g399d119d0_1280.jpg
source

বালিশের নিচে যে ছোট্ট কাগজটা পাওয়া গিয়েছিল তাতে স্পষ্ট করে লেখা ছিল , আমার এই অবস্থার জন্য কেউ দায়ী নয়। আমি নিজেই নিজের পথ বেছে নিয়েছি, ইতি কাব্য।

তীর্থ আর কাব্য জমজ ভাই। মূলত বেড়ে ওঠা তাদের একসঙ্গেই। দেখে বোঝার কোন উপায় নেই যে, তাদের মধ্যে কে ছোট আর কে বড়। তীর্থ সম্ভবত কিছুটা সময়ের বড় হবে। যাইহোক সরকার বাড়িতে সেই সময় বেশ ঘটা করেই তাদের জন্মের আনন্দের খবর বয়ে গিয়েছিল। তবে আজ সরকার বাড়িতে অনেকটা কালো মেঘের ছাপ নেমে এসেছে।

ঘটনাটা এমন না ঘটলেও পারতো। তবে পরিস্থিতি হয়তো অনেক কিছুই বদলিয়ে ফেলে। যার কারনে অনেক সময় অঘটন ঘটে যায়। আর কয়েকদিন পরেই কাব্য আর তীর্থের মাধ্যমিক পরীক্ষা শুরু হবে। তবে কাব্য কোনোভাবেই পরীক্ষা দিতে রাজি নয় এবং সে বুঝতে পারছে যে, সে পরীক্ষা দিলে ভালো কিছু করতে পারবে না এবং ওর থেকে তীর্থ অনেকটাই এগিয়ে যাবে।

ছোট মনের এই ব্যথাটি কেউ আসলে বুঝতে পারেনি। না পারেনি তাদের পরিবারের লোকজন, না পারেনি তাদের প্রতিবেশী। কারণ তারা প্রতিনিয়তই চাচ্ছিল যে, তাদের দুই ছেলেই পরীক্ষাতে বসুক এবং দুই জনই ভালো ফলাফল করুক। তবে সত্য কথা বলতে গেলে কি, কাব্যর মনের ভিতরে কি চলছিল বা তার প্রস্তুতি কেমন, এটা আসলে কেউ জানার চেষ্টা করেনি। আর তাছাড়া সবাই যে পড়াশোনায় একই রকম হবে, সবার ফলাফল যে একই হবে, এটা চিন্তা করাও কিন্তু বোকামি।

শুধুমাত্র পড়াশুনা দিয়ে কাউকে আসলে যাচাই করা খুব কষ্টকর। কেউ হয়তো পড়াশোনাতে কিছুটা দুর্বল হতে পারে তবে অন্য দিকটাতে সে ভালো হতে পারে। আর সব যে পড়াশোনার ভিতরেই নিহিত আছে তাও কিন্তু না। তাছাড়া এত ছোট বয়সের কোমলমতি ছেলের উপর এমন ভাবে মানসিক চাপ না দিলেও চলত বা তাদের উপর একটু প্রত্যাশা কম রাখলেও কোন সমস্যা হতো না।

সরকার বাড়ির অবস্থা আগে থেকেই মোটামুটি বেশ ভালো। তারা ব্যবসায়িকভাবে অনেকটাই এগিয়ে গিয়েছে। বিশেষ করে লিটন সাহেবের তো সেই অনেক আগে থেকেই বাজারের ভিতরে অনেক বড় কাপড়ের দোকান আছে। তার আসলে অনেক প্রত্যাশা তার দুই ছেলেকে নিয়ে। বিশেষ করে তার দুই ছেলে যেন মাধ্যমিকে ভালো ফলাফল করে এবং পরবর্তীতে তারা যেন অন্যত্র কোন ভালো কলেজে ভর্তি হয়ে, ভবিষ্যতে ভালোভাবে আরো এগিয়ে যেতে পারে, তেমনটাই প্রতিনিয়ত প্রত্যাশা ব্যক্ত করছিল, লিটন সাহেব।

কাব্যের মন আসলে কখনোই পড়াশোনায় টিকতো না। ওর মন পড়ে থাকত অনেকটা খেলাধুলায়। বলতে গেলে, ক্রিকেটের প্রতি তার আলাদা একটা দুর্বলতা ছিল। আর ও তাছাড়া বুঝতে পারছিল, ওর বাবার প্রত্যাশার মতো ফলাফল ও কখনো করতে পারবে না। তবে সেই কথা মোটেও বলতে পারছিল না বাবাকে।

নবম শ্রেণীর পরে একবার কাব্য তার বাবাকে বলেছিল যে, বাবা আমাকে যদি সম্ভব হয় তাহলে খেলাধুলা বিষয়ক যে প্রশিক্ষণ কেন্দ্র আছে সেখানে পারলে ভর্তি করিয়ে দাও। তবে ব্যবসায়ী বাবার একটাই চিন্তা, তার দুই ছেলেই পড়াশুনা করে এগিয়ে যাবে, খেলাধুলা করে নয়। সময় গড়িয়ে যায় কাব্যের খেলাধুলার প্রতি নেশা অনেকটাই তীব্র থেকে আরো তীব্রতর হয়। তবে তীর্থ অনেকটা এগিয়ে যায় পড়াশোনাতে। ভাই হিসেবে কাব্যকে বোঝানোর চেষ্টা করেছিল সে। তবে এই বয়সে ভালোলাগার প্রতি যে আগ্রহ তৈরি হয়, সেখানে হয়তো পরামর্শ বারবার উপেক্ষিত হয় ।

অতঃপর মোটামুটি যেভাবে সময়গুলো চলছিল, তাতে কাব্যের প্রতিনিয়ত খেলাধুলায় বেশ উন্নতি হচ্ছিল এবং এলাকার মোটামুটি সব ধরনের ক্রিকেট লিগেই সে অংশগ্রহণ করতো এবং বেশ ভালই প্রশংসিত হয়েছিল, সকলের কাছেই । তবে তার দুর্বলতা শুধু পড়াশুনাতেই।

পরীক্ষা শুরু হওয়ার আর মাত্র কয়েকদিন বাকি আছে। নিজের পড়াশোনার অবস্থা ভেবে কাব্য তার পরিবারকে বলার চেষ্টা করলো যে, সে পরীক্ষা দিলে ভালো কিছু করতে পারবে না। তার থেকে যদি তাকে, খেলাধুলায় বেশ ভালোভাবে মনোনিবেশ করতে দেওয়া হয়, তাহলে হয়তো সে ক্রিকেটে ভালো কিছু করতে পারবে। এমনিতেই লিটন সাহেব বেশ রাগী মানুষ, পরীক্ষার সন্নিকটে এসে ছেলের মুখ থেকে এমন কথা শুনে, সে যেন অনেকটাই হতভম্ব।

অনেকটা রাগের বসেই লিটন সাহেব যা ইচ্ছা তাই বলে বকাবকি করলো কাব্যকে এবং পরিবারের অন্যান্য লোকজন ব্যাপারটা স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ না করে বরং উল্টো কাব্যের উপর আরো ভিন্নভাবে তির্যক কথাবার্তা বললো। যে মন্তব্য গুলো গ্রহণ করতে বেশ কষ্ট হয়েছে কাব্যের।

চতুর্দিকে এতো লোকজন, বন্ধু-বান্ধব ও নিজের আত্মীয়-স্বজন তাও যেন কাব্যকে বোঝার মতো কেউ নেই। কাব্যর মনের অবস্থা আসলেই গুলিয়ে গিয়েছে। সে নিজের কাছে নিজেই অনেকটা অসহায় হয়ে গিয়েছে। এমন অবস্থায় নিজেকে সামলানো বেশ কষ্টসাধ্য। সে নিজেকে সামলাতে পারেনি, নিজেকে ঝুলিয়ে ফেলেছে সিলিং ফ্যানের সঙ্গে, তার আগে সেই ছোট্ট চিরকুটটা রেখে গিয়েছে বালিশের নিচে।

বিঃদ্রঃ
এই ঘটনা একদম বাস্তব, দুইদিন আগে আমার পাশের এলাকাতে ঘটেছে।

Banner-15.png

ডিসকর্ড লিংক
https://discord.gg/VtARrTn6ht


20211003_112202.gif


JOIN WITH US ON DISCORD SERVER

banner-abb4.png

Follow @amarbanglablog for last updates


Support @heroism Initiative by Delegating your Steem Power

250 SP500 SP1000 SP2000 SP5000 SP

Heroism_3rd.png


VOTE @bangla.witness as witness


witness_vote.png

OR

SET @rme as your proxy

witness_proxy_vote.png

Sort:  
 3 years ago 

কাব্যর মতো অনেকে আছে যারা নিজের মনের কথাগুলো কাউকে বোঝাতে পারে না। আসলে মৃত্যুর পথ বেছে নেওয়া হয়তো তার উচিত হয়নি। তবে এত ছোট বয়সে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া তার পক্ষে অনেক কঠিন ছিল। যদি তার পরিবার পরিজন তার পাশে দাঁড়াতো এবং তার কথা মত তাকে খেলাধুলার প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে ভর্তি করে দিত তাহলে হয়তো সে অন্য পর্যায়ে যেতে পারতো। পুরো বিষয়টা সত্যি বেদনাদায়ক। এই পরিস্থিতি যেন কারো জীবনে না হয় এই প্রত্যাশাই করি।

 3 years ago 

এমনটা আমিও প্রত্যাশা করি আপু, নবীন প্রাণ গুলোর সাথে যেন এমনটা আর কোনভাবেই না ঘটে।

 3 years ago 

ভাইয়া আপনার পোস্ট পড়ে অনেক খারাপ লাগল কাব্যের জন্য। সত্যি আমাদের সমাজের মা বাবারা কখনো সন্তানের মনের কথা বুঝতে চান না।আসলে সব বাবা মাই চায় তার সন্তান ভালো রেজাল্ট করুক। কিন্তু সবাই যে পড়াশোনায় ভালো হবে এমন কিন্ত নয়। সত্যিই তো কাব্য যেহেতু খেলাধুলায় ভালো তা হলে কাব্যকে সেদিকে দেওয়ায় উচিত ছিল তার বাবা মার। কাব্যেকে শুধু পড়াশোনা ভালো না পারার জন্য জীবন দিতে হলো। ধন্যবাদ আপনাকে পোস্ট আমাদের মাঝে শেয়ার করার জন্য।

 3 years ago 

দোষ আসলে বাবা-মার না। সমস্যা আমাদের পারিপার্শ্বিক অবস্থার। যেখান থেকে আমাদের নিজেদেরকেই বেরিয়ে আসতে হবে।

 3 years ago 

আহারে,খুব খারাপ লাগলো পড়ে। আসলে মা-বাবা চায় সন্তান আগে লেখাপড়াটা করুক তারপর অন্য কিছু।কিন্তু কাব্য যে খেলাধুলা নিয়েই আছে এটা কেই বা মানতে পারে।তাকে বুঝতে পারলেও সবাই ই চায় স্কুলটা আগে পাশ করুক।তাই বলে এভাবে চলে যাওয়া উচিত হয়নি।খুব খারাপ লাগলো কাব্যর এই ঘটনায়।শেয়ার করার জন্য অনেক ধন্যবাদ ভাইয়া।

 3 years ago 

আসলে প্রত্যেক বাবা-মা তার সন্তানদের ভালো চায়, তবে সন্তানদের কোথায় ভালোলাগা কাজ করছে, এই ব্যাপারটাও একটু বোঝা উচিত।

 3 years ago 

বেশ হতাশাজনক একটি গল্প শেয়ার করলেন পড়ে মনটা একদম খারাপ হয়ে গেল। কারণ হাতের সব আঙ্গুল সমান না আর পড়ালেখার ক্ষেত্রেও সবার মেধা বিকাশ সমান হয় না। একেকজন একেক দিকে এগিয়ে যেতে মন মানসিকতা কাজ করে। ছেলে মেয়েদেরকে অতিরিক্ত মানসিক চাপাচাপি করলে কিংবা ইচ্ছারর বিরুদ্ধে কাজ করলে এরকম হিতে বিপরীত হতে পারে। তাই আমাদের সকলের উচিত এই গল্প থেকে শিক্ষা নেওয়া। অনেক ধন্যবাদ ভাইায়া আপনাকে গুরুত্বপূর্ণ গল্পটি শেয়ার করার জন্য।

 3 years ago 

আপু, আমি নিজেও ঘটনাটা লেখার সময় অনেকটাই কষ্ট পেয়েছিলাম।

 3 years ago 

কাব্য আর তীর্থ দুই ভাই।একজন পড়ায় ভালো একজন খেলাধুলায়।আমাদের সবার উচিত যে যেই বিষয়ে দক্ষ তাকে সেই বিষয়টার উপর আরও উৎসাহ দেওয়া।কিন্তু এখানে লিটন সাহেব পরীক্ষার আগে ছেলের মুখে এরকম কথা শুনে রেগে যা ইচ্ছে তাই বলে দিলেন এবং পরিবারের লোকেরাও একই কাজ করলেন।যায় দরুন কাব্যের ছোট্ট হৃদয় এতো কষ্ট সহ্য করতে পারলো না।তাই শেষ পর্যন্ত তাকে সিলিং ফ্যানের সাথে ঝুলতে হলো।এটা আসলে আমাদের জীবনের অন্যতম ভুল বলা যায়।বিশেষ করে বাবা মায়েরা সন্তানদের উপর নিজের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিয়ে,তাদের সন্তানদের মতামতের গুরুত্ব দেন না।এজন্য অকালেই ঝরে যায় কিছু প্রাণ।সৃষ্টিকর্তা প্রতিটি মানুষকে একই মেধা দেননি,একেক জন একেক কাজে পারদর্শী।ধন্যবাদ ভাইয়া সুন্দর পোস্টটি শেয়ার করার জন্য।

 3 years ago 

একটু হলেও সন্তানদের ইচ্ছেটাকে জানা দরকার, আমার তাই মনে হয় আপু।

 3 years ago 

ভাইয়া আপনার আজকের গল্পটি কিন্তু মনকে বেশ নাড়া দিয়ে গেল। আমার মনে হয় প্রতিটি অভিভাবকের উচিত সন্তানের মনের কথা গুলো কে শোনা। আজ যদি কাব্যের অভিভাবক গন কাব্যের মনের ইচ্ছের কথা জানতে চাইতো, তাহলে হয়তো কাব্যের জীবন টা এমন নাও হতে পারতো। আসলে আমি বুঝি না একটা মানুষকে কে তার ইচ্ছের বিরুদ্ধে চাপাচাপি করা হয়। আর কাব্যদের মত ছোট ছোট বাচ্চাদের কে মৃত্যুর পথ বেছে নিতে হয়।

 3 years ago 

পারিপার্শ্বিক অবস্থা আপু বেশ কঠিন, ব্যাপারটা আমাকেও বেশ ব্যথিত করেছে।

 3 years ago 

ভাইয়া, আপনার লেখাগুলো পড়ে খুবই খারাপ লাগলো এবং একটি হতাশাজনক বিষয় জানতে পেরে মনটা খুবই খারাপ হয়ে গেল। এখানে লিটন এবং তার পরিবারের অজ্ঞতার কারণেই একটি জ্বলন্ত প্রদীপ নিভে গেল। এখানে কাব্যের মনের অবস্থা কেউ বোঝার চেষ্টা করেনি। আমাদের সকলের উচিত আমাদের সন্তানদের মধ্যে যে সন্তানটি যে কাজে বেশি দক্ষ থাকে তাকে সেই কাজেই উৎসাহিত করা। একই সাথে যে কোন কারনে আমাদের সন্তানদের মনে আঘাত দেয়া থেকে আমাদেরকে বিরত থাকতে হবে। এই পোস্টটি পড়ে আমাদের সকলকেই এ সকল বিষয় থেকে সতর্ক হতে হবে। একটি বাস্তব সম্মত ঘটনা আমাদের মাঝে শেয়ার করার জন্য প্রিয় ভাই আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।

 3 years ago 

ধন্যবাদ ভাই, ব্যাপারটা বুঝতে পেরে সাবলীল ভাবে মন্তব্য পোষণ করার জন্য।

Coin Marketplace

STEEM 0.04
TRX 0.32
JST 0.080
BTC 62121.05
ETH 1637.93
USDT 1.00
SBD 0.41