হঠাৎ ছন্দপতন। ১০% প্রিয় লাজুক খ্যাঁক এর জন্য।
বেশ কিছুদিন থেকেই ঢাকায় একটি ব্যক্তিগত কাজে প্রচন্ড ব্যস্ত ছিলাম। ব্যস্ততায় একসময় হাঁপিয়ে উঠলাম। পরে সেই ক্লান্তি দূর করার জন্য পরিবারের সকলে মিলে সিলেট থেকে ঘুরে আসলাম। আপাতত ঢাকায় আমি যে কাজ নিয়ে গিয়েছিলাম সে কাজটি কিছুদিন বন্ধ আছে। দীর্ঘদিন ধরে ঢাকায় থাকার কারণে স্ত্রী সন্তানকে অনেক মিস করছিলাম। তাই সিলেট থেকে ঢাকা ফেরার পর দিনই বাড়ির দিকে রওনা দিলাম।
অনেকদিন পর তাদেরকে দেখতে পাবো বলে মনের ভেতর এক ধরনের ভালোলাগা কাজ করছিল। সেই ভালোলাগা নিয়ে বাড়ির দিকে রওনা দিলাম। আমার সাথে ছিলো আমার মা। আমরা দুজন সকাল এগারোটার দিকে বনশ্রী থেকে রওনা দিলাম গাবতলীর উদ্দেশ্যে। গাবতলী পৌঁছাতে ১২ টার বেশী বেজে গেলো। তারপর বাসের টিকিট কেটে বাসে উঠে বসলাম। যদিও বাসটি নির্ধারিত সময়ের কয়েক মিনিট পরে ছেড়েছে।
এই বাসের রেপুটেশন একসময় খুবই ভালো ছিলো। সব সময় এরা সময় মেনে চলতো। কিন্তু ইদানিং খেয়াল করছি এরা মাঝেমাঝেই নির্ধারিত সময়ের বেশ খানিকটা সময় পরে বাস ছাড়ে। এই কারণে যাত্রীরা সবাই এদের উপর খানিকটা বিরক্ত। কিন্তু বিরক্ত হলেও কিছু করার নেই। কারণ ঢাকা থেকে ফরিদপুর যাওয়ার জন্য এখন একমাত্র মানসম্মত পরিবহন আছে এদের। এই একক আধিপত্যের জন্য এরা এ ধরনের কর্মকান্ড করতে পারছে।
যাই হোক পৌনে বারোটার সময় বাস ছাড়ার কথা থাকলেও বাস ছাড়লো একটার সময়। বাস চলতে শুরু করার কিছুক্ষণ পর আমি ঘুমিয়ে পড়লাম কারণ রাতে ভাল ঘুম হয়নি। কিছুক্ষন ঘুমানোর পর আমার ঘুম ভেঙে গেলো। মাথায় একটি চিন্তা কাজ করছিলো যে ফেরিঘাটের কি অবস্থা? সেখানে যদি জ্যাম থাকে তাহলে আমাদের পৌছাতে সন্ধ্যা হয়ে যাবে। কিন্তু ঘাটে পৌঁছে আমি খুবই অবাক হলাম। কারণ আমাদেরকে এক মিনিট ও অপেক্ষা করতে হয়নি। আমাদের গাড়ি সরাসরি ফেরিতে উঠতে পেরেছে। গত কয়েক বছরে এমন ঘটনা আমার সাথে ঘটেনি। সবসময় ফেরি পারাপারে দেরি হয়েছে।
যেহেতু ফেরিঘাটে আমাদের কোন সময় নষ্ট হয়নি। তাই তখন মনে মনে খুবই খুশি হলাম যে অল্প সময়ে বাসায় পৌঁছে যেতে পারবো। কারণ ফেরি পার হওয়ার পর আমার বাসায় পৌছাতে সর্বোচ্চ আধা ঘন্টা লাগবে। এর জন্য আমি খুবই খুশি ছিলাম। বাসে বসে আমার মার সাথে বিভিন্ন পরিকল্পনা করছিলাম। ফরিদপুর থেকে আবার ঢাকায় ফিরে আমাদের কি কি কাজ করতে হবে। কিভাবে সেই কাজগুলো করা যায় সেগুলি নিয়ে আমি আর আম্মা পরামর্শ করছিলাম।
কিন্তু তখনও আমরা জানিনা সামনে আমাদের জন্য কী অপেক্ষা করছে। ভবিষ্যতের বিভিন্ন পরিকল্পনায় দুজন ব্যস্ত ছিলাম। দেখতে দেখতে আমরা ফরিদপুর বাস স্ট্যান্ডে পৌঁছে গেলাম। পৌঁছানোর পর আমাদের কাছে ছোট ছোট কয়েকটি ব্যাগ ছিলো। আমি দুই হাতে ব্যাগগুলো নিয়ে আম্মাকে বললাম আমি প্রথমে নেমে লাগেজ বক্স থেকে লাগেজ বের করছি। তুমি আস্তে আস্তে নামতে থাকো। আমি ব্যাগ গুলো নিয়ে বাসের গেটের দিকে আগালাম। বাসের গেটের কাছে পৌঁছে আমি এক পা নিচে নামিয়েছি বাস থেকে নামার জন্য। হঠাৎ করে কি হয়ে গেল কিছুই বুঝতে পারলাম না।
আমি মাটিতে পড়ে গেলাম আর তীব্র ব্যথায় আমার চারপাশটা অন্ধকার হয়ে গেলো।ঘটনার আকস্মিকতায় আমি হতবাক হয়ে গেলাম। আশেপাশের দু-একজন এল আমাকে ওঠানোর জন্য। তখন ও আমি বুঝতে পারিনি আমার সাথে কি ঘটেছে। আমি বেশ কষ্ট করে একা একাই উঠে দাঁড়ালাম। তবে যখন আমি মাটিতে পড়ে যায় তখন কিছু শব্দ শুনেছিলাম। কিন্তু শব্দগুলো কিসের সেটা আমি বুঝতে পারিনি। আমি উঠে দাঁড়িয়ে ব্যাগগুলো গুছিয়ে হাতে নিলাম। আর আমি আমার বাঁ পায়ের গোড়ালি নাড়িয়ে দেখছিলাম কোন সমস্যা বোধ করি কিনা। কিন্তু সেখানে তেমন কোন সমস্যা আমি বুঝতে পারিনি। তখন আমার মনে হয়েছিল যাক এ যাত্রায় বেঁচে গিয়েছি। হয়তো বড় কোন সমস্যা হবে না।
কিছুক্ষণ পর আমরা একটি অটোতে উঠে যখন বাসার উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। তখন হঠাৎ করে আমি দেখি চারপাশটা কেমন ঝাপসা দেখছি। আমার মনে হচ্ছিল আমি এখনই জ্ঞান হারাবো। আমার আম্মা আমাকে বলছিল আমরা প্রথমে ক্লিনিকে গিয়ে তোর পায়ের একটা এক্সরে করিয়ে তারপর বাসায় যাই। আমি বলেছিলাম আগে বাসায় যাই তারপর সেখানে সবকিছু রেখে বিকালের দিকে ডাক্তারের কাছে যাবো। কিন্তু এই অবস্থা হওয়ার পর আমি আমার সিদ্ধান্ত বদলালাম। সিদ্ধান্ত নিলাম সরাসরি ক্লিনিকে গিয়ে আগে এক্সরে করাবো। তারপর অন্য সিদ্ধান্ত নেবো। অটোআলা কে বললাম সরাসরি একটি ক্লিনিকে যেতে। আমাদের বাসার খুব কাছেই একটি ভালো ক্লিনিক আছে এই ধরনের চিকিৎসার জন্য।
সেখানে গিয়ে আমি অটো থেকে আর নামতে পারছিলাম না। অনেক কষ্ট করে আমি অটো থেকে নেমে ক্লিনিকের ভিতরে গিয়ে বসলাম। তারপর এক্সরে করলে এক্স প্লেট দেখে ক্লিনিকের লোকজন জানালো আমার পায়ের একটি হাড় ভেঙেছে। শুনে আমি কিছুটা ভয় পেলাম। তারপর তারা আমাকে পরামর্শ দিল একটু পরেই ডাক্তার আসবে। আপনি এখন বাসায় না গিয়ে একবারে ডাক্তারকে দেখিয়ে তারপর বাসায় যান।
আমি থাকি তিনতলায়।তাই আমি চিন্তা করলাম এই পা নিয়ে আমার পক্ষে তিনতলায় ওঠা নামা খুব সমস্যা হবে। যার ফলে কিছুক্ষণ এখানে বসে অপেক্ষা করি। কিন্তু কতক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে এটা নিয়ে খুব চিন্তা হচ্ছিল। কারণ এভাবে আমি বেশিক্ষণ বসে থাকতে পারবো না বুঝতে পারছিলাম। পরে আমি ক্লিনিকের লোকজনের সাথে কথা বললাম। তারা আমার অবস্থা দেখে বললো সমস্যা নাই আপনাকে বেশি অপেক্ষা করতে হবে না। ডাক্তার এলে প্রথমেই আপনাকে দেখিয়ে দেবো।
কিন্তু দীর্ঘক্ষণ বসে আছি ডাক্তার আর আসে না। শেষ পর্যন্ত আরও প্রায় ঘন্টা খানেক পর ডাক্তার এলো। ডাক্তার এসে প্রথম একজন রোগী দেখার পরে আমার রিপোর্টটি হাতে নিলো। হাতে নিয়ে সেও একই কথা বলল যে পায়ের আঙ্গুলের হাড় ভেঙেছে। পরে আমরা যখন জিজ্ঞেস করলাম এখন কি করতে হবে? তখন সে জানালো খুব বেশি টেনশন করার কিছু নেই। আমরা পা প্লাস্টার করে দেবো। একমাস সাবধানে থাকতে হবে। তারপরই আশা করি হাড় জোড়া লেগে যাবে। শুনে অনেকটা স্বস্তি পেলাম। কারন মনে একটা ভয় কাজ করছিল যদি অপারেশন করতে হয় তাহলে বিরাট ভোগান্তির ভিতরে যেতে হবে। ডাক্তার দেখার পরে আমার পা প্লাস্টার করে দিলো। তারপর আমি বাসায় চলে এলাম। অবশ্য ততক্ষনে আমার বেশ কয়েকজন আত্মীয় স্বজন সেই ক্লিনিকে উপস্থিত হয়েছে। বাসায় আসতে আমার তাদের সাহায্য নিতে হলো।
বাসায় এসে শুয়ে চিন্তা করছিলাম জীবন আসলে কতটা অনির্দিষ্ট। এখানে আমাদের কোনো পরিকল্পনাই চলে না। বরং আমরা যে পরিকল্পনার অংশ আমাদের জীবনটা সেভাবেই চলে। আমরা ভাবি এক শেষ পর্যন্ত হয় আর এক। এই অ্যাকসিডেন্ট হওয়ার পর জীবন সম্বন্ধে একটি নতুন উপলব্ধি হয়েছে। কোন কিছু নিয়ে আসলে বেশি চিন্তা করতে নেই। কারণ চিন্তায় শুধু শুধু আপনার শরীর আর মন নষ্ট হবে কোন। কিছুই হাসিল হবে না। তাই আপনার বর্তমান টাকে উপভোগ করুন এবং ভবিষ্যতে যে কোন কিছুর জন্য প্রস্তুত থাকুন। নিজের মনকে সেভাবে গড়ে তুলুন। তাহলে এই হঠাৎ ছন্দপতনে আপনার খুব একটা সমস্যা হবে না।
আজকের মতো এখানেই শেষ করছি। পরবর্তীতে আপনাদের সাথে দেখা হবে অন্য কোন নতুন লেখা নিয়ে। সে পর্যন্ত সবাই ভাল থাকুন সুস্থ থাকুন।
Support @heroism Initiative by Delegating your Steem Power
| 250 SP | 500 SP | 1000 SP | 2000 SP | 5000 SP |
আল্লাহ যা করেন ভালোর জন্যই করেন। হয়তো এর মধ্যেই তোমার কোন মঙ্গল নিহিত রয়েছে। এই যে তোমার উপলব্ধি এটাই বা কম কিসের। জীবন তো ক্ষণস্থায়ী। আগামীর পরিকল্পনা করে লাভ কি। কাল বেচে থাকবো কিনা তাইতো আমরা জানিনা।
একদম ঠিক বলেছো। জীবনেরই তো কোন নিশ্চয়তা নেই। শুধু শুধু ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে লাভ কি?
ভাই বেদনাদায়ক একটা খবর দিলেন শুনে খুব খারাপ লাগলো যদিও এর আগে একটু শুনেছিল তবে বিস্তারিত জানতামনা। আপনার প্রতি সমবেদনা আর দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠুন এই দোয়া করি। দুর্ঘটনা তো দুর্ঘটনাই এখানে আমাদের কোনো হাত নেই কিন্তু এটা বিশ্বাস করতেই হবে আল্লাহ তাআলার প্রত্যেকটি কাজের মধ্যে আমাদের জন্য মঙ্গল লুকিয়ে আছে। আপনি খুব তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে উঠুন এই প্রত্যাশা করি। অনেক অনেক শুভকামনা রইলো।
প্রথমে আপনার আম্মুকে নিয়ে বাড়ি ফেরার গল্পটা বেশ ভালই লাগছিল, কিন্তু মাঝপথে এসে আপনার দুর্ঘটনা মনটা কে খুব আঘাত করলো, খুবই খারাপ লাগছে আপনার এক্সিডেন্টের কথা শুনে। আপনার এভাবে পড়ে যাওয়া পায়ের হাড় ভাঙ্গা এটা অকল্পনীয় ছিল। এমনটা শুরুতে আশা করেনি আর বিষয়টা আপনি আমাদেরকে যেভাবে সহজ করে লিখেছেন হয়তো বিষয়টা আর একটু ভিন্ন। কারণ যে ব্যথা পায় সে বুঝে অন্যরা হয়তো অনুভব করতে পারে। যাইহোক উপরওলার কাছে দোয়া করি যাতে আপনাকে তাড়াতাড়ি সুস্থতা দান করেন। সর্বদা আমাদের সাথে থাকুন এবং আমাদের সাথে এত সুন্দর করে আপনার আনন্দঘন মুহূর্তের সাথে দুর্ঘটনাটি ও শেয়ার করার জন্য আপনার প্রতি রইল ভালোবাসা অবিরাম ভাইয়া।
আসলেই অনেক দিন পর পরিবারের সকলকে দেখতে পাবেন আসলেই একটা আলাদা ভালোলাগা কাজ করে নিজের মনের ভেতর।যাক ফেরিঘাটে অপেক্ষা কততে হয়নি। এটা শুনে বেশ ভালো লাগলো। আসলেই খুব খারাপ লাগলো হঠাৎ মাটিতে পড়ে গেলেন। আসলে মানুষের কখন কি হয় বলা যায় না। আপনি সরাসরি ক্লিনিকের যেয়ে ভাল সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।আমরা যতই পরিকল্পনা করি না কেন কপালে যেটা আছে সেটাই হবে।হে আমাদের বর্তমান টাকে উপভোগ করতে হবে।আসলেই ভবিষ্যতের জন্য আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে
আমাদের উচিত ভবিষ্যতের চিন্তা ভুলে বর্তমানকে উপভোগ করা।
ভাইয়া আপনার পোস্টের টাইটেল দেখে বুঝেছিলাম কোন কিছুর ছন্দ পতন হয়েছে কিন্তু তারা যে এত বড় একটি ছন্দপতন আমি কখনো ভাবি নি। আমি ভাবি নি বাস থেকে যখন আপনি নামার সময় পায়ে আঘাত পেয়েছেন তা যে এত বড় আকার ধারণ করবে সেটাও। যাই হোক আপনার আঙ্গুলের হাড় ভেঙ্গে গেছে শুনে খুব খারাপ লাগলো। তবে দোয়া করছি আপনি খুব দ্রুত সুস্থ হবেন এবং আগের মত হেঁটে বেড়াবেন। নিয়মিত ওষুধ খাবেন ভাইয়া। আপনার সুস্থতা কামনা করছি।
ভাইয়া আপনার লেখাগুলো খুবই মনোযোগ দিয়ে পড়ছিলাম, আর পড়তে পড়তে শেষের দিকে এসে খুবই কষ্ট পেলাম। আপনার পায়ের একটি হাড় ভেঙ্গে গেছে এটি বড়ই দুঃখের কথা। আমাদের উপরওয়ালা আমাদের ভাগ্যে কী লিখে রেখেছে তা শুধু তিনিই জানেন। তা না হলে বাড়ির কাছাকাছি গিয়েও বাড়িতে পৌঁছাতে পারলেন না। এটাই বুঝি ভাগ্যের নির্মম পরিহাস। ভাইয়া আপনি একদম ঠিক কথাই বলেছেন, জীবন হচ্ছে অনির্দিষ্ট আজ আছে কাল নেই। তাই বেশি চিন্তাভাবনা না করে, শরীর ও মনকে ঠিক রেখে, ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত থাকাই উত্তম। ভাইয়া, আপনার অতি মূল্যবান কথাগুলোর জন্য আপনাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ জানাচ্ছি। আল্লাহর কাছে আশা করছি আপনি খুব দ্রুত সুস্থতা লাভ করুন। ভাল থাকবেন, সুস্থ থাকবেন এই প্রত্যাশা করি সব সময়।
ভাইয়া আপনার লিখা পড়ে অনেক খারাপ লাগলো। আসলে বিপদ কার কখন আসে সেটা কেউ বলতে পারেনা। তবে হঠাৎ করে একটা বড়ো ধরণের ব্যথা পেলে সেটা বুঝা যায়না। অনেক দোয়া রইলো আপনার জন্যে তাড়া তাড়ি সুস্থ হয়ে উঠুন।
দোয়া করবেন আপুু যেনো তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে উঠতে পারি।