নাটোরের ঐতিহাসিক দিঘাপতিয়া রাজবাড়ী

in #story8 years ago

দিঘাপতিয়া রাজপ্রাসাদটি প্রাচীন স্থাপত্যকলার দৃষ্টিনন্দন এক নির্দশন। প্রায় ৩শ’ বছরের প্রাচীন ইতিহাস আর ঐতিহ্যের সৌন্দর্যমনন্ডিত এই রাজবাড়ীটি শহরতলির দিঘাপতিয়া ইউনিয়নে আজো কালের সাক্ষি হয়ে উত্তরা গণভবন নাম নিয়ে দেশব্যাপী পরিচিতি লাভ করেছে। এই রাজবাড়ীতে এক সময়ে শোনা যেত নুপুরের ঝংকার আর সেই সঙ্গে মধুরকন্ঠের সুর মূর্ছনা। ছিল পাইক-পেয়াদার কর্মচাঞ্চল্য, রাজ-বাজন্যবর্গের গুরুগম্ভীর অবস্থান। ছিল বিত্ত-বৈভবের ঝলক। এখন আর সেসব নেই। শুধূই কালের সাক্ষি হয়ে সেই দিঘাপতিয়া রাজবাড়ীটি উত্তরা গণভবন নাম নিয়ে আজো স্মৃতি বহন করে চলেছে। দিঘাপতিয়া রাজবাড়ীর সামনে গেলে সবাইকে থমকে যেতে হয় দৃষ্টিনন্দন সুদৃশ্য বিশাল এক সিংহ দুয়ার বা ফটক দেখে। সেই টকের ওপরে রয়েছে এক প্রকান্ড ঘড়ি যা দু’দিক থেকেই দৃশ্যমান। সাত দিনে একবার চাবি দিলেও ঐ ঘড়িটি আজো সঠিকভাবে সময় নির্ণয় করে চলেছে। রাজবাড়ীতে প্রবেশের এটাই একমাত্র পথ। এছাড়া চারদিকে সুউচ্চ প্রাচীর এবং তারপর পরিখা। সারাটা রাজবাড়ী জুড়ে রয়েছে দেশী-বিদেশী নানান বিরল প্রজাতির বৃক্ষরাজি।

37095891_1039844509514068_7411379713253310464_n.jpg
প্রতিষ্ঠাঃ
দিঘাপতিয়া রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন রাজা দয়ারাম রায়। দিঘাপতিয়া রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা নাটোর রাজ্যের দেওয়ান দয়ারাম রায় ১৭০৬ রাজা রামজীবনের কাছ থেকে উপহার হিসেবে বাস করার জন্য যে জমি পেয়েছিলেন ১৭৩৪ সালে তার ওপরেই স্থাপত্যকলার অন্যতম নিদর্শন এই দিঘাপতিয়া রাজপ্রাসাদটি নির্মাণ করেন। তিনি নাটোরের মূল শহর থেকে প্রায় দু’মাইল উত্তরে নাটোর-বগুড়া মহাসড়কের পাশে দিঘাপতিয়া ইউনিয়নে এই রাজপ্রাসাদটি নির্মাণ করেন। রাজবংশের ষষ্ঠ রাজা প্রমদা নাথ রায়ের সময় ১৮৯৭ সালের ১০ জুন নাটোরের ডোমপাড়া মাঠে তিনদিনব্যাপী বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেসের এক অধিবেশন আয়োজন করেন। বিশ্বকবি রবিন্দ্রনাথ ঠাকুর সহ অনেক বরেণ্য ব্যক্তি এ অধিবেশনে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে যোগ দেন। অধিবেশনের শেষ দিন ১২ জুন প্রায় ১৮ মিনিটব্যাপী এক প্রলয়ংকরি ভূমিকম্পে রাজপ্রাসাদটি ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়। পরে ১৮৯৭ সালে ভূমিকম্পে এ প্রাসাদটি ধ্বংস প্রায় হয়ে গেলে রাজা প্রমদা নাথ রায় ১৮৯৭ সাল থেকে ১৯০৮ সাল পর্যন্ত ১১ বছর সময় ধরে বিদেশী বিশেষজ্ঞ, প্রকৌশলী ও চিত্রকর্ম শিল্পী আর দেশী মিস্ত্রিদের সহায়তায় সাড়ে ৪১ একর জমির উপর এই রাজবাড়ীটি পুনঃ নির্মাণ করেন। প্রাচীরে বাহিরের ফটকের সামনে রয়েছে আরো ২.৮৯ একর জমি। দিঘাপতিয়া রাজের রাজা প্রমদা নাথ রায় চারিদিকে সীমানা প্রাচীর দিয়ে পরিবেষ্টিত রাজ প্রাসাদের ভেতরে বিশেষ কারুকার্য খচিত মুল ভবন সহ ছোট-বড় মোট ১২টি ভবন নির্মাণ করেন। তিনি মোঘল ও প্রাশ্চত্য রীতির অনুসরণে কারুকার্যময় নান্দনিক ঐ প্রাসদটিকে এক বিরল রাজ ভবন হিসেবে গড়ে তোলেন। রাজপ্রসাদের দক্ষিণে তৈরি করা হয় একটি বাগান যা রাজার বাগান নামেই পরিচিত। বাগানে রয়েছে দেশী-বিদেশী শতাধিক বিরল প্রজাতির ফুল ও ফলের বৃক্ষরাজি। সেই বাগানে স্থাপন করা হয় বিদেশ থেকে আনা শ্বেতপাথরের মূর্তি আর কৃত্রিম ঝর্ণা।
রাজবংশের রাজাগণ ঃ
দিঘাপতিয়া রাজবংশের রাজারা ছিলেন আধুনিক মন মানসিকতার অধিকারী। ১৭১০ সাল থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত এই রাজবংশের রাজারা কৃতিত্বের সাথেই রাজ্য শাসন করেন। ইতিহাসের পাতায় এখনো যারা অমর হয়ে রয়েছেন তাদের মধ্যে উলে¬খযোগ্য দিঘাপতিয়া রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা রাজা দয়ারাম রায়, জগন্নাথ রায়, প্রাণনাথ রায়, প্রসন্ন নাথ রায়, প্রমথ নাথ রায়, প্রমদা নাথ রায়, প্রতিভা নাথ রায় এবং অষ্টম ও বংশের শেষ রাজা কুমার প্রভাত নাথ রায়। ১৯৬২ সালে তিনি দেশ ত্যাগ করে ভারতে চলে গিয়ে কলকাতায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন এবং ১৯৯৭ সালে ৮০ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন।

37104467_1039844476180738_135687650492284928_n.jpg
প্রথম রাজা দয়ারাম রায় ঃ
দিঘাপতিয়া রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা রাজা দয়ারাম রায় নাটোর রাজের রাজা রাম জীবনের দেওয়ান ছিলেন। তিলি বংশীয় দয়ারামের বাসস্থান ছিল সিংড়ার বিখ্যাত কলম গ্রামে। সপ্তদশ শতকের শেষদিকে পুঠিয়া দর্পণারায়নের অধীনে নাটোর রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা রাজ রাম জীবন যখন পুঠিয়া কাচারিতে মাসিক মাত্র ৮ আনা বেতনে জমার মহুরীর কাজ করতেন সে সময় তিনি দয়ারাম রায়কেও মাসিক মাত্র ৮ আনা বেতনে তাদের চাকর রেখেছিলেন। কথিত আছে রাজা রাম জীবন একদিন রাজ কাজে নৌকায় চলনবিল এলাকায় যান এবং কলম গ্রামে নৌকা ভেড়ান। এ সময় কলম নদীতে কতগুলো ছোট ছোট ছেলে-মেয়ে হই-চই করে বিলে স্নান করছিল। এ সময় যে দু’টি ছেলে নৌকার কাছে চলে আসে তাদেরই মধ্যে একজন দয়ারাম। তাকে অত্যন্ত বুদ্ধিমান মনে হওয়ায় রাজা রাম জীবন তাকে পুঠিয়ায় নিয়ে গিয়ে মাসিক ৮ আনা বেতনে চাকরী দেন। ১৭১৪ সালের শেষ দিকে ভূষনার জমিদার সীতারামের পতনের মূলে ছিল এই দয়ারাম রায়ের কুটকৌশল। সীতারামের পতনের পর নাটোর রাজের রাজা রাম জীবন নবাব মুর্শিদ কুলি খাঁর কাছ থেকে ভূষনা ও মাহ্মুদাবাদের জমিদারী লাভ করেন। সীতারামের সাথে মুর্শিদ কুলি খাঁর যুদ্ধে বাংলার তৎকালীন যে সব জমিদার আর রাজা সহযোগিতা করেছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন নাটোরের রাজা রাম জীবন। আর নাটোর রাজের পক্ষে এ যুদ্ধে গুরত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন দয়ারাম রায়। এ জন্যই নবাব মুর্শিদ কুলী খাঁ খুশি হয়ে দয়ারামকে দেন ‘রায়বায়ান’ উপাধি আর পুরুস্কার হিসেবে রাজা রাম জীবন দয়ারামকে দেন বগুড়া জেলার সারিয়াকান্দি এলাকার মানস নদীর তীরের নওখিলা পরগনা। দিঘাপতিয়া রাজের সবচেয়ে লাভজনক জমিদারি ছিল নওখিলা। নাটোর রাজ্যের যখন দুর্দিন সে সময় রাজা দয়ারাম রায় দিঘাপতিয়া রাজপ্রাসাদ গড়েন। রাজা দয়ারাম রায়ের পুত্র জগন্নাথ রায় ৫ কন্যা রেখে ১৭৬০ সালে ৮০ বছর বয়সে মারা যান।
যা আছে এই রাজবাড়িতে ঃ
রাজবাড়িতে মোট ১২টি ভবন রয়েছে আর এগুলো হচ্ছে প্রধান প্রাসাদ ভবন, কুমার প্যালেস, প্রধান কাচারীভবন, ৩টি কর্তারাণী বাড়ি, প্রধান ফটক রান্নাঘর, মটর গ্যারেজ, ড্রাইভার কোয়ার্টার, ষ্টাফ কোয়ার্টার, ট্রেজারি বিল্ডিং ও সেন্ট্রি বক্স। মূল ভবনসহ অন্যান্য ভবনের দরজা জানালা সব মূল্যবান কাঠের নির্মিত। প্যালেসের দক্ষিণে রয়েছে পাথর এবং মার্বেল পাথরে কারুকাজ করা ফুলের বাগান। বাগানটি ইটালি গার্ডেন নামে পরিচিত। এই বাগানে রয়েছে দেশী-বিদেশী নানা জাতের দুর্লভ সব ফুলের গাছ। বাগানে ইটালী থেকে আনা শ্বেত পাথরের ৪টি নারী ভাষ্কর্য এখনো পর্যটকদের হৃদয় ছুঁয়ে যায়। আকর্ষনীয় টাইপের ফোয়ারা এবং মাঝে মাঝে কারুকাজ করা লোহ্ ও কাঠ নির্মিত বেঞ্চ ও ডিম্বাকার সাইজের একটি মার্বেল পাথরের নির্মিত প¬াটফরম। এছাড়াও ভেতরে রয়েছে আগত অতিথিদের চলাফেরার জন্য ৪ ফুট চওড়া রাস্তা। সমগ্র বাগানে বিরল প্রজাতির ফুল আর নামি-দামী গাছের সমাহার।

37112076_1039844662847386_5269265491632848896_n.jpg
রাজ প্রাসাদ ঃ
দিঘাপতিয়া রাজবাড়ির মূল প্রাসাদটি একতলা। এতে রয়েছে প্রশস্ত একটি হল ঘর। বেশ উঁচু হলঘরের শীর্ষে রয়েছে একটি প্রকান্ড গুম্বুজ। এ গুম্বুজের নিচ দিয়ে হলঘরে পর্যাপ্ত আলো বাতাস প্রবেশ করার ব্যবস্থা রযেছে। হলঘরের মাঝে রাজার আমলে তৈরি বেশকিছু আসবাবপত্র রযেছে। এছাড়াও হলরুমে কারুকার্য খচিত একটি বড় সোফা রয়েছে যাতে একসঙ্গে ৪ জন চারমূখী হয়ে বসা যায় । এই সোফায় বসলে দেয়ালে আটকানো বড় আয়নায় প্রত্যেকে প্রত্যেককে দেখতে পেতেন। উত্তরা গণভবনে উচ্চ পর্যায়ের কোন সভা হলে এ রুমেই হয়। উপরে রয়েছে ঝাড়বাতি। হলরুমের পাশে রয়েছে আরেকটি বড় ঘর। পাশের রান্নাঘর থেকে এ ঘরে সরাসরি আসা যায়। নিরাপত্তার জন্য রান্নাঘরের করিডোরের দু’পাশে রাজার আমলের নেটিং করা রয়েছে। এই ভবনের এক পাশে একটি ঘরে রয়েছে রাজ সিংহাসন। তার পাশের ঘরটি রাজার শয়ন ঘর। এ ঘরে এখনো রাজার খাটটি শোভা পাচ্ছে। শোবার ঘরের বারান্দার চারদিকে তারের নেট দিয়ে ঘেরা ছিল। কুমার ভবনের পেছনের ভবন রাজার কোষাগার আর অস্ত্রাগার। দক্ষিণে ছিল রাণীমহল। আজ আর সেটা নেই। ১৯৬৭ সালে ভেঙ্গে ফেলা হয়েছে। রাণীমহলের সামনে একটি ফোয়ারা আজও স্মৃতিবহন করে চলেছে। পাশে ছিল দাসী ভবন। রাজার একটি চিড়িয়াখানাও ছিল। সেখানে হরিণ আর খরগোসসহ অনেক জীবজন্তুই ছিল। শুধুমাত্র খাঁচাগুলো আজো তার স্মৃতিবহন করছে। শোনা গেছে এসব জীবজন্তু পরে নাকি রাজশাহী চিড়িয়াখানাতে স্থানান্তর করা হয়েছিল। মূল ভবনের সামনে রয়েছে রাজা প্রসন্ন নাথ রায় বাহাদুরের আবক্ষ মূর্তি।
এর দু’পাশে রয়েছে ১৮৫৪ সালে ব্রিটিশদের তৈরি করা দু’টি কামান। মূল প্যালেসের মাঠের পূর্বে রয়েছে রাজার দোলমঞ্চ। পাশেই রয়েছে কুমার প্যালেস। এর সামনে বসানো চারচাকা বিশিষ্ট একটি কালো কামান আজো শোভা পাচ্ছে। মূল রাজপ্রাসাদের প্রবেশের পথে সিঁড়ির দু’পাশে দু’টি কালো কৃষ্ণ মূর্তি। এর পরেই রয়েছে ধাতব বর্ম। এটা পরেই নাকি রাজা যুদ্ধে যেতেন। এ কারণে এ পিতলের তৈরি এ বর্মটি আজো দর্শনার্থীদের বিশেষভাবে নজর কাড়ে। রাজ প্রাসাদের উত্তর পাশে ছিল রাজার বিদ্যুূৎ উৎপাদন কেন্দ্র। অস্টাদশ শতকে সেখান থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ রাজবাড়িতে বিদ্যুতের আলো ঝলমল করতো। বিদ্যুৎ উৎপাদনের সে সব সরঞ্জামাদি আজো সেকানে পরে রয়েছে। পুরো রাজপ্রাসাদে ছিল রাজার বিভিন্ন চিত্রকর্ম, ছবি আর বিদেশী ঘড়ি। আজ সে সব নেই। প্রাসাদের শ্বেতপাথরের মেঝে মোড়ানো থাকতো পার্সিয়ান গালিচায়। রাজা প্রমদা নাথ রায়ের প্রচন্ড রকম ঘড়িপ্রীতি ছিল। আর এ জন্য তিনি দেশ-বিদেশ থেকে অর্ডার দিয়ে ঘড়ি তৈরি করে আনতেন। এসব ঘড়ি মূল প্রসাদ ভবন ছাড়া বিভিন্ন ভবনে স্থাপন করতেন। এমন একটি ঘড়ি ছিল যাতে ১৫ মিনিট পরপর জলতরঙ্গ বাজতো। এছাড়া রাজবাড়ির মূল ফটকে রয়েছে একটি বড় ঘড়ি। এর দু’পাশে দু’টি ডায়াল রয়েছে। ঘড়িটি এখনো সঠিক সময় দিচ্ছে। এই ঘড়িটি ইটালির ফ্লোরেন্স থেকে আনা হয়েছিল। মূল ফটকের উপরের এই বিশালাকার ঘড়ির ঘন্টাধ্বনি আগে ১০ থেকে ১২ মাইল দূর থেকে শোনা যেত। এখন তা মাত্র দু’এক মাইল দূর থেকেই শোনা যায়। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় দিঘাপতিয়া রাজবাড়ি পাকবাহিনীর ক্যাম্প হওয়ায় ঘড়িসহ অন্যান্য মূলবান সম্পদ তারা নিয়ে যায়।
রাজাদের অবদান ঃ
১৯১৭ সাল থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত দিঘাপতিয়া রাজ্যের ৭ জন রাজা বংশানুক্রমিকভাবে রাজ্য শাসন ও উন্নয়নমূলক কাজ করে ইতিহাসে অমর হয়ে রয়েছেন। এ রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা রাজা দয়ারামের সময় এলাকায় ব্যাপক উন্নয়ন সাধিত হয়। চতুর্থ রাজা প্রসন্ননাথ রায়ের আমলে ১৮২৯ সালে নাটোর মহকুমা হয়। রাজশাহী থেকে নাটোর পর্যন্ত রাজপথকে দিঘাপতিয়া পর্যন্ত সম্প্রসারিত করেন এবং বগুড়াগামী রাস্তার সঙ্গে সংযুক্ত করেন। ১৯৫০ সালে এ রাস্তার সংস্কার বাবদ সরকারকে ৩৫ হাজার টাকা দান করেন। ১৮৫১ সালে স্থাপন করেন সর্ব প্রথম নাটোরের দাতব্য হাসপাতাল যা আজকের আধুনিক সদর হাসপাতালে রূপান্তরিত। সে সময় এখানে ইউরোপের ঔষধপত্র ও যন্ত্রপাতি বিণামূল্যে দেয়া হতো। ১৮৫৩ সালে রাজা প্রসন্ননাথ রায়ের মৃত্যুর পর তার দানের অর্থে রাজশাহী দাতব্য চিকিৎসালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তীতে এটিই হয় রাজশাহী সদর হাসপাতাল। ১৮৫২ সালে নাটোর রাজ নির্মিত করে প্রসন্ননাথ একাডেমী। এটিই হয় পরে নাটোরের সর্ব প্রথম হাইস্কুল। এছাড়া দিঘাপতিয়া হাইস্কুল, নাটোর ও রাজশাহী হাসপাতালের জন্য রাজা প্রসন্ননাথ রায় ১৮৫২ সালে এক লাখ টাকা দেন। দিঘাপতিয়া রাজবাড়িটি তিনি আধুনিক ভাবে গড়ে তোলেন। পঞ্চম রাজা প্রসন্ননাথ রায়ের আমলে রাজ্যের বিস্তৃতি লাভ করে। রাজশাহী হুগলী জেলার শেওরাফুলী এস্টেট, যশোরের মাহমুদপুর, নড়াইলের কিছু অংশ, নদীয়া ও বগুড়ার বেশকিছু অংশ জমিদারির অন্তর্ভৃক্তি হয়। এজন্য ১৮৭১ সালে তিনি রাজা বাহাদুর খেতাব লাভ করেন। তিনি রাজশাহী জেলার সর্বাপেক্ষা ধনী জমিদার ছিলেন। ১৮৬৮ সালে রাজশাহী বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। বগুড়ার নওখিলাতে একটি দাতব্য চিকিৎসালয় এবং একটি মাধ্যমিক চিকিৎসালয় স্থাপন করেন। ১৮৮২ সালে তা উচ্চ বিদ্যালয়ে পরিণত হয়। ১৮৭৭ সালে প্রসন্ননাথ রায় বঙ্গীয় আইন সভার সদস্য মনোনিত হন। তার চেষ্টায় অনেক আইন পাশ হয়। এই রাজবংশের ষষ্ঠ রাজা প্রমদা নাথ রায় ১৮৯৪ সালের ২৯ জানুয়ারী ক্ষমতা গ্রহণের পর বিভিন্ন জন কল্যাণকর কাজ করেন। এর মধ্যে রাজশাহী চিকিৎসালয়ে ৭ হাজার টাকা এবং লেডি ডাফুরীন ফান্ডে ২০ হাজার টাকা দান করেন। নওখিলাতে একটি মসজিদ নির্মাণ করেন। রাজশাহী-নাটোর সড়ক সংস্কারের জন্য সমস্ত ব্যয়ভার গ্রহণ করেন। ১৮৯৮ সালে ইংরেজ সরকারের কাছ থেকে রাজা উপাধি পান। রাজশাহী হাসপাতালে পিতামহীর নামে মহিলাদের জন্য ‘ভবসুন্দরী ওয়ার্ড’ তিনি নির্মাণ করেন। পিতার নামে রাজশাহী কলেজে পি এন হোস্টেল নির্মাণ করেন। রাজশাহী টাউন হল (বর্তমানে অলকা হল) প্রমদা নাথের কীর্তি। রাজশাহী এসাসিয়েশনের পরিচালিত লাইব্রেরীর যাবতীয় খরচ এই হলের উপার্জিত অর্থ দিয়েই চলতো। রাজা প্রমদা নাথ রায়ের আমলে ১৯০৯ সালে গভর্নর স্যার ল্যান্সল ট হেয়ার দিঘাপতিয়া রাজ প্রাসাদে আসেন। তার সময়েই ১৯১৯ সালের ২৮ নভেম্বর গভর্ণর লরেন্স লুমিয়ে ডাঙ্গাস এবং আর্ল অব রোনাগুসে জিসিআইই দিঘাপতিয়া সড়কের পার্শ্বে রাজবাড়ী সহ শহরে পানি সরবাহের জন্য নাটোর ওয়াটার ওয়ার্কসের উদ্বোধন করেন।

37101791_1039844606180725_5580567074889007104_n.jpg

সর্বশেষ অবস্থা ঃ
১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর দিঘাপতিয়া রাজা দেশত্যাগ করে ভারতে চলে যান। ১৯৫০ সালে জমিদারি অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন পাশ হওয়ার পর দিঘাপতিয়ার রাজ প্রাসাদটির রক্ষণা-বেক্ষণে বেশ সমস্যা দেখা দেয়। সমস্যা সমাধানে ১৯৬৬ সালে এ রাজভবন ইস্ট পাকিস্তান হাউজে পরিণত হয়। ১৯৬৭ সালের ২৪ জুলাই তৎকালীন গর্ভনর মোনায়েম খান এটিকে গর্ভনর হাউসে রূপান্তরিত করেন। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান এটিকে উত্তরা গণভবন হিসেবে ঘোষণা দেন। আর ১৯৮০ সালের ১৭ নভেম্বর জিয়াউর রহমান ঢাকার বাইরে প্রথম এই উত্তরা গণভবনেই মন্ত্রীসভার বৈঠক করে ইতিহাস সৃষ্টি করেন। পরে বেগম খালেদা জিয়া, এরশাদ ও শেখ হাসিনা সে ধারাবাহিকতা রক্ষা করে এই রাজবাড়িতে মন্ত্রীসভার বৈঠক করেছেন। দিঘাপতিয়া রাজবাড়ীটি একসময় বিস্তীর্ণ এলাকার ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু ছিল। দিঘাপতিয়া রাজবাড়ীর সেই সব রাজা-রাণীদের এখন আর কেউ নেই। আগের সেই গৌরবও আর নেই। গণভবন হলেও রাজ বাড়ীটি এখন শুধুই মুকুটহীন ভাবে রাষ্ট্রীয় অতিথিশালা হিসেবে পড়ে রয়েছে।

Sort:  

ভাই অনেক সুন্দর ভাবে উপস্থাপন করেছেন। এইভাইবে লিখতে পারলে অনেক ভাল করবেন। আরও ভাল লাগলো এই যে, নিজের জেলার একটা ঐতিহাসিক পটভূমি তুলে ধরেছেন। অনেক অনেক ধন্যবাদ......

amar basa chapai give your content imo and eny ph number

Coin Marketplace

STEEM 0.04
TRX 0.32
JST 0.088
BTC 59969.00
ETH 1573.85
USDT 1.00
SBD 0.42