খুশির খোঁজে পথ হারানো: প্রবাস জীবনের অন্যরকম এক গল্প
বন্ধুরা, কেমন আছেন সবাই? আশা করি যেখানেই থাকুন, ভালোই আছেন। জীবনটা আসলে কী বলুন তো? আমার মনে হয়, জীবনটা যেন এক নিরন্তর যাত্রা, যেখানে আমরা সবাই কিছু না কিছু খুঁজে বেড়াই। কেউ খোঁজে অর্থ, কেউ খোঁজে খ্যাতি, আর কেউ হয়তো খোঁজে কেবল একটুখানি শান্তি। কিন্তু এই খোঁজাখুঁজি করতে করতে অনেক সময় আমরা জীবনের আসল দিকগুলোই যেন ভুলে যাই। আজ আমি আপনাদের সাথে আমার মনের খুব গভীর একটি উপলব্ধি ভাগ করে নিতে এসেছি, যার মূল কথা হলো: খুশির খোঁজ করা বন্ধ করে দিয়েছি, কারণ খুশি খুঁজতে খুঁজতে নিজের বর্তমানকে হারিয়ে ফেলছি দিন দিন।
বর্তমানে আমি মালয়েশিয়াতে আছি। এই প্রবাস জীবনটা আমার জন্য একটি দীর্ঘ পথচলা। কত বছর কেটে গেল নিজের দেশ, পরিবার ও প্রিয়জনদের ছেড়ে দূরে। এই প্রবাস জীবনে আমি অনেক কিছুই দেখেছি এবং অনেক কিছু সহ্য করেছি। প্রতিটি দিনই ছিল একটি নতুন চ্যালেঞ্জ। কখনো কাজের চাপ, কখনো একাকীত্ব, আবার কখনো অচেনা পরিবেশে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করতে হয়েছে। শত প্রতিকূলতার মধ্যেও নিজের স্বপ্ন ও পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য আমি কখনো হার মানিনি। মনে হতো, আজ কষ্ট করছি, কাল হয়তো পরিবার ভালো থাকবে, তাদের মুখে হাসি ফুটবে আর সেই হাসিতেই আমি নিজের সব সুখ খুঁজে নেব।
আমার জীবনের সব সুখ, শান্তি, খুশি সবকিছুই যেন আমি পরিবারের জন্য বিলিয়ে দিয়েছি। আমি নিজের প্রয়োজনগুলোকে সবসময় পেছনে রেখেছি। নতুন পোশাক কিনতে গেলে ভাবতাম, এই টাকায় যদি দেশের ভাই বোনদের জন্য কিছু পাঠাতে পারতাম! ভালো খাবার খেতে গেলে মনে হতো, আমার পরিবারের সদস্যরা কি এমন ভালো খাবার খাচ্ছে? শরীর খারাপ হলেও কাজ থামাইনি, কারণ জানতাম, আমার আয় বন্ধ হলে পরিবারের চাকাও থেমে যাবে। মনে মনে একটা ছবি আঁকতাম, যেখানে আমার পাঠানো টাকায় তাদের মুখে হাসি ফোটে, তারা নিশ্চিন্তে জীবন কাটায়। এই ভাবনাগুলোই আমার বেঁচে থাকার একমাত্র শক্তি ছিল।
কিন্তু এত আত্মত্যাগ ও বিলিয়ে দেওয়ার পরেও যদি কখনো নিজের পরিবার থেকেই এমন কথা শুনতে হয় কিছুই তো করোনি আমাদের জন্য! তখন সত্যি বলতে কী, বুকের ভেতরটা যেন দুমড়ে-মুচড়ে যায়। দুঃখ রাখার মতো আর কোনো জায়গা থাকে না। চোখে জল আসে না, কেবল ভেতরে ভেতরে গভীর শূন্যতা তৈরি হয়। মনে হয়, তাহলে এতদিন ধরে আমি কীসের জন্য লড়াই করে গেলাম? কেন জীবনটাকে এভাবে তিলে তিলে শেষ করে দিলাম?
এই অনুভূতিটা আসলে কতটা যন্ত্রণাদায়ক, তা হয়তো কেবল তারাই বুঝবে যারা এমন পরিস্থিতিতে পড়েছেন। যখন নিজের রক্ত-ঘাম দিয়ে অর্জিত অর্থ আর পরিশ্রমকে কেউ 'কিছুই না' বলে উড়িয়ে দেন, তখন মনে হয়, এই জীবনের কি কোনো মূল্য নেই? এই কথাগুলো শুধু কষ্ট দেয় না, বরং ধীরে ধীরে মনের ভেতরের বিশ্বাস আর ভরসাকে নষ্ট করে দেয়।
আমরা অনেকেই কিন্তু এমন করি। আমরা ভাবি, 'অমুক' কাজটা করতে পারলেই খুশি হব, 'অমুক' জিনিসটা পেলেই শান্তি পাব। কিন্তু সেই 'অমুক' জিনিসটার পেছনে ছুটতে ছুটতে আমরা হয়তো জীবনের ছোট ছোট আনন্দগুলো উপভোগ করতে ভুলে যাই। সকালের সূর্য দেখা, এক কাপ চায়ে চুমুক দেওয়া, একজন বন্ধুর সাথে একটু কথা বলা এই যে সাধারণ মুহূর্তগুলো, এগুলোই তো আসলে আসল খুশি। কিন্তু আমরা সেগুলো খেয়ালই করি না, কারণ আমাদের চোখ থাকে ভবিষ্যতের কোনো এক দূরবর্তী 'খুশি'র দিকে।
এই প্রবাস জীবনে আমি দেখেছি, অনেক মানুষ শুধু ভবিষ্যতের আশায় আজকের দিন নষ্ট করে। তারা ভাবে, দেশে ফিরে গেলেই সব ঠিক হয়ে যাবে, পরিবার খুশি হবে, আর তখনই তাদের জীবনে শান্তি আসবে। কিন্তু সেই 'তখন কি সত্যিই আসে? নাকি ততদিনে আমরা এতটাই ক্লান্ত হয়ে যাই যে, খুশিকে চিনতেই পারি না?
আমি এখন চেষ্টা করি দিনের শেষে নিজের জন্য একটু সময় রাখতে। হয়তো নিজের পছন্দের কিছু করা অথবা একটু বিশ্রাম নেওয়া। হয়তো এই ছোট ছোট পরিবর্তনগুলো আমাকে আরও বেশি স্বস্তি দেবে। কারণ আমি বুঝতে পারছি, নিজের বর্তমানকে অবহেলা করে ভবিষ্যতের কাল্পনিক সুখের পেছনে দৌড়ানোটা আসলে জীবনের অপচয়।
আশা করি আমার এই ভাবনাগুলো আপনাদের ভালো লেগেছে। আমার এই উপলব্ধি আপনাদের সাথে ভাগ করে নিতে পেরে আমি সত্যিই আনন্দিত।সঅথবাই ভালো থাকবেন, সুস্থ থাকবেন এবং আজকের দিনে বাঁচতে শিখবেন। ধন্যবাদ সবাইকে।
Upvoted! Thank you for supporting witness @jswit.