আধ্যাত্মিক প্রশ্নোত্তর
১.
শিষ্যঃ প্রভু আমার আগমন কোথা হতে?
গুরুঃ তোমার আগমন আমা হতে।
২.
শিষ্যঃ তুমি তখন কোথায় কিরূপে ছিলে?
গুরুঃ আমি তখন গঞ্জ্জাতে নিরাকাররূপে অচৈতন্য অবস্থায় ছিলাম।
৩.
শিষ্যঃ প্রভু! নিরাকারের কি আবার রূপ হয়?
গুরুঃ না, তাই তো আমি আহাদী স্রষ্টা আহাম্মদীরূপ ধারন করলাম।
৪.
শিষ্যঃ আহাম্মদী স্রষ্টার ত আকার আছে, তবে তাকে ধরা যায় না, ছোঁয়াও যায় না। তবে তোমার রূপের আসল প্রকাশ কি?
গুরুঃ সৃষ্টিই আমার আসল প্রকাশ। সৃষ্টিতেই আমি আমি মুহাম্মদরূপে বিরাজমান। আর তুমিই আমার মুহাম্মদী পূর্ণ রূপ।
৫.
শিষ্যঃ প্রভু! আমি গঞ্জ্জাত হতে এই মোহাম্মদী দেহ জগতে এলাম কি করে?
গুরুঃ নয় বাতন পরিভ্রমণ করে।
৬.
শিষ্যঃ নয় বাতন কি?
চলবে.......
(পর্ব-০২)
৬.
শিষ্যঃ নয় বাতন কি?
গুরুঃ জন্ম নেওয়ার তথা গঞ্জ্জাত হতে এই ধরাধামে আগমন করার নয়টি ষ্টেশন।
৭.
শিষ্যঃ 'নয় বাতন' গুলো কি কি দয়াল?
গুরুঃ গঞ্জে মুখফি, জামাদাত, নাবাদাত, হায়ানাত, নুতফা, আলক্বা, দায়রা, জনীন, তেফেলি।
৮.
শিষ্যঃ নাম জেনে কি আর সাধ মিটে প্রভু!!! করুনা করে এর ভেদ জানাও আমায়।
গুরুঃ তবে শুনো হে পার্থ।
১.গঞ্জে মুখফি (গঞ্জে জাত বা আলমে আরওয়া বা রূহের জগত)ঃ সমস্ত প্রাণীর আত্মা এখানেই ছিল, আবার এখানেই চলে যাবে মৃত্যুর পর।
২.জামাদাত (অর্থাৎ ধাতু বা জড়)ঃ এটা দ্বিতীয় স্ট্যাশন। গঞ্জে মুখফি হতে কুশাকারে আত্মা পৃথিবীতে নেমে আসে (রূপক ব্যাখ্যা)।
৩.নাবাদাত (অর্থাৎ বৃক্ষ)ঃ কুয়াশাকারে নেমে এসে আত্মা কোনো বৃক্ষের উপর পতিত হয়।
৪.হায়ানাত (অর্থাৎ পশু)ঃ এটা চতুর্থ স্ট্যাশন। সেই বৃক্ষ যে পুরুষ প্রানী ভক্ষন করে, আত্মা তাঁর মস্তকে চলে যায় এবং সুপ্ত হয়ে থাকে।
৫. নোৎফা (অর্থাৎ মণি বা বীর্য)ঃ আত্মা সুপ্ত হয়ে মস্তকে বীর্যের মধ্যে অবস্থান করে। যদি বৃক্ষ বা বৃক্ষের ফল মানুষ খায় তবে আত্মা মানুষের মস্তকে, আর যদি অন্য কোনো প্রাণীতে ভক্ষ করে, তবে আত্মা সেই প্রানীর মস্তকে চলে যায় (বাবার মস্তকে থাকে)।
৬.আলক্বা (অর্থাৎ জমাট বাধা রক্ত বা ঝুলে থাকা)ঃ তারপর বীর্য বাবার মস্তক থেকে মাতৃ রেহেম বা গর্ভাশয়ে নেমে এসে জমাট বাধা রক্তের গঠন ধারন করে। সূরা আলাকে ২য়য় আয়াতে এই বিষয়ে উল্লেখ করেছেন।
৭. জনিন (অপরিনত শেকেল)ঃ মানে অপরিনত দেহ। অর্থাৎ তখন দেহের আকার ধারন করে ঠিকই, কিন্তু পূর্ন হয় না।
৮.দায়রা (অর্থাৎ পূর্ন শেকেল)ঃ সবশেষে দেহ পূর্নতা লাভ করে একটি পূর্ন আকৃতি ধারন করে ২৮০ দিনে। মানে ৯ মাস দশ দিনে। অনেকেই দশ মাস দশ দিনের কথা বলে থাকে, সেটা ভুল তথ্য।
৯. তেফেলি ( এটার অর্থ শিশু। এখানে অর্থ হবে তেলেফি কামেল বা পূর্ন বিকাশ)ঃ অবশেষে প্রানী শিশু আকারে জন্ম গ্রহন করে পৃথিবীতে আসে।
৯.
শিষ্যঃ আমরা কি আবার গঞ্জে মখফিতে ফিরে যাবো?
গুরুঃ হুম, এই দেহের অবসান ঘটলে আবারও আত্মারূপে সেখানেই ফিরে যাবে সবাই। আবার এভাবেই ফিরে আসবে।
১০.
শিষ্যঃ প্রভু! অরুজ-নজুল বা ভাংগা-গড়া কি তবে ইহাই??
গুরুঃ হ্যা। এই আসা যাওয়াকেই অরূজ (উর্দ্ধাগমন) ও নুজুল (অবতারণ) বা ভাংগা-গড়া বলে।
১১.
শিষ্যঃ দয়াল তবে কি এই ভাংগা-গড়ার অবসান হবে না?
গুরুঃ ভাংগা-গড়ার অবসানের জন্যেই ত জীবের সকল সাধনা। যখন সকল বাসনা ছেড়ে দিয়ে সাধনা বলে নির্বাণ লাভ করতে পারবে জীব, তখনই তার মুক্তি মিলবে।
১২.
শিষ্যঃ আমাদের এই বার বার আসা যাওয়ার কারন কি?
চলবে..........আধ্যাত্মিক প্রশ্নোত্তর (পর্ব-০৩)
১২.
শিষ্যঃ আমাদের এই বার বার আসা যাওয়ার কারন কি?
গুরুঃ দুনিয়ার প্রতি আমাদের মনের বাসনাই আমাদের এই আসা যাওয়ার কারন।
১৩.
শিষ্যঃ যদি দুনিয়ার বাসনা বিসর্জন দেই তোমার চরনে, তাহলে বিনিময়ে তুমি আমাকে কি দিবে?
গুরুঃ আমি ব্রহ্মানন্দ দিবো।
১৪.
শিষ্যঃ প্রভু! ব্রহ্মানন্দ কি?
গুরুঃ ব্রহ্মানন্দ এমন এক দেশের এমন এক আনন্দ, যার এক বিন্দু পরিমান আনন্দের কাছে এই জাগতিক দুনিয়ার সমস্ত আনন্দ হার মানতে বাধ্য। ঐ আনন্দ বর্ণনাতীত, ভাষায় প্রকাশ সম্ভব না। ঐ আনন্দ নিয়ে বুঝা যায় উপলব্ধির মাধ্যমে, কিন্তু কাউকে বুঝানো যায় না।
১৫.
শিষ্যঃ প্রভু ঐ ব্রহ্মানন্দ পাওয়ার কি কোনো বিকল্প পথ নেই?
গুরুঃ না। কারন এই দুনিয়া আর ঐ দুনিয়া পয়সার এপিঠ-ওপিঠ এর মত। যার একটা চাইলে অন্যটাকে বিসর্জন দিতে হবেই তোমাকে।
১৬.
শিষ্যঃ প্রভু! ব্রহ্মানন্দ কি এই জনমেই লাভ করতে পারব আমি?
গুরুঃ হয়তো, আবার নাও পেতে পারো একজনমে, কেটে যেতে পারে বহু যোনী। এইটা সম্পূর্ণই নির্ভর করে তোমার কর্ম নিষ্ঠার উপর। কামনা বাসনাহীন তথা কামহীন প্রেম কর্মই তোমাকে ব্রহ্মানন্দ দিতে পারে। তুমি যতটুকু আগাবে এই পথে, ততটাই সেই ব্রহ্মানন্দের ঘ্রাণ তোমার কাছে গাঢ় হতে থাকবে।
১৭.
শিষ্যঃ প্রভু! কিভাবে বুঝবো কোনটা কাম আর কোনটা প্রেম? কেননা ব্রহ্মানন্দ লাভ করতে চাওয়াও ত একটা কামনা বা বাসনা। ঈশ্বরকে লাভ করার ইচ্ছাও ত কামনা। কাম ছাড়া কি প্রেম সম্ভব!!!
গুরুঃ অতি উত্তম প্রশ্ন করেছো পার্থ। কামনা আর বাসনার অপর নামই হলো কাম, আর প্রেম হলো কর্মের ফল কামনা না করে শুধুই প্রেমাসম্পদকে নিজের করে নেওয়ার কর্ম করে যাওয়ার নাম।
কাম হলো জাগিতিক কোনো বস্তু লাভের ইচ্ছা ও সেই বস্তু লাভের জন্য কর্ম করা, হোক সেটা গীতাপাঠ বা কুরআন পাঠ, বা নাম কীর্তন কিংবা জিকির। যদি তুমি এইসব এই জন্য করো যে, বিনিময়ে মানুষ তোমাকে ধার্মিক ভেবে সম্মান করবে।
আর প্রেম তথা নিষ্কাম কর্ম হল যা শুধু মাত্র ঈশ্বর লাভ করার বাসনা ও সেই লক্ষে সকল কর্ম করে যাওয়া, হোক সেটা কারো প্রতি ঘৃণা কিংবা আঘাত করা। তোমার বন্ধুত্ব ও শত্রুতাও হবে শুধুই পরমকে পাওয়ার জন। তোমার আহার-নিদ্রা সব কিছুই তখন শুধু হবে তাঁর জন্য। লোক নিন্দার ভয় কিংবা সুনামে তোমার মনের কোনো পরিবর্তন আসবে না।
১৮.
শিষ্যঃ কাম থাকতে কি প্রেম হয়?
গুরুঃ কাম হতেই প্রেমের উৎপত্তি ঘটে এবং প্রেম হয়ে গেল আর কাম থাকে না। তখন কামকেই প্রেমে রূপান্তর করতে হয়।
১৯.
শিষ্যঃ কাম বলতে ত শুনিছি যৌনতা। কিন্তু তুমি ত বাসনাকে কাম বললে, তবে যৌনতার সাথে কি কামের সম্পর্ক নেই??
গুরুঃ হে পার্থ! বাসনার মধ্যে যৌনতাও আছে, কিন্তু যৌনতায় সকল বাসনা যুক্ত নেই। সুতরাং যারা যৌনতাকে কাম ভাবে, তাদের জানার সীমা ক্ষুদ্র। মূলত নিষ্কাম প্রেমে যৌনতায়ও কামনা থাকে না।
২০.
শিষ্যঃ যৌনতার মাঝে কি সাধনা আছে প্রভু?
চলবে#আধ্যাত্মিক প্রশ্নোত্তর (পর্ব-০৪)
২০.
শিষ্যঃ যৌনতার মাঝে কি সাধনা আছে প্রভু?
গুরুঃ না। যৌনতায় মাঝে সাধনা নেই, তবে সাধনায় যৌনতা চলেও আসতে পারে।
২১.
শিষ্যঃ প্রভু! ঠিক বুঝে উঠতে পারি নি। সাধনার মধ্যে কিভাবে যৌনতা চলে আসতে পারে?
গুরুঃ ধরো তুমি তোমার স্ত্রীকে খুবই ভালবাসো, কিন্তু এই প্রেমে বহিঃপ্রকাশের জন্য যৌনতা আবশ্যক হয়ে দাড়ায়। প্রেমই ত প্রকৃত সাধনা। প্রেমের প্রকাশ ঘটাতে যৌনতা কখনো কখনো চলে আসতে পারে। কিন্তু সেটা শুধু প্রেমের ক্ষেত্রে স্থান কাল পাত্র বিবেচনায়। কিন্তু যৌনতায় কোনো সাধনা নেই।
২২.
শিষ্যঃ শুনেছি রতি সাধনা নামে এক সাধনা আছে, সেখানে নাকি যৌনতাই মূখ্য বিষয়। কিন্তু আপনার কথার সাথে সেগুলোর মিল পাচ্ছি না প্রভু।
গুরুঃ দেহের সকল কামনাকে নিজের অধীন করে নেওয়ার ক্ষমতা অর্জনই রতি সাধনার মূল উদ্দেশ্য। যৌন ক্ষমতা বৃদ্ধি করে নারী ভোগের জন্য রতি সাধনা নয়। রতি সাধনের উদ্দেশ্য কামশক্তিকে নিয়ন্ত্রনে রাখা। মনকে কাম হতে বিরত রাখার সক্ষমতা অর্জন করা।
২৩.
শিষ্যঃ কিন্তু প্রভু অনেকেই ত রতি সাধনার নামে যৌন কামনায় মত্ত হয়ে কামলীলায় নিজেকে ডুবিয়ে রাখছে।
গুরুঃ ফুল থেকে মৌমাছি আহোরন করে মধু আর মাঁকড়শা আহোরন করে বিষ। অনুরূমভাবে দুষ্টুরা সাধনার নামে করে নোংরামী, আর সাধকরা করে আত্মনিয়ন্ত্রণ।
২৪.
শিষ্যঃ রতি সাধনা নাকি সব সাধনার উর্দ্ধে?
গুরুঃ ভুল। রতি সাধনা হল দম সাধনার একটা অংশ। মনকে নিয়ন্ত্রণ এর জন্যেই এই সাধনা করা হয়, আর মন নিয়ন্ত্রণ হলে দেহের সবকিছুই নিয়ন্ত্রনে আনতে সহজ হয়ে উঠে সাধকের জন্য।
২৫.
শিষ্যঃ প্রভু! গুলিয়ে যাচ্ছি কিছুটা। আমার ক্ষুদ্র ভান্ডে এতো সূক্ষ্ম কথা ধারণ করতে পারছি না। কৃপা করে আমাকে রতি সাধনা সম্পর্কে বিস্তারিত বলুন।
গুরুঃ
'রতি' শব্দের আক্ষরিক অর্থ হল মৈথুন, যৌনসঙ্গম, যৌনকর্ম, স্ত্রী সহবাস ইত্যাদি। সেই হিসেবে 'রতি সাধন' এর অর্থ ধরা যায় যৌনসঙ্গম বা স্ত্রী সহবাস সংক্রান্ত সাধনা।
রতি সাধন বলতে বুঝায়, যে সাধনার দ্বারা বীর্যকে নিজের নিয়ন্ত্রনে এনে নিজের যৌন শক্তিকে বৃদ্ধি, দীর্ঘক্ষণ স্ত্রীসঙ্গম, জন্মনিয়ন্ত্রণ, আশানুরূপ সন্তান লাভ ও বীর্যকে সংরক্ষনের মাধ্যমে মনকে নিজের বশে এনে কামভাব দমন করে আধ্যাত্মিক উন্নতি অর্জন ও দেহকে সবল বা সুঠাম অর্থাৎ চাঞ্চল্য ও শক্তিধর করে রাখার দেহ সাধনা। এটা 'দম সাধনা' এর অন্যতম একটি অংশ।
শ্বাস-প্রশ্বাস ও তত্ত্ব নির্নয়ের মাধ্যমে রতি সাধকগন যৌন কর্ম করে থাকেন। কোন নাসিকায় শ্বাস প্রবাহিত হওয়ার সময় সঙ্গম করলে অধিক সময় সঙ্গম করা যায়, কিভাবে বীর্যকে স্তম্ভন করে রাখা যায়, কিভাবে নিন্মগামী চন্দ্রকে (বীর্য পাত হওয়ার উপক্রম হলে) আবার উর্ধ্বমুখী করা যায় এবং ব্রহ্ম দ্বারে দমকে আটকে রেখে বীর্যকেই রুদ্ধ করে রাখার পদ্ধতি সম্পর্কে জানা ও দম সাধনার মাধ্যমে এইসব ক্ষমতা অর্জন করাই হল মূলত রতি সাধন কর্ম।
রতি সাধনার আরেকটি বিষয় হল দেহের মাঝে ছয়টা চক্র আছে, যাকে ষটচক্র বলা হয়। এই ষটচক্রভেদ জেনে ও কর্ম করে দেহকে অটল রাখাও রতি সাধনের অন্যতম অংশ।
২৬.
শিষ্যঃ তবে কি রতি সাধনা আত্মিক কোনো উন্নতি করে না?
গুরুঃ করবে না কেন! আত্মা ত উন্নতি করে এই দেহের মাধ্যমেই। যদি এই দেহ ঠিক না থাকে, তাহলে সে কিভাবে আত্মিক উন্নতি সাধন করবে??? তাই আত্মিক উন্নতির জন্যে রতি সাধনার গুরুত্ব অবশ্যই রয়েছে। কারন দেহ রতি ঠিক থাকলেই আত্মিক সাধনায় মন লাগে।
২৭.
শিষ্যঃ দেহ রক্ষা এবং মন বশে আনতে কি তবে রতি সাধনার গুরুত্বই বেশি?
শিষ্যঃ 'রতি সাধনা' করার ফলে দেহের বীর্যের ঘাটতি কমে যায়, ফলে মনের চঞ্চলতা হ্রাস পায়। রতি সাধনার জন্য দম সাধনা তথা পাছ আনফাসের সাধনা করতে হয়। তাই ইহা দেহ ও মন ভাল রাখতে সহযোগী। তবে মনকে বশে রাখার জন্য দম সাধনাই প্রধান সাধনা।
২৮.
শিষ্যঃ দমের সাথে মনের সম্পর্ক কি?
গুরুঃ
দম তথা শ্বাস প্রশ্বাসকে নিয়ন্ত্রন করতে পারলেই বীর্য ও মন নিয়ন্ত্রনে এসে যায়। আর মনের সাথে বীর্যের অনেক সম্পর্ক বিদ্যমান। তাই যার বীর্য যত ঘন তার মন তত বেশি স্থির। সাধনার ক্ষেত্রে মনকে নিয়ন্ত্রনে না আনতে পারলে বা স্থীর করতে না পারলে কেউ কোনো সাধনায় সিদ্ধি লাভ করতে পারবে না। তাই বিভিন্ন পদ্ধতিতে দেহ সাধকগন দমের সাধন করে থাকেন। আর বীর্য ঘন হলে যৌন ক্ষমতা বৃদ্ধি পায় ও মন আসতে আসতে নিজের বশে চলে আসতে থাকে বা স্থীর হয়ে যায়। আর এই জন্যই রতি সাধকগন এই সাধনা করে থাকেন। যার ফলে তাদের রতি শক্তি বৃদ্ধি পায় এবং সাধনার এক পর্যায় বীর্যপাত ঘটানো বা না ঘটানো বা সন্তান জন্ম দেওয়া না দেওয়া তাদের ইচ্ছাধীন বা আয়ত্বাধীন হয়ে যায়। তবে ইহা সহজ কথা নয়। অনেক কঠিন সাধনা।
২৯.
শিষ্যঃ চরণে সহস্র প্রনাম প্রভু! কৃপা করে জানাবে কি যে ভজন আর সাধনা কি? দুইটা কি একই বস্তু? নাকি ভিন্নতা আছে?
গুরুঃ সূক্ষ্ম পার্থক্য আছে ভজন ও সাধনার মাঝে। ভজন পায় গুরু আর সাধন পায় দয়াল (আহাম্মদী সত্ত্বা)। মূলত দুইটাই গুরু এবং দয়াল পায়। কিন্তু বাহ্যিক কিছু সূক্ষ্ম পার্থক্য বিদ্যমান।
৩০.
শিষ্যঃ প্রভু! তাহলে ভজন ও সাধনের মাঝে পার্থক্য কি? কৃপা করে আমাকে জানান।
চলবে....
#আধ্যাত্মিক প্রশ্নোত্তর (পর্ব-০৬)
৩০.
শিষ্যঃ প্রভু! তাহলে ভজন ও সাধনের মাঝে পার্থক্য কি? কৃপা করে আমাকে জানান।
গুরুঃ ভজন ও সাধন শব্দ দুটির শাব্দিক অর্থ এক রকম হলেও এই দুইটির মধ্যে অনেক পার্থক্য বিদ্যমান। ভজন মানে হল এমন দাসত্ব, যার দ্বারা প্রভু বাহ্যিক দৃষ্টিতে কোনো উপকার লাভ করে থাকে দাস হতে। আর সাধন তথা সাধনা হল এমন কর্ম যার ফলাফল শুধু সাধক একাই ভোগ করেন, এতে যার সাধনা করা হয় তার কোনো উপকার করা হয় না বাহ্যিক দৃষ্টিতে। অর্থাৎ ভজন করতে হয় শরীরের সামর্থ শক্তি প্রয়োগ করে, যেমনঃ গুরুর সেবা যত্ন করা, গুরুর বাড়ির গোলামী করা, কোনো ব্যক্তির সেবা করা বা সাহায্য করা। আর সাধনার উদারহরন হল, গুরু ধ্যান করা বা মোরাকাবা মোশাহেদা করা, জ্বিকির করা ইত্যাদি যে কাজ গুলোতে শারিরীক পরিশ্রম হয় না।
প্রথমে ভজনা করতে হয়, পরে সাধনা। কারন গুরুর সেবা করে তাকে সন্তুষ্ট করলেই সে এমন কোনো কর্ম শিক্ষা দেয়, যার ফলে ভক্ত সেটা ঘরে বসে বা কোনো নির্দিষ্ট স্থানে বা সব সময় সেই কর্ম করতে পারে প্রভু লাভ করার জন্য। অধিকাংশ সাধকই তাদের গানে সাধনার আগে ভজনার কথা উল্লেখ করেছেন। যেমন লালন সাঁইজি বলেছেন "নাই আমার ভজন-সাধন/ চিরদিন কুপথে গমন।"
ভজনে সন্তুষ্ট হলেই গুরু সাধনা পদ্ধতি প্রদান করেন ভক্তকে। যে যত বেশি ভজন করেন, গুরু তার প্রতি ততবেশি সন্তুষ্ট হন এবং উচ্চতর সাধনা ও জ্ঞান দান করেন । বিভিন্ন ওলীদের জীবনেও দেখা যায় যে পীরের দরবারে বছর বছর গোলামীর পর গুরুর সন্তুষ্টি অর্জন করে গুরুর কাছ থেকে সাধন কর্ম পদ্ধতি শিক্ষা লাভ করার পর বনে জঙ্গলে গিয়ে একাকী সাধনা করে ওলীয়তী প্রাপ্ত হয়েছেন।
৩১.
শিষ্যঃ তবে কি ভক্ত সাধনা পাওয়ার আশায় গুরুর ভজনা করবে?
গুরুঃ না! সকল বাসনা ত্যাগ করে একনিষ্ঠভাবে গুরুর দাসত্ব তথা ভজনা করতে হবে। আর এটাই প্রথম অবস্থায় সাধনা ভাবতে হবে মনে প্রাণে।
৩২.
শিষ্যঃ ভজন আর সাধনার স্তরগত পার্থক্য কি?
গুরুঃ সাধনার স্তর সাধারণত ৪টি। প্রথম স্তর পারি দিতে হয় ভজন দ্বারা, আর ২য় স্তরে ভজনের সাথে সাধন মিশ্রিত হয়। তৃতীয় স্তরে শুধুই সাধনা করতে হয় এবং চতুর্থ স্তরে সে পূর্ণতা লাভ করে।
৩৩.
শিষ্যঃ সাধনার এই স্তরগুলোর নাম কি প্রভু?
গুরুঃ ১.ফানাফিশ শায়েখ।, ২. ফানাফির রাসূল।, ৩. ফানা ফিল্লাহ্।, ৪.বাকা বিল্লাহ্।
আর সনাতন শাস্ত্রে এইটা ১.স্থূল, ২.প্রাবর্ত, ৩.সাধক, ৪.সিদ্ধ (সিদ্ধি) বলা হয়ে থাকে।
৩৪.
শিষ্যঃ প্রভু! কৃপা করে এই স্তর সম্পর্কে বিস্তারিত জানিয়ে আমার মনের দ্বন্দ্ব নিরাশ করুন।
চলবে.....
#আধ্যাত্মিক প্রশ্নোত্তর (পর্ব-০৭)
৩৩.
শিষ্যঃ সাধনার এই স্তরগুলোর নাম কি প্রভু?
গুরুঃ ১.ফানাফিশ শায়েখ।, ২. ফানাফির রাসূল।, ৩. ফানা ফিল্লাহ্।, ৪.বাকা বিল্লাহ্।
আর সনাতন শাস্ত্রে এইটা ১.স্থূল, ২.প্রাবর্ত্ত, ৩.সাধক, ৪.সিদ্ধ (সিদ্ধি) বলা হয়ে থাকে।
৩৪.
শিষ্যঃ প্রভু! কৃপা করে এই স্তর সম্পর্কে বিস্তারিত জানিয়ে আমার মনের দ্বন্দ্ব নিরাশ করুন।
গুরুঃ তাহলে শুনো হে পার্থ!
*ফানা ফিশ শাইখঃ 'ফানা ফিশ শাইখ' এর অর্থ হল পীরের মাঝে ফানা বা বিলন হওয়া। অর্থাৎ পীরের কাছে পূর্ণ আত্মসমর্পণ করা। পীরের ইচ্ছায় ফানা, পীরের হুকুমে ফানা, পীরের জন্য ফানা, পীরের মাঝে ফানা হওয়াকেই ফানা ফিশ শাইখ বলে। অর্থাৎ নিজের ইচ্ছাকে কুরবানী দেওয়া পীরের জন্য। এটাই সাধনার প্রথম স্তর।
*ফানা ফির রাসূলঃ ইহার অর্থা রাসূলের মাঝে ফানা হওয়া। যখন ফানা ফিশ শাইখ এর স্তর পারি দিবে, তখন আপন পীরের ছুরতে রাসূলের নূরানী মূর্তি দেখতে পাবে। যে চেহারা এতো সুন্দর ও নূরময় হবে যে, মনে হবে লক্ষ কোটি নক্ষত্রের আলো তার পীরের মাঝ হতে বিচ্ছুরিত করতেছে সমস্ত দুনিয়াকে আলোকিত করে দিয়ে। ঐ নূরের আলোতে তখন ভক্তের দেহের সমস্ত মোকাম ও মঞ্জিল রাসূলের নূরে নূরাম্বীত হয়ে যাবে। এই স্তরে আসার পরই সাধক ওলীর দরজায় পৌঁছে যাবে। তখন সে ভাবে বিভুর হয়ে মুখ দিয়ে যদি কিছু বলে, তবে তা হয়ে যাবে, কিন্তু সর্ববস্থায় হবে না। তবে তখন থেকেই তাকে ওলী হিসেবে গণ্য করা হয়।
*ফানা ফিল্লাহ্ঃ ইহার অর্থ আল্লাহর মাঝে বিলিন বা ফানা হওয়া, আল্লাহতে মিশে যাওয়া। ফানা ফির রাসূল এর স্তর পার হওয়ার পরই সাধক এই স্তরে উপনিত হন। তখন তিনি কামেল ওলী হয়ে যান। তবে পূর্ন কামেলে মোকাম্মেল হন না। তাই তাদের আবারও জন্ম নিতে হয় পূর্ণতা লাভের জন্য। আর এসমস্ত ওলীগনই পরবর্তী জন্মে জন্মগত ভাবে মাদারজাত ওলী হয়ে জন্মগ্রহন করেন। তারা যখন কিছু বলে, তখন তা হয়ে যায়।
*বাকা বিল্লাহ্ঃ ইহার অর্থ আল্লাহতে স্থায়ী ভাবে মিশে যাওয়া। এই স্তরেই সাধকের জন্ম-মৃত্যু বাড়ণ হয় এবং সে নির্বাণ লাভ করে। এই স্তরের ওলীদেরই কামেলে মোকাম্মেল বলা হয়। অর্থাৎ তারা স্থায়ী ভাবেই আল্লাহর সাথে মিশে একাকার হয়ে যায়। তখন তারা মুখে যখন যে অবস্থায় যা বলে, তাই হয়ে যায়। তখন তাদের মুখ আল্লাহর মুখ হয়ে যায়। তারা আল্লাহময় হয়ে যায়। এসমস্ত ওলীগনকেই গাউস কুতুব বলা হয়। ইনারা জন্মগত ভাবেই মাদার জাত ওলী হয়ে থাকেন। এই স্তরে গিয়েই মনসুর হেল্লাজ (রাঃ) বলেছিলেন "আনা আল হক্ব (আমিই সত্য বা আমিই খোদা)"।
৩৫.
শিষ্যঃ এক জনমেই কি বাকায় পৌছানো সম্ভব?
গুরুঃ এক জনমে সম্ভব নাও হতে পারে, লেগে যেতে পারে হাজার জনম।
৩৬.
শিষ্যঃ জন্মান্তরবাদ সম্পর্কে আমার ধারনা খুবই কম, কৃপা করে যদি আমার মনের অন্ধকার দূর করতেন প্রভু।
গুরুঃ জন্মান্তরবাদ অর্থ হল এক জন্ম থেকে অন্য জনম। মৃত্যু বরনের পর আবার জন্ম গ্রহন করা, আবার জন্মের পর মৃত্যু বরন করা, এভাবে বারবার মৃত্যুর পর জন্ম এবং জন্মের পর মৃত্যু বরন করার উপর যে বিশ্বাস ও মতবাদ বা দর্শন রয়েছে, তাকেই জন্মান্তরবাদ বলে।
৩৭.
শিষ্যঃ জীব বার বার আসা যাওয়া কেন করে দয়াল?
গুরুঃ জীবের এই আসা যাওয়ার কারন হল তার বাসনা ও কর্ম। বাসনা পূরন ও কর্মের ফল ভোগ করার জন্যেই জীব বার বার বিভিন্ন যোনীতে আসা যাওয়া করে। কর্ম ভালও হতে পারে আবার মন্দও হতে পারে। ভাল কর্মের জন্যেও জন্ম গ্রহন করতে হয়, আবার খারাপ কর্মের জন্যেও জন্ম গ্রহন করতে হয়।
৩৮.
শিষ্যঃ মৃত্যু কি তাহলে?
গুরুঃ মৃত্যু হল জরাজীর্ণ দেহ হতে অন্য একটি দেহে আত্মার স্থানান্তর।
৩৯.
শিষ্যঃ কবর কি?
গুরুঃ জঠর ব্যদনা খুব ভয়াবহ, যেটাকে গোড় আযাব বা কবরের আযাব বলা হয়। এই গোড় আযাব থেকে কেউ রক্ষা পায়নি, যাদের জন্মগ্রহন করতে হয়েছে। যেটা হল মাতৃগর্ভের নয় মাস দশ দিন। মাতৃ গর্ভটাই কবর। কেউ কেউ দেহকেই কবর বলেছেন, সেটা তাদের মত, আমাদের মতে মাতৃগর্ভই কবর। (আমি আমার মতের পক্ষে যুক্তি দিয়ে অন্যদের মতকে অবজ্ঞা করতে চাচ্ছি না)।
৪০.
শিষ্যঃ তাহলে হাশর কি?
চলবে.....
#আধ্যাত্মিক প্রশ্নোত্তর (পর্ব-০৮)
৪০.
শিষ্যঃ হাশর কি?
গুরুঃ হাসর হল পরিনামের মাঠ। যেখানে জীব তার কৃতকর্মের ফল ভোগ করবে। সেটা আর কোথায় হতে পারে!!!! নিশ্চয়ই এই পৃথিবীই হাশরের ময়দান। জন্মের পর থেকেও জীবের হাশর শুরু হয়।
৪১.
শিষ্যঃ কিন্তু হাশর ত পৃথিবী ধংষের পরের জীবন। তাহলে পৃথিবী বলতে কি বুঝায়? কুরআনে ত স্পষ্ট আছে যে কেউ একবার পৃথিবী থেকে চলে গেলে সে আর পৃথিবীতে ফিরতে পারবে না।
গুরুঃ অতি উত্তম প্রশ্ন। তোমার দেহই হল পৃথিবী। কেউ একবার দেহ থেকে বের হয়ে গেলে সে আর সেই দেহে ফিরে আসতে পারে। কুরআনে এই দেহভান্ডের কথাই বলা হয়েছে। তুমি কেন বুঝতেছো না হে পার্থ! মানুষ যা করতে তাহারই বদলা পাবে, তাহলে লাঠির আঘাতের বিনিময়ে লাঠির আঘাত, আর থাপ্পড়ের বিনিময়ে থাপ্পড়, দানের বিনিময়ে ধনই পাওয়া উচিত। কিন্তু থাপ্পড়ের বিনিময়ে জীব কেন আগুনে জ্বলবে!!! তাই সঠিক পরিনাম পেতে হলে এই পৃথিবীতেই আসতে হবে, অন্য কোথাও কর্মের ফল পাওয়ার উপায় নেই। হোক সেটা ভাল কিংবা মন্দ কর্ম।
৪২.
শিষ্যঃ তাহলে যে শুনি পাপ পূণ্যের পরিমাপ করা হবে মীজানের পাল্লায়, তবে কি সেটা মিথ্যা!!! মীজান এর হাকীকত কি প্রভু?
গুরুঃ ঈশ্বর এবং তাঁর কোনো প্রতিনিধির কথা কখনোই মিথ্যা হতে পারে না। আমরাই তাদের কথার হাকীকত বুঝতে পারি না। প্রতিটা মানুষের পাপ পূণ্যের পরিমাপ হচ্ছে। বিবেক হল সেই মীজান। মানুষ কোনো কর্ম করার সাথে সাথেই সে তার পাপ ও পূন্যের বিচার স্বয়ং করতে পারে এই বিবেকের মাধ্যমে।
৪৩.
শিষ্যঃ তাহলে পুলসিরাত কি প্রভু? যে পথ বাকি হিরার চেয়ে ধারালো এবং চুলের চেয়ে সূক্ষ্ম। যার ঐ পারে থাকবে স্বর্গ আর তলদেশে থাকবে নরক।
গুরুঃ ধর্মপথই হল পুলসিরাত। ধর্মের পথ হিরের চেয়ে ধারালো, চুলের চেয়েও সূক্ষ্ম। সৎ পথে চলতে থাকো, তবেই এর বাস্তবতা উপলব্ধির করতে সক্ষম হবে তুমি। ধর্মের পথে পারি দিতে পারলে তুমি স্বর্গ লাভ করবে এবং পা পিছলে পরে গেলে নরকে গমন করে।
৪৪.
শিষ্যঃ তাহলে স্বর্গ-নরক কোথায়?
চলবে....
#আধ্যাত্মিক প্রশ্নোত্তর (পর্ব-০৯)
৪৪.
শিষ্যঃ তাহলে স্বর্গ-নরক কোথায়?
গুরুঃ স্বর্গ-নরক এই ধরাধামেই বিদ্যমান। আমাদের ভিতরেই স্বর্গ ও নরক। পৃথিবীর মাঝে থেকেই স্বর্গ ও নরকের স্বাদ ভোগ করতে হবে।
৪৫.
শিষ্যঃ তাহলে জান্নাতের সেই সুখ-ভোগ ও নরকের সেই যন্ত্রনা কোথায়?
গুরুঃ হে বৎস! তুমি কি জান্নাতের সুখ দেখো নাই! নরকের অনল অনূভব করো নাই!!!
৪৬.
শিষ্যঃ প্রভু! এগুলো এখনও আমার জ্ঞানের বাইরে।
গুরুঃ শুনো। তুমি যে আনন্দে আছো, ভোগ-বিলাসে আছো। এটাই তোমার জন্য জান্নাত। স্ত্রীই হুর রূপে তোমাকে আনন্দ দিচ্ছে, আর তোমার সন্তান-সন্তানাদিই গেলামান রূমে তোমার স্ত্রীর ভালবাসার পাত্র হয়েছে। এই দুনিয়ার মাঝেই তুমি কত আনন্দে আছো, মনের আনন্দই প্রকৃত জান্নাত। তবে জান্নাতুল ফিরদাউস তথা ব্রহ্মানন্দ লাভ বা নির্বাণ লাভ এর স্তর আরো অনেক উর্দ্ধে। সেই জান্নাত পেতে হলে তোমাকে দুনিয়ার সকল জান্নাত ত্যাগ করতে হবে।
৪৭.
শিষ্যঃ প্রভু জান্নাতের যে স্তর আছে। তাহলে সেগুলো কি, কোথায় ও কিভাবে?
গুরুঃ জান্নাত কি তা ত বুঝাইলাম। জান্নাতের স্তর বুঝো না! এই যে কেউ মানব কূলে জন্ম নেওয়ার পরেও না খেয়ে মরতেছে আবার কেউ রাজ ভোগ খাচ্ছে। কেউ রাজার ঘরে, কেউ জমিদারের ঘরে, আবার কেউ ভিক্ষারীর ঘরে জন্ম গ্রহন করতেছে। এটাই হল স্তর। কিন্তু যে মানব কূলে আছে, সেই মূলত জান্নাতবাসী। কারন তার ইবাদত এর সুযোগ আছে, উন্নত জীবন লাভের সুযোগ আছে সাধনার মাধ্যমে।
৪৯.
শিষ্যঃ তাহলে নরক কি?
গুরুঃ মানব ও জ্বীন জাতির বাইরে যত কূল আছে আছে তারা সবাই নরকবাসী। কিন্তু মানবও নরকে বাস করতেছে। নরকের আগুন দুনিয়ার বাহ্যিক আগুনের চেয়েও তীব্রতর। মানুষের হৃদয়ের মধ্যে যে আগুন জ্বলে তা কাউকে দেখানো যায় না। যে আগুন এই বাহ্যিক আগুনের থেকেও হাজারগুন তেজ সম্পূন্ন।
৫০.
শিষ্যঃ পাপ-পূণ্য কি?
চলবে....
#আধ্যাত্মিক প্রশ্নোত্তর (পর্ব-১০)
৫০.
শিষ্যঃ পূণ্য (সওয়াব) কি?
গুরুঃ যে কর্ম করার পর তোমার মনে আনন্দ জাগে এবং মানুষের কাছে তা প্রকাশ করতে তোমার ভাল লাগে, সেটাই পূণ্য। অর্থাৎ কোনো কর্মের পর তোমার ভিতরের বিবেক গুরু যদি রায় দেয় যে তুমি ভাল কাজ করেছো, তবেই সেটা পূন্য।
৫১.
শিষ্যঃ পাপ (গুনাহ) কি?
গুরুঃ যে কর্ম করার পর তুমি নিজেই নিজের কাছে লজ্জিত হও এবং তুমি চাও না কোনোভাবেই তা মানুষের কাছে প্রকাশ হোক, সেটাই পাপ কর্ম।
৫২.
শিষ্যঃ পাপ-পূন্য কি কর্মের উপর নির্ভর করে নাকি মনোভাবের উপর নির্ভর করে? মানে পাপ-পূন্যের কি কর্ম আলাদা আলাদা ভাগ করা আছে? নাকি আমাদের নিয়ত বা মনোভাবের উপর কর্মটি পাপ বা পূন্যে রূপান্তরিত হবে?
গুরুঃ পাপ-পূন্য হবে নিয়ত তথা মনোভাবের উপর বিচার করে। যেমন কেউ নদীর তীরে একটা বাঁশের একটা খুঁটি স্থাপন করল এই ভেবে যে, যাতে কোনো মুসাফির উট বা ঘোড়া নিয়ে আসলে খুঁটিতে বেঁধে পানি পান করতে পারে। আবার আরেকজন এসে বাঁশের খুঁটি দেখলো এবং ভাবলো যে এই পথে অনেক অন্ধ লোকও চলা ফেরা করে, সুতরাং এই বাঁশ থাকলে তারা পরে গিয়ে আঘাত পাবে, তাই সে বাঁশের খুঁটি তুলে ফেলল। এখানে দুইজনেরই পুণ্য হবে। কারন দুইজনের উদ্দেশ্যই সৎ ছিল। অর্থাৎ কর্মটি পাপ নাকি পূন্যের, সেটা বিবেচিত হবে।
৫৩.
শিষ্যঃ পাপ-পূন্য নিয়ে যদি আরেকটু পরিস্কার করে বলতেন প্রভু, আরো উপকৃত হতাম।
গুরুঃ জীবকে শান্তি দেওয়া ধর্ম, আর অশান্তি দেওয়া অধর্ম। সেটা যেভাবেই হোক।
৫৪.
শিষ্যঃ প্রেম কি আর কাম কি?
চলবে...
#আধ্যাত্মিক প্রশ্নোত্তর (পর্ব-১১)
৫৪.
শিষ্যঃ প্রেম কি আর কাম কি?
গুরুঃ প্রেম হল নিস্বার্থ কর্ম। কোনো বিনিময় লাভের আশা না করে শুধু প্রভুর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য যা যা করা হয়, তাহাই প্রেমে গণ্য। আর স্বার্থযুক্ত কর্মই হল কাম। কামের আরেক নাম হল বাসনা। বাসনা নিয়ে যে কর্ম করা হয় তাহা সবই কাম।
৫৫.
শিষ্যঃ ঈশ্বরের সন্তুষ্টির আশার বাইরে মানুষ ও অন্যান্য প্রাণী যে একে অপরকে ভালবাসে, তাহা কি তবে প্রেম নয়!!! তাহা সবই কি তবে কাম!!
গুরুঃ জাগতিক বিষয় আর আধ্যাত্মিক বিষয় সম্পূর্ন ভিন্ন। এই দুইটি আলাদা জগত। এই জাগতিক মানুষ আনন্দে হাসে, আর প্রভুর প্রেমিকরা প্রভুর উদ্দেশ্যে চোখের জল ফেলে কাঁদতে পারলে আনন্দ পায়। জাগতিক ভাবে বিচার মানুষের প্রতি মানুষের ভালবাসা, পশুর প্রতি পশুর ভালবাসা সবই প্রেম। কিন্তু আধ্যাত্মিক জগতের সব কিছুই হল প্রভুকে কেন্দ্র করে। যদি কোনো মানুষ কোনো মানুষ বা অন্য পশুকে প্রভুর সন্তুষ্টির জন্য ভালবাসে, তবে তা প্রেম। আর কাম হল কামনা বাসনা। যদিও জাগতিক মানুষের শুধু যৌনতাকেই কাম বলে। কিন্তু প্রভুর সন্তুষ্টির জন্য যদি যৌন কর্ম করে থাকে কেউ, তবে সেটাও তখন কাম না হয়ে প্রেমে গণ্য হবে।
৫৬.
শিষ্যঃ যৌন কর্ম কিভাবে প্রেম হতে পারে? আর প্রভুর সন্তুষ্টির জন্যেই বা কিভাবে কেউ যৌন কর্মে লিপ্ত হয়? সেটা কেমন পরিস্থিতে হয়?
গুরুঃ হে পার্থ! তোমাকে সহজ ভাবে বুঝাচ্ছি। ধরো কোনো স্ত্রী তার স্বামীর প্রতি খুব আসক্ত হয়ে উত্তেজিত হয়ে উঠল হঠাৎ। তার এই কাম জ্বালা নিবারণ না করার আগ পর্যন্ত সে অশান্তি থেকে মুক্তি পাবে না। এমন অবস্থায় স্বামীর উচিত স্ত্রীর মনের বাসনা পূর্ন করা। তবে নিজের খায়েশ মেটানোর জন্য নয়; বরং স্ত্রী হল প্রভুর সৃষ্ট জীব। আর এই স্ত্রীর অধিকার দেওয়া হয়েছে স্বামীর উপর। স্বামীকে ভাবতে হবে যে এই স্ত্রী আল্লাহর পক্ষ থেকে আমার জন্য মেহমান, যার ভাল-মন্দ দেখার ভার আমার উপর দেওয়া হয়েছে, সুতরাং তাকে অশান্তি থেকে মুক্তি দিতেই হবে। এরূপ ভাবনা মনে নিয়ে স্ত্রীর মনের বাসনা পূরনে যৌন কর্মে লিপ্ত হলেও সেই স্বামীর জন্য তাহা প্রেমেই গণ্য হবে। কারন তার উদ্দেশ্য ছিল প্রভুর সন্তুষ্টি। [সংক্ষিপ্ত ভাবে বুঝানোর চেষ্টা করব, জ্ঞানীদের জন্য ইশারাই যথেষ্ট]
৫৭.
শিষ্যঃ ধন্য আমি। প্রভু! যদি বাসনাই কাম হয়ে থাকে তাহলে যারা লোভী, অহংকারী, হিংসুক, তারাও কি কামুক?
গুরুঃ হ্যা, লোভ, মায়া, অহংকার, হিংসা, মোহ যার মধ্যে আছে, সেই ব্যক্তিই কামুক।
৫৮.
শিষ্যঃ তবে যে প্রভু শুনেছি ষড় রিপুর মধ্যে কামই প্রধান রিপু, তাহলে লোভ, মায়া, মোহ, গর্ব, ঈর্ষা এগুলো 'কাম' হয় কিভাবে? সব ত আলাদা বিষয়।
গুরুঃ শুনো, কাম হল ষড় রিপুর প্রধান। আর বাকী পাঁচটি অপশক্তি হল কামের অধীন। কাম নিবারণ হলেই বাকীগুলো এমনিতেই দমন হয়ে যাবে। এই পাঁচের মিশ্রনেই 'কাম'। কামের সাথে কোনো না কোনো ভাবে এই (লোভ, মায়া, অহংকার, হিংসা, মোহ) পাঁচটি অপশক্তি জড়িত।
৫৯.
শিষ্যঃ প্রভু কাম দমন করব কিভাবে?
#আধ্যাত্মিক প্রশ্নোত্তর (পর্ব-১২)
৫৯.
শিষ্যঃ প্রভু কাম দমন করব কিভাবে?
গুরুঃ কাম দমন করা সহজ কথা নয়, চাইলেই কাম দমন সম্ভব নয়। এতে গুরুর কৃপা প্রয়োজন। যখন তুমি সত্যকে দর্শন করবে, নিজেকে চিনতে পারবে, যখন তোমার আত্মজ্ঞান হাসিল হবে এবং তুমি আত্মদর্শন করবে তখনই কামকে দমন করতে পারবে। যখন তুমি পূর্ণ ভাবে বুঝবে ও বিশ্বাস করবে যে এই দুনিয়ার মায়া ও মোহ সব কিছু মিছে, এগুলো কিছুই তোমার কাজে আসবে না, যখন তুমি বুঝতে পারবে এই দুনিয়ার কিছুই তোমার নয়, এমনকি তুমি নিজেও তোমার নও, সুতরাং এই মায়া মোহ সবই অর্থহীন, যখন বুঝবে কেউ তোমার নয়, তুমি মিছেই মায়াজালে বন্দী হয়ে ষড়রিপুর দাস হয়ে পরিবা হচ্ছ, তখনই কামনা থেকে তোমার মুখ ফিরে আসবে।
৬০.
শিষ্যঃ প্রভু কাম থেকে নাকি প্রেমের উৎপত্তি। তাহলে কামে আমার অবনতি কেন হবে?
গুরুঃ কাম থেকে প্রেমের উৎপত্তি এটা সত্য। কিন্তু প্রেম জাগ্রত হয়ে গেলে আর সেখানে কাম থাকেনা।
৬১.
শিষ্যঃ কিন্তু সেটা কিভাবে প্রভু? আমাকে কৃপা করে বুঝিয়ে বলুন।
গুরুঃ কাম তথা বাসনা থেকেই প্রেম জাগ্রত হয়। ধরো তুমি কোনো সুন্দর রমনীকে দেখতে পেলে, তখন তোমার মাঝে কাম জাগ্রত হল, তুমি তার রূমে আস্তে আস্তে মুগ্ধ হতে লাগলে এবং প্রতিনিয়ত তার প্রতি দুর্বল হতে থাকলে। এই সুন্দর রূপের লালসায় তুমি তার প্রেমে পরে যাবে অতি শীঘ্রই। এক পর্যায়ে তাকে তুমি প্রচন্ড ভালবেসে ফেললে। তোমাদের বিয়ে হল, হঠাৎ কিছুদিন পর দেখা গেল কোনো রোগের কারনে সেই রমনীর সেই রূপ লাবন্য নষ্ট হয়ে গেল। কিন্তু সেই রমনীর প্রতি তোমার যে প্রেম, তা কিন্তু নষ্ট হবে না যদি তাকে সত্যিকারের ভালবেসে থাকে। কিন্তু তোমার এই প্রেম জাগ্রত হয়েছিল তার রূপ দেখেই। তখন তার বিশ্রী চেহারায় তুমি সৌন্দর্যতা খুঁজে পাবে, কারন তুমি এখন তাকে ভালবাসো। বিষয়টা অনেকটা দুধ আর দুধি বা দইয়ের মত বা ঘি ও মাঘনের মত। দুধ থেকেও দই হয়, কিন্তু দই জমলে আর দুধ থাকে না। দুধ থেকেও মাঘন হয়, কিন্তু মাঘন হয়ে গেলে আর দুধ থাকেনা, মাঘন থেকেই ঘি হয়, কিন্তু ঘি হয়ে গেলে আর মাঘন থাকেনা।
৬২.
শিষ্যঃ কিন্তু প্রভু দই বা দুধিতে তো দুধ থেকে যায় সুপ্ত ভাবে, শুধু দুধের রূপান্তর ঘটে দই বা দধিতে। প্রেমের মধ্যেও কি তবে কাম লুকিয়ে থাকে সুপ্ত হয়ে?
গুরুঃ ঠিক ধরেছো। কামই প্রেমে রূপান্তর হয়ে যায়। কামের মাঝেই প্রেম আর প্রেমের মাঝেই কাম সুপ্ত হয়ে থাকে। কামুক তার প্রেমকে জাগ্রত করতে না পারার কারনে সারাজীবন কামেই ডুবে থাকে। আর প্রেমিক কাম থেকেই প্রেমকে জাগ্রত করে তুলে কাম থেকে নিজেকে সম্পূর্ন মুক্ত রাখে।
৬৩.
শিষ্যঃ প্রভু সংসারে থেকেও কি মুক্তি লাভ করা যায়?
লেখাঃ Pirzada DM rahat
That an interesting one! I like it ( if google translate did his job correctly) XD