ইহজগতের অন্তরালে!
সেবার পুজোয় পাহাড়ে ঘুরতে গিয়ে মৃন্ময়ী খানিক বিস্মিত হয়ে দেখছিল! একরাশ জমা সাদা তুলোর মতো মেঘের বিছানা যেনো কেউ পেতে রেখেছে আকাশ জুড়ে।
বিছানায় পাতা সাদা চাদর এর মত মেঘ যেনো মনে করিয়ে দিচ্ছিল, ইহজগতের আড়ালে একটি জগত আছে।
আর, সেই জগতে পৌঁছতে হলে মনের মলিনতা পরিত্যাগ বাঞ্ছনীয়!
নইলে এই মেঘের ভেলায় করে ওপারের জগতে পৌঁছনো সম্ভব নয়!
ওই যে কি সব বলে স্বর্গ, মর্ত আর পাতাল!
এখন তো সে মর্তলোকে রয়েছে, কিন্তু আজকের এই দৃশ্য তার মনে কৌতূহল সৃষ্টি করেছে, সত্যি হয়তো এই পাহাড়ি পথ ধরে উপরে উঠতে পারলে ওপারের মলিনতা বিহীন স্বর্গলোকে পৌঁছনো সম্ভব!
অর্থাৎ সৎ পথে সংঘর্ষ করে জীবনযাপন করাই এই লোকে পৌঁছনোর একমাত্র টিকিট!
তবে, এই পাহাড়ি পথ ধরে একবার উঠতেই তো প্রাণ ওষ্ঠাগত! জীবনের চড়াই উৎরাই এর মধ্যে না জানি কত মলিনতা স্পর্শ করে গেছে এই জীবনকে, কখনও জ্ঞাতসারে আবার কখনও অজ্ঞাতসারে!
তার কি এই মলিনতা বিহীন স্বর্গলোকে জায়গা হবে? আচ্ছা! কি আছে ঐ পরপারে?
যা কিছু পড়েছে সে এতদিন নানা ধর্মগ্রন্থ থেকে, সে গুলোর মধ্যে উল্লেখিত সবটা কি এই সাদা মেঘের আড়ালে লুকিয়ে রয়েছে?
যারা হারিয়ে গেছে, তাদের মধ্যে কতজন জায়গা করে নিতে পেরেছে এই অমলিন মেঘের বিছানায়?
পিছন থেকে ডাক পড়তেই সম্বিৎ ফিরে পেলো মৃন্ময়ী! কতক্ষন এভাবে দাড়িয়ে ছিল সে নিজেই জানে না!
মৃন্ময়ীর মা মৃণালিনী দেবীর ডাক শুনে, সে পিছন ফিরে চাইলো।
তার মা তাকে তন্ন তন্ন করে খুঁজছিলেন, এতো উঁচুতে তার ফোনের নেটওয়ার্ক পাওয়া যাচ্ছিল না, তাই তিনি চিন্তায় পড়ে গিয়েছিলেন।
অনেক খুঁজে মৃন্ময়ীকে পেয়ে খানিক স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন মৃণালিনী।
কি রে, সেই এক্ ঘণ্টা ধরে তোকে খুঁজে বেড়াচ্ছি, ঐদিকে হোটেলে সকলের দুপুরের খাওয়া শেষ, তোকে সকলেই খুঁজে বেড়াচ্ছে, ফোনে চেষ্টা করেও পাওয়া যাচ্ছে না!
একটা অচেনা জায়গায় এভাবে কেউ না বলে বেরিয়ে পড়ে?
মৃন্ময়ীর কানে সবটাই আসছিল কিন্তু তখনও তার ঘোর কাটেনি! তাই, কোনো উত্তর ছাড়াই মায়ের সমস্ত কথা নির্বিকার ভাবে শুনছিল মৃন্ময়ী।
মৃণালিনী কোনো উত্তর না পেয়ে, এক্ প্রকার ধমক দিয়ে বললো কি হলো, কথা কানে যাচ্ছে না?
আজকাল দিনকাল ভালো নয়, চতুর্দিকে নানা ঘটনা ঘটেছে, এইভাবে দলছুট হয়ে কেনো বেরিয়েছিস একলা?
মায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে মৃন্ময়ী তার মাকে প্রশ্ন করলো, আচ্ছা মা, বাবা কি ঐ মেঘের আড়ালের দেশে রয়েছে?
ওখানে কি আরেকটা জগত রয়েছে যেটা এই মর্তবাসী দেখতে পাই না?
এবার, মৃণালিনী নির্বাক! এই ঘুরতে আসাটা তার মেয়ের জন্যই, সে নিজেও স্বামী হারিয়েছেন, কিন্তু বাবার বড্ডো কাছে ছিল মৃন্ময়ী!
বাবা এবং মেয়ের এইরকম বন্ধন খুব একটা দেখা যায় না, আজকালের এই যান্ত্রিক যুগে!
মৃণালিনী যদিও খানিক শাসন করতো মেয়েকে কিন্তু মৃদুল (মৃণালিনীর স্বর্গীয় স্বামী) সব সময় মেয়ের পক্ষ নিয়ে কথা বলতো!
এক্ সাথে খাওয়া, কেনাকাটা, এমনকি গত বছর এখানেই তিনজন এসেছিল একসাথে।
এখন মৃণালিনী বুঝতে পারছে, কেনো মৃন্ময়ী অন্য জায়গায় না গিয়ে এখানে ঘুরতে আসতে চেয়েছিল।
প্রথম কন্যা সন্তান নিয়ে শ্বশুর বাড়ি থেকে বাঁকা কথা মৃণালিনী কে শুনতে হয়েছিল বলে, মৃদুল, এক্ মাসের মধ্যে দু'কামরার ফ্ল্যাটে এসে উঠেছিল, সদ্যজাত মেয়েকে নিয়ে।
সেই থেকে অফিস থেকে সটান বাড়ি, যদিও বিয়ের পর একটা আধটা বন্ধুর সাথে যোগাযোগ ছিল, কিন্তু মেয়ে আসার পর, সবার থেকে দূরত্ব তৈরি করে নিয়েছিল মৃদুল।
শৈশবে মেয়েকে স্কুলে নিয়ে যাওয়া, তারপর মৃণালিনী স্কুল থেকে মেয়েকে ঠিকমত নিয়ে এসেছে কিনা সবটা খোজ নিত মৃদুল!
মাঝেমধ্যে বেশ বিরক্ত বোধ করত মৃণালিনী! অফিসে কাজের ফাঁকে কে এত বারংবার ফোন করে! আমিও তো মা, নাকি?
হালকা হেঁসে মৃদুল বলতো, বাবাকেই তো মেয়েদের সযত্নে বড় করতে হবে, সমাজে পুরুষের হাল দেখে আমি নিজেই লজ্জিত!
তাই পুরুষ হয়ে সমাজের সেই পুরুষদের খানিক পাপস্খালন এর চেষ্টা করছি!
মৃণালিনী মনে মনে গর্বিত হতো এরকম স্বামী পেয়ে, কিন্তু ভালো কিছুর সময় সীমিত আর তাই, মেয়ের মাধ্যমিকে ভালো ফলাফল করবার বাড়তি উৎসাহ নিয়ে গাড়ি চালাতে গিয়ে দুর্ঘটনা!
এরপর সাত দিন লড়াইয়ের পর, অবশেষে মৃণালিনী আর মৃন্ময়ী দের একা ফেলে চিরতরে না ফেরার দেশে হারিয়ে গেলো মৃদুল!
নির্বাক হয়ে দুজনেই হোটেলের দিকে ফিরতে গিয়ে নজরে পড়লো, আকাশে মেঘের রং পরিবর্তিত হয়ে সাদা থেকে কালো হয়ে গেলো মুহুর্তের মধ্যে!
তবে কি মৃদুল, মৃন্ময়ীর কথা শুনতে পেয়েছে?
সত্যি কি মৃন্ময়ীর কথা ঠিক, ইহজগতের আড়ালে ও কি একটি অন্য জগত রয়েছে? সেখানে কিছু অমলিন মানুষ হয়তো স্থান পায়, কে বলতে পারে!
Curated by:@wirngo