টিকে থাকুক বন্ধুত্ব
আমার পাশের দুজন মানুষকে দেখে, অনেকেই আমার বন্ধু ভাবতে পারেন। তবে সেটা ভাবলে নেহাত আমাকে দোষারোপ করা হবে। তারা আসলে আমার ভাই। কেমন ভাই, এটা বলা মুশকিল।
তবে জীবনে চলার পথে অনেক মানুষের সঙ্গেই তো থেমে থেমে দেখা হয়, টুকটাক কথা হয়। হয় ভাবের আদান-প্রদান। যদিও আমার শুভাকাঙ্ক্ষীর তালিকাটা বড্ড ছোট, তারপরেও যখন কিছু মানুষ পাশে এসে কাঁধে হাত রেখে বলে, যা করছো বেশ ভালোই করছো এবং এগিয়ে যাও তোমার গতিতে। তখন হয়তো এমন কথাগুলো অনেকটাই অনুপ্রেরণা জোগায় ।
৯০ এর দশকে এই মফস্বল এলাকায় যখন একটি মাত্র কিন্ডারগার্টেন স্কুল ছিল, তখন সেখানে রোজ দাদীর সঙ্গে যাতায়াত করতো সদ্য স্কুলে পা দেওয়া নবীন প্রাণ মিথুন আর ওদিক থেকে ছুটে আসতো একই সময়ে কখনো বাবা নতুবা মায়ের হাত ধরে চন্দন। তাদের পরিচয়ের সূত্রপাত সেই কিন্ডারগার্টেন স্কুল থেকেই, যা এখনো চলমান।
কিন্ডারগার্টেনের সময়টা এত দ্রুত চলে গিয়েছিল যেন, বুঝে ওঠার আগেই সব কিছু নিমিষেই শেষ। সেই রোজ রোজ স্কুলে যাওয়া, রং পেন্সিল দিয়ে সাদা খাতায় আঁকাআঁকি, বাহারি টিফিন আর নবীন প্রাণের হৈ হুল্লোড় আচমকাই যেন উধাও।
পরিবারের কারণে মিথুনের পরবর্তী গন্তব্য হয় টাঙ্গাইলের বোর্ডিং স্কুলে। একটু শাসনে রাখার জন্যই পরিবার থেকে তাকে হয়তো সেসময় চেষ্টা করেছিল ক্যাডেট কোচিং করানোর জন্য। মিথুন তো যাওয়ার আগে চন্দনকে ফিসফিস করে বলেই গিয়েছিল, ভাই আর যাই করিস ঐ বোর্ডিং স্কুলে যেন ভর্তি না হোস।
বেশ কড়াকড়ি নিয়ম কিন্তু ওখানে। মিথুনের চলে যাওয়াতে ক্রমাগত চন্দনের মনে অস্থিরতা জাগ্রত হয়। বন্ধুত্বটাই যেখানে মুখ্য বিষয়, সেখানে এসব কড়া শাসনের বুলি যেন অনেকটাই তুচ্ছ মনে হচ্ছিল চন্দনের। সে তার পরিবারের কাছে বলেই দিল, আমিও ক্যাডেট কোচিং করতে চাই।
যাক অবশেষে চন্দনের গন্তব্য হয়ে গেল সেই বোর্ডিং স্কুলে। দুরন্তপনা যাদের স্বভাব, তাদের কাছে এই রুটিন মাফিক জীবনটা যেন অনেকটাই বন্দীদশার মতোর লাগতো। নিজেদের থেকেই একটা সময় তারা স্বেচ্ছায় ছুটি দিল সেই বন্দী জীবনকে।
এই তল্লাটে লাল রঙের ইটের গাঁথুনি দিয়ে যে স্কুলটা নির্মিত আছে, সেখানেই তাদের পরবর্তীতে আবারো সাক্ষাৎ হয়ে গেল, তখন তারা মাধ্যমিকে পদার্পণ করেছে । সেই সোলায়মান মাস্টারের ইংরেজি প্রাইভেট থেকে শুরু করে হাইস্কুলের পুরো এলাকায় যেন তাদের বিচরণ লেগেই থাকতো। বলা যায়, চুম্বকের মত আকর্ষণ ক্ষমতা ছিল তাদের দুজনের সম্পর্কের মাঝে।
যদিও পথিমধ্যে অনেকের সঙ্গেই তাদের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক হয়েছিল বা সেইসব সম্পর্ক এখনো আছে, তবে এতসব সম্পর্কের ভিড়েও, তাদের নিজেদের অভ্যন্তরীণ সম্পর্কটাকে তারা প্রতিনিয়ত প্রাণবন্ত ও সতেজ রাখার চেষ্টা করেছিল।
ব্যস্ত নগরী ঢাকার উদ্দেশ্যে মিথুনের যাত্রা শুরু হয় মাধ্যমিকের পরেই। তবে এ যাত্রায় চন্দন অবশ্য নিজেকে মানিয়ে নিয়ে ছিল বগুড়া শহরেই। নিয়তিতে যদি দুজনের একসঙ্গে মিলিত হওয়া থাকে, তাহলে আর ঠেকায় কে।
আবারো দেখা হয় দুজনের সেই ব্যস্ত নগরীতে। হয়তো বিশ্ববিদ্যালয় দুটো আলাদা ছিল, তবে থাকার জায়গা তো একই ছাদের নিচে। এভাবেই চলতে থাকে বন্ধুত্ব।
৩০ টা বছর কতো লম্বা সময়, তাই না। কোথায় সেই ১৯৯২ আর আজ কোথায় ২০২৩, সময় চলে গিয়েছে তার নিজের গতিতে। মুহূর্তেই কত কিছু লিখে ফেললাম। হয়তো অনেক কিছুই বাকি থেকে গিয়েছে। কিছু বিষয় অব্যক্ত থাকাই ভালো, যা হয়তো সবার জানতে নেই। দীর্ঘ সময়ের সম্পর্কে মান-অভিমান থাকা নিতান্তই স্বাভাবিক। তাছাড়া এগুলো তো বন্ধুত্বের অংশ। তবে এগুলোকে কাটিয়ে কত দ্রুত নিজেদের সম্পর্ককে আবারো গতিশীল করা যায়, সেই চিন্তা করাই তো প্রকৃত বন্ধুর কাজ।
মোটামুটি অর্থনৈতিকভাবে প্রথম থেকেই অনেকটাই সচ্ছল দুজনের পরিবার। জীবনটাকে তারা ঐ চাকরি কেন্দ্রিক গণ্ডির মধ্যে কখনোই বেঁধে রাখতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করত না। নিজেরা কিছু করে, সেখানে যেন অন্য মানুষের কর্মসংস্থান হয় তেমনটাই হয়তো তাদের চিন্তাভাবনা।
আমি স্বাধীনচেতা মানুষদেরকে বড্ড ভালোবাসি। হয়তো ব্যক্তিত্বের দিক থেকে পছন্দ করেই দুটো কথা ঝটপট লিখে ফেললাম তাদের নিয়ে।
সেদিন যখন এই ব্যস্ত শহরের ছোট্ট রেস্তোরাঁতে বসে একা একা নিজের মতো করে কিছুটা সময় কাটাচ্ছিলাম, ঠিক সেসময় দীর্ঘদিন পরে মুহুর্তেই মিথুন ভাইয়ের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। আগে যেরকম দেখেছি এখনো ঠিক তেমনই আছেন। আমি বুঝতে পেরেছি সে তার বন্ধু চন্দনের কাছে এসেছে। হয়তো দুই বন্ধু মিলে ঐ ঝিলের পাড়ে মন খুলে কিছুটা সময় গল্প করবে, তারপরে আবারো যে যার গন্তব্যে চলে যাবে। চোখের পলক ফেলতে না ফেলতেই চন্দন ভাই এসে হাজির।
হাতের আঙ্গুলে গুনে দেখলাম, এই মানুষগুলোর সঙ্গে কম করে হলেও ছয় থেকে সাত বছর পরে দেখা হয়ে গেল। তাদের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কটা যেন অবিকল ঠিক আগের মতোই আছে। বেশ সাদামাটা ও ছিমছাম। দেখে বোঝার কোন উপায় নেই যে, এতো সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান তারা। অর্থবিত্ত-প্রতিপত্তি থাকার পরেও, মানুষ যে খুব সাদামাটা জীবনযাপন করে, তা হয়তো তাদের দেখলেই কিছুটা প্রমাণ মেলে।
দুজনের মাঝে দাঁড়িয়ে গেলাম, বললাম সাত বছর আগে যেভাবে ছবি তুলেছিলাম আর একবার সেই রকম মুহূর্তের সাক্ষী হতে চাই। যদিও তারা এ যাত্রায় আমাকে নিরাশ করেনি।
সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যাণে, মাঝে মাঝেই টুকটাক চন্দন ভাইয়ের ব্যাপারে জানতে পারি, সেও তো আমার মতো বাবা হয়ে গিয়েছে। তবে মিথুন ভাইটা এখনো একাই রয়ে গিয়েছে। তার পিছনে অবশ্য যথেষ্ট কারণ আছে। হঠাৎ করেই তার পিতৃবিয়োগ এবং তাদের পারিবারিক ব্যবসা গুছিয়ে নিতে সে বেশ চেষ্টা করছে। হয়তো তার জীবনেও নতুন কেউ আসবে, সেটা হয়তো শুধুমাত্র এখন সময়ের ব্যাপার ।
টিকে থাকুক বন্ধুত্ব, এই শিরোনামে লেখাটি কেন লিখলাম, তা একটু ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করছি। এখন যে আমাদের সময়ে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কগুলো ক্রমাগত তৈরি হচ্ছে, তার বেশিরভাগই স্বল্প সময়ের ব্যবধানে প্রতিনিয়ত তিক্ততায় ভরে যাচ্ছে ।
আমার নিজেরও বাস্তব জীবনে বন্ধুত্ব নিয়ে তো আর কম অভিজ্ঞতা হলো না। যখন তিক্ততার ব্যাপারগুলো একটু পর্যালোচনা করার চেষ্টা করি, তখন যে উত্তরগুলো পাই, তাতে দেখা যায় সেখানে হয়তো মতের অমিল নতুবা আমার বাস্তবিক চিন্তাধারা তাদের কাছে অনেকটাই গ্রহণযোগ্য হতো না। তবে আমি তাদের কাছে বেশ কৃতজ্ঞ, সেই সকল বন্ধু আমাকে ছেড়ে গিয়ে সঠিক সময়ে সঠিক পথ দেখিয়েছে, হয়তো এটাই হওয়া জরুরি ছিল আমার সঙ্গে।
তবে আমার হিংসে হয়, এই চন্দন ও মিথুন ভাইয়ের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক দেখে। কেন হিংসে হয়, তা জানি না। হয়তো তাদের মত বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক এখন আর দেখা যায় না বললেই চলে। টিকে থাকুক তাদের বন্ধুত্ব, এমনটাই তো প্রত্যাশা করছি শুভাকাঙ্ক্ষী হিসেবে।
ডিসকর্ড লিংক
https://discord.gg/VtARrTn6ht
| 250 SP | 500 SP | 1000 SP | 2000 SP | 5000 SP |
VOTE @bangla.witness as witness
OR
এভাবেই হয়তো বছরের পর বছর বন্ধুত্ব টিকে থাকে। আসলে এই মানুষগুলো হয়তো চিরচেনা। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে সবার মাঝে দূরত্ব তৈরি হয়েছে। অনেকদিন পর সবার সাথে দেখা হয়েছে জেনে ভালোবাসো ভাইয়া। আসলে মানুষের ব্যক্তিত্ব মানুষকে স্মরণীয় করে রাখে। তারা সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান হয়েও সাদামাটা জীবন যাপন করে দেখে ভালো লাগলো।
জীবন তো এটাই আপু, ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন মানুষ বিধায় তাদের নিয়ে দুটো কথা লেখার ইচ্ছে জেগে ছিল। ধন্যবাদ আপনাকে।
বন্ধু তো অনেক জন থাকে ৷ তবে মনে প্রানে একজন বন্ধু থেকে যায় জীবনের শেষ পযন্ত সুখে দুখে পাশে ৷ যেমন টা মিথুন আর চন্দন ৷ ভালো লাগলো প্রায় দীর্ঘ বছর পরে দেখা ৷
অর্থ বিত্ত হলেও মানুষ যে সাদা মাটা থাকে তার বাস্তব উদাহরণ ৷ সত্যি ভালো লাগলো ব্লগ টি পড়ে৷ সর্বোপরি বলবো এভাবেই চির অটুট থাকুক ভালোবাসা গুলো ৷
এমনটা প্রত্যাশা আমিও করি ভাই, তাদের বন্ধুত্ব চির অটুট থাকুক।