আকাশের ক্রন্দন
দুপুরের পর থেকেই যেন অবিরাম ঝরেই চলেছে। বিরতির কোনো লক্ষণই চোখে পড়ছে না। এত ক্রন্দন কেন আকাশের?
শুধু কি পানি ঝরছে, নাকি অসংখ্য জীবনের ওপর নেমে আসছে দুর্যোগ?
যে ঘরটাকে মোটামুটি নিরাপদ ভেবে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়েন, হঠাৎ ঘুম ভেঙে যদি দেখেন সেই ঘরেই ধীরে ধীরে পানি বাড়ছে; নিজের শেষ ভরসার আশ্রয়টুকুও তলিয়ে যাওয়ার উপক্রম—তখন কেমন অনুভূতি হবে? একবার অন্তত ভেবে দেখুন তো।
এই যে গৃহবন্দি জীবন, কিংবা দীর্ঘ কর্মঘণ্টার পর নিয়ম করে আড্ডার ঘাটতি নিয়ে হাঁসফাঁস করা, অথবা আবহাওয়ার সঙ্গে তাল মিলিয়ে ধোঁয়া ওঠা নানান পদের খাবার খেতে না পেরে অস্থির হয়ে ওঠা—তার আগে দয়া করে মুদ্রার অপর পিঠটাও দেখুন।
দেখলে নিজেকেই অপরাধী মনে হবে। সজোরে কেউ কানের নিচে চড় মারলেও হয়তো তখন অতটা কষ্ট পাবেন না, যদি আপনার ভেতরে মনুষ্যত্ব বেঁচে থাকে।
সবার জীবন এক নয় রে, ভাই। যেখানটায় চুলো জ্বলে, সেখানটাও আজ পানির নিচে। দুপুর গড়িয়ে রাত হয়েছে, রাত পেরিয়ে ভোর হয়েছে, তবুও আকাশের ক্রন্দন থামেনি।
যে ঘরটাকে মানুষ সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় মনে করে, সেখানেও হাঁটুসমান পানি। চারদিকে সরীসৃপের আনাগোনা, বিশুদ্ধ খাবার পানির সংকট, অনিশ্চয়তা আর আতঙ্ক—সব মিলিয়ে জোড়াতালির জীবন।
এখানে আরাম নয়, বেঁচে থাকাটাই সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
এরই মধ্যেই অনেক এলাকায় আবার বন্যার আশঙ্কা । নিরাপদ আশ্রয় বলতে এখন সামান্য একটু শুকনো জায়গা—যেখানে অন্তত শরীরটাকে কিছুক্ষণের জন্য এলিয়ে দেওয়া যায়। যে মানুষগুলো গতকালও নিজের ঘরে ছিল, আজ তাদের কাছে সেই সামান্য শুকনো মাটিটুকুই বিলাসিতা।
তাই প্রকৃতির এই কান্নাকে শুধু জানালার কাঁচে আছড়ে পড়া বৃষ্টির শব্দ ভেবে উপভোগ করবেন না। মনে রাখবেন, আপনার কাছে যে বৃষ্টি পরমানন্দের , অন্য কারও কাছে সেটাই জীবনের সবচেয়ে বড় দুঃস্বপ্ন।
প্রকৃতির এই দুর্যোগ একদিন থেমে যাবে, পানি নেমেও যাবে। কিন্তু বিপদে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সুযোগ যদি হারিয়ে ফেলেন, সেই শূন্যতা কোনো দিনই পূরণ হবে না। মানুষ হিসেবে আমাদের প্রকৃত পরিচয় দুর্যোগের দিনে—কতটা অনুভব করতে পারি, আর কতটা এগিয়ে যেতে পারি, সেটাতেই।