মাস্টারমশাই
পঙ্কজ বাবুর দোকানে অনেক আগে থেকেই আমার যাতায়াত । বেশ ভালো একটা সম্পর্ক রয়েছে তার সঙ্গে। যেহেতু এই গলিতেই আমার চেম্বার ছিল, তাই মোটামুটি তার সঙ্গে পরিচয়ের সূত্রপাত সেখান থেকেই। তাছাড়াও ভদ্রলোক আমার বান্ধবীর বাবা ।
আমার এখনো বেশ ভালো মনে আছে, একটা সময় নিজের জীবন নিয়ে আমি খুবই সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছিলাম, সেই সময়টাতে পঙ্কজ বাবু অনেকটা দেবদূতের মত ভূমিকা পালন করেছিল। সেই সুপরামর্শ গুলো সেই সময়টাতে আমার অনেকটাই কাজে দিয়েছিল।
বহুদিন বাদে আজ সন্ধ্যায় মোটামুটি ইচ্ছে করেই পঙ্কজ বাবুর দোকানে উঁকি দেওয়ার চেষ্টা করে ছিলাম। কিছুটা খোশগল্প হয়েই গেল তার সঙ্গে।
হঠাৎই মাস্টারমশাইয়ের আগমন। এখন থেকে ১০-১২ বছর আগেও যেমনটা দেখেছিলাম ঠিক যেন এখনো তেমনটাই দেখছি। শারীরিক পরিবর্তন তেমন লক্ষ্য করা যাচ্ছিল না বললেই চলে, তবে মাথার চুল গুলো যে কিছুটা পেকে গিয়েছে, তা কিন্তু বেশ ভালোই বোঝা যাচ্ছে।
চেয়ারটা নিজের থেকেই এগিয়ে দিলাম মাস্টারমশাইয়ের দিকে এবং নিজে উঠে দাঁড়িয়ে ছিলাম। যখন মাস্টারমশাই বসেছিল, অতঃপর তার অনুমতি নিয়েই পুনরায় বসে ছিলাম।
এই মফস্বল এলাকায় হাতেগোনা কিছু প্রবীণ মাস্টার আছে, যার মধ্যে আমার মাস্টারমশাই একজন । সদা হাস্যোজ্জ্বল,বিনয়ী ও বেশ গুছিয়ে কথা বলে । ননী মাস্টার শুধু যে আমার একার মাস্টারমশাই তা কিন্তু নয়। কত শত ছাত্র-ছাত্রী যে তার কাছ থেকে মাধ্যমিকে শিক্ষা গ্রহণ করেছে, তা এই মুহূর্তে বলা বেশ কষ্টসাধ্য।
পঙ্কজ বাবু বেশ মিশুক স্বভাবের মানুষ। তার সুসম্পর্ক কমবেশি সকল পেশা ও বয়সের লোকের সঙ্গেই আছে। তাই হয়তো সময় সুযোগ পেলে সকলেই তার কাছে আসে। এক্ষেত্রে মাস্টারমশাইয়ের আগমনে আমি তেমনটা অবাক হইনি।
এই প্রথম সম্ভবত মাস্টারমশাইয়ের পাশাপাশি বসার সৌভাগ্য হয়েছিল। আগে যখন তার কাছে পড়তে যেতাম, সেই ঘরভর্তি ছাত্র-ছাত্রীর মাঝে কখনো তার কাছাকাছি দাঁড়ানো বা বসার মত সুযোগ আমার তেমনটা হয়নি।
পড়াশোনায় আমি বরাবরই দুর্বল ছিলাম। এক্ষেত্রে অবশ্য মাস্টারমশাইয়ের কোন ব্যর্থতা ছিল না। মূলত সকল ব্যর্থতা ছিল আমার। কারণ আমি নিজেই অমনোযোগী ছিলাম ।
সময় কত দ্রুত চলে যায়, দেখতে দেখতে কখন যে মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরিয়ে গিয়েছিলাম, তা বুঝে উঠতেই পারিনি। অতঃপর অনেকটা বছর পর হুট করে আজ মাস্টারমশাইয়ের সঙ্গে দেখা। চেষ্টা করছিল খোঁজ-খবর নেওয়ার জন্য এবং আমিও টুকটাক কিছুটা তার প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছিলাম।
মাস্টারমশাই এখনো বেশ আমাকে মনে রেখেছে, একজন ছাত্র হিসেবে এটাই তো বড় সার্থকতা। আমার আসলে বাস্তবিক তেমন কোন পরিচয় নেই, যেটা আমি তার কাছে উপস্থাপন করব। তাও তো বলেই ফেললাম আগে টুকটাক ডাক্তারি পেশার সঙ্গে যুক্ত ছিলাম, এখন সেটাও ছেড়ে দিয়েছি। তেমন কিছুই করি না, রোজ মানুষ দেখি, ঘুরিফিরি আর টুকটাক লেখালেখি করি।
নিজের থেকেই চায়ের প্রস্তাব দিলাম, যদিও প্রথমত না করেছিল। তবে আমার বিশেষ অনুরোধে পরবর্তীতে মাস্টারমশাই রাজি হয়েছিল। টুক করে তো তাকে বলেই ছিলাম, এমন সময় তো আর রোজ রোজ আসবে না। থাকুক না হয় সময়টা স্মরণীয় হয়ে।
চা-চক্রে সমসাময়িক ব্যাপার নিয়ে অনেক কথাবার্তাই হলো। হয়তো কিছু কথা নিজের থেকে আমিও বললাম এবং তাদেরও কিছু কথা শুনলাম। মাস্টারমশাইকে নিয়ে আসলে দু-চারটে কথায় অনুভূতি লিখে শেষ করা বেশ কঠিন । সে আসলে সম্মানের ঊর্ধ্বে। হয়তো মাধ্যমিকের সময়টাতে যদি তার দেওয়া পুঁথিগত শিক্ষাগুলো না পেতাম, তাহলে হয়তো আমার মতো ছাত্রের জন্য মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরোনো বেশ মুশকিল হয়ে যেত ।
বেঁচে থাকুক, সুস্থ থাকুক, ভালো ও নিরাপদে থাকুক মাস্টারমশাই। তার কাছ থেকে যা পেয়েছি, তা আসলে অফেরত যোগ্য । মাস্টারমশাই আমাকে নিয়ে যে দুটো কথা মানুষের কাছে বলবে, এমন কোন অবস্থায় আমি নেই বা পৌঁছাতেও পারিনি।
তবে মাস্টারমশাই কে নিয়ে যদি কিছু কথা আমাকে বলতে দেওয়া হয়, তাহলে তো এক নিঃশ্বাসে কিছু কথা বলেই ফেলবো, হয়তো আমার জীবন চলার পথটা কিছুটা হলেও সহজতর হয়েছে তার কাছ থেকে পাওয়া প্রাপ্ত শিক্ষা থেকে।
ডিসকর্ড লিংক
https://discord.gg/VtARrTn6ht
| 250 SP | 500 SP | 1000 SP | 2000 SP | 5000 SP |
VOTE @bangla.witness as witness
OR
জীবন চলার পথে মানুষের বিষণ্ণতা থাকে। অনেক সময় মানুষ কি করবে তা কুল পাই না ভেবে। যখন নিজের দিশেহারা হয়ে যায়, ঠিক তখনই কেউ না কেউ আপনার পাশে অবশ্যই দাঁড়াবে। তেমনি পঙ্কজ দাদা আপনার পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন।একটা বিষয় লক্ষ্য করে দেখবেন ভাই,সমাজে যেসব মানুষ গুলো ভালো তাদের বন্ধু অনেক এবং তাদের সবার সাথে ভালো সম্পর্ক থাকে। মাস্টার মশাই কি আপনি যে সম্মান দেখেছেন খুব ভালো লাগলো ভাই। এখন এই সম্মান আর দেখায় না। মাস্টারদের দেখলে সালাম দেয়ার প্রয়োজন বলতেও পারেনা।সমাজের মানুষ অনেকটাই পাল্টে গেছে ভাই। আর এটা ঠিক শিক্ষকরা অবশ্যই সম্মানের উর্ধ্বে। ধন্যবাদ আপনার গল্পটি পড়ে খুব ভালো লাগলো।
আমাদের প্রথম শিক্ষক বাবা-মা হলেও জীবনের গতিতে চলার ক্ষেত্রে অন্যরাও ব্যাপক ভূমিকা রাখেন।আর তারা হলেন আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষকেরা।আর আপনি আপনার মাষ্টারমশাইয়ের সাথে কিছুটা সময় পার করেছেন এটা দেখে সত্যি বেশ ভালো লাগছে ভাই। তাছাড়া এই প্রথম তার পাশাপাশি বসার সৌভাগ্যটা হয়েছে এটাই তো সবচেয়ে বড় বিষয়। কারণ এই সৌভাগ্য সবার হয় না। সর্বোপরি সকলেই ভালো থাকুক এই কামনা আমিও করি।
সবার জীবনেই হয়তো এমন দু-একজন মাস্টারমশাই থাকে যাদের কথা বলে শেষ করা যায় না ।বিশেষ করে মাধ্যমিকের মাস্টারমশাইদের কথা সারা জীবন মনে থাকে। তাদের শিক্ষাটা আমরা হয়তো ঠিকভাবে গ্রহণ করতে পারিনি কিন্তু তাদের দিতে কার্পণ্য ছিল না।