বশিরের দিনকাল (দ্বিতীয় পর্ব)। ১০% প্রিয় লাজুক খ্যাক এর জন্য।
প্রথম পর্বের লিংক
বশির পরদিন সকালে উঠে আবার তার মালিকের বাড়ির সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলো। কিছুক্ষণ পর খেয়াল করে দেখে তার মালিকের গাড়ি বাড়ি থেকে বের হচ্ছে। গাড়ি চালাচ্ছে একজন নতুন ড্রাইভার। এই দৃশ্য দেখে বশিরের মাথার ভেতর চক্কর দিয়ে উঠলো। এতক্ষণ সে আশা করেছিল যে তার চাকরী হয়তো এ যাত্রায় টিকে যাবে। কিন্তু নতুন ড্রাইভার কে দেখে সে বুঝতে পারল তার সমস্ত আশাভরসা শেষ।
সে এখন কি করবে কিছুই বুঝতে পারছেনা। আর কয়দিন পরে বাড়ি ভাড়া দিতে হবে। ঘরে বাজার সদায় তেমন কিছু নেই। সাথে আছে বাচ্চার লেখাপড়ার খরচ। এখন সে কি করবে? কোথায় যাবে কিছুই বুঝতে পারছে না। মন খারাপ করে সে ধীর পায়ে হাঁটতে লাগলো। কোথায় যাচ্ছে সে কিছুই জানেনা। এখন সে হঠাৎ করে কোথায় চাকরি পাবে? এই চাকরিটা তার খুবই প্রিয় ছিল। এখানে পরিশ্রম ছিল খুবই কম এবং বেতন ভালোই ছিল। মালিক লোকটাও খারাপ ছিল না। ড্রাইভারদের কে সাধারণত তাদের মালিক পক্ষের লোকজন কুৎসিত ভাষায় গালিগালাজ করে। কিন্তু তার এই মালিক কখনো তাকে খারাপ ভাষায় গালি দেয় নি। অনেক মালিক আছে যারা ড্রাইভারকে মারধর পর্যন্ত করে। উল্টো যেকোন বিপদে আপদে মালিক অনেক সাহায্য করতো তাকে।
এখন সে হঠাৎ করে চাকরি হারিয়ে ফেলে দিশেহারা বোধ করছে। তার শরীরে এখনো বেশ ব্যথা। সেই ব্যথা নিয়েই সে রাস্তা দিয়ে হেটে যাচ্ছে। হাঁটতে হাঁটতে একটি চায়ের দোকানে গিয়ে বসলো। তৃষ্ণায় তার গলা শুকিয়ে এসেছে। দোকান থেকে গ্লাস নিয়ে এক গ্লাস পানি খেলো। তারপর সে এক কাপ চায়ের অর্ডার দিল। বশির সকালে নাস্তা না করেই বাসা থেকে বেরিয়ে গিয়েছে। এখন তার প্রচন্ড ক্ষুধা লেগেছে। তার পকেটে টাকা পয়সাও খুব একটা বেশি নেই। দুশ্চিন্তায় তার মন আছন্ন হয়ে আছে। বশির বসে বসে চিন্তা করছিল। যেভাবেই হোক তার বসের সাথে তাকে দেখা করতেই হবে। যদিও সে জানে এখন যেহেতু সে একজন নতুন ড্রাইভার নিয়ে নিয়েছে। তাই তার এখন চাকরি পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
হঠাৎ তার মনে পড়লো সে যে অ্যাক্সিডেন্ট করেছে এটা কি তার মালিক জানে। সে তখনই সিদ্ধান্ত নিল সে তার মালিকের অফিসে যাবে। গিয়ে যেভাবে হোক তার মালিকের সাথে দেখা করবে। তারপর তাকে সবকিছু খুলে বলবে। বশির এই অসুস্থ শরীর নিয়ে দ্রুত পা চালিয়ে তার মালিকের অফিসের দিকে রওনা দিল। সেখানে পৌঁছাতে প্রায় দেড় ঘণ্টা লেগে গেল। ইতিমধ্যে দুপুর হয়ে গিয়েছে। অফিসের রিসিপশনে গিয়ে সে তার মালিকের সাথে দেখা করতে চাইল। রিসিপশন থেকে তাকে জানালো তার মালিক বাইরে খেতে গিয়েছে। আসতে কিছুটা দেরি হবে। বশির রিসিপশনের সোফায় বসে রইলো।
এদিকে তার প্রচন্ড ক্ষুধা লেগেছে। কিন্তু কিছুই করার নেই। কারণ এখন যদি সে খেতে বাইরে যায় তাহলে মালিকের সাথে দেখা নাও হতে পারে। এভাবে বসে থাকতে-থাকতে বশির একসময় ক্লান্ত হয়ে সোফায় ঘুমিয়ে পড়ল। হঠাৎ রিসিপশনের লোকটার ধমকে তার ঘুম ভেঙে গেলো। রিসিপশনের লোকটা একজন ড্রাইভারকে গেস্টদের সোফায় বসে ঘুমাতে দেখে অত্যন্ত বিরক্ত হয়েছে। সে বশির কে বলল বাইরে গিয়ে ঘুমাও। বশির অত্যন্ত লজ্জা পেলো। তারপর সে ধীরে ধীরে হেঁটে বাইরে যাচ্ছিল।
এর ভেতর সে দেখল তার মালিক অফিসে ঢুকছে। সে তার মালিককে সালাম দিল। তার মালিক তার দিকে ভালোমতো না তাকিয়ে তার রুমের দিকে চলে যাচ্ছিলো। বসির একটু অবাক হল। সে পেছন থেকে ডাকলো স্যার আপনার সাথে আমার একটু কথা আছে। তারপর তার মালিক তাকে বলল ঠিক আছে আমার রুমে আসো। বশির তখন একটু বুকে সাহস পেলো। বশির তার মালিকের পিছু পিছু তার রুমে প্রবেশ করলো। রুমে ঢুকতেই তার মালিক তাকে বলল কি বলবে তাড়াতাড়ি বলো। আমার অনেক কাজ আছে।
বশির তার মালিককে জিজ্ঞেস করল স্যার কি আমার উপর কোন কারণে রেগে আছেন? তার মালিক উত্তর দিল তোমার মত কেয়ারলেস লোক আমি কখনো দেখিনি। তুমি ডিউটিতে আসো না আবার কাউকে কিছু জানানোর ও প্রয়োজন মনে করো না। বশির প্রচন্ড অবাক হল। বশির বলল স্যার আমিতো ম্যানেজার সাহেব কে জানিয়েছিলাম। বশিরের মালিক বলল কই ম্যানেজার তো আমাকে কিছু জানায়নি। তখন আবার তার মালিক তাকে জিজ্ঞেস করল তুমি সেদিন ডিউটিতে আসোনি কেনো? তখন বশির তাকে সবকিছু খুলে বললো। তারপর সে তার প্যান্ট হাটু পর্যন্ত উঠিয়ে তার মালিককে দেখালো। মালিক বশির এর শারীরিক অবস্থা দেখে কিছুটা কষ্ট পেলো।
সে তখনই তার ম্যানেজারকে ডেকে পাঠালো। ম্যানেজার সাহেব কিছুক্ষণ পর এসে উপস্থিত হলো। ম্যানেজার রুমে ঢুকে দেখে বশির বসে আছে। সে বশিরের সাথে দুর্ব্যবহার শুরু করে। সে বলে তোর এত বড় সাহস তুই আবার স্যারের সামনে এসেছিস। এক্ষুনি এখান থেকে বেরিয়ে যা। তখন মালিক ম্যানেজারকে একটা কড়া ধমক দেয়। বলে আপনি চুপ করুন। আপনি আমাকে কেন জানাননি যে বশির একসিডেন্ট করেছে। আপনি কেন আমার কাছে মিথ্যা কথা বলেছেন? ম্যানেজার যখন বুঝতে পারলো স্যার সব কিছু জানতে পেরেছেন। তখন সে কাচুমাচু ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে রইল। মালিক তখন ম্যানেজার কে বলল আপনি এখন বশিরের কাছে ক্ষমা চাইবেন। তার নামে মিথ্যা অপবাদ দিয়ে আপনি চাকরি খাওয়ার চেষ্টা করেছেন। এটা একটি ভয়ংকর অপরাধ। আপনি যদি বশিরের কাছে ক্ষমা না চান তাহলে আমি এক্ষুনি আপনাকে চাকরি থেকে বের করে দেবো।
ম্যানেজার সাহেবের মুখ লজ্জায় লাল হয়ে গেলো। বশির সাথে সাথে বলে উঠলো থাক স্যার আমার কাছে মাফ চাইতে হবে না। তখন বশিরের মালিক ম্যানেজার কে বলল আপনি যে নতুন ড্রাইভার নিয়োগ দিয়েছেন তাকে এক মাসের বেতন দিয়ে চলে যেতে বলুন। কাল থেকে বশির ডিউটি জয়েন করবে। খুশিতে এবং কৃতজ্ঞতায় বশিরের দুচোখ দিয়ে দরদর করে অশ্রু বয়ে যাচ্ছিল। বশির জানতো তার মালিক অত্যন্ত ভাল লোক। তার কাছে একবার পৌঁছতে পারলে তার আর সমস্যা হবে না। এখন বশিরের বুকটা অনেক হালকা লাগছে। অনেক বড় একটা সমস্যা থেকে সে রেহাই পেলো। তারপর বশির সেদিনের মত খুশিমনে বাড়ি ফিরে এলো। (সমাপ্ত)
Support @heroism Initiative by Delegating your Steem Power
| 250 SP | 500 SP | 1000 SP | 2000 SP | 5000 SP |
🇧🇩🇧🇩ধন্যবাদ🇧🇩🇧🇩
আমি রূপক। আমি একজন বাংলাদেশী। আমি বাঙালি। আমি বাংলায় মনের ভাব প্রকাশ করতে ভালোবাসি। আমি আমার বাংলা ব্লগ কমিউনিটিকেও ভালোবাসি
আপনি খুব অল্পকথায়, বশিরের জীবনের মাধ্যমে পাঠকদের কাছে সমাজের করুন এক বাস্তবতাকে তুলে ধরেছেন।খুবই পীড়াদায়ক হয়,মাঝপথে চাকুরী চলে গেলে,সেটা আর কেউ না বুঝলেও পরিবার-পরিজন নিয়ে থাকা মধ্যবিত্তরা হাড়েহাড়ে টের পায়।যাইহোক, সৎ সাহস নিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়াই সফলতা।ধন্যবাদ, আপনাকে একটি সুন্দর কথনে বাস্তবতা রুপায়ন করার জন্য,ভালবাসা আর শ্রদ্ধা রইলো
ধন্যবাদ আপনাকে ভাই।
শ্রদ্ধা ও ভালবাসা রইলো,ভাইয়া।
বসিরের প্রথম অবস্থা দেখে সত্যি ভেবেছিলাম ওর চাকুরিটা বুজি চলেই যাবে । আসলেই সমাজে এখনো কিছু ভালো মানুষ আছে যাদের জন্যি আমাদের সমাজটা টিকে আছে। আর ম্যানেজারের মতো লোকদের জন্য সমাজে এতো দূর্নীতি । যাইহোক বসির তার চাকুরি ফিরে পেয়েছে, অসহায় সময়ে বসকে পাশে পেয়েছ ভালো লগছে। অসাধারন গল্প লিখেছেন আপনি।