জেনারেল রাইটিং || স্মৃতিচারণ: লিচু চোর ধরার একটি ঘটনা

in আমার বাংলা ব্লগ2 years ago

নমস্কার,

তোমরা সবাই কেমন আছো? আশা করি, সবাই ভালো আছো। আমিও মোটামুটি ঠিক আছি।

lychee-376900_1280.jpg

ইমেজ সোর্স

আমাদের গ্রামের বাড়িতে প্রচুর পরিমাণে ফলের গাছ রয়েছে। এই ফলের গাছগুলোর মধ্যে সবথেকে বেশি রয়েছে আমের গাছ। তবে প্রতিবছর আমাদের গাছের আম কমবেশি চুরি হলেও সব থেকে বেশি চুরি হতো লিচু। আমি যে সময়ের ঘটনাটি আজ শেয়ার করবো, সেই সময়টাতে আমাদের একটি মাত্র লিচু গাছ ছিল। তবে লিচু গাছটা আকারে ছিল অনেক বড় এবং প্রত্যেক বছরই প্রচুর পরিমাণে লিচু হতো। এজন্য সব চোরদের নজর আমাদের এই লিচু গাছের উপরেই থাকতো। তাছাড়া আমাদের গ্রামের অন্য কোন বাড়িতে বড় কোনো লিচু গাছ ছিল না বললেই চলে সেই সময়টাতে। যাদের দুই-একটা লিচু গাছ ছিল তাদের গাছ গুলো অনেকটাই ছোট আকারের ছিল। সেইজন্য সেগুলোতে সেভাবে ফলন হতো না। গ্রামের মধ্যে সবথেকে বেশি ফলন আমাদের লিচু গাছেই হতো।

প্রতিবছর অনেক কষ্ট করে গাছের লিচু পাহারা দিয়ে দিয়ে রাখতে হতো আমাদের। একদিকে চোরের অত্যাচার অন্যদিকে বাদুড়ের অত্যাচার। সব মিলিয়ে খুব বেশি লিচু খাওয়ার সুযোগ পেতাম না আমরা লিচুর মৌসুমে। বাদুড়ের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য কয়েক বছর আমরা জাল টানিয়েও রেখে দিতাম। যদিও জাল টানাতে একটু খরচ বেশি যেত, তবে অনেক লিচু রক্ষা করা যেত এটা করলে। কিন্তু চোরের হাত থেকে তো আর জাল টানিয়ে লিচু রক্ষা করা যায় না, তার জন্য সারা রাত জেগে পাহারা দিতে হতো আমাদের। তবে সব সময় এরকম পাহারা দিয়েও পারা যেতো না। একবার গ্রীষ্মের এক গভীর রাতে আমরা সবাই রাতে ঘুমিয়ে ছিলাম তখন চুরির এই ঘটনা ঘটে। সেইবার রাত দুটো পর্যন্ত মোটামুটি বাড়ির কয়েকজন জেগে থেকে গাছের লিচু পাহারা দেওয়া হয়েছিল। তবে আমরা লিচু পাহারা দিচ্ছিলাম, অন্যদিকে লিচু চোরেরা আমাদেরই পাহারা দিচ্ছিল। সেদিন যা ঘটনাটি ঘটেছিল তা দেখে তাই মনে হচ্ছিল।

গাছের লিচু পাহারা দেওয়া শেষে যখনই সবাই আমরা ঘুমাতে গেছিলাম তার ১ ঘন্টা পরেই এই লিচু চুরির ঘটনাটি ঘটে। সেই সময়টাতে আমার বয়স ১১ বছরের মত হবে। আমি সেইরাতে আমার ঠাকুরদার কোলে ঘুমিয়েছিলাম। এক ঘন্টা পরে আমার ঘুম ভেঙ্গে যায় এবং বাইরের বাথরুমে যাওয়ার জন্য আমি আমার ঠাকুরদাকেও জাগিয়ে তুলি। তারপর আমার ঠাকুরদা আমাকে নিয়ে বাইরে আসে। সেই সময়ই লিচু গাছ থেকে আমি কিছু আওয়াজ শুনতে পাই। যেহেতু লিচু গাছটি আমাদের বাড়ির উঠোনের পাশে ছিল, সেজন্য এই সাউন্ডটা একদম স্পষ্ট শুনতে পাই। সেই সময় অন্য কোন গাছ না নড়লেও লিচু গাছ দেখি একটু জোরে জোরে নড়ছে। আমার ঠাকুরদা বিষয়টা তখন খেয়াল করেনি। তবে আমি আমার ঠাকুরদাকে বিষয়টা বললে, ঠাকুরদাও বিষয়টা খেয়াল করার চেষ্টা করে। তখন ঠাকুরদা এটা বুঝতে পারে যে, কেউ আমাদের লিচু গাছের আশেপাশে অথবা গাছে রয়েছে।

যদিও সেই মুহূর্তে আমরা এই চোর ধরার জন্য যাইনি। আমরা নিরিবিলি প্রথমে আমাদের ঘরের ভেতর চলে আসি , তারপর বাবা ও জেঠুকে ডেকে, লাইট এবং সাথে লাঠি নিয়ে একসাথে বেরিয়ে পড়ি এই চোর ধরার জন্য। অনেক সময় চোরদের কাছে বিভিন্ন ধরনের ধারালো জিনিসপত্র থাকতে পারে। আমরা যদি খালি হাতে সেখানে যাই, তাহলে তাদের দ্বারা আমরা আক্রান্তও হতে পারি, সেইজন্য আমরা সাথে লাঠি এবং লাইট দিয়ে তাড়া করেছিলাম এই লিচু চোরদেরকে। তখন দেখি তিন জন চোর একসাথে জোরে জোরে দৌড়াচ্ছে। আর আমরা সবাই চিৎকার করছি তখন, চোর.. চোর.. বলে ‌। এই সময় তিনজন দৌড়ে পালিয়ে গেলেও যে দুইজন গাছের একদম উপরে ছিল তারা আর পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পায়নি। যাইহোক, যারা দৌড়ে গেছিল তাদের আর সেই মুহূর্তে আমরা ধরতে পারেনি।

তবে যে দুজন গাছে ছিল তাদের ধরে আশেপাশে লোকজনদের ডেকে আমরা গাছের সাথে বেঁধে রেখে দিয়েছিলাম। তাদের বয়স মোটামুটি ২০ থেকে ২৫ এর মধ্যে ছিল আর তারা আমাদের গ্রামেরও ছিল না, তারা অন্য গ্রাম থেকে চলে এসেছিল আমাদের গাছে লিচু চুরি করতে। আমরা যেহেতু দুইজনকে ধরতে পেরেছিলাম তাই বাকি যে তিনজন পালিয়ে গেছিল তাদের সম্পর্কেও আমরা ইনফরমেশন পেয়ে গেছিলাম। পরের দিন সকালে তাদেরকেও সেই গ্রাম থেকে ধরে আনা হয়। তারপর গ্রামে সালিশ বসানো হয় এই চুরির বিষয়টা নিয়ে

এই চুরির শিকার আমরা এর আগেও বেশ কয়েকবার হয়েছি। সেই জন্য তাদের যাতে ভালো রকমের শাস্তি হয়, সেই ব্যবস্থা নেওয়া হয় সালিশের মাধ্যমে। তবে আমি তখন ছোট ছিলাম, এই বিষয়গুলো দেখে আমার একটু খারাপ লাগছিল। চোরদের প্রতি বলতে পারেন, আমার একটু দয়াও হচ্ছিল। তবে কি আর করা যাবে, বাড়ির লোকজন যে সব ডিসিশন নিচ্ছিল আমি তাই দেখে যাচ্ছিলাম। সেইবার চোর ধরার পর আর আমাদের গাছের লিচু চুরি হয়নি অনেক বছর পর্যন্ত।


পোস্ট বিবরণ

শ্রেণীজেনারেল রাইটিং
লোকেশনবারাসাত , ওয়েস্ট বেঙ্গল।
বন্ধুরা, লিচু চোর ধরার এই ঘটনাটি তোমাদের কেমন লাগলো তা কমেন্ট এর মাধ্যমে জানিও । সবাই ভালো থাকো, সুস্থ থাকো , সুন্দর থাকো ,হাসিখুশি থাকো , নিজের পরিবার নিয়ে সুখে শান্তিতে থাকো , সবার জন্য এই শুভকামনা রইল।

ধন্যবাদ সবাইকে






আমার পরিচয়

IMG_20220728_164437.jpg

আমি সুবীর বিশ্বাস( রঙিন)। কলকাতার বারাসাতে আমি বসবাস করি। আমি স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে আমার গ্রাজুয়েশন কমপ্লিট করেছি, ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফিস এন্ড ফিসারিস সাবজেক্ট নিয়ে। বর্তমানে আমি রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যানরত আছি। আমি ব্যক্তিগতভাবে একটু শান্ত স্বভাবের । চুপচাপ থাকতেই বেশি ভালোবাসি আমি। নতুন নতুন জিনিস শিখতে আমার খুব ভালো লাগে। মাঝে মাঝে আর্ট করা, ফটোগ্রাফি করা, রেসিপি করা , গল্প লেখা আমার বেশ ভালো লাগে। আমি স্টিমিটকে অনেক ভালোবাসি এবং সব সময় স্টিমিটে কাজ করতে চাই।

🌷🌷 সমাপ্ত 🌷🌷

Sort:  
 2 years ago 

লিচু চোরের দল তাহলে রীতিমতো শায়েস্তা হয়েছিল যেহেতু তাদেরকে গাছের সাথে বেঁধে রেখেছিলেন হা হা হা।

 2 years ago 

হিহিহি..🤭🤭 ঠিক কথা বলেছেন ভাই। লিচু চোরদের বেশ ভালই শায়েস্তা করা হয়েছিল সেইবার।

 2 years ago 

আসলে গ্রামের মধ্যে এমন কারো বাড়ি থাকতো যাদের ফল গাছ বেশি হয়। আগে তো সবার গাছে গাছে ছিল না, তাই তো এক জায়গা থেকেই চুরি হতো। আপনাদের লিচু চুরি করার জন্য দেখছি অন্য গ্রামের লোক এসেছিল। তবে সেই চোর গুলোকে আপনারা ধরতে পেরেছেন দেখেই অনেক বেশি ভালো লাগলো। নিচে থাকা চোরগুলো হয়তো পালিয়ে গিয়েছিল, আর গাছে থাকা চরগুলো গাছের মধ্যেই আটকে গিয়েছিল, তাই আপনারা ধরে নিতে পেরেছেন। তারা নিশ্চয়ই তাদের কাজের শাস্তি পেয়েছিল।

 2 years ago 

সেটা তো অবশ্যই ভাই, তারা তাদের কাজের শাস্তি পেয়েছিল সেইবার।

 2 years ago 

আসলে বাড়িতে এই ধরনের বিভিন্ন গাছ থাকলে অনেক ঝামেলা পোহাতে হয়। আমাদের গ্রামের বাড়িতেও এইরকম বহু গাছ ছিল, যার কারণে আমারও এরকম অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছি বহুবার। আপনি যে বুঝতে পেরে আপনার ঠাকুর দাদাকে বলেছিলেন এবং তারপর আপনারা সকলে মিলে লাঠি আর লাইট নিয়ে গিয়ে চোরদের ধরতে পেরেছিলেন এটাই ভালো হয়েছে। যেহেতু সবাইকে ধরে নিয়ে গাছের সাথে বেঁধে রাখা হয়েছিল আর গ্রামে সালিশ বসানো হয়েছিল, এজন্যই হয়তো অন্য চোরেরা আর আপনাদের বাড়িতে বহু বছর চুরি করতে যায়নি।

 2 years ago 

যেহেতু সবাইকে ধরে নিয়ে গাছের সাথে বেঁধে রাখা হয়েছিল আর গ্রামে সালিশ বসানো হয়েছিল, এজন্যই হয়তো অন্য চোরেরা আর আপনাদের বাড়িতে বহু বছর চুরি করতে যায়নি।

হ্যাঁ দিদি, এই জন্যই হয়তো পরবর্তী কিছু বছর ধরে আমাদের গাছের লিচু চুরি আর হয়নি।

 2 years ago 

লিচু চুরির ঘটনাটি বেশ ভয়ংকর ছিলো।সত্যি তাই চোরদের হাতে ধারালো অস্ত্র থাকে এবং তা দিয়ে চোর আক্রমণ করে বসে।আপনি ওয়াশরুমে যাওয়ার পথে চোরের উপস্থিতি বুঝতে পারেন এবং ঠাকুর দাদা সহ অন্যদেরকে ডেকে চোর তারা করেছেন জেনে ভালো লাগলো।আসলে চোর নাম শুনলে রাগ লাগে কিন্তুু চোর ধরা পরার পড় মারলে আবার চোরের জন্য খুব খারাপ লাগে।ধব্যবাদ সুন্দর লিচু চোর ধরার গল্পটি আমাদের সাথে ভাগ করে নেয়ার জন্য।

 2 years ago 

আসলে চোর নাম শুনলে রাগ লাগে কিন্তুু চোর ধরা পরার পড় মারলে আবার চোরের জন্য খুব খারাপ লাগে।

এটা একটা জটিল সমস্যা দিদি। তারাও তো মানুষ, তাদেরকে সবাই যখন মারে, সেই বিষয়টা দেখতে তো খারাপ লাগাটা স্বাভাবিক।

 2 years ago 

হাহাহা! চোর তো ফেঁসে গেল দেখছি দাদা! লিচুর গাছে একে তো বাদুরের উৎপাত থাকে সাথে চুরের! আপনি আপনার ঠাকুরদাকে বলে ভালোই করেছেন। চোর দুইটার উচিত শিক্ষা হয়েছিল। আর এরাই মনে হয় রেগুলার চুরি করতো লিচু!

 2 years ago 

তা এক প্রকার বলতে পারেন ভাই, চোরদের বেশ ভালই উচিত শিক্ষা হয়েছিল সেইবার। তবে এরাই রেগুলার চুরি করতো কিনা সেটা জানি না সঠিক ভাবে।

Coin Marketplace

STEEM 0.04
TRX 0.33
JST 0.104
BTC 64621.25
ETH 1928.65
USDT 1.00
SBD 0.37