"🌿 আমার বাংলা ব্লগ 🌾" এ দ্বিতীয় প্রতিযোগিতা : বিষয় - "রচনা প্রতিযোগিতা - নিজের প্রিয় গ্রাম বা শহর"



আসসালামু আলাইকুম।

সবাই কেমন আছেন? আশা করি সকলে খুব ভালো আছেন।আমি আমার বাংলা ব্লগ কমিউনিটিকে ধন্যবাদ জানাতে চায় এতো সুন্দর একটা প্রতিযোগিতার আয়োজন করার জন্য।আমাদের সবার কাছেই আমাদের জন্মভূমি খুবই প্রিয়।আজকে আমি আপনাদের সাথে আমার গ্রাম সম্পর্কে একটা রচনা লিখে শেয়ার করব।আশা করি আমার গ্রাম সম্পর্কে জেনে আপনাদের খুব ভালো লাগবে।চলুন শুরু করি-



"আমার প্রিয় গ্রাম"


PicsArt_07-06-11.19.31.jpg



সূচনা: যদি একটি দেশকে গাছ বলা হয়, তাহলে সেই গাছের শিকড় হলো গ্রাম। আর ডালপালা, পাতা এবং ফল হলো শহর।আমি সেই গাছের শিকড় তথা গ্রামে বাস করি।গ্রামের অপরূপ রূপ দেখতে দেখতে আমার প্রতিটা দিন শুরু এবং শেষ হয়।সকাল বেলা ভোরের পাখির কিচিরমিচির ডাক শুনে ঘুম ভাঙে।সকালের মুগ্ধ বাতাসে ভরে যায় মন।আমি যখন তৃতীয় শ্রেণিতে পড়তাম তখন "বন্দে আলী মিঞা" কবির লেখা একটা কবিতা পড়েছিলাম।কবিতাটার নাম ছিল "আমাদের গ্রাম"। চলুন কয়েক লাইন কবিতা শুনে আসি-



"আমাদের ছোট গাঁয়ে ছোট ছোট ঘর
থাকি সেথা সবে মিলে নাহি কেহ পর।
পাড়ার সকল ছেলে মোরা ভাই ভাই
একসাথে খেলি আর পাঠশালে যাই।
হিংসা ও মারামারি কভু নাহি করি,
পিতা-মাতা গুরুজনে সদা মোরা ডরি।"


গ্রামে আছে মন ভরা ভালোবাসা আর সবার সাথে গভীর সম্পর্ক।সেজন্য আমার কাছে গ্রাম সবচেয়ে বেশি প্রিয়।গ্রামে বাস করে সহজ সরল খেটে খাওয়া মানুষগুলো।



অবস্থান: আমাদের গ্রামটা বাংলাদেশের খুলনা বিভাগের, কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালী থানাধীন সদকী ইউনিয়ন পরিষদের লালন বাজারের পাশে অবস্থিত।আমাদের গ্রামের নাম " চর-আগ্রাকুন্ডা"।আমাদের গ্রামটা অনেক ছোট।সদকী ইউনিয়ন পরিষদের সবচেয়ে শেষের গ্রাম হলো আমাদের গ্রামটা।আমাদের গ্রামের ডাকঘর কুমারখালীতে অবস্থিত।আমি এই গ্রামেই জন্মগ্রহণ করেছি আর এখানেই বেড়ে উঠেছি।আমাদের গ্রামের ঠিক পাশ দিয়েই বয়ে চলেছে একটা নদী। নদীটির নাম "গড়াই"।এই নদী দিয়ে প্রতিদিন কয়েক হাজার মানুষ পারাপার হয়।



আয়তন ও জনসংখ্যা : আমাদের গ্রামটা ছোট হওয়ায় এর আয়তনটা তেমন বেশি না।ছোট্ট এই গ্রামে বাস করে প্রায় তিন হাজারেরও বেশি মানুষ। স্বল্প জায়গার মধ্যেও তারা ভ্রাতৃত্ব বোধ মেনে নিয়ে বসবাস করে যাচ্ছেন।



গ্রামের মানুষের পেশা: আমাদের গ্রামের বেশির ভাগ মানুষই অশিক্ষিত। তাই তারা বেশির ভাগই দিনমজুরের কাজ করে থাকেন।স্বল্প সংখ্যক মানুষ শিক্ষিত এবং তারা বড় ধরনের চাকরি করেন।কেউ কৃষি কাজ করে তার জীবিকা চালায় কেউবা অটো,ভ্যান বা রিকসা চালিয়ে।এরই মাঝে কেউ করে ছোট খাটো ব্যবসা। ইটের ভাটায় ইট কেটেও অনেক দিন চলে যায়।মানুষগুলো অশিক্ষিত হওয়ার মূল কারণ হলো দারিদ্রতা।অভাবের তারনায় আমাদের গ্রামের মানুষের ছেলেদেরকে অনেক ছোট বয়সেই কাজ করে নিজের পরিবারকে দেখতে হয়।আর খুব অল্প সংখ্যক মানুষই ভালো করে লেখা পড়া করার সুযোগ পায়।

IMG_20210706_113337_399.jpg



গ্রামের ঘর-বাড়ী: গ্রামের মানুষ যেহেতু বেশির ভাগই গরিব। তাই তাদের বাসস্থানগুলো তেমন ভালো না।স্বল্প সংখ্যক মানুষের বাড়ী ঘরে ইট দিয়ে গাথা বা ভালো করে নির্মাণ করা।তাছাড়া বেশির ভাগ মানুষেরই বাড়ী মাটির ডুয়া আর টিনের চাল দিয়ে তৈরি।অনেকের আবার শুধু ঘরের ডুয়া বা মেঝে ইট দিয়ে তৈরি করা বাকি সব কিছু টিন দিয়ে।গ্রামের ঘরগুলো কাঁঠ এবং বাঁশের সাহায্যে সুন্দর করে নির্মাণ করা হয়।আমাদের গ্রামে তিন থেকে চারটা ভালো সুন্দর বাড়ী আছে।আমাদের নিজের বাড়ীও মেঝেটা শুধু ইট দিয়ে তৈরি আর বাকি গুলো টিনের দ্বারা নির্মাণ করা।

IMG_20210706_110039_308.jpg



গ্রামে উৎপাদিত জিনিস: যেহেতু আমাদের গ্রামের মানুষ বেশির ভাগই গরিব। দিনমুজুর খেটে খাওয়া মানুষ।তাই আমাদের গ্রামে তেমন কিছু উৎপন্ন হয় না শুধু কৃষি পণ্য ছাড়া।এখানে বেশির ভাগ মানুষই কৃষি কাজ করে।তাই এখানে সব ধরনের সবজি পাওয়া যায়।যেমন:আলু,পটল,বেগুন,ঢেঁড়স,চালকুমড়া, কলা,শাক,ওল, সহ সব ধরনের সবজিই চাষ করা হয় আমাদের গ্রামে।এই সবজিগুলো চাষ করার পর সেগুলো শহরের বাজারে নিয়ে গিয়ে বিক্রয় করা হয়।একজন কৃষক সারাটা দিন রৌদ্রের মধ্যে কষ্ট করে এই ফসলগুলো ফোলিয়ে থাকেন।



গ্রামের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠা : আমাদের গ্রামেটা ছোট হলেও এখানে সব ধরনের প্রতিষ্ঠাই আছে।আমাদের গ্রামে রয়েছে একটা প্রাইমারি স্কুল।যেটার নাম : "চর-আগ্রাকুন্ডা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়"।আমি নিজেও এই বিদ্যালয়ে ছোট বেলা পড়াশুনা করেছি।এখানে রয়েছে একটা জামে মসজিদ।মসজিদ থাকলেও এখানে কোনো মাদ্রাসা এখনও গড়ে ওঠে নাই।একটা ইদগাহ্ এবং একটা গোরস্থানও রয়েছে।আমাদের গ্রামের পাশেই একটা মাধ্যমিক বিদ্যালয় রয়েছে।তার নাম : "গড়াই মাধ্যমিক বিদ্যালয়"।তবে আমি এখানে পড়াশুনা করি নাই। আমি আমাদের কুমারখালী থানার মধ্যে একটা নামকরা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পড়াশুনা করেছি।বিদ্যালয়টার নাম: "কুমারখালী এম.এন পাইলট মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয়" ।আমাদের গ্রামে যেহেতু কোনো হিন্দু বাস করে না তাই আমাদের গ্রামে কোনো মন্দির নির্মাণ করা হয় নাই।এছাড়া এখানে রয়েছে একটা ছোট্ট বাজার।

IMG_20210706_105949_828.jpg

IMG_20210706_134753_550.jpg



গ্রামের যোগাযোগ ব্যবস্থা: আমরা যেহেতু গ্রামে বাস করি তাই আমাদের যোগাযোগের তেমন কোনো সুবিধা নাই।আর আমাদের গ্রামে রয়েছে একটা নদী।নদী পার হলেই তবে শহরের সব ধরনের সুযোগ সুবিধা ভোগ করা যায়।আমাদের যেকোনো কাজে শহরে যেতে হলে নদী পার হতে হয়।আর নদী পার হওয়ার মাধ্যম হলো নৌকা।যেহেতু নদীতে এখনও ব্রীজ নির্মাণ হয় নাই তাই নৌকায় যাতাযাত করা লাগে।তবে গত এক বছর হলো ব্রিজ নির্মাণের কাজ চলছে।কাজ প্রায় ৫০ ভাগ শেষ হয়েছে।আমাদের গ্রামে কোনো হাসপাতাল না থাকায় কারুর কোনো ধরনের সমস্যা হলে তাকে নদী পার করে হাসপাতালে নিতে হয়।এর জন্য নদী পার হওয়ায় দেরি হলে অনেক রোগীর সমস্যা দেখা দেয়।নদী ছাড়া শহরে যাওয়ার অন্য কোনো পথ নেই আমাদের গ্রামের।সব দিক থেকে বলা যায় আমাদের গ্রামের যোগাযোগ ব্যবস্থাটা খুব সংকটের মধ্যে আছে।তবে নদীতে ব্রিজ নির্মাণের কাজ শেষ হলে আমাদের এই ভোগান্তি শেষ হবে।

IMG_20210706_110704_063.jpg

IMG_20210706_110645_306.jpg

IMG_20210706_110317_473.jpg

IMG_20210706_110119_385.jpg



গ্রামের হাটবাজার ও দোকানপাট: আমাদের গ্রামে কোনো ধরনের হাট বসে না।আমরা পাশের গ্রামে যে হাট বসে সেখানে আমাদের প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো কিনতে যায়।প্রতি রবিবারের দিন সেখানে হাট বসে।হাটে সকল ধরনের পশু ক্রয় -বিক্রয় করা সহ নানা ধরনের সবজিও পাইকারি এবং খুচরা বিক্রয় করা হয়।আমাদের গ্রামের মাঝে রয়েছে ছোট একটা বাজার।সেখানে রয়েছে ৫/৬ টা দোকান।একটা ঔষুধের দোকান, দুইটা চায়ের এবং দুইটা মুদি খানা সহ একটা কাঠের দোকানও রয়েছে।এখানে কাঠ দিয়ে বিভিন্ন ধরনের জিনিস নির্মাণ করে খুচরা বিক্রয় করা হয়।

IMG_20210706_134742_578.jpg



গ্রামের রাস্তা: আমাদের গ্রামের বেশির ভাগ রাস্তাই মাটির। তবে কিছু দিন আগে গ্রামের মাঝ খান দিয়ে যে রাস্তাটা গিয়েছে সেটা পাকা করে দিয়েছে সরকার থেকে।তাছাড়া বাকি রাস্তাগুলো এখনও মাটিরই রয়েছে।গ্রামের মেটো পথ দিয়ে হাটতেঁ বেশ ভালো লাগে আমার। সুন্দর প্রাকৃতিক দৃশ্য আর বাতাসের মাঝে যেন আমি হারিয়ে যায়।

IMG_20210706_110025_609.jpg



গ্রামের নারীরা: আমাদের গ্রামের নারীরাও বসে থাকেন না।তারা পুরুষের পাশা পাশি বাড়ীতে বিভিন্ন ধরনের পশুপাখি পালন করে আয় করেন।তারা বাসায় হাসঁ,মুরগি, ছাগল-গরু পালন করে থাকে।যার ফলে তারা আর্থিক দিক দিয়ে লাভবান হন।এছাড়াও মেয়েরা বিভিন্ন ধরনের সুন্দর সুন্দর নঁকশি কাঁথা তৈরি করে সেলাই করেন।



গ্রামে কাটানো ছোট বেলা: আমার কাছে যেন মনে হয় গ্রামের মতো অন্য কোথাও ছোট বেলাটা এত আনন্দ করে কাটানো যায় না।সকাল বেলা ভোরে মায়ের বকুনি শুনে ঘুম থেকে উঠতে হয়। তারপর তারাতরি হাতমুখ ধুয়ে ওজু করে মসজিদে যেতে হয় কুরআন শিক্ষার জন্য।মসজিদ থেকে এসে আবার যেতে হয় প্রাইভেট পড়তে।এরপর স্কুল করে এসে হয় বিকালের সময়। তখন ছোট মানুষেরা মেতে ওঠে নানা ধরনের খেলায়। কেউবা বল নিয়ে, কেউ দৌরদৌরি করে।তারা যেন এক অন্য দেশে হারিয়ে যায়।



গ্রামের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য : অপরূপ সৌন্দর্যের লিলাভুমি আমাদের গ্রামটা।চারিদিকে সবুজের খেত।পাশ দিয়েই বয়ে চলেছে প্রবহমাণ নদী।যার বুকে হাজারও জেলে প্রতিদিন সকাল এবং বিকালে মাছ ধরে তাদের জীবিকা নির্বাহ করে থাকেন।সবুজ শ্যামল মাঠ ভরা খেত আর কৃষকের মুখের হাসি যেন আমাদের মনটাকে জুরিয়ে দেয়।ভোরের সূর্য যখন পাকা ধান খেতের উপর পরে মনে হয় যেন সোনার মতো চিক চিক করে।সবুজ শ্যামল মাঠ ভরা খেত নিয়ে আমাদের এই গ্রাম খানি।

20201123_195510.jpg

IMG_20210706_110631_783.jpg

IMG_20210706_110331_879.jpg

IMG_20210706_110259_462.jpg

IMG_20210706_110215_943.jpg



গ্রামের বন্ধুরা: আমরা যারা গ্রামে বাস করি তারা হয়ত প্রতিদিন বন্ধুদেরকে নিয়ে পার্টিতে বা বড় কোনো ধরনের রেস্টুরেন্টে যেতে পারি না।তবে আমরা বিকেল হলেই কয়েক জন বন্ধু মিলে বেরিয়ে পরি ঘুরতে।খুজতে যায় প্রকৃতির অপরূপ রূপকে।যার মাঝে আমরা নিজেদেরকে হারিয়ে ফেলে।বেশির ভাগ বিকেলটায় কাটে বন্ধুদের সাথে নদীর তীরে হেটে বা কখনও চায়ের দোকানে চা খেতে খেতে আড্ডা দিয়ে।এই মজাগুলো কখনও শহরে গেলে পাওয়া যাবে না।

20201123_165134.jpg

20201123_172336.jpg

IMG_20210706_110913_966.jpg

IMG_20210706_110618_150.jpg

IMG_20210706_110528_911.jpg

IMG_20210706_110343_965.jpg



উপসংহার : আমাদের গ্রাম খানি মায়ায় ভরা, আলোতে বাতাসে রেখেছে ভোরে।আমার কাছে আমার গ্রামখানি সবচেয়ে বেশি প্রিয়।এখানকার মানুষের মাঝে নেই কোনো হিংসা।শেষে আমার নিজের মন থেকে কিছু বলে শেষ করতে চায়।


"আমাদের গ্রাম খানা মায়ায় ভরা
সহজ সরল মানুষের আনাগোনা
ভোরের পাখি যেন ঘুম ভেঙে দেয়
শিশিরের ফোটা যেন চোখ খুলে দেয়
আমার জন্মভূমি সে যে আমার গ্রাম খানি।"



Cc:
@rme
@rex-sumon
@hafizulla
@curators
@blacks


RGgukq5E6HBM2jscGd4Sszpv94XxHH2uqxMY9z21vaqHt2kFULPYJ54Xb4fwnoWiqhnsVGNxUzm11EdnGCa7fkkDE1L3RcvRuixigDGPZV8mEE3dfWRPrqDE6fkyJYE.png

Sort:  
 5 years ago 

আপনি আপনার গ্রাম সম্পর্কে অনেক সুন্দর ও বিস্তারিত ভাবে লিখেছেন । আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ

আপনাকেও অনেক ধন্যবাদ আমার পোষ্টটা পড়ার জন্য।

Coin Marketplace

STEEM 0.04
TRX 0.33
JST 0.083
BTC 64052.22
ETH 1725.47
USDT 1.00
SBD 0.42