অন্তরালের ছায়া সিজন ২, পর্ব ৭ : অপরাধীর সাক্ষর

in আমার বাংলা ব্লগ10 months ago

পর্ব ৭ : অপরাধীর সাক্ষর


1000113649.jpg

মতিউরেরা রকির বাসায় আসার পরেই কিছুক্ষণের মধ্যে ৬-৮ টা গাড়ি ভর্তি করে পুলিশ সদস্যরা রকির বাসায় ঢুকলো, আবার অন্য দিকে নদী পথে কয়েক ইউনিট নৌপুলিশও এসে হাজির হলো নদীর তীরে ।






বখতিয়ারের ঘুষি খেয়ে সেই ব্যাক্তি অনেকটাই দুর্বল হয়ে গিয়েছে । তবুও মুন্না তাকে ধরতে গেলে হাতে থাকা একটি ছুরি দিয়ে মুন্নাকেও তার হাতে আঘাত করে । তখন একই সাথে সকলেই সেই ব্যাক্তির উপরে ঝাপিয়ে পরায় সে একটা সময় নিজেকে আত্মসমর্পণ করে তাদের কাছে ।

মুহুর্তের মধ্যেই সময় অপচয় না করে রকির লাশকে পোস্টমর্টেম করার জন্য পাঠিয়ে দেয় মতিউর এবং শহরের কুক্ষেত সিরিয়াল কিলারকে মুখে কালো কাপড় দিয়ে পেছিয়ে থানায় নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেয় । মতিউরের কথা মতো তাকে থানায় এনে আলাদা একটি রুমে রাখা হয় তার জিজ্ঞেসাবাদের জন্য এবং রুমের চারপাশেও নিরাপত্তা শক্ত করা হয় ।

রুমের ভিতরে চেয়ারের মধ্যে বসে আছে অতিভদ্র একজন ব্যাক্তি, সুন্দর করে একটি ফুল হাতার শার্ট পরা, নিচে ইস্ত্রি করা পেন্ট পরা, কিন্তু রকির বাসার দস্তাদস্তির সময় অনেকটাই তার জামা কাপড় নষ্ট হয়ে আছে । কিন্তু তার চোখে মুখে কোনো চিন্তার ছাপ দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না । চেয়ারে বসে একটি পা অবিরত নাড়িয়ে যাচ্ছে । ডান হাতটা তার স্বাভাবিক থাকলেও বাম হাতটা অনেকটাই বাঁকা খুব সম্ভবত অনেক আগে বা ছোট সময় হাত ভেঙে গেলে বা হাতে রড লাগানো হলে এভাবে বাঁকা হয়ে থাকে । সে চেয়ারে বসেই টুকা দিয়ে দিয়ে তার শরীরের জমাট রক্তগুলো সড়ানোর চেষ্টা করছে খুবই শান্তভাবে ।

কিছুক্ষণ পরেই মতিউর, বখতিয়ারসহ সকল ইউনিট রুমে প্রবেশ করলো । আর জবাবদিহি শুরু করলো মতিউর নিজেই । সে প্রথমে বলে —

— কি নাম আপনার?

— ডাঃ রাজীব ।

— আপনি ডাক্তার?

— না সাবেক ডাক্তার ।

— কিসের ডাক্তার ছিলেন?

— নিউরো সার্জন ।

— তাহলে এসব কাজে জরালেন কেন?

— (কিছু না বলে হাসতে শুরু করলো)

— আপনি কি মানুষ? একজন মানুষের দ্বারা কি এতগুলো খুন করা সম্ভব বলেন? খুন করলেন ত করলেন, এমন নৃশংসভাবেও যে কেউ কাউকে খুন করতে পারে তা আমার জানা ছিলো না । একে একে ৫ টি খুন করেছেন আপনি । আর সবগুলো লাশকে এমনভাবে বিকৃত করেছেন যে আমার মুখের ভাষা নেই বলার মতো । কেন খুন করেছিলেন আপনি ওদের বলুন । (রেগে গিয়ে)

— ওদেরকে আমি তাদের কৃতকর্মের ফল দিয়েছি স্যার ।

— আমাদের সাথে কি মসকারা করছেন আপনি?

— তা করতে যাবো কেন স্যার?

— তাহলে ওদের কেন হত্যা করেছেন সেটা বলেন ।

— সাইরা! আমার ছোট বোন সাইরা । সাইরা যখন ৮ম শ্রেণিতে পড়ে তখন এক এক্সিডেন্টে আমরা আমাদের মা-বাবাকে হারিয়ে ফেলি । তখন থেকেই আমরা এতিম হয়ে যাই এই দুনিয়ায় । তবুও আমি কষ্ট করে আমার পড়াশোনা চালিয়ে যাই আর সাইরার দায়িত্ব নেয় আমার ছোট চাচা । কিন্তু এতে যে চাচা ব্যাতিত আর কেউই তার পরিবারে খুশি ছিলো না সেটা তাদের কর্মকাণ্ডেই বুঝা যেতো । কিন্তু তখন আমাদের আর কিছু করার ছিলো না । আমি আমার পড়াশোনা শেষ করি খুবই কষ্ট করে । অর্থ এবং সময় দুটিই তখন আমার কাছে মূল্যবান ছিলো । অনেক কষ্টে আমার পড়াশোনা শেষ করে যখন আমি ডাক্তার হই তখন সাইরার থেকে খুশি হয়তো পৃথিবীতে আর অন্য কেউ হয় নি সেদিন ৷ আমি ডাক্তার হয়ে গেলেও তখনো তেমন একটা ভালো স্থানে পৌঁছুতে পারিনি । যাইহোক ধীরে ধীরে আমি যখন একটা পর্যায়ে চলে যাই তখন আমি ঠিক করি সাইরাকে আমার কাছে নিয়ে এসে পড়বো । তাকে আমার কাছে রেখে ভালো একটি কলেজে পড়াশোনা করাবো । যেই কথা সেই কাজ, আমি তাকে আমার কাছে নিয়ে আসলাম । সে প্রথমে আসতে রাজি হয়নি, কিন্তু তারও একটা উপযুক্ত বয়স হয়েছে ভালো মন্দ বোঝার তাই সেও রাজি হয়ে যায় । তাকে আমি শহরের সেরা কলেজে ভর্তি করাই । আমি সে কলেজে পড়া অবস্থাতেই তাকে বিয়ে দিয়ে দিবো আর তারপরে আমি করবো । কিন্তু তা আর হলো না । (কান্না করতে করতে)

— কেন?

— সে কলেজে পড়ার সময় কোনোভাবে নাদিরার সাথে পরিচিত হয় । আর তারপরেই সে আর নাদিরা প্রায় সময়ই এক সাথে সময় অতিবাহিত করতো । সাইরারও তেমন বন্ধু বান্ধব না থাকায় আমিও তাকে কোনো সময় মানা করতাম না । এভাবেই চলতে লাগলো অনেকদিন । একদিন আমি আমার চেম্বারে বসে রয়েছি, রোগি দেখা শেষ করলাম মাত্র ৩০ মিনিটের মতো হবে । তার পরে বসে রেস্ট নিচ্ছিলাম একটু । তখনই হঠাৎ করে কে বা কারা যেন জিপ গাড়ি থেকে চাদর দিয়ে মোড়ানো একটা কিছু আমার চেম্বারের সামনে রেখে অনেকক্ষণ হর্ণ বাজাতে শুরু করলো । তখন আমি বের হতে হতেই তারা আবার তাদের গাড়ি নিয়ে চলে গেলো । আমি কিছু মুহূর্তের জন্য কিছুই বুঝে ওঠতে পারছিলাম না । তখন আমি সাহস করে আরেকটু সামনে আসি এসে দেখি চাদর দিয়ে কিছু একটা পেছানো, দেখে বুঝায় যাচ্ছিলো এটা কোনো মানুষের বডি । আর ভিতর থেকে গোঙ্গানোর আওয়াজ আসছিলো । আমি তাড়াতাড়ি করে চাদর সরাতেই আমার শরীরে হুট করে আকাশ থেকে বজ্রপাত হলো । এতো দেখি আমার কলিজার টুকরা সাইরা (বলেই কান্না শুরু করে দিলো) । (আরেকটু স্বাভাবিক হয়ে) আমি তখন দ্রুত ভিতরে নিয়ে যাই আমার চেম্বারে । সাইরার শরীরের অবস্থা খুবই বাজে ছিলো । জানোয়ারের দলেরা আমার বোনকে প্রথমে রেইপ করে পরে ওকে প্রাণে মেরে ফেলতে চেয়েছিলো । তার মাথায় একটা বড় ফ্রেকছার ছিলো । হাতগুলো আর পা গুলো তখনো দড়ি দিয়ে বাধা ছিলো । সাইরা ঠিক মতো নিশ্বাসও নিতে পারছিলো না । কথা বলতে গেলে বার বার ওর কথা আটকে যাচ্ছিলো । তবুও সে কাঁপা কাঁপা গলায় আমার সাথে কিছুক্ষণ কথা বললো । আমি তাকে এসব বিষয়ে প্রশ্ন করলে সে আমাকে বলে — " ভাইয়া আজকে যখন আমি কলেজ থেকে বাসায় আসি তখন রাস্তায় নাদিরার সাথে আমার দেখা হয় । পরে জানতে পারি সে এইদিকে তার কোনো ক্লাইন্টের বাসায় গিয়েছিল । তার পর সে আমাকে এক প্রকার জোর করে তার সাথে করে নিয়ে যায় । তারপরে আমরা গিয়ে ওঠলাম একজনের ফ্লেটে । সেখানে আগে থেকেই ৪ জন ছেলে ছিলো । আমি ওদের দেখে কিছুটা অস্বস্তি অনুভব করায় চলে আসতে চাই কিন্তু নাদিরা বললো যে ১০ মিনিটে সেও বের হবে আর তার ক্লাইন্টের এড্রেসও নাকি আমাদের বাসার কাছেই । তাই আমার ইচ্ছে না থাকা সত্বেও গিয়ে একটি রুমের সোফায় বসি । আমি রুমে একাই বসে ছিলাম । কিন্তু পাশের রুম থেকে নাদিরাসহ ওদের কথা বার্তা শুনতে পাচ্ছিলাম আর ওরা কিছু একটা নিয়ে তর্ক করছিলো । আমি কি হয়েছে দেখার জন্য যখন সেই রুমের কাছে যাই তখন শুনলাম তারা কোনো মেয়ে নিয়ে কথা বলছে । আমি তখন সঙ্গে সঙ্গে তাদের মাঝে না গিয়ে কিছু সময় সেখানেই দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করলাম আর বুঝার চেষ্টা করছিলাম আসলে তারা কোন মেয়ের কথা বলছে । তার পরে ভাইয়া আমি বুঝতে পারি আসল বিষয়টি । নাদিরা স্পা সেন্টার চালানোর পাশাপাশি সে আরেকটি কাজ করতো সেটা হচ্ছে সেই জানোয়ারদের মনে খোরাক মেটানোর জন্য মেয়ে বের করে দিতো । এটা সে অনেক দিন যাবৎ এই করে আসছে । কিন্তু কিছুদিন আগে নাকি একটা মেয়েকে নিয়ে এসেছিলো, সেই মেয়ে নাকি এবার তাদের নামে মামলা করবে বা আরো কি যেন বললো । অর্থাৎ তারা এবার বিপদে পরতে পারে । আমি তাদের এসব কথা শুনেই আস্তে পায়ে পিছনে আসতে যাই আর তখনই আমার পায়ের ধাক্কা লেগে পিছন দিয়ে কিছু একটা পরে যায় আর শব্দ হয় । সেই শব্দ শুনেই সকলেই আমার দিকে তাকায় আর আমাকে দেখে কিছুটা বিচলিত হয়ে যায় ভাইয়া । আর তখনই নাদিরা বলে ওঠে ও সব শুনে গিয়েছে দিহান । এই বলে সে আমার কাছে আসলো, এসে আমাকে সুন্দর করে বুঝাতে শুরু করলো আমি যেন এই কথা কাউকে না বলি ভাইয়া । কিন্তু আমি ভয়ে কান্না করতে শুরু করি কারণ আমি কখনও নাদিরার এমন রূপ দেখি নাই । এসব দেখে রুবেল বললো যে এই মেয়েকে বিশ্বাস করা যাবে না নাদিরা, ওর কিছু একটা করতে হবে । ও বেচে থাকলে আমাদের বিপদ হতে পারে । তার কথায় দিহানও সায় দেয় ভাইয়া । আর রকি তো আরো বাড়িয়ে বলে আমার সম্মান নষ্ট করে আমাকে মেরে ফেলতে । নাদিরা প্রথমে সকলকে থামানোর চেষ্টাও করে ভাইয়া কিন্তু একটা পর্যায়ে যখন আমাকে সে শান্ত করতে পারছিলো না তখন ভাইয়া সেও আমার মাথার চুলে ধরে আমাকে আরেক রুমে নিয়ে গিয়ে জানোয়ারদের হাতে তুলে দেয় ভাইয়া । তখন নাদিরাকেও আমার অচেনা মনে হচ্ছিলো ভাইয়া । আমি ভাবছিলাম ও আমার এত ভালো বন্ধু হয়ে আমার সাথে এমনটা কেন করতেছে । আমি ভাইয়া নাদিরাকে বলছিলাম যে আমরা তো বোনের মতো আমাকে ছেড়ে দাও তুমি! তুৃমিও তো একজন মেয়ে তুমি কিভাবে পারো এসব । সে তখন আমার চুলগুলো আরো শক্ত করে ধরে টান দিয়ে বলে — "সবার আগে আমি, আমি বেঁচে থাকলে সব ঠিক থাকবে"। এই বলে সে জানোয়ার গুলোর কাছে আমাকে দিয়ে সে রুম থেকে বেরিয়ে গেলো। সাইরাকে তখন আমি আবার জিজ্ঞেস করি যে সে ওদের চিনে কিভাবে, তার প্রতিত্তোরে সে বলে "বাসায় যখন শুরুতে আসে তখন নাদিরাই তাদেরকে একে একে পরিচয় করিয়ে দেয়"। আমি তখন তাকে আবার জিজ্ঞেস করলাম পরে কি হয়েছিল, তখন সে আবার বলা শুরু করলো — " যখন শয়তানগুলোর খিদে মিটে গেলো তখন রকি বলে উঠলো আমাকে মেরে ফেলার জন্য । সেই প্রস্তুতিও রুবেল নিতে শুরু করে দেয় । তখন নাদিরা আবার রুমে প্রবেশ করে । আর সে আমাকে দেখে তার মন পরিবর্তন করে আর তাদেরকে বলে । দেখ ওর অবস্থা এমনিতেই খারাপ হয়ে গিয়েছে, ও বার বার অচেতন হয়ে যাচ্ছে আর তাছাড়াও ওর ভালো একটা শিক্ষা হয়েছে । আমি ওকে চিনি, ওকে নিয়ে আর টেনশন করতে হবে না আমাদের । নাদিরার এই কথা বলতেই দিহান হেসে হেসে উত্তর দিলো "ও তাই" এই বলে তার হাতে থাকা রড বা কিছু একটা দিয়ে আমার মাথায় অনেক জোরে আঘাত করে আর এর পরে আমি আর কিচ্ছু বলতে পারি না ভাইয়া । ভাইয়া আমি আর পারছি না ভাইয়া! আমার অনেক কষ্ট হচ্ছে ভাইয়া । তুমি আমাকে ক্ষমা করে দিয়ো ভাইয়া । আমি তোমার স্বপ্নগুলোকে পূরণ করতে পারলা............" এতটুকু বলেই আমার সাইরা আমাকে ছেড়ে চলে যায় সারাজীবনের জন্য"। (আবার কান্না শুরু করলো)

— তাহলে দেশে কি পুলিশ প্রশাসন নেই? আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার অধিকার আপনাকে কে দিয়েছে?

— না স্যার ছিলো না । আমি পরের দিনই থানায় যাই তাদের বিরুদ্ধে মামলা করার জন্য স্যার, কিন্তু এমপির ছেলে বলে পুলিশও আমার মামলা নিতে রাজি হচ্ছিল না । তখন এক অফিসার আমাকে বসিয়ে অন্য এক রুমে গিয়ে কার সাথে যেন কথা বলে আর ফিরে এসে আমাকে উল্টা পাল্টা কথা বলতে লাগে আর আমাকে ভয় দেখাতে শুরু করলো এমপির । অবশ্য শুধু এমপি না বাকিদেরও থানার লোকদের সাথে খুবই ভালো একটা সম্পর্ক ছিলো ।

— আপনি একজন শিক্ষিত লোক হয়ে এতটুকু ধারণা রাখেন না যে তাদের উপরেও কেউ আছে? আপনি তাদের কাছে গেলেন না কেন?

— কার কাছে যাবো, সবাই তো দিন শেষে এক সুতা দিয়েই গাঁথা । এখানে আমাদের দুঃখ কষ্ট দেখার মতো কেউ নেই ।

— আমি আপনার সাথে একমত পোষণ করতে পারি যে উপর মহলের চাপের ফলে অনেক অফিসারই সেফ জোন দিয়ে চলা ফেরা করে কিন্তু আপনার এই কথা আমি কোনোভাবেই মানতে পারছি না যে সাধারণ লোকজনদের দেখার মতো আর বিচার পাওয়ার অধিকার নাই ।

এই বলে রুমে কিছু সময় পিন ড্রপ সাইলেন্ট । কেউ কোনো কথা বলছে না । একপর্যায়ে মতিউর আবার বলে উঠলো —

— আপনার সাথে যা হয়েছে সেটা সত্যিই অন্যায় হয়েছে, আপনার এবং আপনার বোনের জন্য আমারও খারাপ লাগছে । কিন্তু আপনি আইনকে নিজের হাতে তুলে নিয়েছেন, আর এর থেকে বড় অপরাধ আর একটিও নেই । এখন আপনার বিচার করবে মহামান্য আদালত ।

এই বলে মতিউরও রুম থেকে বের হয়ে গেলো । বের হয়ে সকলেই এক শান্তির নিশ্বাস ফেললো । অবশেষে তারা পেরেছে, তারা পেরেছে শহরের সেই সিরিয়াল কিলারকে আইনের আওতায় আনতে । তখনই হঠাৎ মুন্না প্রস্তাব করলো যে ডাঃ রাজীব এর সাথে যেই অফিসার এমন করেছে সেটারও যেন একটা সুস্পষ্ট তদন্ত হয় । তার এই প্রস্তাবে সকলেই একমত পোষণ করে এবং মতিউরকে এর দায়িত্ব দেওয়া হয় ।

দেখতে দেখতেই রাত পেরিয়ে সকাল হয়ে আসলো, এরই মাঝে সেই রাত থেকেই একেক করে মিডিয়া আর সাধারণ জনগণ আসতে শুরু করে । কেউ আসে রিপোর্ট করবার জন্য তো কেউ আসে কৌতুহলবসত । যাইহোক, সকাল ৯টার দিকে মতিউর আর তার সম্পূর্ণ টিম বের হয়ে আসলো প্রেস ব্রিফিং এর জন্য, মতিউর তখন সকলের সামনে এসে বলতে লাগলো —

— আপনারা এত দিন যাবৎ দেখেছেন, শহরে এক সিরিয়াল কিলার একের পর এক খুন করেই যাচ্ছিলো । সে, তার একটি পূর্ব ঘটনাকে কেন্দ্র করে এই খুন গুলি পরিচালনা করে । তার টার্গেটে থাকা সবগুলো সাস্পেক্টকেই সে খুন করতে সক্ষম হলেও পরিশেষে এক রুদ্ধশ্বাস অভিজানের মাধ্যমে আমি, আমার পুলিশ বাহিনীর টিম এবং একটি প্রাইভেট টিম মিলে তাকে আটক করতে আমরা সফল হয়েছি ।

— এভাবে নিরীহ লোকদের হত্যা করার পিছনের কারণটা কি আমরা সেটা জানতে চাই । (সংবাদ কর্মী )

— দেখেন! আসলে আপনার কথা সম্পূর্ণ সঠিক না । আপাতদৃষ্টিতে তারা নিরীহ বলে মনে হলেও তাদেরও অনেক দোষ ছিলো । এবং তারা একটি জঘন্য কাজে লিপ্ত ছিলো । আর তারই পরিপ্রেক্ষিতে একটা সময় তাদের এই কৃতকর্মের ফল পেয়েছে । সুতরাং পরিশেষে আমরা কেবল এটিই বলতে পারি যে খুন হওয়া ব্যাক্তিরাও একেবারে নির্দোষ না । আর এখনো মহামান্য আদালতের রায় আসার বাকি আছে, তার পরেই ঘটনার একটি সুস্পষ্ট তদন্ত করে বলা যাবে আপনাদেরকে । আপাতত আমরা এখন এটাই বলতে পারছি অতি আনন্দের সাথে যে অপরাধী এখন আমাদের আওতায় আছে এবং এখন আর ভয়ের কোনো কারণ নেই ।

— আপনি বললেন তারা একটি জঘন্য অপরাধের সাথে জড়িত ছিলো, বিষয়টি একটু খোলাসা করে বলুন । (সংবাদ কর্মী)

— এখন পর্যন্ত আমরা যে তথ্য পেয়েছি তাহলো তারা একপ্রকার নারীক্যালেঙ্কারিতে জড়িত ছিলো এবং তাদের বাবা বা আত্মীয়র পাওয়ার এর ফলে অবাদে নিশ্চিন্তে সমাজে চলাফেরা করতো । এরই সাথে আমি আরেকটি বার্তা দিতে চাই আপনাদের মাধ্যমে, ক্ষমতা দেখিয়ে যারাই বা যেই অপরাধ করবে তাদেরকে অবশ্যই অবশ্যই আইনের আওতায় আনা হবে । আপাতত আমরা এতটুকুই আপনাদেরকে জানাতে পারছি, ধন্যবাদ । (এই বলে তারা আবার সকলেই থানার ভিতরে চলে যায়)

মাস কয়েক পরে আদালতের সর্বশেষ রায় এলো, আজকে ডাঃ রাজীবকে মৃত্যদণ্ড দেওয়া হয়েছে । এবং এরই পাশাপাশি তদন্তের মাধ্যমে বের করা হয়েছিলো রাজীবের কেস গ্রহণ না করার পিছনে কে ছিলো আর তাদেরকে কে সেল্টার দিয়েছিল । তাদেরকে সেল্টার দেওয়ার পিছনে ছিলো এমপি মহোদয় এর পিএস এবং মামলা গ্রহণ না করার পিছনে ছিলো হাবিলদার আনোয়ার । হাবিলদার আনোয়ারকে মহামান্য আদালত চাকরি থেকে বরখাস্ত, ৩০ লাখ টাকা জরিমানা এবং ৩৫ বছরের কারাবাস দিয়েছেন আর পিএস কে ১০ লাখ টাকা জরিমানাসহ আমরণ কারাবাস দিয়েছেন ৷

দেখতে দেখতে কতগুলো দিন চলে গেলো, আজকে থেকে ২ বছর হয়ে গেলো মতিউরের সমাধান করা সেই সিরিয়াল কিলারের ঘটনাটি । এই সময়ের মধ্যে কেস সল্ভ করার প্রেক্ষিতে মতিউরও বিভিন্ন সম্মাননা সহ অনেক মেডেল পায়, পোস্টিংও এখন উন্নত হয়ে বিভাগীয় শহরে হয়ে যায় । Team IO5 ও এখন সবাই সবার কাজে ব্যাস্ত । সকলেই এখন নিজেদের জীবন গোছাতে শুরু করে দিয়েছে । অন্যদিকে আবার ডাঃ রাজীবেরও ফাঁসির তারিখ অতি নিকটে আসতে শুরু করেছে । আজকেই কারাবন্দীদের একটি গ্রুপকে ট্রান্সফার করে নিয়ে আসা হয়েছে রাজীবের কারাগারে । রাজীবসহ বাকি কয়েদিরাও তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে অন্য কারাগার থেকে আসা কয়েদিদের । কয়েদিরা সকলেই একে একে পুলিশভেন থেকে নামছে, ঠিক তখনই রাজীব লক্ষ্য করলো সেই ভেন থেকে এমপি এর পিএস ও নামছে আর তা দেখে রাজীব এর চোখে রক্ত জমতে শুরু করে আর টকটকে লাল হতে শুরু করে ।

ভেন থেকে নেমে কিছুটা সামনে আসতেই পিএসও ডাঃ রাজীবকে দেখতে পায় । দুজনের একে অপরের সাথে চোখাচোখি হতেই, রাজীব শান্ত হয়ে পিএস এর দিখে তাকিয়ে একটা হাসি দিলো..............


সমাপ্ত


অন্তরালের ছায়া সিজন ২, পর্ব ৬ : শেষ কল


ক্যামেরা আর কিবোর্ড এর পেছনে আমি


Coin Marketplace

STEEM 0.04
TRX 0.33
JST 0.099
BTC 64519.20
ETH 1873.33
USDT 1.00
SBD 0.38