বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা নিয়ে কিছু কথা ( ১০ লাজুক খ্যাঁকের জন্য বরাদ্দ)

in আমার বাংলা ব্লগ4 years ago

কেমন আছেন সবাই? আশা করি ভাল আছেন। আমার বাংলা ব্লগ পরিবারের সকল সদস্যদের বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা দিবসের শুভেচ্ছা। আজ আমি আপনাদের সাথে বাংলাদেশের স্বাধীনতা নিয়ে কিছু কথা বলব।

war-g216bc04ad_1920.jpg

Image Source

একটি দেশের স্বাধীনতা অর্জনের পেছনে থাকে অনেক ত্যাগ ও বিসর্জন। পৃথিবীতে অনেক দেশ আছে যাদের স্বাধীনতা অর্জনের পেছনে কোন রক্ত ঝরেনি, আবার অনেককে স্বাধীনতা না চাইতেও পেয়েছে কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ছিল সম্পূর্ণ আলাদা এদেশের স্বাধীনতা অর্জনের পেছনে এক করুণ ইতিহাস রয়েছে, রয়েছেএক রক্তাক্ত ইতিহাস। আমরা সিঙ্গাপুরের কথা জানি দেশটি স্বাধীনতা চাইনি তাকে জোর করে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে অথচ আমরা যখন স্বাধীনতা চাইলাম তখন আমাদের সাথে কত ধরনের তা তাল-বাহানা করা হলো কিন্তু একটা পর্যায়ে এসে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করল। শুধু যে নয় মাসে স্বাধীনতা অর্জনের পথ রচিত হয়েছে কি তা কিন্তু নয় ১৯৪৭ সালের দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে যখন ভারত উপমহাদেশ কে স্বাধীন করা হল তখন জন্ম নিল ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি রাষ্ট্র। সেই পাকিস্তান কে আবার শুধু ধর্মের ভিত্তিতে হাজার হাজার মাইল দূরে একটি দেশের সাথে যুক্ত করা হলো যে দেশের সাথে ছিল না কোনো সংস্কৃতির মিল, ছিল না কোনো চিন্তাধারার ও ভাষার মিল, শুধুমাত্র ধর্মের ভিত্তিতে এক করা হয় । শুরু থেকেই পাকিস্তানীরা এদেশের মানুষকে বিভিন্নভাবে শোষণ করতে শুরু করল। যার প্রথম আঘাত আসলো আমাদের মাতৃভাষায়। তারা আমাদের মাতৃভাষাকে কেড়ে নিতে চেয়েছিল কিন্তু পৃথিবীর ইতিহাসে এমন কোন বর্বর জাতি নেই যারা কখনো কারো মাতৃভাষাকে কেরে নিতে পারে। তারাও পারেনি অবশেষে এক রক্তক্ষয়ী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়। আর এখান থেকে রচিত হয় 24 বছরের স্বাধীনতার দীর্ঘ পদযাত্রা। বাংলার মানুষ ধীরে ধীরে স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখতে শুরু করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর হাত ধরে। অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে আমরা যখন স্বপ্ন দেখা শুরু করলাম তখন তারা বারবার এদেশের কিছু দোসরদের নিয়ে ষড়যন্ত্র করা শুরু করলো কিন্তু তারা কখনোই দেশপ্রেমের কাছে পেরে উঠতে পারেনি।

explosion-ge6f192b1b_1920.jpg

Image Source

বাংলার ইতিহাসে রয়েছে ৫২'ভাষা আন্দোলন, ১৯৫৮ সালের সামরিক আইন, ১৯৬২ সালের শিক্ষা আইন, এরপর ১৯৬৬ সালের ঐতিহাসিক ছয় দফা দাবি যে দাবী কে বলা হয় বাংলাদেশের স্বাধীনতার ম্যাগনাকার্টা। এই ছয় দফার মধ্য দিয়েই বাংলার স্বাধীনতার মূল ভিত্তি রচিত হয়েছিল। বাংলার স্বাধীনতা সূচনা শুরু হয়েছিল এই দফাগুলোর মধ্য দিয়ে, এর সাথে যুক্ত হয়েছিল ছাত্রদের ১১ দফা। এরপর আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে আসে ১৯৬৯ সালের ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থান। সারা বাংলাদেশের মানুষের ভিতরে জাগরণ সৃষ্টি হয়। সারাদেশ যখন অসহযোগ আন্দোলনের সৃষ্টি হল তখন শেখ মুজিবুর রহমানকে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় আসামি। তাকে মুক্ত করার জন্য শুরু হয় গণ-আন্দোলন এই আন্দোলনের টিকতে না পেরে পাকিস্তানী জান্তা সরকার বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি দেয়। এরপরে ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে যখন আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ জয় লাভ করে তখন তারা ক্ষমতা ছেড়ে দিতে বিভিন্ন তালবাহানা করে। বাংলাদেশের মানুষ যখন বুঝতে পারলো তারা এই পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের হাতে কখনো ক্ষমতা দিবেনা । ইয়াহিয়া খান ও জুলফিকার আলী ভুট্টো ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয় । তেমনই এক মাহিন্দ্র ক্ষণে আসে ঐতিহাসিক 7 ই মার্চ যেদিনে রচিত হয়েছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতার রক্তিম সূর্য। যে দিনটি না আসলে হয়তো বা বাংলাদেশ কখন স্বাধীন হত না। বঙ্গবন্ধুর সেই ভাষণকে আজ বিশ্ব ঐতিহ্য হিসাবে ঘোষনা করা হয়েছে। এই ভাষনে তিনি ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তুলতে বলেছিলেন, যার যা আছে তা নিয়ে প্রস্তুত থাকতে বলেছিলেন। তিনি বলেছেন এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম।আমি একটা বই পড়েছিলাম যদিও বইটির নাম আমার এখন মনে পড়ছে না। সেই বইয়ে লেখা একটি চিরকুটের কথা বলা ছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অনেক আগেই তার নিজস্ব নেতাকর্মীদের বিশেষ করে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের যুদ্ধের জন্য আগাম প্রস্তুতি নিতে বলেছিলেন । মুক্তিযুদ্ধে আমরা নিউক্লিয়াসের কথা জানি অর্থাৎ মুজিব বাহিনী। বঙ্গবন্ধু যুদ্ধ শুরুর পূর্বেই তারা একটা চিঠি পায় বঙ্গবন্ধুর হাতে হতে সেই চিঠিতে বলা আছে কলকাতার একটি বাড়িতে অস্ত্র রাখা আছে যুদ্ধ শুরু হলে তোমার সরাসরি সেখানে যাবে। তাদের মধ্যে উল্লেখ করছিল তোফায়েল আহমেদ, শেখ ফজলুল হক মনি,সিরাজুল ইসলাম খান সহ আরো অনেকেই। মুক্তিযুদ্ধের একমাত্র দলটি কোন সেক্টরে আন্ডারে ছিল না। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হয় 25 শে মার্চের গণহত্যার মধ্য দিয়ে। পাকিস্তানি দোসররা হঠাৎ 25 শে মার্চে তালিকা ধরে বাংলাদেশের বরেণ্য বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করা শুরু করে । প্রথমে তারা রাজার বাগ পুলিশ লাইন হত্যাযজ্ঞ চালায় এর সাথে সাথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বিভিন্ন শিক্ষকদের ধরে নিয়ে গিয়ে হত্যা করে। শুরু হয়ে যায় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ যে দেশে না ছিল কোন অস্ত্র না ছিল কোনো নিজস্ব মিলিটারি। যে দেশের মানুষ তিন বেলা ভাত খেতে যান যন্ত্রনা তারা অস্ত্র চালনা শুরু করলো এবং পাকিস্তানের চাকুরীরত কিছু বাঙালি অফিসাররা, পুলিশ, ইপিআর বাহিনীসহ বিভিন্ন বাহিনীতে চাকুরীরত বাঙালিরা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করা শুরু করে। সাধারণ অস্ত্র নেই তারা যুদ্ধে শুরু করে এক বুক ভরা দেশপ্রেম নিয়ে বাংলাকে স্বাধীন করার প্রত্যয় নিয়ে।

আমার জানা নেই পৃথিবীর আর কোন ইতিহাসে স্বাধীনতার জন্য এত মা-বোনকে ইজ্জত দিতে হয়েছে তাদের সম্ভ্রম হারাতে হয়েছে। পৃথিবীর ইতিহাসের সব সময় নারী শিশু যুদ্ধের বাইরে ছিল কিন্তু বাংলাদেশে একমাত্র দেশ যাদের উপর এমন ভাবে গণহত্যা চালানো হয়েছে যেখানে না শিশু, না নারী কাউকেই বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। অথচ এ দেশটি একটি ধর্মের ভিত্তিতে স্বাধীন হয়েছিল। পাকিস্তানি দের সাথে বাংলাদেশের কিছু দোসর যুক্ত হয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে মুছে দেওয়ার নীল নকশা অঙ্কন করা শুরু করলো কিন্তু তারা ব্যর্থ এদেশের মানুষের দেশ প্রেমের কাছে কাপুরুষরা কখনোই মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারেনি। যুদ্ধের একদম শেষ পর্যায়ে বাংলাদেশ পরম বন্ধু ভারত বাংলাদেশকে সাহায্যের জন্য এগিয়ে আছে। বাংলাদেশ ও ভারত মিলে একটি যৌথ বাহিনী গঠন করে এবং গেরিলা ট্রেনিং দেওয়া শুরু করে। এই গেরিলা বাহিনীর কাছে পাকিস্তানি জান্তা বাহিনী নাস্তানুবাদ হওয়া শুরু করে। ভারতীয় বাহিনীর দ্বারা বাংলার আকাশ কে সম্পূর্ণ নিরাপদ করা হলে তারা জলপথ ও আকাশপথে থেকে কোন ধরনের সাহায্য সহযোগিতা থেকে বঞ্চিত হয়।

world-war-g9a1c80590_1280.png

Image Source

তারা যখন চারিদিকে কোণঠাসা হয়ে পড়া শুরু করে তখন তাদের মনে এক বাংলাদেশকে সারা জীবনের জন্য পঙ্গু করার জন্য এদেশের মেরুদন্ড কে ভেঙে দেওয়ার জন্য নীলনকশা প্রণয়ন করে। যে নীলনকশার বাস্তবায়ন করে দেশ স্বাধীন হওয়ার মাত্র দুইদিন আগে 14 ই ডিসেম্বর। তাদের নীলনকশা অনুযায়ী এ দেশের বুদ্ধিজীবী, ডক্টর, আইন বিশেষজ্ঞ থেকে শুরু করে সকল জ্ঞানী গুণী শিল্পী, ব্যক্তি কে ধরে নিয়ে নিয়ে হত্যা করে। তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের আবাসিক হলে গিয়ে গিয়ে ডেকে নিয়ে গিয়ে হত্যা করেছিল। এই স্বাধীনতা যুদ্ধে আমরা হারিয়েছি মুনীর চৌধুরীকে, জহির রায়হান, সেলিনা পারভীন থেকে শুরু করে অজস্র বুদ্ধিজীবী কে। আমরা হারিয়েছি গোবিন্দ চন্দ্র, আনোয়ার পাশার মত শিক্ষকদের। মূলত সেই দিনটি ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের সবথেকে বড় আঘাত। বাংলাদেশ স্বাধীন হয় নতুন একটি দেশের জন্ম হয়। কিন্তু জন্মের পর থেকেই অনেক ষড়যন্ত্রের মধ্য দিয়ে শুরু হয়ে যায় এদেশের স্বাধীনতার পথে চলা একটি নতুন দেশ যখন ভাঙ্গা-গড়ার মধ্য দিয়ে যায় পুরো দেশ যখন একত্র হয়ে কাজ করার অঙ্গীকার নিয়ে মাঠে নামবে ঠিক তখন এদেশের আকাশে নেমে আসা আরো এক কালো ছায়া। সেই কালো অন্ধকারে ঢেকে চাই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ। স্বাধীনতার সূর্য যেন আরো একবার অন্ধকারে গাঢ় মেঘের আড়ালে হারিয়ে যায়।

ধন্যবাদ

@abidatasnimora


break.png

banner-abb23.png

Sort:  
 4 years ago 

আপনি স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে খুবই সুন্দর কিছু লেখা আমাদের মাঝে উপস্থাপন করেছেন। যদিও এই লেখাগুলো আমাদের সকলের পরিচিত তবুও আপনার উপস্থাপনায় এই লেখাগুলো পড়ে খুবই ভালো লাগলো। আসামের স্বাধীনতা আমাদের গৌরব। অনেক ধন্যবাদ আপনাকে

 4 years ago 

এত সুন্দর মন্তব্য করার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।

 4 years ago 

মহান স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে অনেক সুন্দর বিস্তারিত লিখেছেন। এই বিষয়গুলো সব সময় আমাদের মাথায় রাখা দরকার। এমনিতেই বিষয়গুলো সম্পর্কে জানা আছে। কিন্তু আপনি সুন্দরভাবে এই ইতিহাস তুলে ধরেছেন দেখে আরো বেশি ভালো লাগলো। আমাদের মাঝে এত সুন্দর ভাবে বিষয়গুলো তুলে ধরার জন্য ধন্যবাদ।

 4 years ago 

আপু আপনি পোস্ট টা মন্তব্য করেছেন দেখে ভালো লাগল।

 4 years ago 

প্রথমে মহান স্বাধীনতা দিবসের শুভেচ্ছা জানাই। আসলে স্বাধীনতা দিবস বাঙালির জাতির জন্য গৌরবের একটি দিন। এই দিনটি অর্জন করতে দীর্ঘ নয় মাস মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন হয়েছে। খুবই ভালো লাগলো আপনি মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ধারণা আমাদের দিয়েছেন। শুভকামনা রইল।

 4 years ago 

অনেক সুন্দর মন্তব্য করেছেন ভাইয়া আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।

 4 years ago 

আপনার উল্লেখিত সবগুলো তথ্য আসলে আমরা কমবেশি অনেকেই জানি। তবে নতুন করে এত সুন্দরভাবে আবার উপস্থাপনা করে আমাদের মাঝে শেয়ার করার জন্য সত্যিই আপনাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ প্রিয় বোন। সকল শহীদদের জন্য বিনম্র শ্রদ্ধা রইল।

 4 years ago 

ধন্যবাদ ভাইয়া আপনাকে।

 4 years ago 

মহান স্বাধীনতা উপলক্ষে খুব সুন্দর লিখেছেন। বিস্তারিত খুব সুন্দর বর্ননা দিয়েছেন।আমার মনে হয়, পৃথিবীর কোন ইতিহাসে এভাবে মা বোনদের ইজ্জত এবং প্রান দিয়েছেন।সেলুট এবং শ্রদ্ধা সকল শহীদের প্রতি। তাদের আত্নার মাগফেরাত কামনা করছি।ধন্যবাদ আপনাকে।

 4 years ago 

হ্যা আপু আপনি ঠিক বলেছেন।পৃথিবীর কোনো ইতিহাসেই এমন নাই।ধন্যবাদ আপনাকে।

মহান স্বাধীনতা দিবসে প্রথমে আপনাকে জানাই অনেক শুভেচ্ছা। আসলেই আমরা স্বাধীনতা শব্দটি নিজের সাথে যুক্ত করার জন্য অনেক কিছু ত্যাগ করেছি। শুধুমাত্র এই শব্দ টা নিজ নিজ এর সাথে যুক্ত করার জন্য 30 লক্ষ মানুষ প্রাণ দিয়েছি। অবশেষে স্বাধীনতা নামক রক্তিম সূর্যটা হাতে পেয়েছি। ধন্যবাদ আপনাকে আপনি অনেক সুন্দর ভাবে সবকিছু বর্ণনা করেছেন। পড়ে অনেক ভালো লেগেছে।

 4 years ago 

এত সুন্দর মন্তব্য করার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ। শুভকামনা রইল।

Coin Marketplace

STEEM 0.04
TRX 0.33
JST 0.101
BTC 64129.37
ETH 1821.95
USDT 1.00
SBD 0.38