বন্ধুত্ব সম্পর্কটা আপন ভাইয়ের থেকেও বেশি হয়ে যায়.....?
আমাদের প্রত্যেকের জীবনের শুরু থেকে আজ পর্যন্ত অনেক বন্ধু হয়েছে, অনেক বন্ধু হারিয়ে গেছে আবার হয়তোবা ভবিষ্যতে আরো অনেকের সাথে বন্ধুত্ব হবে। এর মাঝে কিছু কিছু মানুষের সাথে এমন বন্ধুত্ব সৃষ্টি হয়, যার রক্তের সম্পর্কের ও হার মানায়। আমি মনে করি শুধু আমার নয় আপনাদেরও এমন কিছু বন্ধু রয়েছে যা আপনার আপন মায়ের পেটের ভাইয়ের তুলনায় কোন অংশে কম নয়।
আজ আমি আমার এমন কিছু বন্ধুদের সম্পর্কে আপনাদের সাথে আলোচনা করব যারা আমার আপন ভাইয়ের থেকেও অনেক বেশি কিছু ছিল বা আছে।
শুরুতেই আমি আমার ছোটবেলার এক বন্ধুকে নিয়ে কিছু কথা বলতে চাই। আমার ছোটবেলার অনেক বন্ধুদের মধ্যে একটি বন্ধু তার নাম আনিস ও আমার সব বন্ধুর থেকে আলাদা ছিল সেই ছোটবেলা থেকেই। কিন্তু ওর সাথে আমার সব থেকে বেশি ঝগড়া হতো। অনেকদিন কথা না বলে থাকতাম আবার কিছুদিন পরে দুজন দুজনের সাথে আবার কথা বলতাম ওর কাছ থেকে কখনো আমি কোন খারাপ উপদেশ পাইনি যখনই পেরেছি আমাকে ভালো উপদেশ এবং ভাল কাজে সাহায্য করেছে। সব সময় আমার বিপদে আপদে পাশে এসে দাঁড়িয়েছে বিশেষ করে আমার বিপদে দিনগুলোতে।
ওর সাথে যতবার আমি টাকা-পয়সা লেনদেন করেছি কখনোই এই টাকা পয়সা নিয়ে আমাদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি হয়নি। আমি ওর কাছ থেকে যখনই কোন টাকা নিয়েছি ও কোন সময় আমার কাছ থেকে সেই টাকা ফেরত চাইনি সেটা যত অ্যামাউন্টেরি হবে ঠিক ততদূর আমিও তার সাথে একই কাজটি করেছি আমি কখনো তার কাছে আমার পাওনা টাকা ফেরত চাই না। যদি কখনো পাওনা দেয়না হিসাব করতে যাই নিঃসন্দেহে সে আমার থেকেই পাবে আমি তার কাছে পাবো না আর এই হল আমাদের বন্ধুত্বের নমুনা।
আমার আরেকটি বন্ধু আছে যার নাম রাশেদ। আমার এই বন্ধুটি আমাকে অন্ধের মত বিশ্বাস করে। যেটা আমি ওকে বারবার বলি এটা ঠিক না তুমি আমাকে এতটা বিশ্বাস করো না আমি এতটা বিশ্বাসের যোগ্য নয়। কিন্তু সে কখনোই আমার এই কথার তো একটাই করে না কেন বিশ্বাস করে বলতেছি ওর একটি কম্পিউটার এক্সেসরিজ এর দোকান এবং সার্ভিস সেন্টার রয়েছে যেখানে আমি বেশ কিছুদিন অ্যাজ এ ম্যানেজারের দায়িত্ব পালন করেছি। কারণ ওর ওখানে যত লোকজন আসে তারা কেউ না কেউ কিছু না কিছু চুরি করে চলে যায় তাই ওর একজন বিশ্বস্ত লোকে প্রয়োজন ছিল তাই একদিন সে আমার বাসায় এসে আমাকে নিয়ে যায়। ওর দোকানটি ছিল বাংলাদেশের সমুদ্রসৈকত কক্সবাজারে। সেখানে আমার ঘোড়াও হয়েছে এবং তার দোকানের দেখাশোনারও দায়িত্বটা পালন করতে পেরেছি।
ও আমাকে শুরুর দিন থেকেই তার দোকানের সকল দায়িত্ব দিয়ে চলে যেত এবং তার ক্যাশে প্রতিদিন না হলেও চার পাঁচ লাখ টাকা থাকতো যেখান থেকে আমি যদি কিছু টাকা শরীয়ে ও নেই সে কখনোই বুঝতে পারবে না এমন পরিস্থিতিতে ছিল। এবং সে কখনোই আমার কাছ থেকে কোনদিন হিসাব চাইনি কত টাকা আছে বা কত টাকা ছিল আমি যা ইচ্ছে খরচ করেছি যা ইচ্ছে করেছে। কিন্তু অতরূপ আমি তার বিশ্বাসের মর্যাদা রাখার জন্য প্রত্যেকটা স্টেপের খরচ আমি খাতা-কলমে লিখে রাখতাম যদিও বাসে পাতার কলগুলো কখনোই চেক করেনি কিন্তু আমি সবসময় তাকে দেখানোর চেষ্টা করতাম এবং জোর করে দেখাতাম। কারন আমার মনে প্রচুর পরিমাণে ভয় ছিল কখনো যদি সে সন্দেহ করে এটাই সবথেকে ভয় ছিল। কারণ আমি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি সন্দেহ অনেক খারাপ একটা জিনিস এটা মনের মধ্যে একবার বাসা বাঁধলে আর কখনো একে তাড়ানো যায় না। এখন সেই বন্ধু আবার অনেকদিন ধরে আমাকে কল করছে তার দোকানে গিয়ে কিছুদিন সময় দেওয়ার জন্য হয়তোবা আমি কয়েকদিনের মধ্যেই তার দোকানে যেতে পারি।
আমার আরেকটি বন্ধু, যে আমার খুব কাছের একজন যার নাম হল মাহমুদ। আমার এই বন্ধুটি হলো খুবই রাগী এবং একটু কম বোঝো তাই আমরা তাকে সবাই মজা করে ডাকি মধু আর মধু অর্থ হলো পাগল। আর এই মধু বন্ধুটি আমার জন্য যা করেছে তা আমি কখনোই আশা করিনি। বছরখানেক আগের কথা আমি গ্রামের বাড়ি থেকে চট্টগ্রাম গিয়েছিলাম একটি চাকরির উদ্দেশ্যে সেখানে ওই বন্ধুটি থাকে। এবং সেখানে গিয়ে আমি তার বাসায় থাকি টানা তিন মাস সে ফ্যামিলি বাসায় থাকত না সে থাকতো ব্যাচেলার বাসায় সেই ব্যাচালার বাসার তিন মাসের ভাড়া এবং আমার খাওয়া-দাওয়ার এর খরচ শুধু তাই নয় আমার পকেট খরচটা পর্যন্ত সে চালিয়েছে। তার কিছুদিন পর আমি একটি চাকরি পাই চাকরি করার ১৫ দিনের মাথায় আমি খুব অসুস্থ হয়ে পড়ি। আমার অসুস্থতা দেখে সে আমার সেবা যত্ন করে আমার মাথায় পানি ঢেলে দেয় হাত পা টিপে দেয় শুধু তাই নয় সে আমার সকল চিকিৎসা করেছে তার টাকা দিয়ে। এমন বন্ধু কজনের কপালে জোটে। আমি অনেক ভাগ্যবান এমন কিছু বন্ধু পেয়ে।
আমার এমন অনেক বন্ধু আছে যাদের কথা এক এক করে যদি বলতে যায় তাহলে দিন শেষ হয়ে যাবে রাত শুরু হবে তাও শেষ হবে না।
এখন আমি আমার এমন এক বন্ধুর কথা বলবো আপনাদের সাথে যার কথা না বললেই নয়। তার কথা যদি আমি না বলি আমি তার প্রতি বেইনসাফি করে ফেলব।
আমি ২০১৫ সালের ১৫ ই ডিসেম্বর ওমান শহরে যায় চাকরির উদ্দেশ্যে। সেখানে গিয়ে আমি খুব বিপদে পড়ে যাই কারণ আমাকে যে কাজের কথা বলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে সেই কাজটি দেয়া হয়নি। আমি আমার এক আত্মীয়র মাধ্যমে বিদেশে যাই তিনি আমাকে বলেছিলেন দোকানের সেলম্যান হিসেবে আমাকে নিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু যাওয়ার পরে দেখি আমি লেবার হিসাবে গিয়েছি। আর আমার কাজ হল রাজমিস্ত্রি কাজ তাও একটি কোম্পানিতে। আমি তো কখনোই কোন কাজ করিনি তখন এখন কিভাবে এই রাজমিস্ত্রির কাজ করবে সেই চিন্তায় আমি শেষ হয়ে যাচ্ছিলাম। দুদিন কাজ করতে গিয়েছিলাম সাইডে। সেখানে আমাকে সবাই দেখে বুঝতে পারছি না আমি যে প্রতারণার শিকার হয়েছি তখন সেখানকার কিছু বাংলাদেশী ভাইয়েরা আমাকে সাহায্য করে এবং বলে তুমি অফিসে গিয়ে কথা বল। এবং আমি তাদের কথা মতো অফিসে যাই সেই অফিসের একজন অফিস বয়েছিল যিনি আমাকে অনেক সাহায্য করেছে। তিনি আমাকে নিয়ে ম্যানেজারের কাছে যায় এবং আমার সম্পর্কে সব তাকে খুলে বলে তিনি সবকিছু শুনে বুঝে আমাকে জিজ্ঞাসা করলে তুমি কি কম্পিউটার চালাতে পারো আমি বললাম যে স্যার লেখাপড়া কতটুকু করেছ আমি বললাম স্যার ইন্টার করেছি।
ওই ম্যানেজার স্যারের বাড়ি ছিল ইন্ডিয়াতে তার জন্যই আমি তার সাথে ভালোভাবে কথা বলতে পেরেছিলাম কারণ আমি আগে থেকেই হিন্দি ভাষায় কথা বলতে পারতাম। তাই তাকে আমি আমার মনের ভাব বোঝাতে পেরেছিলাম। তখন তিনি আমাকে আরেক ইন্ডিয়ান লোকের সাথে একজন হেলপার হিসেবে কাজ করতে শুরু করেন ডাটা এন্ট্রিতে। আলহামদুলিল্লাহ তার কিছুদিন পরেই আমি সম্পূর্ণ কাজ শিখে যাই এবং আমাকে আলাদা একটা রুম দেওয়া হয় সেখানে আমার সাথে আরেকজন এসিস্ট্যান্ট দেওয়া হয়।
আর এরই মধ্যে আমার এক পাকিস্তানি ভাইয়ের সাথে বন্ধুত্ব তৈরি হয় যার নাম ছিল সৈয়দ রেজওয়ান শাহ্। আমার অবসর সময়টুকু আমি তার সাথে কাটানো শুরু করি যেখানে যেতাম যাইতাম দুজন একসাথেই করতাম। এভাবে যখন এক থেকে দেড় বছর চলে যায় আমাদের দুজনের মধ্যে এমন একটা বন্ধুত্ব সৃষ্টি হয় যা আপন ভাইয়ের মতো। তার ফ্যামিলির সকল সদস্য আমার সাথে কথাবার্তা বলে এবং আমার ফ্যামিলির সকল সদস্য তার সাথে কথাবার্তা বলে এতে আমাদের সম্পর্কটা আরো মজবুত হতে থাকে। সে যে আমারে আসলেই তার ভাইয়ের মর্যাদা দিয়েছিল সেটা আমি প্রত্যেক সেকেন্ডে সেকেন্ডে বুঝতে পারি। কারণ আমি যদি ব্যথা পেতাম বা অসুস্থ হতাম আমার থেকেও তাকে দেখে মনে হতো সে কষ্ট পাচ্ছে বেশি।
এভাবেই তিনটি বছর আমাদের দেখতে দেখতে কেটে যায়। এবং তিন বছর পরে আমি বাংলাদেশে ছুটিতে আসি। ছুটি কাটিয়ে তিন মাস পর আমি আবার ওমানে ফিরে যাই সেখানে যাওয়ার এই দিন পরে আমার মা এই দুনিয়া থেকে বিদায় নেন। যে দিনটা ছিল আমার জন্য অনেক বেদনাদায়ক। জানিনা আপনি বিশ্বাস করবেন কিনা এতক্ষণ আমি পোস্টটা খুব সুন্দরভাবে লিখছিলাম বাট এখন আমার কন্ঠে এবং চোখে জলের ছায়া পড়ে আছে। যাই হোক তখন আমার পকেটে মাত্র বাংলাদেশি টাকায় এক হাজার টাকা ছিল বুঝতেই পারছেন ছুটি কাটিয়ে মাত্র ২৩ দিন হলো আমি এসেছি এখনো বেতন ও পাইনি। আমার সেই ভাই শুনতে পেয়ে আমার কাছে ছুটে আসে। সে আমার কাছে এসেই আমাকে জড়িয়ে ধরে এবং বলে কি করবে তুমি এখন আমি বললাম ভাই আমাকে ছোটবেলা থেকে মানুষ করেছে শুধুমাত্র তার কবরে মাটি দেওয়ার জন্য এবং তার জানাজা দেয়ার জন্য এই টাকা পয়সা দিয়ে আমি কি করবো। ও একটি কথা আপনাদের বলাই হয়নি যেটা হল আমার বাবা মারা গিয়েছিলেন তখন আমার বয়স ছিল মাত্র দেড় বছর এবং আমার মায়ের বয়স ছিল মাত্র 18 বছর সেই থেকেই তুমি আমাকে নিয়ে যুদ্ধ করছেন দ্বিতীয় বিবাহ করেননি।
আর সেই মায়ের শেষ মুখখানা আমি দেখতে পারবো না। একথা ভাবতেই আমার বুকটা ফেটে যাচ্ছিল আর হাউ মাউ করে কান্না করছে। তখন আমার ভাই বলল আমি থাকতে তুমি কেন চিন্তা করছো আমি তো আছি। সে আমার কাছ থেকে গিয়ে কোম্পানির কাছ থেকে পাসপোর্ট নিয়ে আসে আমার। এবং টিকিটও কেটে নিয়ে আসে শুধু বাংলাদেশের টিকিট নয় ঢাকা এয়ারপোর্ট থেকে বরিশাল এয়ারপোর্ট এর ও টিকিট কেটে নিয়ে আসে আমার ভাই। এবং আমি আসার সময় আমাকে প্রায় পঞ্চাশ হাজার টাকা বাংলাদেশী আমার হাতে তুলে দেন। আর দিয়ে বলেন এটা দিয়ে খরচ করো লাগবে তোমার। তখন আমি কিছু বলার ভাষা খুজে পাচ্ছি না কি বলবো শুধু তার দিকে তাকিয়ে আছি আর সে আমার থেকেও বেশি কান্না করছিল ওই সময়টায়। মনে হচ্ছিল তার নিজের মা মারা গিয়েছে সত্যি বলছি ভাই না দেখলে বিশ্বাস করতে পারবেন না। এমনও বন্ধু হতে পারে কারো। ওই যে বললাম আমি অনেক ভাগ্যবান এমন কিছু বন্ধু পেয়েছি।
এত বড় একটি উপকার করল সে আমার যা কল্পনার বাইরে। তার সেই সাহায্যের জন্য আমি আমার মায়ের শেষ ইচ্ছাটা পূরণ করতে পেরেছিলাম।
আমি তো মনে করি আমাদের প্রত্যেকের জীবনে এমন কিছু বন্ধু থাকা খুবই প্রয়োজন যারা আমার সুখে নয় বিপদেই পাশে বেশি থাকবে এমন কেউ কোন বন্ধু পেয়ে থাকেন যদি তাদেরকে কখনোই কষ্ট দিবেন না।
এখন আমি ও আমার পাকিস্তানের সেই বন্ধু দুজন দুজনার দেশে আছি কিন্তু আমাদের সম্পর্কটা সেই আগের মতই আছে হয়তোবা দূরে আছি ফোনে কথা হচ্ছে কিন্তু সম্পর্ক সে আগের মতই আছে।
তো বন্ধুরা আজ এ পর্যন্তই আসলে সত্যি কথা বলতে এখন আমি আর কিছু লিখতে পারছি না আমার সেই দিনগুলো মনে পড়ে যাচ্ছে কি অবস্থা হয়েছিল সেদিন আমার যেদিন আমার সবথেকে আপন মানুষটি এই পৃথিবী ছেড়ে চলে গিয়েছে আমাকে একা শূন্য করে দিয়ে গিয়েছে এখন আমি এতিম হয়ে বেঁচে আছি।
প্রথমেই আপনাকে আমাদের,,,, কমিউনিটিতে স্বাগতম।
বন্ধুত্ব এমন একটা শব্দ। যে শব্দের মাঝে লুকিয়ে থাকে অসম্ভব রকম ভালোবাসা শ্রদ্ধা মায়া। কারো সাথে একবার ঘনিষ্ঠভাবে বন্ধুত্ব হয়ে গেলে।
সেই মানুষের সাথে কাটানো মুহূর্তগুলো কখনো ভুলে থাকা যায় না। আজকে আপনি আপনার বন্ধুদের সাথে কাটানো মুহূর্ত গুলোর কথা আমাদের সাথে শেয়ার করেছেন! যেগুলো পড়তে গিয়ে আসলে বাস্তবতার খুব কাছাকাছি চলে গিয়েছিলাম।
আপনার বন্ধুদের সাথে কাটানো মুহূর্তগুলো মনে করে,,, আপনার যে অনুভূতিটা মনে হয়েছিল! সেটা আপনি আমাদের সাথে তুলে ধরেছেন! অসংখ্য ধন্যবাদ আপনাকে,,,, আপনার জন্য অনেক অনেক শুভকামনা রইল! ভালো থাকবেন।
আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ আমার পোস্টটি পড়ার জন্য।