বিরিয়ানী
বিরিয়ানি'র জন্য শ্রদ্ধাঞ্জলি
স্যার সলিমুল্লাহ্ মেডিকেল কলেজ ও মিটফোর্ড হাসপাতাল ক্যাম্পাসে কেবল পা রেখেছি। সিনিয়রদের সবাইকে সালাম দেই। বসা থেকে ঘ্যাচাং করে দাঁড়িয়ে পড়ি। 'পক্স হোস্টেল' যা এখন 'আলাউদ্দিন ছাত্রাবাস' হিসেবে পরিচিত যদিও আমাদের প্রস্তাবনা ছিল 'স্বদেশী বিনয় বসু ছাত্রাবাস' নামকরন করার, সেখানের ডাইনিং-এর মেম্বার ছিলাম।
সেদিন ছোট্ট সে ডাইনিং-এ আর কেউ না থাকায় মিঠু, প্রভাস, আসলাম, অমল, সুশংকর সহ ডাইনিং গিয়ে কেবল বসেছি এমন সময় বিশাল গোঁফ-দাঁড়ি-চুলের এক সিনিয়র ভাই ঢুকলেন। আমরা সবাই খাবার রেখে দাঁড়িয়ে সালাম দিলাম এবং কিছুটা আতংকে ঠায় দাঁড়িয়েই রইলাম।
'বেশ বেশ ! জুনিয়ররা সিনিয়রদের সব সময় সন্মান করবে তা তিনি যে দলেরই হোক। তোমরা বসছ না কেন...'
বলেই ডালের বড় গামলায় হাত ধুতে ধুতে বললেন, হাত ধোয়ার পানিতে গামলা ভরে গেছে সরানোর নাম নেই।' কাউকে খুঁজতে তিনি ডাইনিং এর ভেতরের দিকে একটু যেতেই সে সময়ের ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি এসে হাজির। আবার সালাম দিয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। 'আজকে ডালের পানি এত পাতলা কেন?' বলেই এক গ্লাস মেরে দিলেন। আমাদের গলা দিয়ে আর কথা সরে না।
বিশাল গোঁফ দাঁড়ি চুলের ১৫তম ব্যাচের সেই শাহিদ আনোয়ার রুমি ভাই পেছনে এসে বললেন, 'কিরে কি খাস? '
'আর বলিস না, সব ফাঁকিবাজ ডালের পানি কি পাতলা করেছে..'
রুমি ভাই'র সাথে আমরা সবাই ঘটনার আকস্মিকতায় হতভম্ব। রুমি ভাই দ্রুত সামলে নিয়ে বললেন, তোমরা প্রথম এসেছো চল বিরিয়ানি খাওয়াই।'
নিয়ে গেলেন তাঁতিবাজারের ঐতিহাসিক 'কাশ্মীরী বিরিয়ানি'র দোকানে। 'বাবুল দা নতুন ইয়ারের স্টুডেন্ট।'
'নমস্কার সবাইকে।'
'আসসালামু আলাইকুম।'
আমজাদ টেবিলে নতুন ড্যাগ থেকে বিরিয়ানি সাজাও। পোড়া পোড়া মসলায় মাখা মাখা সিনার চাপ, হাড়ির নিচের মসলা মাখানো পোলাও, পোড়া সিদ্ধ আলু। বোরহানি দুই গ্লাস। সালাদ নতুন করে মাখাও। নতুন পিয়াজ কাটতে বল, কাঁচা মরিচ লাগাও। একটা করে পরে এক্সট্রা ফুচকা।'
বিল নিজেদের দিতে হবে কিনা এ আতংকে ধীরে ধীরে আর লাগবে না, আর লাগবে না বলে শেষ করলাম। অতি দ্রুততায় বিল বকশিশ পর্ব শেষ করলেন রুমি ভাই। স্টাফদের মুখে বিগলিত হাসি। 'জুনিয়ররা, টিপস দিতে কোন দিন কার্পণ্য করবে না। টিপসে বংশের পরিচয়। আর নো রিক্সা। খাবারের পর হাঁটতে হয়। হোস্টেলের কাছে গিয়ে কোল্ড ড্রিংস পর্ব।'
সেই থেকে কত কাশ্মীরী, হাজী, নান্না, বিসমিল্লাহ্, আল রাজ্জাক, বড় ভাইদের বিয়ের চুলায় ড্যাগের পর ড্যাগ উঠল কিন্তু রুমি ভাইয়ের রুচিতে কোন কমতি হলো না।
আজো কাচ্চি, টিকিয়া, মুরগী মুসল্লাম, লেগ রোস্ট, খাশির রেজালা, চাইনিজ সবজি, বোরহানি, ফিরনি, ফালুদা, মালাই চা ছাড়া কোন কথা রুমি ভাইয়ের মুখে শুনি না। এটাই তাঁর ভাষা এবং ধ্যান। আমরা তাঁর মন্ত্রমুগ্ধ শ্রোতা এবং হেলপার। উনি চালান আর আমরা সাইডে রোস্ট, সামনে বোরহানির চেঁচামেচিতে সবাইকে লাইনে রাখি।
যখনি দেখা হয় সালাম পর্ব শেষে একটিই কথা 'সবাই কে আসতে বলো। অনেকদিন কাচ্চি মারা হয় না।' একদিন জিজ্ঞেস করলাম, 'বড় ভাই, মারা বলেন কেন ?!' 'মারা বলব না তো কি বলবো, খাওয়া তো আপনারা খান, খাওয়া শেষে বিলের মারাটা তো আমাকেই খেতে হয়...!!'
শাহিদ আনোয়ার রুমি ভাই'র পরে গোপেন কুন্ডু দা, মফিজ-শাহিন ভাই, জাহিদ-এলিস-বাপিন-আসাদুজ্জামান খান রিন্টু ভাই, রেজাউল আমিন টিটু আর মেফতুন আহমেদ সুমন ভাইও তাঁদের মহিমান্বিত মানি ব্যাগ নিয়ে মেলা দিন এগিয়ে এসেছিলাম। সেকথা আরেক দিন পাড়বো।
তবে সব ছাড়িয়ে মেডিকেল জীবনের সেই প্রথম বিরিয়ানি'র স্বাদ, ঘ্রাণ আজো ভেসে আসে, মস্তিষ্কের প্রকোষ্ঠে প্রকোষ্ঠে ঘুরে বেড়ায়।
খুব মনে পড়ে মিটফোর্ড'এর সেসব 'বিরিয়ানিময় দিন' গুলি। যেখানে বিল দেবার জন্য আমাদের বড় ভাইরা তাঁদের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি।


our bangladeshi biriani food.we love it so much.