ব্লাড কিলার — পর্ব ৭ : বাড়ীর নিরবতা

in আমার বাংলা ব্লগ8 months ago

ব্লাড কিলার — পর্ব ৭ : বাড়ীর নিরবতা


1000126260.jpg

বখতিয়ার আর আবিদ গাড়ি চালাতে চালাতে সুমাইয়ার বাড়ির দিকে এগোচ্ছিল । গাড়ির জানালার বাইরে সন্ধ্যার আলো ধীরে ধীরে কালচে নীল হয়ে আসছে । বাতাসে অদ্ভুত এক নীরবতা ।

বাড়ির গেটের সামনে দাঁড়াতেই দুজনেই থমকে গেল । বাড়িটা একদম ছবির মতো— পাকা দুইতলা ভবন, উঠোন জুড়ে সাদা পাথর আর মাঝখানে সাজানো গাছপালা । সুমাইয়ার পরিবারের আর্থিক অবস্থা যে ভালো— সেটা কারও বোঝার জন্য গোয়েন্দা হওয়া লাগে না ।

বখতিয়ার গাড়ি থেকে নামতে নামতেই আবিদ ধীরে বলে উঠল—
— স্যার, বাড়িটা কিন্তু বেশ স্ট্যান্ডার্ড ।

বখতিয়ার — (হালকা হাসি দিয়ে) বড়লোকেরা সবসময়ই নিজেদের হাইলাইট করতে পছন্দ করে ।

দুজনে দরজায় কলিংবেল টিপতেই কয়েক সেকেন্ড পর সুমাইয়া দরজা খুলল । সাজানো পোশাক, শান্ত মুখ, কিন্তু চোখে এক অদ্ভুত ক্লান্তি— যেন অনেকদিন ধরে কেউ তার কথা মন দিয়ে শোনেনি ।

ইন্টারভিউ শুরু

আবিদ — আপনি কি বাড়িতে একা থাকেন?

সুমাইয়া এক মুহূর্ত চুপ করে থেকে একটা বিষণ্ণ হাসি দিল ।

সুমাইয়া — অনেকটা এমনই বলা যায় । আমার স্বামী ব্যবসার কাজে দেশের বাইরে থাকেই বেশি… বছরের বেশি সময় ও বাইরে কাটায় ।

বখতিয়ার চেয়ারে হেলান দিল, চোখ ফোকাস করল তার দিকে ।

বখতিয়ার — আপনি কনককে কিভাবে চিনতেন?

সুমাইয়া একটু দূরে তাকাল । যেন মনে পড়ে যাওয়ার ভয় পাচ্ছে, সেই পুরনো স্মৃতি ভেঙে পড়ছে তার ভেতরে ।

সুমাইয়া — কনক আর আমি ছোটবেলা থেকেই বন্ধু । একই পাড়ায় বড় হয়েছি… তারপর… বাবা আমার ‘ভবিষ্যৎ’ দেখে এক বড়লোক ছেলের সাথে কম বয়সেই বিয়ে দিয়ে দেয় । আমার পড়াশোনা থেমে যায় । কনকও তখন ব্যস্ত হয়ে পড়ে নিজের ভবিষ্যতে । (তার কণ্ঠ একটু কেঁপে উঠল) আমি আর কনক… আস্তে আস্তে হারিয়ে গেলাম দু’দিকে ।

আবিদ হালকা গলা পরিষ্কার করল ।

আবিদ — বিয়ের তো অনেক বছর হয়ে গেল । আপনার কি কোনো সন্তান নেই?

প্রশ্নটা শুনেই সুমাইয়ার চোখে একটি দমবন্ধ করা আঘাত ফুটে উঠল ।

সুমাইয়া — না… আমার কোনো সন্তান নেই । আর সত্যি বলতে কি… আমার স্বামী কখনোই আমাকে মা হওয়ার ‘সময়’ দেয়নি ।
তার কাছে ব্যবসা, ব্র্যান্ড— সবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল । আমি শুধু… একটা রুমে থাকা মানুষ হয়ে গিয়েছিলাম ।

বখতিয়ার ধীরে মাথা নেড়ে বলল—
— আর এই সুযোগটাই কনক কাজে লাগিয়েছে… তাই তো?
আপনার সাথে তার অ্যাফেয়ার ছিলো?

সুমাইয়া কিছুক্ষণ মুখ নামিয়ে রাখল… তারপর ধীরে ধীরে বলল—
— কনক আমার ছোটবেলার বন্ধু ছিলো । সে সবসময়ই আমার জীবনে একটা জায়গা দখল করে রেখেছিল… বিয়ের পর আমি যখন একা হয়ে গেলাম… ঠিক তখনই কনক আবার ফিরে আসে । আমাদের বন্ধুত্ব… আস্তে আস্তে প্রেমে রূপ নেয় । আমি তাকে খুব ভালোবাসতাম… আর সেও আমাকে অনেক শক্তি দিত মানসিকভাবে ।

আবিদ — আপনি কি খেয়াল করেছিলেন— কনক কি কিছুদিন ধরে আলাদা আচরণ করছিল?

সুমাইয়া মাথা নেড়ে বলল—
— হ্যাঁ… সে আগের মতো থাকত না । খুব চিন্তিত দেখাতো । আমি জিজ্ঞেস করলে বলত— অফিসের প্রেশার । আমি… আমি আর জোর করিনি । ভাবতাম, হয়তো সত্যিই ব্যস্ত ।

বখতিয়ার উঠে দাঁড়াল, চোখে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ।

বখতিয়ার — আচ্ছা । আমাদের যদি আর কোনো প্রশ্ন থাকে, আপনাকে থানায় আসতে হতে পারে ।

সুমাইয়া ভদ্রভাবে মাথা নোয়াল—

সুমাইয়া — ঠিক আছে স্যার… আমি আসবো ।





নুসরাত আর সুমাইয়ার বাড়িতে জিজ্ঞাসাবাদের বখতিয়ার আর আবিদ থানায় আসে এবং দুজনেই দৌড়াদৌড়ি শুরু করে ফর্মালিটির জন্য— রিপোর্ট তৈরি, তথ্য যাচাই, নোট নেওয়া— সব মিলিয়ে কখন যে রাত হয়ে গেছে তারা টেরই পায়নি । ফাইলগুলো গোছানোর সময় আবিদ মাথা তুলে বখতিয়ারকে বলে—
— স্যার, কেসটা তো বারবার একই জায়গায় আটকে যাচ্ছে— পরকীয়া আর টাকা । এই কনক লোকটা বাপু… বেশ জাউরা ছিলো মনে হয় ।

বখতিয়ার হালকা হাসল— সেই পরিচিত, শান্ত কিন্তু চিন্তাময় হাসি ।

বখতিয়ার — ঠিক বলেছো তুমি । আর আমি তো তোমাকে বলেছিলাম— কনক আর আফিয়ার অতীত আর বর্তমান— সবকিছু খুঁটিয়ে জানতে হবে । তার আপডেট কী?

আবিদ গলা পরিষ্কার করল । মনে হলো সে নিজের সব নোট মাথায় ঝালাই করছে ।

আবিদ — স্যার, কনক প্রচণ্ড ঋণের মধ্যে ছিল । বিলাসী লাইফস্টাইল— গাড়ি, পার্টি, ঘোরাঘুরি— এগুলো চালাতে গিয়ে সে সবার কাছেই টাকা চাইতো । ওর সবচেয়ে বড় ইনকাম ছিলো আফিয়ার টাকা কিন্তু একসময় আফিয়া তাকে টাকা দেওয়া বন্ধ করে দেয় । অন্যদিকে— যাদের কাছ থেকে সে আগে টাকা নিত, তাদের সাথেও কনক বাটপারি করত । সেই কারণে আর নতুনকরে টাকা পেত না । আর প্রেমিকাদের দিক থেকে—
মিম আর ফারিয়া বিদেশে চলে যাওয়ার পর থেকে কনককে টাকা দেওয়া বন্ধ করে দেয় । কেবল সুমাইয়া তাকে নিয়মিত টাকা দিত… নুসরাত গরীব হওয়ায় সে তেমন সাহায্য করতে পারত না ।

বখতিয়ার ঠোঁট কামড়ে তথ্যগুলো মনে গেঁথে নিল ।

বখতিয়ার — আর আফিয়া? ওর ব্যাপারে কিছু পেলে?

আবিদ: না স্যার, এখনও না । তবে কাজ চালাচ্ছি… কিছু না কিছু বের হবেই ।

বখতিয়ার উঠে দাঁড়াল ।

বখতিয়ার — রাত অনেক হয়েছে, চলো— আজকে তুমি আমার বাড়িতে খাবে । দাওয়াত রইলো ।

আবিদ — আরে স্যার, আপনার রান্নার স্বাদ আমি কোনোভাবেই মিস করতে পারি না । চলুন!

বখতিয়ার এর বাড়িতে

দুজনে বখতিয়ারের বাসায় পৌঁছে ফ্রেশ হয়ে নিল । রান্নাঘরের লাইট জ্বালানো মাত্রই ঘরটা উষ্ণ আর আরামদায়ক মনে হলো ।
বখতিয়ার অ্যাপ্রোন গায়ে দিয়ে রান্না শুরু করলো ।

আবিদ পাশে দাঁড়িয়ে কৌতূহল নিয়ে তাকিয়ে ছিল ।

আবিদ — স্যার… আপনি কি বাসায় একা থাকেন?

বখতিয়ার — (নরম হাসি) হ্যাঁ, থাকি । কেন?

আবিদ — মানে… একা থাকলে একাকীত্ব গ্রাস করে না?

বখতিয়ার হাতের লবণটা হাঁড়িতে দিতে দিতে তাকাল আবিদের দিকে ।

বখতিয়ার — দেখো আবিদ— আমরা মানুষ হিসেবে আমাদের চাওয়া পাওয়ার শেষ নেই তবে এই পৃথিবীতে যার চাওয়া যত কম সে ততবেশি সুখী ।

আবিদ — তাহলে তো আপনি সবচেয়ে সুখী মানুষ?

এই কথা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ভাতের পাতিল থেকে গরম পানি উপচে পড়তে লাগল । বখতিয়ার তাড়াতাড়ি ছুটে গিয়ে গ্যাসটা ঠিক করল । তারপর আবার হাঁড়িটা থেকে পানি সরানোর ব্যবস্থা করলো এবং মাংসের পাতিলে মাংস রান্না শুরু করলো, তখন বখতিয়ার বললো—

— দেখো… যেকোনো কিছু করতে হলে সেটাতে সময়ের প্রয়োজন হয় আবার বেশি দেরী হয়ে গেলেও সমস্যা, আমার রান্না করতে খুব ভালো লাগে এবং আমি তা ভালো করে করেত পারি তার পরেও আমার ভুল হয় । আমরা মানুষ মাত্রই ভুল আর ধৈর্যহীন ।

রান্নার ঘ্রাণ ধীরে ধীরে ঘরে ছড়িয়ে পড়ছিল । কিছুক্ষণ পর মুরগির মাংস আর ভাত দুটোই তৈরি ।

বখতিয়ার — চলো, ডাইনিং টেবিলে ।

আবিদ বসার পর বখতিয়ার নিজ হাতে খাবার পরিবেশন করতে লাগল । আহামরি আইটেম না হলেও— বখতিয়ারের হাতের রান্না মাংস ভাত যেন অন্যরকম হয়ে উঠল । দুজনে কথা বলতে বলতে, হাসতে হাসতে খাওয়া শেষ করল ।

খাওয়া শেষে বখতিয়ার বলল—

— থাকলে ভালো হতো ।

আবিদ একটু হাসল ।

আবিদ — স্যার… আমি আজ ভীষণ খুশি তবে আমি থাকতে পারবো না, আজ আসি । আগামীকাল নতুন করে শুরু করতে হবে । দুজনে দরজার কাছে গিয়ে বিদায় নিল ।


চলবে...


ব্লাড কিলার — পর্ব ৬ : রান্নার ধোঁয়া


লেখক পরিচিতি


আমি আগেও আপনাদের সঙ্গে শেয়ার করেছি ক্রিপ্টো, মুভি রিভিউ, ফটোগ্রাফি, গল্প লেখালেখি আর ব্লগ । এখন সেই অভিজ্ঞতার ধারাবাহিকতায় শুরু করেছি নতুন এক অধ্যায় — গেমিং ! 🎮 । 🎥 আমার ইউটিউব চ্যানেল Bokhtiar The Survivor-এ আমি প্রতিনিয়ত কাজ করে যাচ্ছি, যেখানে আমি আপনাদের সঙ্গে ভাগ করে নিচ্ছি আমার গেম খেলার বাস্তব অনুভূতি আর সেই রোমাঞ্চকর মুহূর্তগুলো ।

Coin Marketplace

STEEM 0.04
TRX 0.33
JST 0.096
BTC 62885.60
ETH 1754.15
USDT 1.00
SBD 0.39