ব্লাড কিলার — পর্ব ৬ : রান্নার ধোঁয়া

in আমার বাংলা ব্লগ8 months ago

ব্লাড কিলার — পর্ব ৬ : রান্নার ধোঁয়া


1000125126.jpg

রাত গভীর । শহরটা জীর্ণ হাসি ফোটানো এক নিষ্ক্রিয় মুখের মতো — বাইরে তেমন কোনো শব্দ নেই, শুধু দূরে—কোনো অলিতে কুকুর ভোঁ-ভোঁ করে কাঁদছে । প্রায় মধ্যরাত পেরিয়ে গেছে । থানার সব আলো নিভে ফেলেছে যেন—কাজগুলো বেগে নেওয়ার কৌটো বন্ধ করে রেখে সবাই বাড়ি ফিরে গেছে ।

বখতিয়ার তার সাধারণ রুটিনেই চলে । সে বাড়ি ফিরে এসে গোসল করে ফ্রেশ হয়; তারপর রান্নাঘরের টেবিলের ধার ঘেঁষে দাঁড়িয়ে নীরবভাবে রান্না শুরু করে । রান্না তার কাছে ছিলো নিরাময়—এক ধরণের মননশীল ধ্যান, যেখানে ধীরেসুস্থে ছাঁটা, মশলার গন্ধ, কড়াইয়ের সীটের ছোটখাটো আওয়াজ—এসবই তাকে শান্ত করে । সে মনে করত—রান্না যত ধীর, ততই স্বাদের গভীরতা বাড়ে । আজ রাতেও সে খেয়াল করলো—চুলায় একটা স্লো-সিমার, প্যানের ধোঁয়া ধীরে উঠে, ঘরের বাতি হালকা পলকাতে থাকে ।

রান্না শেষে সে টেবিলে বসে খেয়ে নিল । হালকা গরম ভাত, মসলাদার ডাল—সবকিছুই তাকে সামান্য সান্ত্বনা দিল । তারপর ঘুমানোর প্রস্তুতি নিল । বিছানায় শুয়ে অচেনা এক দুর্বিনীত স্বপ্ন দেখতে শুরু করল— হাড় কাঁপানো স্বপ্নে সে হঠাৎ জেগে উঠল । কপালে ঘাম, গলায় খুশখুশে অবস্থা । বখতিয়ার উঠে পানি খেয়ে আবার বিছানায় শুতে গেল; কিছুক্ষণ পরে অদ্ভুত শান্তিতে গভীর ঘুমে পড়ে গেল ।

সকাল হলেই বখতিয়ার ফোন করল—ডিউটি চালু ।
ফোনে আবিদের উত্তেজনায় ভরা কণ্ঠ—
“স্যার, আমি কিছু তথ্য পেয়েছি । আপনি আসেন পরে আমি একএক করে বলবো ।”
“ঠিক আছে, আমি আসছি ।”—বখতিয়ার শান্ত কণ্ঠে উত্তর দিল ।

থানায় পৌঁছে টেবিলে বসেই তারা কাজ বাঁধল । আবিদ একটুও ধাক্কা ছাড়ল না—তার মুখে ছিল মিশ্র উদ্দীপনা ও বিস্ময় ।

আবিদ (এক ঠোঁট হাসি মিশিয়ে, মজা করে) :
“স্যার, কনকের সেই ‘চকচকে জীবন’টা দেখলে আপনি অবাক হবেন — একটা লোকের পক্ষে এতগুলো মেয়ের সাথে সম্পর্ক রাখা! এটা কি কোন সুপারহিউম্যান ক্যারিয়ার?”

বখতিয়ার সামান্য হাসি দিয়ে বলল, “তুমি মোজা খুলে উল্টে ফেললে, রহস্য বেরোতে পারে ।” তাদের মধ্যে রসিকতা ক্ষণিকের তীব্রতা ভেঙে দিল ।

এরপর আবিদ গ্রাউন্ডেড রিপোর্ট খুলে বলল—
“আমরা খুঁজে পেয়েছি : চারজন নাম স্পষ্ট—নুসরাত, সুমাইয়া, মিম এবং ফারিয়া । মিম আর ফারিয়া শেষ তিন মাসে বিদেশে স্থায়ীভাবে চলে গেছে, সেটাও রেকর্ডে আছে ।”

বখতিয়ার মাথা কিম্বা কাঁধ নাড়ালো— ভাবতে লাগল, দূরে থাকা মানুষদের ডেকে পাওয়া কি সহজ হবে? তিনি বলেন,
“তাহলে শুরু করি নুসরাত থেকে ।”

তারা দুজনে পুলিশ গাড়ি নিয়ে নুসরাতের বাড়িতে পৌছালো । বাড়িটা পুরোনো এক বস্তির ধাঁচে, সামনে টিনের নঃশব্দ কৌতুক আর ভাঙা বেঞ্চ—এক ধরনের বাস্তবতা যা শহরের চকচকে আড়ালে লুকায় ।

দরজায় কড়া নাড়ে কেবল কিছু সেকেন্ডে নুসরাত দরজা খুলে দিল — তার চেহারা ক্ষুদ্র, চোখে দাগ আছে—যে দাগগুলো হয়তো মাসের মাঝামাঝি কাঁধে ভর করে থাকা ক্লান্তি ।

বখতিয়ার কড়া স্বরে বলতে শুরু করল, কিন্তু কণ্ঠে ভদ্রতা বজায় রইল—
“আপনি আর কনক কিভাবে পরিচয়?”

নুসরাত (সোজা কণ্ঠে):
“স্কুল জীবন থেকেই—আমরা বন্ধু ।”

বখতিয়ার —
“শুধুই বন্ধুত্ব, অদ্ভুত তো আমরা তো জানতাম কনক আর আপনার মধ্যে অ্যাফেয়ার চলছে আর শুধু যে আপনাদের দুজনের মধ্যে তা সীমাবদ্ধ তাও নয় । আচ্ছা এইসব পরে হবে এখন বলুন আপনাদের মাঝে কি শুধুই বন্ধুত্ব ছিলো না-কি আপনারা প্রেমিক ছিলেন?”

নুসরাত চোখে বিষাদ নিয়ে বলল—
“দেখুন প্রেম আমাদের দুজনের মধ্যে থাকলেও কনক ছিলো খুবই লোভী মানুষ, যার কারণে আমি গরীব হওয়ায় সে শুধু আমার শরীর নিয়ে খেলেছে আর বিয়েটা সে আফিয়াকে করেছে ।”

বখতিয়ার নাক ফুলে বললেন—সত্যিই রাগ-মিশ্রিত তাগিদ ।
“তুমি কেন ওর সঙ্গে থেকেছো, যখন তুমি জানো সে তোমাকে কিভাবে ব্যবহার করে?”

নুসরাত একটু লজ্জায় নামলো,
“আমি কনককে সর্বদাই পাশে দেখতে ছেয়েছি আর যেহেতু কনকের বিয়ে হয়ে হিয়েছিলো আফিয়ার সাথে তারপরও আমি এই সম্পর্কে রাজি ছিলাম, আমি এতকিছু বুঝতে চাইনি আমি শুধু কনকে আমার পাশে দেখতে চেয়েছি ব্যাস ।”

আবিদ ফাঁকে প্রশ্ন করল—
“আপনি কি কাউকে সন্দেহ করেন, কনককে কে খুন করতে পারে?”

নুসরাত কাঁপা কণ্ঠে বলল—
“আমি সিউর হয়ে বলতে পারবো না, তবে কনক আমাকে বলতো তার জীবনটা একদম এই ঠিক যাচ্ছে না । সে সবসময় কোনো না কোনোভাবে মানসিক চাপের মধ্যে থাকতো । সে সবসময় এটাই বলতো যে আফিয়ার সাথে তার সম্পর্ক করাটা ঠিক হয় নি, আফিয়া খুবই বদ মেজাজী একটা মেয়ে তার খুব বেশি ইগো ।”

বখতিয়ার নীরবে মাথা নেড়ে বলল—
“ঠিক আছে, আপনি আমাদের ফোন দেবেন, আর প্রয়োজন হলে থানায় আসবেন ।”

নুসরাত নম্রভাবে সম্মতি দিলেন ও দরজা বন্ধ করলেন ।

গাড়িতে ফিরে আসার পথে—রাস্তায় সূর্যের আলোর কিছুটা— শুধু তাদের বেলুন দেখালো—আবিদ হঠাৎ হেসে বলল,
“প্রতিটি সাক্ষাত্কারেই আফিয়ার নাম ঘুরে বেড়ায় । সবখানেই ছাপটা নেগেটিভ ।”

বখতিয়ার গম্ভীর কণ্ঠে বললেন—
“আমি আভাস পেয়েছি—আফিয়া সাধারণ বিপদজনক নারী নয় । ও জানে এ খেলা কিভাবে চালাতে হয় । ও ভেবে বসেছে, যদি ও আমাদের এড়াতে পারে, ও বেঁচে যাবে ।”

আবিদ কৌতুক মেশানো ভঙ্গিতে বলল—
“আর কী ধরনের প্রস্তুতি নেবেন, স্যার—কোনো সুপার কুক? বা ‘রান্নার ডিটেইকটিভ’?”

বখতিয়ার হালকাভাবে হেসে বলল—
“না, আমার অর্থ রান্না নয় —আমাদের পুরো পরিকল্পনাটা সাজাতে হবে । আমরা শুধু ঘটনার পেছনের গল্প খোঁজব না, বরং আফিয়ার উপর নজর রাখতে হবে—তার ফোন, কাকে দেখা করল, কোথায় গেল—সবকিছু ।”

আবিদ বিস্ময় করে বলল—
“স্রেফ নজর রাখা? সেটা তো প্রমাণ নয়, স্যার ।”

“ঠিক,” বখতিয়ার কণ্ঠে কড়তা ফিরে এলো, “তাই আমি বলছি—আমরা প্রমাণ বের করব । আমি মনে করি আফিয়া নিজেই খুন করেনি; ও অন্য কাউকে দিয়েই করেছে । কারো কাছে টাকা দিয়ে কাউকে দংশাতে বলেছে; হয়তো কন্ট্রাক্ট কিলার—আমি সেটা নিশ্চিত না, কিন্তু সম্ভাব্যতা আছে ।”

আবিদ একটু চমকে উঠলো—
“আপনি কন্ট্র্যাক্ট কিলারের কথা বললেন? ও? এটা কি বাড়াবাড়ি হবে না?”

বখতিয়ার খুব ধীর কণ্ঠে বললেন—
“না, এটা কেবল একটা ইঙ্গিত । এখানে অনেক মানুষের রেশনালিটি ভাঙা । মানুষ দেউলিয়া মানে শুধুই আর্থিক নয়; আত্মসম্মান, বদনাম—এসবের দায়ে কেউ কাউকে শেষ করে দিতে পারে ।”

আবিদ চুপ করে একটু সময় নিল। তার চোখে দেখা গেল কাজের উত্তেজনা ও সামান্য ভয় ।

“ঠিক আছে,”—সে বলল,—“আমি কনকের সব মোবাইল লিংক, ব্যাংক ট্রানজেকশন এবং যে লোকদের সাথে ওর রিলেশন ছিল—তাদেরও ফলো করব ।”

বখতিয়ার হালকা মাথা নেড়ে বলল—
“ভাল । আর তুমি নুসরাতের কথা পুরোটাই নোট করো । আমরা এখন শুরু করছি—এখান থেকেই কোনো নতুন কীপয়েন্ট উঠে আসবে ।”


চলবে...


ব্লাড কিলার — পর্ব ৫ : জিজ্ঞাসাবাদ


লেখক পরিচিতি


আমি আগেও আপনাদের সঙ্গে শেয়ার করেছি ক্রিপ্টো, মুভি রিভিউ, ফটোগ্রাফি, গল্প লেখালেখি আর ব্লগ । এখন সেই অভিজ্ঞতার ধারাবাহিকতায় শুরু করেছি নতুন এক অধ্যায় — গেমিং ! 🎮 । 🎥 আমার ইউটিউব চ্যানেল Bokhtiar The Survivor-এ আমি প্রতিনিয়ত কাজ করে যাচ্ছি, যেখানে আমি আপনাদের সঙ্গে ভাগ করে নিচ্ছি আমার গেম খেলার বাস্তব অনুভূতি আর সেই রোমাঞ্চকর মুহূর্তগুলো ।

Coin Marketplace

STEEM 0.04
TRX 0.33
JST 0.100
BTC 64001.77
ETH 1773.48
USDT 1.00
SBD 0.39