বাঙালিয়ানার স্বাদে এক দুপুর৷ কষে কষা রেস্টুরেন্টে এক স্মরণীয় অভিজ্ঞতা
বাঙালিয়ানার স্বাদে এক দুপুর: কষে কষা রেস্টুরেন্টে এক স্মরণীয় অভিজ্ঞতা
🙏 সকলকে স্বাগত জানাই 🙏
শহর কলকাতার বুকে এমন অনেক স্থান রয়েছে, যেখানে পা রাখলেই মনে হয় যেন সময় থেমে গেছে। আধুনিকতার জাঁতাকলে হারিয়ে যেতে বসা আমাদের শিকড়, আমাদের সংস্কৃতি আর ঐতিহ্য আজও কোথাও কোথাও আপন ছায়া বিস্তার করে আছে। তেমনই এক দুপুরে, আমি আর আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধু সময় কাটাতে গিয়েছিলাম ‘কষে কষা’ নামক এক রেস্টুরেন্টে। আমরা জানতাম না যে সামান্য একবেলা খাওয়ার ইচ্ছা, আমাদের এক অনন্য অভিজ্ঞতার দিকে নিয়ে যাবে।
‘কষে কষা’ শুধু একটি রেস্টুরেন্ট নয়; এটি যেন একটি যাদুঘর, যেখানে সাজানো রয়েছে বাঙালি মধ্যবিত্ত সংসারের ফেলে আসা দিনগুলোর ছবি। দরজায় প্রবেশ করতেই যেন এক অন্য কলকাতায় ঢুকে পড়লাম আমরা। চালচুলে কাঠের চেয়ার, লাল-সাদা চেক টেবিলক্লথ, দেওয়ালে সাদা কালো ছবি আর অ্যালবাম থেকে তুলে আনা বাঙালির অতীতের জীবনের ঝলক। পেছনের দেওয়ালে লেখা রয়েছে রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দ, আর সুকুমার রায়ের বিখ্যাত উদ্ধৃতি। এক মুহূর্তে যেন মনে হচ্ছিল, আমরা আর বর্তমান কলকাতায় নেই। বরং সেই কলকাতায় ফিরে গেছি, যেখানে দুপুরবেলায় খাওয়ার পর রেডিওতে বেতার নাটক শোনা হতো, আর সন্ধ্যায় কুপিবাতির আলোয় গল্প।
আমরা অর্ডার করেছিলাম চিকেন কবিরাজি। যা আমাদের রুচি এবং আবেগ দুইয়ের সঙ্গেই যেন গভীরভাবে জড়িয়ে। কবিরাজি কাটলেট এক সময় বাঙালি রেস্তোরাঁর গর্ব ছিল, আজ তা বহু জায়গায় বিলুপ্তপ্রায়। কিন্তু ‘কষে কষা’ যেন আবার সেই স্বাদ ফিরিয়ে এনেছে। সোনালি ডিমের কোটিং, ঝালমশলা দিয়ে কষানো মাংস, আর প্রতিটি কামড়ে পুরোনো দিনে ফিরে যাওয়ার এক মধুর অনুভব। প্রথম কামড়েই মনে হল। এ যেন শোভাবাজারের কোনো বনেদি বাড়ির পুজোর দুপুর, যেখানে ঠাকুর দালানে বসে কাঁসার থালায় পরিবেশন করা হতো খাবার।
চিকেন কবিরাজির পরে আমরা নিয়েছিলাম একেবারে ঘরোয়া খাবার। ভাত, ডাল আর ছানার তরকারি। বাঙালির প্রাত্যহিক জীবনের এক অনন্য উপাদান এই সরল আহার। কিন্তু সেই সাধারনতার মধ্যেই যে কতটা তৃপ্তি লুকিয়ে থাকে, তা আমরা আবার নতুন করে বুঝতে পারলাম। ডালে ছিল ঘি-এর গন্ধ, আর ছানার তরকারির প্রতিটি টুকরো যেন একান্ত যত্নে রান্না করা। খাবার পরিবেশনের ধরণটিও ছিল নজরকাড়া। খাবারের সঙ্গে পরিবেশও যেন মিশে এক হয়ে গেল।
খাওয়া শেষ করে আমরা কিছুক্ষণ চুপ করে বসে ছিলাম। কেউ কোনো কথা বলছিল না। চারপাশের বাঙালিয়ানার গন্ধ, দেওয়ালে টাঙানো হারিয়ে যাওয়া বাংলা সিনেমার পোস্টার, টেবিলে রাখা কাঠের জলজ্যান্ত রেডিও। সবকিছু মিলিয়ে যেন এক ধরনের আবেশ আমাদের গ্রাস করেছিল। বন্ধুর চোখে আমি একটি অপার সন্তোষ দেখতে পেলাম, যেটা হয়ত কোনো দামি রেস্তোরাঁর অভিজ্ঞতা দিতে পারে না।
এই অভিজ্ঞতা আমাদের মনে করিয়ে দিল, বাঙালিয়ানার স্বাদ শুধু খাবারে নয়। তা লুকিয়ে থাকে পরিবেশে, গন্ধে, আলো-আঁধারিতে, আর হৃদয়ের গভীরে জাগ্রত স্মৃতিতে। ‘কষে কষা’ সেই আবহ তৈরির যে চেষ্টা করেছে, তা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। এটি শুধুমাত্র খাওয়ার জায়গা নয়; এটি এক ‘স্মৃতি-স্থান’, যেখানে আমরা ফিরে পেতে পারি আমাদের ছেলেবেলার দুপুর, ঠাকুমার রান্নাঘরের গন্ধ, কিংবা বাবার সঙ্গে প্রথম বাইরে খাওয়ার দিনগুলোর স্মৃতি।
আমাদের জীবন আজ এতটাই যান্ত্রিক যে আমরা প্রায়শই ভুলে যাই আমাদের শিকড় কোথায়। এই রকম একটি রেস্টুরেন্ট সেই শিকড়ে ফিরে যাওয়ার একটা উপায় হয়ে উঠতে পারে। সেখানে গিয়ে শুধু পেট ভরল না। ভরল মনও। এবং যে বন্ধু আমার সবচেয়ে কাছের, তার সঙ্গে এই মুহূর্ত ভাগ করে নেওয়ার ফলে মুহূর্তটি আরও বেশি মূল্যবান হয়ে উঠল।
এই এক দুপুর আমাদের মনে এক দীর্ঘ সময়ের স্বাদ দিয়ে গেল। হয়ত আমরা আবার ফিরে যাব ‘কষে কষা’-য়। নতুন কোনো খাওয়ার তালিকায় চোখ রাখতে নয়, বরং নিজেদের হারানো সময় খুঁজে পেতে।
🙏 ধন্যবাদ 🙏
(১০% বেনিফিশিয়ারি প্রিয় লাজুক খ্যাঁককে)
--লেখক পরিচিতি--
কৌশিক চক্রবর্ত্তী। নিবাস পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলায়। পেশায় কারিগরি বিভাগের প্রশিক্ষক। নেশায় অক্ষরকর্মী। কলকাতায় লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলনের সাথে দীর্ঘদিন যুক্ত৷ কলকাতা থেকে প্রকাশিত কবিতার আলো পত্রিকার প্রধান সম্পাদক। দুই বাংলার বিভিন্ন প্রথম সারির পত্রিকা ও দৈনিকে নিয়মিত প্রকাশ হয় কবিতা ও প্রবন্ধ। প্রকাশিত বই সাতটি৷ তার মধ্যে গবেষণামূলক বই 'ফ্রেডরিক্স নগরের অলিতে গলিতে', 'সাহেবি কলকাতা ও তৎকালীন ছড়া' জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। সাহিত্যকর্মের জন্য আছে একাধিক পুরস্কার ও স্বীকৃতি। তার মধ্যে সুরজিত ও কবিতা ক্লাব সেরা কলমকার সম্মান,(২০১৮), কাব্যলোক ঋতুভিত্তিক কবিতায় প্রথম পুরস্কার (বাংলাদেশ), যুগসাগ্নিক সেরা কবি ১৪২৬, স্রোত তরুণ বঙ্গ প্রতিভা সম্মান (২০১৯), স্টোরিমিরর অথর অব দ্যা ইয়ার, ২০২১, কচিপাতা সাহিত্য সম্মান, ২০২১ তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য।
কমিউনিটি : আমার বাংলা ব্লগ
ধন্যবাদ জানাই আমার বাংলা ব্লগের সকল সদস্যবন্ধুদের৷ ভালো থাকুন, ভালো রাখুন।
Upvoted! Thank you for supporting witness @jswit.
Thank you for sharing on steem! I'm witness fuli, and I've given you a free upvote. If you'd like to support me, please consider voting at https://steemitwallet.com/~witnesses 🌟
https://x.com/KausikChak1234/status/1922350589779796171?t=NfL_gn73WNZQK8ddVR9ing&s=19
https://x.com/KausikChak1234/status/1922351296415207584?t=2SGH29pNUimwt_dg3NR0vw&s=19
https://x.com/KausikChak1234/status/1922351780836397168?t=G0ew2GNoLn9Cmkte1xflig&s=19
https://x.com/KausikChak1234/status/1922352232193753284?t=yaWuhVdU5tIB1_xneFudrA&s=19
https://x.com/KausikChak1234/status/1922352653490651299?t=T6Ekcxz1qcQEL4id8andJg&s=19