শৈশবের কত খেলা আজ বিলুপ্ত।
আজকে সকালে কমিউনিটির রিপোর্ট তৈরি করে পাবলিশ করার পর ঘড়ির কাঁটায় দেখলাম তিনটে বাজে।
সকালের ওষুধ খেতে ভুলে গেছি! কাজ শেষে একটু ছাতু খেয়ে যখন ওষুধ খেতে গেছি দেখি একটা গুরুত্বপূর্ণ ওষুধ শেষ।
কাজের চাপে খেয়াল করা হয়নি! তড়িঘড়ি ওষুধের দোকানে ফোন করলাম কিন্তু তারা জানালো কালকের আগে ওষুধ পাওয়া যাবে না।
যে ওষুধ আমি খাই সেটা পাওয়া যাচ্ছে না আশেপাশের কোনো দোকানে।
খানিকক্ষণ বসে রইলাম চুপ করে, কেউ নেই যাকে দিয়ে দূরের দোকানে পাঠাবো।
এদিকে বেলা শেষের দিকে, প্রতিদিন স্নানে যেতে দেরি হয়ে যাচ্ছে।
এইরকম সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে মনে হলো ছেলেবেলার কথা, আর তখনই কিছু খেলার কথা মাথায় আসলো যেগুলো প্রতিদিন বিকেলে খেলতাম।
আজ সেইসব খেলা বিলুপ্ত।
আজকে আমার শৈশবের কিছু খেলার কথা আপনাদের সাথে ভাগ করে নিতে চলে এসেছি,
তবে আগেই জানিয়ে রাখি মন্তব্যের মাধ্যমে জানাতে কেউ ভুলবেন না উল্লেখিত খেলাগুলো কে কে ছেলেবেলায় খেলেছেন!
আর কোন্ কোন্ খেলা আপনারা কখনো খেলেন নি!
আমার বেশিরভাগ শৈশব কলকাতার যে পাড়ায় অতিবাহিত হয়েছে, সেই পাড়ায় রাস্তার শেষ প্রান্তে যে পরিবার থাকতো, তাদের পাল বাড়ী বলেই পরিচিত ছিল, আবার তাদের বাড়ির উল্টোদিকে মানা দি দের বাড়ি ছিল ব্যানার্জি বাড়ি নামে পরিচিত।
বেশীরভাগ বাড়ি মনে রাখা হতো তাদের উপাধি দ্বারা, তবে সকলের ক্ষেত্রে নয়, যেমন আমাদের বাড়িকে দত্ত বাড়ি কেউ বলতো না, আমার বাবার নাম করেই পরিচিতি পেত আমাদের বাড়ি।
অহঙ্কার নয় তবে পাড়ায় তখন আমার বাবা উচ্চ বৃত্তের তালিকায় সর্বাগ্রে ছিলেন, সাথে আমাদের দু বোনের লেখা পড়ার খ্যাতি ছিল যথেষ্ট।
যাক, যে প্রসঙ্গে কথাগুলো উল্লেখ করলাম, সেটা হলো, ওই পাল বাড়িতে যারা ছিলেন তাদের ব্যবসা ছিল প্রতিমা নির্মাণের।
যে সময় যে পুজো সেই প্রতিমা নির্মিত হতো, কাজেই অনেক এঁটেল মাটি পাওয়া যেত তাদের বাড়িতে।
আমার খেলার সঙ্গীদের নিয়ে বিকেল হলেই মাটি নিতে পৌঁছে যেতাম পাল বাড়িতে, আমাকে কেউ মানা করতো না, কারণটা উল্লেখিত আগেই।
এরপর, সেই মাটি সকলের মধ্যে সমান ভাগে ভাগ করে দেওয়া হতো সকল সঙ্গীদের মধ্যে।
তারপর বাড়ির সামনের রাস্তায় বসে যেতাম যার যার ভাগের মাটি নিয়ে।
এবার খেলা শুরু। প্রথমে নিজের নিজের মাটি দিয়ে পাতলা বাটি তৈরি করে, এবার সেই বাটি উল্টো করে সজোরে রাস্তায় ছুঁড়ে মারতে হতো! স্বাভাবিক কারণেই সশব্দে কাঁচা মাটির বাটির মাঝখান ফেঁটে যেত!
এবার যার বাটিতে যতো বড়ো ফুঁটো হবে অপর জনকে ততটাই মাটি দিয়ে সেই বাটির ফাঁকা অংশ ভরতে হবে।
এভাবে খেলার শেষে যার কাছে বেশি মাটি জমা হবে সেই বিজয়ী।
আরেকটি খেলা ছিল ডাঙ্গুটি খেলা, এখন কাউকে যেটা খেলতে দেখি না। এখন তো সব কাঁচের জানালা কিন্তু আগে ছিল কাঠের, কাজেই ভাঙার ভয় ছিল না।
এটাও একটা কারণ হতে পারে।
এরপর কুমির ডাঙ্গা, লুকোচুরি, গুলি, গাঁধী, বুড়ির চু, কড়ি, তীর ধনুক ইত্যাদি।
বুড়ির চু খেলাটার কথা আগেও লিখেছিলাম জানিনা কতজন পড়েছেন!
একজনকে বুড়ি সাজিয়ে মাটি খুঁড়তে হতো, এরপর দলের বাকিরা প্রশ্ন করতো -
ও বুড়ি কি করো?
উত্তর - গর্ত খুঁড়ছি।
গর্ত খুঁড়ে কি হবে?
উত্তর - পয়সা জমাবো।
পয়সা দিয়ে কি হবে?
উত্তর - গরু কিনবো।
গরু কিনে কি করবে?
উত্তর:- দুধ খাবো।
দুধ খেয়ে কি হবে?
উত্তর :- মোটা হবো।
এরপর সকলে মোটা বুড়ি বলে যেই ডাকবে, ওমনি বুড়ি সাজানো সঙ্গীকে ছুটে দলের কাউকে ধরতে হবে।
যে, আগে ধরা পড়বে সে আমার বুড়ি সাজবে, এই ছিল খেলা।
আমাকে খুব যত্ন করে কঞ্চি দিয়ে ধনুক আর একটা তীর বানিয়ে দিয়েছিল আমার জ্যাঠামশাই এর একমাত্র সুপুত্র।
একবার সেটা নিয়ে পাশের বাড়ির মাঠে দাড়িয়ে এমন ভাবে তীর ধনুক চালিয়েছিলাম, যে সেটা উড়ে গিয়ে ওই পাল বাড়ির চালে পড়েছিল, সেটা আর পুনরুদ্ধার করা যায় নি!
আজ ও আফসোস রয়ে গেছে, কারণ বাবা জানতে পেরে বেশ বকেছিল আমার দাদাকে;
যদি কারোর চোখে গিয়ে লাগে!
আমার উপরে অগাধ আস্থা ছিল সেই থেকেই এই দুর্ঘটনার প্রতি বাবার দুশ্চিন্তা ছিল আর কি!
এগুলো যেমন ছিল ঘরের বাইরের খেলা তেমনি বর্ষাকালে ঘরে খেলার ব্যবস্থাপনা ছিল ভরপুর।
তবে শর্ত একটাই আমাদের বাড়িতে এসে খেলতে হবে, কারোর বাড়িতে আমাদের যাওয়া চলবে না।
আমাদের পাড়ায় আমার বড়ো পিসি দের সাদা কালো টেলিভিশন, তাই বাবা কিনে এনেছিল বি.পি.এল কোম্পানির রঙিন টেলিভিশন বাড়ির জন্য।
কাজেই, কাউকেই বেশি সাদা সাদি করতে হতো না বাড়িতে আসার জন্য, টিভি দেখার লোভ সামলানো কঠিন!
আগেও জানিয়েছি দুটো শয়নকক্ষ যার একটি আমাদের দু'বোনের আর অপরটি ছিল মা বাবার।
ওই ঘরেই টিভি থাকতো। আর আমাদের ঘরের খাটের তখন মশারী টানাবার সুবিধার্থে কাঠের ফ্রেমের মত করা ছিল।
সেগুলোতে মায়ের শাড়ি দিয়ে ঘর তৈরি করা হতো এই বর্ষায় খেলার জন্য।
এরপর কেউ এদিক ওদিক থেকে বিভিন্ন পাতা তুলে নিয়ে আসত বাজার যাবার নাম করে, আর কেউ রথের মেলা থেকে কেনা নকল বাসনে সেগুলো রান্না করতো।
এখন কে ভাবতে পারে দল বেঁধে খেলার কথা, তখন সবার মা বাবা নিশ্চিন্ত কেবল জানা থাকলেই তাদের সন্তান কোথায় আছে।
কখনো কারোর বাড়িতে আগাম জানিয়ে যাবার প্রয়োজনীয়তা ছিল না, যা রান্না হতো তাই দিয়ে খাইয়ে তবেই বাড়ি পাঠাতো।
পাড়ার সকল পরিবার মিলে চড়ুইভাতি এখন দেখাই যায় না, কি যে মজা হতো শব্দে প্রকাশ অসম্ভব।
এখন আন্তরিকতা সব বিলীন আধুনিকতার আড়ালে।
এমন কত খেলা, কত মুহুর্ত কেবলমাত্র স্মৃতির পাতায় আবদ্ধ হয়েই রয়েছে, যা আর ফেরার নয়!
আজকে আপনার পোস্ট পরিদর্শন করার মাধ্যমে। মনে হচ্ছে শৈশবের স্মৃতিগুলো আবারো মনে নাড়া দিয়ে উঠলো। শৈশবের সেই স্মৃতি কখনো ভুলে থাকা সম্ভব নয়। আমরা যে খেলা গুলো খেলেছিলাম আমাদের শৈশবে। সে খেলাগুলো এখন আর তেমন একটা দেখা যায় না। আধুনিকতার ছোঁয়ায় ছোট ছোট বাচ্চারা এখন অনেকটা এগিয়ে গেছে। সারাক্ষণ মোবাইলে গেম খেলা, ভিডিও দেখা এগুলো নিয়ে ব্যস্ত থাকে। খেলাধুলা করার মত সময় তাদের কাছে পাওয়া যায় না।
মাঝে মাঝে আমিও যখন চুপচাপ বসে থাকি। তখন শৈশবের সেই খেলাধুলার কথা বেশ মনে পড়ে। আমার তো মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে সে খেলা গুলো যদি আবার খেলতে পারতাম। সেই দিনগুলো যদি আবার ফিরে পেতাম তাহলে কতই না ভালো হতো।
আপনার ও পোস্টে উল্লেখিত বেশ কিছু খেলা আমি খেলেছি। তবে সেই খেলা গুলো এখন আর দেখতে পাই না। মাঝে মাঝে দেখি ছোট ছোট বাচ্চারা বসে মাটি দিয়ে বিভিন্ন ধরনের জিনিসপত্র তৈরি করে। কিন্তু আমরাও ছোটবেলায় এমন করেছিলাম সেই দৃশ্যটা মনে পড়ে। অসংখ্য ধন্যবাদ আপনাকে, শৈশবের স্মৃতি, এবং খেলা গুলো নিয়ে এত সুন্দর একটা বিষয় আমাদের সাথে আলোচনা করার জন্য। ভালো থাকবেন।
Upvoted. Thank You for sending some of your rewards to @null. It will make Steem stronger.
আমাদের বাচ্চারা এখন আধুনিক সভ্যতাই গড়ে উঠছে আর এজন্যই আধুনিক সভ্যতার যেগুলো ডিভাইস এই ডিভাইস মুখি হচ্ছে, আর এই কারণে শৈশবের খেলা গুলো আস্তে আস্তে বিলুপ্তর পথে সত্য কথা বলতে আপনি যে খেলা গুলোর নাম উল্লেখ করছেন তার অর্ধেক খেলাও আমি করি নাই। আর আমার বাচ্চারা আমি যেগুলো খেলা করছি তার অর্ধেক নামও জানেনা।
আমার ছোট ভাইয়ের একটি ছেলে আছে সে পড়াশোনা শেষ করেই রাতে যখন ঘুমাতে যাই তখন তার কাছে ফোন দিতেই হবে কিছুক্ষণ সময় গেম খেলবে তারপর ঘুমাবে সকালে ও স্কুল থেকে এসে দুপুরে খাওয়া দাওয়া করে খানিকক্ষণ সময় ঘুমিয়ে তারপর ঘুম থেকে উঠে বিকেল বেলা যেমন বাচ্চারা খেলাধূরা করে তখন সে ফোনের ভিতরে গেম খেলে। কিছুতেই এই অভ্যাসটা বদলানো যাচ্ছে না যদি তার কাছে ফোন না দেওয়া হয় সে কান্নাকাটি করে এবং মাটি গড়াগড়ি দিতে থাকে খুবই মুশকিলে পড়েছি।
ম্যাডাম আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ শৈশবের কিছু পুরনো স্মৃতি এবং খেলা সম্পর্কে খুব সুন্দর একটি আর্টিকেল আমাদের মাঝে উপস্থাপনা করার জন্য।
May be i was a baby of new culture. I have never played these games in my childhood.
আপনার পোস্টের মাধ্যমে পুনরায় শৈশবের অনেক স্মৃতি মনে পড়ে গেল।স্কুল থেকে ফিরেই আমরা নানান খেলায় মেতে উঠতাম।মার্বেল খেললে বাড়ির লোকজন মাঝে মাঝে মাইর দিত! আমাকে যদি জিজ্ঞাসা করা হয় আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ সময় কোনটা তাহলে বিনা ভাবনায় আমি বলে দিব শৈশবের কথা।তবে এখনকার প্রজন্ম আমাদের সময়ের শৈশবকে পায়না।এরা চার দেয়ালের ভিতর বন্দী থাকে।
ধন্যবাদ আপনাকে।
আপনার পোষ্টটি পড়ে শৈশবের স্মৃতি মনে পড়ে গেল।ছোটবেলায় কত খেলায় না খেলেছি কিন্তু এখন আর খেলা হয় না ।
এগুলোর মধ্যে অনেক খেলাই ছোটবেলায় খেলেছি। কিন্তু বুড়ি চু এবং গাধী খেলা কখনোই খেলিনি। যাইহোক, শৈশবের সময়গুলো কতই না সুন্দর ছিল। স্কুল থেকে ফিরে বেরিয়ে পড়েছি খেলার মাঠে, খেলেছি নানা রকমের খেলা। বড় বেলায় এসে সব খেলার সাথীদের হারিয়ে ফেলেছি, সাথে খেলাগুলোও 🥲🥲🥲।
আপনার লেখা পড়ে একদম ছোটবেলায় ফিরে গিয়েছি কিছু সময়ের জন্যে। আমরাও ছোটবেলায় পুকুর থেকে কাদা মাটি তুলে এভাবে হাড়ি পাতিল,পাখি, বাঘ বানাতাম।
পাশাপাশি আমাদের গ্রামে আমরা গাদন নামে একটা খেলা খেলতাম। যেখানে মাটিতে দাগ কেটে ঘর বানানো হতো।
বউচি, লুকোচুরি কত খেলেছি তার হিসেব নেই। তবে আমার সব থেকে ভালো লাগতো গাছিয়া ডোল নামের এক বিশেষ খেলা। গাছের মধ্যে সবাই বানরের মত ঝুলতাম আর এই খেলায় যে চোর থাকতো সে থাকতো মাটিতে। গাছ থেকে নেমে মাটিতে থাকা চোরকে ছুয়ে আবার গাছে ঊঠা। খুব মজার ছিল।
তবে এখন এ সব বিলুপ্তপ্রায়। মোবাইল এসে এখনকার বাচ্চাদের শৈশব যান্ত্রিক করে ফেলেছে। সবাই এখন ভিডিও গেইমে আশক্ত। তারা আমাদের সেই ছোটবেলার খেলা গুলোর মজা কোনদিন অনুধাবন করতে পারবেনা।
ধন্যবাদ আপনাকে। একদম শৈশবের মজার কিছু স্মৃতি নাড়িয়ে দেয়ার জন্যে।
দিদি আপনার পোস্ট পড়ে শৈশবের খেলার দিনগুলোর কথা মনে পড়ে গেল। শৈশবে যেসব খেলা খেলেছি এখন আর সেগুলো চোখে পরেনা। এখনকার ছেলেমেয়েরা কম্পিউটারে, মোবাইলে গেম নিয়ে ব্যস্ত। আমি ছোটবেলা পুতুল খেলা খেলতাম খুব বেশি। মাটি দিয়ে পুতুল বানিয়ে পুতুলের সংসার সাজাতাম। হাড়ি পাতিল নিয়ে মিছে মিছে রান্নার খেলা খেলতাম। আরো অন্যান্য অনেক ধরনের খেলা খেলতাম। আপনি যে চড়ুইভাতী খেলার কথা বলেছেন! আমাদের অঞ্চলে সেটাকে জুলাই-ভাতী খেলা বলে। এই খেলাটা দারুণ আনন্দের। মাঝে মাঝে মনে হয় আবার যদি ছোট হয়ে যেতে পারতাম ! তাহলে সেই আনন্দের দিনগুলো আবার ফিরে পেতাম।
আপনাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ, শৈশবের খেলার স্মৃতি এবং শৈশবের খেলার বিষয় আমাদের সাথে শেয়ার করার জন্য। ভালো থাকবেন।