পরীক্ষার পর ছুটি কাটানোর মুহুর্ত ও মোবাইল থেকে দূরে রাখার উপায়।
প্রিয় আমার বাংলা ব্লগের বন্ধুরা,
সমস্ত ভারতবাসী এবং বাংলাদেশের বাঙালি সহযাত্রীদের আমার আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন।
আশা করি আপনারা ঈশ্বরের কৃপায় সুস্থ আছেন, সব দিক থেকে ভালোও আছেন। আপনাদের সবার ভালো থাকা কামনা করে শুরু করছি আজকের ব্লগ।
ক্যাপশন পড়ে নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন আজকের পোস্ট লিখব একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে।
মোবাইলের কুপ্রভাব বিশেষ করে বাচ্চাদের ক্ষেত্রে তাই নিয়ে আগেও বিস্তর আলোচনা করেছি। কিন্তু বাচ্চাদের ফাঁকা সময় থাকা মানেই মোবাইলের প্রতি ঝোঁকটা অনেক বেড়ে যায়৷ সেই মুহুর্তে বাবা মায়েদের অনেক বেশি সতর্ক হতে হয়৷
এই বিষয়টা বহু আগে থেকেই আমার মনে হত। তাই আমি যা যা করি মা হিসেবে সেই সমস্ত কিছুই আপনাদের সাথে শেয়ার করব। অর্থাৎ বাচ্চাদের স্কুল ছুটি থাকলে আমামদের কেমন করে তাদের সঙ্গ দেওয়া দরকার বা কিভাবে ব্যস্ত রাখা যায়৷
কিছুদিন আগেই আমার মেয়ের স্কুলের পরীক্ষা শেষ হয়েছে। তাই ফলাফলের আগে পর্যন্ত কেবল একটাই চিন্তা কি খাই আর কি করি। স্কুল বা পরীক্ষা চলাকালীন প্রচন্ড ব্যস্ততায় তার দিন কাটে। কিন্তু এখন তো চব্বিশ ঘন্টাই ঘরে। আর সেই ভাবে পড়াশুনোও নেই। ফলে সময় কাটানোর উপায় রীতিমতো ভেবে বের করতে হয়েছে। যা তার ক্ষতি করবে না সাথে সাথে ছাত্রাবস্থার নানান দিকে বিকাশও ঘটাবে। সেইগুলোই আপনাদের সাথে তুলে ধরব।
আমার মা বলেন শুধু পড়াশুনো করলেই হয় না৷ সাথে অন্য কিছুও করতে হয়। মানে এক্সট্রা কারিকুলাম অ্যাক্টিভিটি। কারণ প্রতিটা বিভাগেরই আলাদা আলাদা প্রয়োজনীয়তা আছে। আর মানসিক বিকাশেও তাদের আলাদাই অবদান। তাছাড়া বাঙালির মেয়েরা সবই করে। তায়ে আবার আমি মেদিনীপুরের মেয়ে। আমাদের ওদিকে ছেলে মেয়েরা সকলেই অনেক কিছু করে থাকে। প্রবাসে আছি বলে কোন কিছুই জুটবে না এমন নয়, আজ ইন্টারনেটের যুগ৷ তাই কোন কিছু হাতের মুঠোয় আনাটা সহজ। মোবাইলে কেবল মাত্র গেম খেলে বা আজকালের ভ্লগ, ভিডিও রিল ইত্যাদি দেখে সময় কাটাচ্ছে আর আমি সেটা হাঁ করে দেখছি এমনটা হবার নয়। আমার রুটিনে আমার মেয়ে মোবাইল হাতে নেওয়ার সুযোগই পায় না৷ কেন বলুন তো? কারণ মেয়েটি এই ছুটিতে গান, কবিতা আবৃত্তি, বাংলা লিখতে শেখা, কেশবচন্দ্র নাগের অংক করা ছবি আঁকা ইত্যাদি নিয়মিত করে চলেছে। এবং তা মহানন্দেই৷ ফলত তার আর মোবাইল দেখার সুযোগই হয় না৷ এই অ্যাক্টিভিটিগুলোর অনেক প্রয়োজনীয়তা আছে। মানে কেন করাই? বিস্তারিত আলোচনা নিচে করছি।
কেশব চন্দ্র নাগের অংক -
আমরা খারাপ পশ্চিমবঙ্গে পড়াশোনা করেছি প্রায় প্রত্যেকেই জানি অংক ভালো করে শিখতে হলে বা অংকে নিজেকে পারদর্শী করতে হলে অবশ্যই কেশব চন্দ্র নাগের অংক করা দরকার। আমরা ছোটবেলায় বাংলা মিডিয়ামে পড়েছি এবং কেশব চন্দ্র নাগের বেশিরভাগ বই বাংলাতে পাওয়া যায়। যেহেতু প্রবাসে থাকি এবং মহারাষ্ট্রে থাকার কারণে আমার মেয়ে ইংলিশ মিডিয়ামে পড়ে এবং ভাষা শিক্ষা হিসেবে মারাঠি এবং হিন্দি এই দুটো ভাষায় তাকে পড়তে হয় এবং শিখতেও হয়েছে। বাংলা এতটা বিস্তারিত জানেনা। তাই বাংলা ভাষার অংক বই কিভাবে করবে সেসব চিন্তা ভাবনা করে আমি গতবারই যখন কলকাতা গিয়েছিলাম তখন কলেজ থেকে একটি ইংরেজি ভার্সনের কেশব চন্দ্র নাগে অংক বই এনেছিলাম। পরীক্ষার পর এই দীর্ঘ ছুটিতে বাড়িতে খেলাধুলার পাশাপাশি মাঝেমধ্যে অংকটা করাচ্ছি। যেতে পারে অংকের ভীত শক্তপোক্ত তো হচ্ছেই এবং ধারাবাহিকভাবে পড়াশোনাটা থেকে যাচ্ছে। আসলে অংক একটা এমন বিষয় যা অনেকটাই খেলা বা ম্যাজিকের মত। মজার ছেলে পড়ালে বাচ্চাদের মধ্যে আগ্রহ জন্মায়। আর আমি সেটাই চেষ্টা করে যাচ্ছি।
সঙ্গীত চর্চা-
মোটামুটি হ্যাং আউটে যারা নিয়মিত থাকেন তারা প্রত্যেকেই জানেন আমি একটু আধটু গান পারি৷ আমার কাছে গান মানে মনের আনন্দ এবং ভালো থাকার সংজ্ঞা৷ যারা সঙ্গীতপ্রেমি তারা প্রত্যেকেই জানেন গানের মাধ্যমে বা গানের হাত ধরে খুব অনায়াসে দুঃখ কষ্ট ভুলে যাওয়া যায়৷ তাই আমার মা বলেন গান মানুষের মনকে তরতাজা রাখে।
তাছাড়া আমার কন্যাটি মোটামুটি ভালোই গায়৷ স্কুলের প্রোগ্রামগুলোতে সব সময়ই অংশগ্রহণ করে৷ বাংলা হিন্দির থেকেও বেশি ইংরেজি গানে তার বেশি শখ। অনেক বুঝিয়ে একটি ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের দিদিমনির কাছে শিখতে দিয়েছি। যাতে করে গানের ভীতটা তৈরি হয়। তাছাড়া এখন অনেক সময়। তাই গান করে সময়ও যেমন সুন্দর কাটছে তেমন মনে আনন্দও হচ্ছে৷
বাংলা ভাষার শিক্ষা -
এক্ষুনি বললাম যে আমরা প্রবাসে থাকার কারণে এবং রাজ্যের মূল ভাষা মারাঠি হওয়ার কারণে ইংরেজি হিন্দির পাশাপাশি মারাঠিটাও লিখতে পড়তে শিখতে হচ্ছে। অর্থাৎ স্কুলে তিনটি ভাষা পড়তে হয়। এই বিষয়ে আমার খুব একটা আপত্তি নেই কারণ আমি নিজেও মনে করি যে রাজ্যে বসবাস করছি সেই রাজ্যের ভাষা জানতে হয়। না হলে অসাধারণ কাজগুলো আটকে যায়। অথচ আমি তো মনেপ্রাণে বাঙালি। তাই আমার মেয়ে যদি বাংলা ভাষাটা একেবারেই লিখতে পড়তে না জানি তাহলে আমার কেমন লাগবে। সারা বছর অন্যান্য বিষয়ের পড়ার চাপের ফলে বাংলার দিকে খুব একটা বেশি নজর দিতে পারি তা নয়। তাই এই ছুটির সময় যখন পড়াশোনা অন্যান্য কোন চাপ নেই তখন মনের আনন্দে বাংলা শিখছে। কে আনন্দের একটা বড় কারণ হলো ও জানে ওর মা বাংলায় লেখালেখি করে। অন্তত মায়ের লেখাগুলো পড়ার জন্য বাংলাটা শিখতেই হবে। খুব তাড়াতাড়ি শিখে নিচ্ছে কারণ হিন্দি এবং মারাঠি দুটোতে মাত্রা ব্যাকরণ ইত্যাদি বাংলার মতই। ছুটির দিনগুলোতে সময় কাটানোর এর থেকে ভালো উপায় এবং আনন্দঘন মুহূর্ত আর অন্য কিছু আছে বলেই আমার জানা নেই।
ছবি আঁকা-
খুব ছোট থেকেই আমার মেয়ে খুব ভালো রং করত। তখন একটি শিক্ষকের কাছে গিয়েছিলাম ছবি আঁকার জন্য। অবশ্যই অনলাইন দিয়েছিলাম কারণ সেই সময়টা করোনার লকডাউন চলছে। কিন্তু শিক্ষকের শিখানোর ধরন এবং কথাবার্তার টেম্পার আমার মেয়ে ঠিক নিতে পারেনি ফলে তার মধ্যে আকার ইচ্ছায় চলে গিয়েছিল। দুই মাস আগে ওকে একটি নতুন শিক্ষকের কাছে দিয়েছি সেটাও অনলাইন। ওখানে কিছুদিন ক্লাস করার পর থেকে দেখলাম ওর আঁখার প্রতি অনেকটাই ইচ্ছে জন্মেছে। বলতে হয় না নিজের থেকে সারাদিনের সময় পেলে আসতে বসে যায়। আমার তো মনে হয় মোবাইলে সময় কাটানোর থেকে এইভাবে ছবি একই সময় কাটানো অনেকটাই ভালো।
তাছাড়া যত বড় হচ্ছে ক্লাসের নানান বিষয় নানান ডায়াগ্রাম আঁকতে হয় যা অনেকটাই সময় লাগে। কিন্তু আঁকার হাত ভালো থাকলে সেই সমস্ত কিছু ঝটপট করে নেওয়া যায়।
ছবি আঁকার একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মনঃসংযোগ বৃদ্ধি। ছবি আঁকলে ধৈর্য বাড়ে। কারণ একটা ছবি সুন্দরভাবে করতে গেলে একটু দিতেই হয়। জীবনে ধৈর্য এবং মনঃসংযোগ এই দুটোই অত্যন্ত প্রয়োজনীয় জিনিস সাফল্যের দিকে এগিয়ে যাওয়ার জন্য। আপনারা কি বলছেন?
কবিতা আবৃত্তি-
লকডাউন এর সময় থেকে অনলাইনেই আমার মেয়ে আবৃত্তি শেখে। আবৃত্তিটা শেখানোর অনেকগুলো কারণ রয়েছে। যেমন ধরুন আবৃত্তি যখন করতে হয় তার টোন তো আলাদা হয় তাই যারা আবৃত্তি করে তাদের বাসনঙ্গেই বদলে যায়। আবৃত্তি করা মানে কবিতা মুখস্ত করে বলা। আর এটাই একটা নিয়মিত অভ্যেস। যার ফলে দুটো জিনিস ঘটে প্রথমত খুব কম সময়ে যেকোনো জিনিস পড়ে মনে রাখার অভ্যেস। দ্বিতীয়ত স্মৃতিশক্তি বাড়ে। কারণ যে কোন বাচ্চা এক দেড় বছরের বেশি আবৃত্তি শিখে ফেলা মানে তাকে অনেক আবৃত্তি মনে রাখতে হয়। আর আমি মনে করি চর্চা একটা নিয়মিত পদ্ধতি যার ফলাফল ক্লাসের পড়াশুনাতেও আসে।
যারা ভালো তাদের মধ্যে অনেকেই ভালো উপস্থাপক হয়ে যায় বা রেডিও জকির কাজ করে। অর্থাৎ বলো চলে আবৃত্তি কিন্তু ভবিষ্যতে জীবিকা নির্বাহের দিকেও ঠেলে দিচ্ছে।
এই এত কিছু করার পরেও সে কিন্তু অনেকটাই সময় পাই যা ছেলেটা কে দেয় এবং খানিকটা সময় টিভি দেখে।
মোবাইল দেখতে দিই না ঠিকই তবে টিভিতে সে তার পছন্দমত কার্টুন দেখে। কারণ আমার মনে হয় মোবাইলে লুকিয়ে লুকিয়ে কি দেখছে সেটা তো আমরা জানতে পারি না তাই টিভি চললে আমি ঠিকই লক্ষ্য নজর রাখতে পারি। টিভি দেখার পেছনে এটাই একটা বড় কারণ। এছাড়া চোখের ওপর অতো চাপ পড়ে না।
তাহলে বলুন বন্ধুরা আমার হিসেবে কি কোন ভুল হচ্ছে? ওর এই ছুটির দিনগুলো আমি কি ঠিকমতো করে ওর জন্য তৈরি করতে পারছি?
আপনাদের মতামতের অপেক্ষায় থাকব। আজ এলাম।
| পোস্টের ধরণ | লাইফস্টাইল ব্লগ |
|---|---|
| ছবিওয়ালা | নীলম সামন্ত |
| মাধ্যম | স্যামসাং এফ৫৪ |
| লোকেশন | পুণে,মহারাষ্ট্র |
| ব্যবহৃত অ্যাপ | ক্যানভা, অনুলিপি |
১০% বেনেফিশিয়ারি লাজুকখ্যাঁককে
~লেখক পরিচিতি~
আমি নীলম সামন্ত। বেশ কিছু বছর কবিতা যাপনের পর মুক্তগদ্য, মুক্তপদ্য, পত্রসাহিত্য ইত্যাদিতে মনোনিবেশ করেছি৷ বর্তমানে 'কবিতার আলো' নামক ট্যাবলয়েডের ব্লগজিন ও প্রিন্টেড উভয় জায়গাতেই সহসম্পাদনার কাজে নিজের শাখা-প্রশাখা মেলে ধরেছি। কিছু গবেষণাধর্মী প্রবন্ধেরও কাজ করছি। পশ্চিমবঙ্গের নানান লিটিল ম্যাগাজিনে লিখে কবিতা জীবন এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি৷ ভারতবর্ষের পুনে-তে থাকি৷ যেখানে বাংলার কোন ছোঁয়াই নেই৷ তাও মনে প্রাণে বাংলাকে ধরে আনন্দেই বাঁচি৷ আমার প্রকাশিত একক কাব্যগ্রন্থ হল মোমবাতির কার্ণিশ ও ইক্যুয়াল টু অ্যাপল আর প্রকাশিত গদ্য সিরিজ জোনাক সভ্যতা।
কমিউনিটি : আমার বাংলা ব্লগ
আমার বাংলা ব্লগ পরিবারের সব্বাইকে আমার আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন৷ ভালো থাকুন বন্ধুরা। সৃষ্টিতে থাকুন।
Upvoted! Thank you for supporting witness @jswit.
https://x.com/neelamsama92551/status/1903501206498267236?t=LdfyCJFh3unUELVi7OgCNg&s=19
https://x.com/neelamsama92551/status/1903502960098972028?t=fsRk_2TVMJQwvBmOl39xkg&s=19
https://x.com/neelamsama92551/status/1903504335272853994?t=si1lkvEo_pWKTAKW5QnwjA&s=19
https://x.com/neelamsama92551/status/1903526107502289231?t=IjiN5y_1quIaxiyWdfF-fA&s=19
We support quality posts and good comments Published in any community and any tag.
Curated by : chant
আপনার পোস্টটি খুবই চিন্তাশীল এবং অনুপ্রেরণাদায়ক।আপনি যেভাবে আপনার মেয়েকে বিভিন্ন ধরনের কার্যকলাপের মাধ্যমে ব্যস্ত রাখছেন, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। গান, কবিতা, ছবি আঁকা এবং বাংলা ভাষার শিক্ষার মাধ্যমে তার মানসিক বিকাশ ঘটানো খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আপনার এই উদ্যোগের মাধ্যমে শুধু পড়াশোনা নয়, সৃজনশীলতা এবং মনঃসংযোগেরও বিকাশ ঘটছে। এমনভাবে ছুটির সময় কাটানো সত্যিই সময়ের সঠিক ব্যবহার। আপনার মা’র কথাও যথার্থ, "শুধু পড়াশোনা নয়, এক্সট্রা কারিকুলামও গুরুত্বপূর্ণ" ধন্যবাদ দিদি।
হ্যাঁ আপু। আমি সব সময়ই চেষ্টা করে যাই। জানি না ভবিষ্যৎ কি আছে। তাও যতটুকু আমার হাতে ততটুকু তো অবশ্যই চেষ্টা করি।
আপনাকে অনেক ধন্যবাদ যে আপনি পোস্টটা সময় নিয়ে পড়েছেন ও মন্তব্যও করেছেন।