জেনারেল রাইটিং-জীবনের অনিশ্চয়তা ও আপনজনের টান

in আমার বাংলা ব্লগ9 months ago

আসসালামু আলাইকুম

কেমন আছেন সবাই? আশা করবো সবাই ভালো আছেন। সৃষ্টিকর্তার রহমতে আমিও আছি ভালোই। তবে ব্যস্ত এ নগরে কতটুকু সময় ভালো থাকতে পারবো সেটা বলা মুশকিল। শত ঘাত প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে কাটাতে হয় যান্ত্রিক জীবন। মাঝে মাঝে মনে হয় সব কিছুকে বন্ধ করে দিয়ে দূরে কোথাও সবুজ গাছের ছায়ায় নিজেকে একটু স্বস্থির ছায়া দিতে। কিন্তু ঐ যে বাস্তবতা, সেটা তো বড়ই নিষ্ঠুর আর নির্মম। কোন কিছুতেই ছাড় দিতে চায় না। সে যাই হোক বাবা । চলুন মূল পোস্টে ফিরে যাওয়া যাক।

প্রতিদিনই চেষ্টা করি আপনাদের মাঝে সুন্দর করে কিছু লিখে উপহার দেওয়ার জন্য। চাই চারদিকের মানুষগুলোর মধ্যে লুকিয়ে থাকা কষ্টগুলো কে আমার লেখার যাদুতে আপনাদের মাঝে তুলে ধরতে। জানিনা কতটুকু আপনাদের মাঝে নিজের মনের কথা গুলো কে শেয়ার করতে পারি। আজ চেষ্টা করলাম আপনাদের মাঝে নতুন একটি জেনারেল রাইটিং শেয়ার করার জন্য। আশা করি প্রতিদিনের মত করে আমার আজকের জেনারেল রাইটিংটিও আপনাদের কাছে বেশ ভালো লাগবে।

1000025212.png

অফিস শেষে ক্লান্ত শরীর নিয়ে যখন দুপুরে বাসার পথে ফিরছিলাম, তখনও কল্পনাই করতে পারিনি যে হঠাৎ এভাবে জীবনের সাথে এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে। পথের মাঝে হঠাৎ খবর পেলাম—আমার সেজো ভাই হার্ট অ্যাটাক করেছে। খবরটি শুনেই মনটা কেঁপে উঠল, শরীর যেন অবশ হয়ে এলো। মানুষ যতই ব্যস্ত থাকুক, যতই দূরে থাকুক, আপনজনের বিপদের খবর শোনার সাথে সাথেই সব কিছু থেমে যায়। আমারও তাই হলো, মুহূর্তের মধ্যেই সব কাজকর্ম ফেলে দৌড়ে এলাম হৃদরোগ হাসপাতালে।

হাসপাতালে গিয়ে প্রথমেই বুঝতে পারলাম সরকারি হাসপাতালে রোগী ভর্তি করা কতটা কষ্টসাধ্য ব্যাপার। দরজায় দীর্ঘ লাইন, রোগীর ভিড়, স্বজনদের উৎকণ্ঠা—সবকিছু মিলিয়ে যেন এক অস্থির পরিবেশ। একজন অসুস্থ মানুষকে নিয়ে পরিবারের লোকজন যখন হাসপাতালে আসে, তখন তাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হয় একটু সহানুভূতি আর দ্রুত চিকিৎসা। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সেখানে প্রক্রিয়ার ভিড়ে, কাগজপত্রের ঝামেলায় আর অনুমতির অপেক্ষায় সময় নষ্ট হয়। সেদিন নিজের চোখে দেখে আরও গভীরভাবে অনুভব করলাম এই দুর্ভোগ।

সৌভাগ্যবশত, পরিচিত একজন ডাক্তারের মাধ্যমে অনেকটা জোরের ভিত্তিতে আমার ভাইকে ভর্তি করানো সম্ভব হলো। না হলে হয়তো আরও সময় চলে যেত, আর সময়ই হলো হার্টের রোগীর জন্য সবচেয়ে মূল্যবান জিনিস। ভর্তি করানোর পরপরই ডাক্তাররা পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করলেন। যতটুকু জানলাম, তার অবস্থা মোটেও ভালো নয়। এই কথাটি শোনার পর থেকে বুকের ভেতরে এক অদ্ভুত ভার অনুভব করছি। মনে হচ্ছে প্রতিটি মুহূর্ত অনিশ্চয়তার।

রক্তের সম্পর্কের টান এমনই যে, সেটা অন্য কিছুর সাথে তুলনাই করা যায় না। যত দূরে থাকি, যত ব্যস্ত থাকি, আপনজনের কষ্টের খবর শুনে মন শান্ত থাকতে পারে না। সেজো ভাইয়ের সাথে আমার শৈশবের অনেক স্মৃতি জড়িয়ে আছে। খেলাধুলা, পড়াশোনা, পারিবারিক আড্ডা—সব জায়গাতেই তার উপস্থিতি এক ধরনের নির্ভরতার প্রতীক ছিল। আজ সেই মানুষটিই যখন হাসপাতালের বেডে শুয়ে জীবনের সাথে লড়ছে, তখন আমার ভেতরে কেমন যেন এক শূন্যতা কাজ করছে।

সারা বিকেল আর সন্ধ্যা হাসপাতালেই কাটল। ডাক্তারদের সাথে কথা বললাম, পরীক্ষার রিপোর্ট আসার অপেক্ষায় থাকলাম, আর পরিবারের সবার মধ্যে দুশ্চিন্তার ছাপ স্পষ্টভাবে চোখে পড়ল। মায়ের চোখের পানি, বাবার নিঃশব্দ দীর্ঘশ্বাস, আর ছোট ভাইবোনদের উৎকণ্ঠা—সব মিলিয়ে পরিবেশটা ভারী হয়ে উঠল। মানুষ যখন কঠিন পরিস্থিতিতে পড়ে, তখন তার ভেতরের অসহায়ত্ব প্রকট হয়ে ওঠে। সেই মুহূর্তে টাকা-পয়সা, পদমর্যাদা, জ্ঞান-বুদ্ধি—কোনো কিছুরই তেমন গুরুত্ব থাকে না। সবচেয়ে বেশি দরকার হয় প্রিয় মানুষের সুস্থ হয়ে ওঠা।

কোনোভাবে হাসপাতালের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে, চিকিৎসা শুরু হওয়ার পর যখন কিছুটা স্বস্তি ফিরে পেলাম, তখন রাত অনেকটা গড়িয়ে গেছে। তবুও মনটা একেবারেই শান্ত নয়। জানি না সামনে কী আছে, জানি না আমার ভাইয়ের ভাগ্যে কী লেখা আছে। মানুষ যখন অসহায়ভাবে ভবিষ্যতের অপেক্ষায় থাকে, তখন সময়টা আরও ভারী মনে হয়। প্রতিটি সেকেন্ড যেন ঘড়ির কাঁটায় নয়, বুকের ভেতরে চাপ তৈরি করে।

অবশেষে সব কাজ শেষ করে যখন বাসায় ফিরতে ফিরতে রাত বারোটা বেজে গেল, তখন শরীরের ক্লান্তি আর মানসিক চাপ একসাথে ভর করল। কিন্তু ঘরে ফিরে শুয়ে থাকতে মন সায় দিল না। বুকের ভেতরের ভার কমাতে, অনুভূতিগুলো প্রকাশ করতে আমি কলম তুলে নিলাম। লিখতে বসে বুঝলাম, মানুষের জীবন কতটা অনিশ্চিত। সকালবেলা সুস্থ মানুষ দুপুরেই মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যেতে পারে। এই অনিশ্চয়তাই জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা।

আজকের এই দিনটি আমাকে আরও একবার শিখিয়ে দিল যে, জীবন খুব ছোট আর ভীষণ ভঙ্গুর। আমরা প্রতিদিন নানা ব্যস্ততায় ডুবে থাকি, অফিস করি, কাজকর্ম করি, ভবিষ্যতের পরিকল্পনা করি। কিন্তু এক মুহূর্তেই সবকিছু থেমে যেতে পারে। আমাদের সম্পর্কগুলো, ভালোবাসা আর যত্নই আসলে জীবনের মূল সম্পদ। অর্থ, পদমর্যাদা বা খ্যাতি কোনো কিছুই হাসপাতালে শয্যাশায়ী প্রিয়জনের জীবন ফিরিয়ে দিতে পারে না।

আমি জানি, এই লেখা পড়ে অনেকেই হয়তো নিজের জীবনের অভিজ্ঞতার সাথে মিল খুঁজে পাবেন। আমাদের প্রত্যেকের পরিবারে কোনো না কোনো সময়ে এমন কঠিন পরিস্থিতি আসে। তখন আমরা বুঝতে পারি, প্রিয় মানুষদের সাথে সময় কাটানো, তাদের যত্ন নেওয়া আর ভালোবাসা প্রকাশ করাটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। জীবনকে খুব হালকা ভাবে নেওয়া উচিত নয়, কারণ প্রতিটি মুহূর্তই মূল্যবান।

আজকের অভিজ্ঞতা আমাকে আরও বেশি কৃতজ্ঞ করেছে। কৃতজ্ঞ, কারণ আল্লাহ আমাদের পরীক্ষা নিচ্ছেন, কিন্তু একইসাথে ধৈর্য ধরার শক্তিও দিচ্ছেন। কৃতজ্ঞ, কারণ এমন পরিস্থিতিতেও কিছু মানুষ পাশে এসে দাঁড়িয়েছে, সাহায্য করেছে। আর সবচেয়ে বড় কৃতজ্ঞতা এ জন্য যে, এখনো সেজো ভাই বেঁচে আছেন এবং চিকিৎসা নিচ্ছেন। সামনে কী আছে তা কেউ জানে না, কিন্তু আশা আর দোয়া মানুষের সবচেয়ে বড় সম্বল।

রাত গভীর হলেও মনে হলো, আপনাদের সাথে এই অভিজ্ঞতা শেয়ার না করলে মনটা হালকা হবে না। তাই লিখতে বসেছি। আপনারা সবাই আমার ভাইয়ের জন্য দোয়া করবেন—এটাই আমার একান্ত অনুরোধ। হয়তো আপনাদের দোয়া আর ভালোবাসায় আল্লাহ তার রহমত বর্ষণ করবেন, আর আমার ভাই সুস্থ হয়ে আবার আমাদের মাঝে ফিরে আসবেন।

জীবনের এই দোলাচলে একটাই শিক্ষা পাই—আমাদের উচিত একে অপরকে আরও বেশি ভালোবাসা, যত্ন নেওয়া এবং পাশে থাকা। কে জানে কোন মুহূর্তে কার জীবনের অধ্যায় শেষ হয়ে যাবে! তাই প্রতিটি সম্পর্ককে গুরুত্ব দিতে হবে, প্রতিটি মুহূর্তকে মূল্য দিতে হবে। আমি আশা করি, এই অভিজ্ঞতা আপনাদেরও মনে করিয়ে দেবে যে জীবন শুধু ব্যস্ততা নয়, জীবন হলো ভালোবাসা আর আপনজনের সাথে থাকার নাম।

আমার পরিচিতি

আমি মাকসুদা আক্তার। স্টিমিট প্লাটফর্মে আমি @maksudakawsar হিসাবে পরিচিত। ঢাকা হতে আমি আমার বাংলা ব্লগের সাথে যুক্ত আছি। আমি একজন গৃহিনী এবং চাকরিজীবী। তারপরও আমি ভালোবাসি আমার মাতৃভাষা বাংলায় নিজের মনের কথা গুলো আমার বাংলা ব্লগের প্লাটফর্মে শেয়ার করতে। আমি ভালোবাসি গান শুনতে এবং গাইতে। আমি অবসর সময়ে ভ্রমন করতে এবং সেই সাথে সুন্দর কিছু ফটোগ্রাফি নিজের ক্যামেরায় বন্দী করতে ও ভালোবাসি। মাঝে মাঝে নিজের মনের আবেগ দিয়ে দু চার লাইন কবিতা লিখতে কিন্তু আমার বেশ ভালোই লাগে। সর্বোপরি আমি ভালোবাসি আমার প্রাণপ্রিয় মাকে।


3W72119s5BjVs3Hye1oHX44R9EcpQD5C9xXzj68nJaq3CeF5StuMqDPqgYjRhUxqFbXTvH2r2mDgNbWweA4YGBo825oLh4oqEqeynn5EZL11LdCrppngkM (1).gif

VOTE @bangla.witness as witness

witness_vote.png

OR

SET @rme as your proxy


witness_proxy_vote.png

1000206266.png

1000206267.png

❤️❤️ধন্যবাদ সকলকে❤️❤️

Coin Marketplace

STEEM 0.04
TRX 0.32
JST 0.082
BTC 60241.63
ETH 1567.82
USDT 1.00
SBD 0.42