বাবু ভাই
তখনো আমার চেম্বার দেওয়া হয়ে ওঠে নি। সবেমাত্র নতুন পাশ করে বের হয়েছি। এলাকার সরকারি হাসপাতালে টুকটাক যাওয়ার সুযোগ হতো বাবার চাকরির সুবাদে। তাছাড়াও পাশ করার পর থেকে চেম্বার দেওয়ার আগ পর্যন্ত, দীর্ঘ সময় মূলত অলস ভাবেই বাসায় কাটাতাম।
তবে একটা সময়ের পরে এখানকার হাসপাতালের যে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ছিল, অনেকটা তার অনুরোধে বা নিজের ক্লিনিক্যাল কাজগুলো তে হাত পরিপক্ক করার জন্যই, হাসপাতালে প্রতিনিয়ত যাতায়াত করতাম।
বাবু ভাইয়ের সঙ্গে প্রথম পরিচয় আমার সেখান থেকেই। দেখতে দেখতে দীর্ঘ কতটা সময় কেটে গেল। আমি তো পরবর্তীতে চেম্বার করেছিলাম, ৬-৭ বছর প্র্যাকটিসের সঙ্গে জড়িত ছিলাম। তবে বাবু ভাই বেশ আশায় ছিল, তার সরকারি চাকরিটা হবে, এই অপেক্ষায় প্রতিটা প্রহর গুনতো।
বলছি এখন থেকে ছয়-সাত বছর আগের ঘটনা। সেই সময় তো এলাকাতে ডাক্তার স্বল্পতা ছিল। বিশেষ করে বিভিন্ন সরকারি ছুটিতে হাসপাতালে ডাক্তার প্রায় শূন্যই হয়ে যেত। তাই সেই সময়গুলোতে হাসপাতালে আমাকে অনেকটা বেশি সময় দিতে হতো।
হাসপাতালটা ছোট হলেও এখানে আগত রুগীর সংখ্যা ছিল বেশ। কারণ অনেক জনবহুল ছিল আমাদের এলাকাটা। জরুরী বিভাগে রাত্রি বেলা যখন ইমার্জেন্সি ডিউটি করতাম, ঠিক সেখানেই দেখতাম ডাক্তারের সহকারীর ভূমিকায় বাবু ভাই বেশ ভালোই কাজ করতো।
তাকে আমি খুব কাছ থেকেই দেখেছি। তার ক্লিনিক্যাল কাজে হাত বেশ ভালোই ছিল। খুব দ্রুত ইমার্জেন্সি ট্রিটমেন্ট দেওয়া মানে সেলাই করা, ইনজেকশন দেওয়া, ক্যানুলা ও ড্রেসিং থেকে শুরু করে টুকটাক ছোটখাটো যে কাজগুলো থাকতো,সেই কাজগুলো রোগীর সে খুব ভালোভাবেই করতে পারতো । তবে বাবু ভাই এই পেশাতে এই এলাকাতে মোটামুটি ফ্রিতেই অনেকটা সময় দিয়েছিল। তার আসলে একটা সরকারি চাকরি বলা যায় প্রাপ্যই ছিল।
ভাই আমার থেকে বয়সে কিছুটা বড় ছিল। সে পড়াশোনা করেছিল সিরাজগঞ্জ মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট কলেজ থেকে। মূলত সহকারী মেডিকেল অফিসার পদের জন্য অনেকটাই চাকরির চেষ্টা করছিল।
মাঝে তো তাদের নিয়োগের সার্কুলার হয়েছিল।মেধা যেহেতু ভালো ছিল, তাই লিখিত পরীক্ষাতে অনেকটা ভালো ফলাফল করেছিল। তবে ধরা খেয়ে গিয়েছিল ভাইভা পরীক্ষাতে গিয়ে। যার মাধ্যমে সুপারিশ করেছিল, পয়সার অভাবে তার আসলে মন জোগাতে পারেনি। তাই চাকরিটা অধরাই থেকে গিয়েছিল।
দীর্ঘদিন পরে, আজ হঠাৎই তার সঙ্গে দেখা। একসময় হাসপাতালে তার সঙ্গে কত রাত ইমার্জেন্সি ডিউটি করেছি, আজ সেই সব মুহূর্ত সবই যেন অতীত। তার থেকে আমার প্রফেশনাল ডিগ্রী বড় থাকলেও তাকে চেষ্টা করতাম বেশ সম্মান দিয়েই কথা বলার জন্য । ডিগ্রী ছোট হোক বা বড় হোক এটা কোন বিষয় না। বিষয়টা যেহেতু চাকরির, তাই আমিও খুব একটা ভালো কিছু করতে পারিনি।
আমার হয়তো পারিবারিক অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা কিছুটা ভালো ছিল বিধায়, পরবর্তীতে চেম্বার দিয়ে ছিলাম এবং দীর্ঘ সময় প্র্যাকটিস করার পরে আরো একটা চেম্বার দেওয়ার সুযোগ হয়েছিল। যদিও এখন সবকিছু ছেড়ে দিয়েছি।
তবে তাও বাবু ভাইয়ের অবস্থার কথা চিন্তা করলে বেশ খারাপ লাগে। ভাই বেশ মেধাবী ছিল তবে পয়সার অভাবে সে অনেকটাই ব্যর্থ হয়েছিল।
আমি নিজেই যত হতাশার ভিতরে সময় পার করি, সেখান থেকে আজ যখন তার সঙ্গে দীর্ঘদিন পরে হঠাৎ করে দেখা হয়েছিল এবং তার কথাগুলো যখন শুনছিলাম, তখন বড্ড খারাপ লাগছিল। কারণ কিছুই করার নেই আমার, তার জন্য।
চাকরির কথা ভাবতে ভাবতে তার আসলে অনেকটাই মানসিক পরিবর্তন হয়ে গিয়েছে। তাকে আসলে কি বলে সান্তনা দেব, সেই ভাষা আমার জানা নেই। সত্যি বলতে কি, আমি তো নিজেও সরকারি চাকরির জন্য দুই-তিনবার পরীক্ষা দিয়েছিলাম। তবে পরীক্ষা দিয়ে যা বুঝতে পেরেছিলাম, সেটা আমার বেশ ভালো ভাবেই মনে থাকবে। এসব চাকরি আসলে আমার জন্য নয়। তাই আর ধৈর্য্য ধরে থাকি না।
সম্ভবত তার আর একবার চাকরির পরীক্ষাতে বসার বয়স আছে। তবে এখন সার্কুলার নতুন করে হবে কিনা এবং পরীক্ষা দিতে পারবে কিনা, সেটা নিয়েও সে বেশ চিন্তায় আছে। এমন হতাশা যে শুধু তার একার, তা বললে নেহাত ভুল হবে। কারণ এমন অবস্থা আশেপাশে চতুর্দিকে বিরাজ করছে।
তারপরেও তার আগামী দিনটা সুখকর হোক। হয়তো স্বল্প সময়ের পরিচিত হলেও, তাকে আমি যতটুকু চিনি বা জানি, সেই জায়গা থেকে তার প্রতি এতোটুকু শুভেচ্ছা তো জানাতেই পারি।
ডিসকর্ড লিংক
https://discord.gg/VtARrTn6ht
| 250 SP | 500 SP | 1000 SP | 2000 SP | 5000 SP |
VOTE @bangla.witness as witness
OR
বাবু ভাইয়ের মতো হাজারো মেধাবী আজ নিরুপায়। একদিকে পরিবারের বোঝা মাথার উপর অন্যদিকে চাকরির চিন্তা। সব মিলিয়ে যখন জীবন এলোমেলো হয়ে যায় তখন কিছুই করার থাকে না আমাদের। হতাশা ছাড়া জীবনে আর কিছুই নেই। এভাবে হয়তো হাজারো মেধাবী হাল ছেড়ে দিচ্ছে। তবুও চাই বাবু ভাইয়ের যেন ভালো একটি অবস্থান তৈরি হয়।
এমনটা চাওয়া আমারও আপু, তার যেন একটা সুখবর হয় এই আশাই করছি।
আপনার বাবু ভাইয়ের কথা শুনে সাময়িক কিছুটা খারাপ লাগা কাজ করেছিল। কিন্তু চারপাশে হাজারো বাবু ভাইয়ের কথা মনে পড়ে খারাপ লাগাটা বেশিক্ষণ থাকলোনা ! চারপাশে সব দেখতে দেখতে আমারা এখন অনেকটা অভ্যস্ত। তারপরেও আপনার বাবু ভাইয়ের জন্য শুভ কামনা। আর বাবু ভাইয়ের অছিলায় আমাদের বর্তমান সমাজ ব্যবস্থার নিদারূণ সত্য তুলে ধরেছেন। বাবু ভাইদের জয় হোক। শুভ কামনা আপনার জন্য।
চাকরির বাজারে আসলেই পারিপার্শ্বিক অবস্থা বেশ করুন আপু। কি যে একটা বাজে অবস্থা বিরাজ করছে, তা আসলে বলা বেশ কষ্টকর।
বর্তমানে মেধা দিয়ে নয় ভাইয়া, বরং টাকা ছড়ালেই সরকারি চাকরি পাওয়া যায়। বাবু ভাই মেধাবী হলেও, টাকার দিক থেকে অসচ্ছলতার কারণে হয়তো তার স্বপ্নের চাকরিটা আর পাওয়া হলো না। যদিওবা সে লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিল, তবে ভাইভাতে গিয়ে ধরা খেয়ে গেল। এই হচ্ছে আমাদের বর্তমান প্রেক্ষাপট। এরকম হাজারো বাবুর চাকরি না পাওয়ার আর্তনাদ আমাদের চারপাশের বাতাসকে যেন ভারী করে তুলেছে। তবুও যেন কারো কোনই কর্ণপাত নেই, এসব বাবু ভাইদের পরিস্থিতি নিয়ে কারো কোন ভাবার সময় ও সুযোগ নেই। যাইহোক ভাইয়া, বাবু ভাইয়ের জন্য দোয়া করছি সে যেন আরেকটি বার পরীক্ষায় বসতে পারে, এবং সেখানে সফলতা লাভ করে। আপনার ও বাবু ভাইয়ের জন্য অনেক অনেক শুভকামনা রইল।
আপনার মন্তব্যের সঙ্গে একদম সহমত পোষণ করছি ভাই। তবে তারপরেও বাবু ভাইয়ের ভালো হোক এমনটাই প্রত্যাশা ব্যক্ত করছি।
সত্যিই ভাইয়া বাবু ভাইয়ের গল্পটি পড়ে মনটা অনেক খারাপ হয়ে গেল। মাঝে মাঝে ভাবি কি লাভ এত মেধাবী হয়ে। কি লাভ এত এত লেখাপড়া করে। শত শত বেকার ছেলেমেয়ে আজ এক যন্ত্রণাময় জীবন যাপন করছে। দিনে দিনে চলে যাচ্ছে হতাশার এক ভিন্ন দেশে। আসলেই খারাপ লাগে বাবু ভাইদের জন্য। দোয়া রইল আপনার বাবু ভাইয়ের জন্য।