গোধূলির ডায়েরি || পর্ব-৫: দামি বিছানার সস্তা ঘুম
আজকের রাতটা কুয়াশায় মোড়ানো নয়, বরং এক দমবন্ধ করা নিস্তব্ধতায় ভরা। দাদু আজ পার্কে এসে ল্যাম্পপোস্টের নিচে দাঁড়ালেন না। তিনি এসে বসলেন লেকের পাড়ে, যেখানে আলো-আঁধারির এক অদ্ভুত খেলা চলছে। তার কোলের ওপর খোলা জীর্ণ ডায়েরিটা, তবে তার আঙুলগুলো আজ স্থির। চশমার আড়ালে তার চোখ দুটো আজ বড্ড ক্লান্ত দেখাচ্ছে।
আমার দিকে না তাকিয়ে, লেকের কালো জলের দিকে চেয়ে দাদু বিষণ্ণ গলায় বললেন,
"শোনো ছোকরা, এই সভ্য সমাজ প্রতিটা জিনিসের দাম নির্ধারণ করতে পেরেছে, কিন্তু কোনো কিছুর মূল্য বুঝতে শেখেনি।"
দাদু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলতে লাগলেন, “আজ সন্ধ্যায় শহরের সবচেয়ে বড় অট্টালিকাটার সামনে দিয়ে আসছিলাম। দেখলাম, সেই প্রাসাদের মালিক কোটি টাকার নরম মখমলের বিছানায় শুয়ে এপাশ-ওপাশ করছে। তার পাশে রাখা হাজার টাকার ঘুমের ওষুধের কৌটো। পুরো পৃথিবী কেনার সামর্থ্য আছে লোকটার, অথচ এক ফোঁটা শান্তি কেনার ক্ষমতা নেই। অথচ ঠিক সেই অট্টালিকার নিচে, ফুটপাতের শক্ত পাথরে শুয়ে এক রিকশাচালক আকাশের তারা গুনতে গুনতে পরম শান্তিতে ঘুমে তলিয়ে গেছে। তার কোনো দামী বিছানা নেই, কোনো প্রহরী নেই, শুধু আছে এক বুক ক্লান্তি আর প্রশান্তি।”
দাদু ডায়েরির পাতাটা আলতো করে ছুঁয়ে দেখলেন।
“কী অদ্ভুত বৈপরীত্য, তাই না? মানুষ সারাজীবন টাকা নামক এক মরীচিকার পেছনে দৌড়ায় এক টুকরো সুখের আশায়। অথচ সেই টাকা যখন আসে, তখন সে আরামের সব উপকরণ কিনতে পারলেও, আসল আরামটাই হারিয়ে ফেলে। আমরা দামী বিছানা কিনতে গিয়ে ঘুমকে বিক্রি করে দেই। আমরা সাফল্যের চূড়ায় উঠি ঠিকই, কিন্তু সেখানে বাতাস এত পাতলা যে নিঃশ্বাস নেওয়াই দায় হয়ে পড়ে।”
দাদু ডায়েরিটা ধীরে ধীরে বন্ধ করলেন। দূর থেকে একটা ট্রেনের হুইসেল শোনা গেল, যেন কোনো একাকী আত্মার আর্তনাদ।
"মনে রেখো ছোকরা, জীবনটা অট্টালিকার উচ্চতায় নয়, মনের গভীরতায় মাপা হয়। উপার্জনের পেছনে অন্ধ হয়ে এমন কিছু হারিয়ে ফেলো না, যা পরে পুরো পৃথিবীটা বন্ধক দিলেও আর ফেরত পাবে না। ধনী হওয়া সহজ, কিন্তু শান্ত হওয়া বড্ড কঠিন।”