গোধূলির ডায়েরি || পর্ব-৪: স্মৃতির নিলাম
আজ সন্ধ্যাটা কেমন যেন ভারী। বাতাস থমকে আছে, আর ল্যাম্পপোস্টের আলোটা আজ একটু বেশিই নিস্তেজ। দাদু পার্কে এলেন অনেক দেরিতে। তার সেই জীর্ণ চামড়ার ডায়েরিটা আজ বুকের সাথে চেপে ধরেননি, বরং একটা প্লাস্টিকের ব্যাগে করে এনেছেন। চশমাটা নাকের ডগায় নামিয়ে, তিনি ডায়েরিটা খুললেন। আজ তিনি কোনো পাতা ওল্টালেন না, শুধু শেষ পাতাটার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
আমার দিকে না তাকিয়েই তিনি বললেন,
"শোনো ছোকরা, এই পৃথিবীর সবচেয়ে দামী জিনিস কী জানো? স্মৃতি। অথচ আমরা সবাই সেই স্মৃতির সস্তা নিলামদার।"
দাদু বলতে লাগলেন, “মানুষ আজব প্রাণী। সে সারাজীবন দৌড়ায় সুখের পেছনে, আর যখন সুখের মুহূর্তগুলো আসে, তখন সে ব্যস্ত থাকে সেগুলোকে ক্যামেরায় বন্দি করতে। সে ভাবে, ছবি তুললেই বোধহয় মুহূর্তটা তার হয়ে গেল। কিন্তু সে ভুলে যায়, স্মৃতি ক্যামেরায় থাকে না, থাকে মনের গহীনে। আমরা সবাই অতীতে বাঁচি, ভবিষ্যতে বাঁচার স্বপ্ন দেখি, কিন্তু বর্তমানকে তুচ্ছ মনে করে হারিয়ে ফেলি।”
বৃদ্ধ একটু থামলেন, একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আকাশে উড়ন্ত পাখির দিকে চাইলেন।
“তারপর কী হয় জানো? যখন সময় ফুরিয়ে আসে, তখন মানুষ সেই স্মৃতির নিলামে ওঠে। সে তখন বুঝতে পারে, তার সমস্ত সঞ্চয়, সমস্ত অর্জন—সব মিথ্যে। তার আসল সম্পদ তো সেই মুহূর্তগুলো ছিল, যা সে হেলায় হারিয়েছে। স্মৃতি হলো এক বিষাক্ত বাগান, যেখানে কণ্টকগুলোকে আমরা জল দেই, আর ফুলগুলোকে উপেক্ষা করি। আমরা ভালোবাসতে শিখি শুধু ছবিকে, স্মৃতিকে না।”
দাদু আবার ডায়েরিটা বন্ধ করলেন। বাতাসটা যেন আরও গম্ভীর হয়ে এলো।
"তাই বলছি ছোকরা, মুহূর্তগুলোকে ক্যামেরায় বন্দি করার চেয়ে, মনের গহীনে সাজিয়ে রেখো। কারণ ছবি একদিন নষ্ট হয়ে যাবে, কিন্তু স্মৃতি তোমার সাথেই থাকবে। আমরা সবাই একদিন ছবি হয়ে যাব, শুধু স্মৃতি হয়ে থাকব না।”