গোধূলির ডায়েরি || পর্ব-৬: আগামীর মরীচিকা
আজকের সন্ধ্যাটা বাতাসহীন, বড় নিথর। ল্যাম্পপোস্টের হলুদ আলোটা কেমন যেন নিষ্প্রাণ, ঠিক যেন এক বৃদ্ধের শেষ নিঃশ্বাস। দাদু আজ পার্কে এলেন এক বিষণ্ণ চাউনি নিয়ে। জীর্ণ ডায়েরিটা আজ তিনি খুললেন না, কেবল একটা পুরনো, বন্ধ হয়ে যাওয়া পকেট ঘড়ি বের করে হাতের তালুতে নিলেন। চশমাটা খুলে পাশে রেখে, তিনি ঘড়িটার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন।
আমার দিকে না তাকিয়েই, এক অজানা শুন্যতার দিকে চেয়ে দাদু ভাঙা গলায় বললেন,
"শোনো ছোকরা, এই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় অভিশাপ কী জানো? মানুষ ভাবে তার হাতে অনেক 'সময়' আছে।"
দাদু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলতে লাগলেন, “এই পকেট ঘড়িটার দিকে তাকাও। কাঁটা দুটো দশটা বেজে দশে থেমে আছে। আমি সারাজীবন ভেবেছি, একদিন ঘড়িটা ঠিক করাবো, একদিন সময়টাকে আবার চলতে দেব। ভেবেছি, আগামীকাল করব, আগামী সপ্তাহে করব। এই 'আগামীকাল'-এর মরীচিকার পেছনে দৌড়াতে দৌড়াতে আজ আমি জীবনের শেষ প্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছি। অথচ ঘড়িটা এখনো বন্ধ। ঠিক করানোর সময় আর হলো না।”
বৃদ্ধ একটা শুষ্ক হাসি হাসলেন, যা কান্নার চেয়েও করুণ।
“মানুষ বড় অদ্ভুত বোকা। সে প্রেমের কথা গুছিয়ে রাখে ভবিষ্যতের জন্য, ক্ষমা চেয়ে নেওয়ার মুহূর্তটা পিছিয়ে দেয় আগামীর তরে। সে ভাবে, আজ থাক, কাল হাসব, কাল ভালোবাসব, কাল বাঁচব। অথচ আমরা ভুলে যাই, জীবনটা কোনো নাটক নয় যে স্ক্রিপ্ট আগে থেকেই লেখা আছে। আগামীকাল বলে কিছু নেই, ছোকরা, ওটা কেবল এক মৃত মানুষের শেষ অজুহাত। এই মুহূর্তটাই আসল, এই শ্বাস-প্রশ্বাসটাই একমাত্র সত্য।”
দাদু ঘড়িটা প্লাস্টিকের ব্যাগে ভরে নিলেন। বাতাসটা যেন আরও নীরব হয়ে এলো।
"মনে রেখো ছোকরা, ডায়েরির পাতা ফুরিয়ে যাওয়ার আগে, সমস্ত না বলা কথাগুলো বলে দিও। কারণ কাল যখন গোধূলি আসবে, তখন হয়তো বলার জন্য তুমিও থাকবে, কিন্তু শোনার জন্য সে আর থাকবে না। আমরা সবাই সময়ের গোলাম, অথচ ভাবি আমরাই সময়ের মালিক।”
https://sunpump.meme/token/TX5eXdf8458bZ77fk8xdvUgiQmC3L93iv7