গল্প রাইটিং- অন্ধকারের মেয়ে রুনি -২য় পর্ব
আসসালামু আলাইকুম
কেমন আছেন সবাই? আশা করবো সবাই ভালো আছেন সৃষ্টিকর্তার রহমতে । আমিও আছি আপনাদের দোয়ার বরকতে জীবন নিয়ে ভালোই। তবে কেন জানি আজকাল ব্যস্ততাগুলো আমায় দারুন প্যারা দিচেছ। প্যারা দিচ্ছে জীবন আর সময় দুটোই। কিন্তু আমি তো ব্যস্ততা চাই না। চাই একটু শান্তি আর প্রশান্তি। চাই একটু স্বাধীনতা। যাই হোক এসব কথা বলে শুধু শুধু সময় নষ্ট করে লাভ নেই। তাই চলে যাই আজ আপনাদের জন্য আমার লেখা সুন্দর গল্পে। যা কিনা বাস্তব জীবেন থেকে সংগ্রহ করা।
প্রতিদিনই চেষ্টা করি আমি আপনাদের মাঝে সুন্দর করে কিছু লিখে উপহার দেওয়ার জন্য। চাই চারদিকের বাস্তব কিছু ঘটনাকে গল্পে রূপ দিয়ে আপনাদের মাঝে উপস্থাপন করতে। যাতে করে আমার লেখার যাদুতে আপনারা মুগ্ধ হতে পারেন। যদিও সময় করে উঠতে পারি না। যদিও নিজের ক্রেয়েটিভিটি আপনাদের মাঝে তুলে ধরার সময় হয় না। তবুও চেষ্টা করলাম আপনাদের মাঝে নতুন একটি পোস্ট শেয়ার করার জন্য। আশা করি প্রতিদিনের মত করে আমার আজকের জেনারেল গল্পটিও আপনাদের কাছে বেশ ভালো লাগবে।
এসএসসি পরীক্ষায় রুনি অসাধারণ ফল করেছিল। ফলাফল হাতে পেয়ে যখন সে বাড়ি ফিরছিল, তার চোখে তখন ভবিষ্যতের হাজারটা স্বপ্ন। মনে হচ্ছিল, এই সাফল্যই তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেবে। মা হাসিমুখে তাকে বুকে টেনে নিয়েছিলেন, চোখে জল ছিল গর্বের। কিন্তু বাবা শুধু নিঃশব্দে তাকিয়ে ছিলেন, তার চোখে ছিল আনন্দের আড়ালে লুকানো চিন্তা—মেয়েকে এখন কলেজে পড়াতে হবে, কিন্তু কীভাবে? পরের কয়েকদিন রুনি নতুন কলেজে ভর্তি হওয়ার প্রস্তুতি নিতে লাগল। সে চেয়েছিল বিজ্ঞান বিভাগে পড়তে, কারণ সংখ্যার সাথে খেলা আর পরীক্ষাগারে কাজ করা তার ভীষণ পছন্দ ছিল। তার স্বপ্ন ছিল একদিন ইঞ্জিনিয়ার হবে, নিজের জীবনের দারিদ্র্যকে পরাজিত করবে। কিন্তু ভাগ্য যেন সবসময়ই তার স্বপ্নের সামনে এক অদৃশ্য দেয়াল তুলে দিত।
রুনির পরিবারের আর্থিক অবস্থা ছিল অত্যন্ত খারাপ। বাবা ছিলেন একজন স্বল্প বেতনের চাকুরিজীবী, সংসারে ভাইবোনের সংখ্যা অনেক। বড় ভাইরা তখন নিজেদের পরিবার নিয়ে ব্যস্ত, কেউই আর আগের মতো সংসারে সহযোগিতা করত না। মা যতই চেষ্টা করতেন, তবুও সংসারের হিসাব মেলানো যেত না। ফলে রুনির কলেজে ভর্তি হওয়ার প্রশ্ন উঠতেই ঘরে এক ধরনের নীরবতা নেমে এলো। এক রাতে মা চুপচাপ রুনির পাশে এসে বসে বললেন, “মা, তুই তো জানিস, আমাদের অবস্থাটা কেমন। বিজ্ঞান বিভাগে পড়তে অনেক খরচ, ল্যাব ফি, বইপত্র, প্র্যাকটিকাল—সব মিলিয়ে আমরা পারব না। তুই একটু কমার্সে ভর্তি হ।” কথাগুলো শুনে রুনির বুকটা হুহু করে উঠল। তার মনে হলো, কেউ যেন হঠাৎ তার মনের ভেতর থেকে এক টুকরো আলো কেড়ে নিল।
কিন্তু রুনি জানত, কাঁদলে সমস্যার সমাধান হয় না। সে মাথা নিচু করে বলল, “ঠিক আছে মা, আমি কমার্সেই ভর্তি হব। তবে আমি থামব না, আমি একদিন নিজের মতো করে সফল হব।” এই ছোট বাক্যটিতে ছিল তার আত্মবিশ্বাসের শক্তি, যা কোনো পরিস্থিতিই নষ্ট করতে পারেনি।এরপর শুরু হলো তার কলেজে ভর্তির লড়াই। অর্থের অভাবে সে নিজের পড়ার খরচ তুলতে শুরু করল টিউশন করে। এলাকার কয়েকজন অভিভাবক তাদের সন্তানদের পড়ানোর দায়িত্ব রুনিকে দিলেন। সকালে নিজের কলেজের প্রস্তুতি, দুপুরে টিউশন, আর রাতে নিজের পড়াশোনা—এই রুটিনে তার জীবন চলে গেল যান্ত্রিকভাবে।
কিন্তু তার এই টিউশন জীবনও সহজ ছিল না। গরমের দুপুরে ঘাম ঝরিয়ে হেঁটে হেঁটে যেতে হতো ছাত্রদের বাসায়। অনেক সময় খালি পেটে পড়াতে হতো, কারণ টিফিনের টাকা জমিয়ে রাখত কলেজে ভর্তি ফি’র জন্য। তারপরও সে কখনও অভিযোগ করত না। বরং নিজের কষ্টেই সে খুঁজে নিত নতুন সাহস। এদিকে আশেপাশের কিছু মানুষ তার প্রচেষ্টাকে দেখে বিদ্রূপ করত। কেউ বলত, “রুনি এখন টিউশন করে, তাই না? এত কষ্ট করে কী হবে?” আবার কেউ ঠাট্টা করে বলত, “কমার্সে ভর্তি হয়েছে মানে স্বপ্ন শেষ!” কিন্তু রুনি এসব কথাকে পাত্তা দিত না। সে জানত, তার লড়াই অন্যদের চেয়ে আলাদা। তার কাছে এটা শুধুই পড়াশোনা নয়, বরং আত্মসম্মানের লড়াই।
কলেজে ভর্তি হওয়ার দিনটা ছিল এক অনন্য দিন। সকালবেলা মা তার পুরনো সাদা ওড়নাটা ইস্ত্রি করে দিলেন। রুনি সেই ওড়নাটা গায়ে জড়িয়ে যখন কলেজে ঢুকল, মনে হলো সে যেন নতুন এক দুনিয়ায় পা রেখেছে। আশেপাশের হাসিখুশি মুখ, নতুন বন্ধুত্ব, আর পড়াশোনার প্রতিযোগিতা—সবকিছুই তাকে ভেতর থেকে উৎসাহিত করছিল। কিন্তু কমার্স বিভাগে পড়া তার জন্য সহজ ছিল না। আগে যে বিজ্ঞান বই নিয়ে সে আত্মবিশ্বাসী ছিল, এখন তাকে নতুন করে হিসাব, ব্যালেন্স শিট, ডেবিট ক্রেডিটের নিয়ম শিখতে হচ্ছিল। প্রথম কয়েকদিন সে কিছুটা ভড়কে গিয়েছিল, কিন্তু দ্রুত নিজের মতো করে পড়ার কৌশল তৈরি করল। প্রতিদিন নিজের জন্য নোট লিখত, টিউশনের ফাঁকে ছোট ছোট সময়গুলো কাজে লাগাত।
রুনির ক্লাসে কিছু সহপাঠী প্রথমে তাকে তেমন গুরুত্ব দিত না। তারা ভাবত, গরিব পরিবারের মেয়ে, হয়তো টিকতে পারবে না। কিন্তু প্রথম টার্ম পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের পর সবাই অবাক হয়ে গেল। রুনি ক্লাসে প্রথম হলো। শিক্ষকরা তার পরিশ্রম আর মনোযোগের প্রশংসা করলেন। সেই মুহূর্তে রুনি বুঝল, মানুষের চোখে নিজের অবস্থান পরিবর্তন করতে মুখের কথা নয়, কাজের ফলই যথেষ্ট।
এক বিকেলে কলেজ থেকে ফেরার পথে এক পুরনো বান্ধবী বলল, “তুই তো বিজ্ঞান ছেড়ে কমার্সে চলে গেছিস, মন খারাপ হয়নি?” রুনি হেসে উত্তর দিল, “মন খারাপ হয়নি, বরং নিজের সীমাবদ্ধতার মধ্যেও আমি লড়াই করে যেতে শিখেছি।” কথাটা শুনে বান্ধবী কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল, যেন সে বুঝতে পারল—রুনি কেবল পড়ুয়া মেয়ে নয়, সে এক যোদ্ধা।
রুনির জীবন তখনও সহজ হয়নি। টিউশনের টাকা দিয়ে কলেজের ফি, বই, খাতা—সব কিছু চালানো যেত না। অনেক সময় বন্ধুরা নতুন বই কিনত, কিন্তু রুনি পুরনো বই ধার নিয়ে পড়ত। রাত্রে মোমবাতির আলোয় বসে নোট করত, আর নিজের স্বপ্নকে মনে মনে দৃঢ় করত। তার মধ্যে এক অদ্ভুত শক্তি জন্ম নিয়েছিল—যে শক্তি তাকে থামতে দেয়নি।এভাবেই এক বছরের পর আরেক বছর কেটে গেল। রুনি নিজের মেধা, পরিশ্রম আর ধৈর্যের মাধ্যমে কলেজের সবার কাছে প্রিয় হয়ে উঠল। শিক্ষকরা তাকে উদাহরণ হিসেবে দেখাতেন—“দেখো, রুনি কেমন অধ্যবসায়ী।”
কিন্তু রুনি কখনও গর্ব করত না। তার চোখে ছিল বিনয়, তার মুখে ছিল এক চুপচাপ হাসি। সে জানত, সামনে আরও পথ বাকি, আরও বাধা আসবে। তবুও সে ভয় পেত না। তার কাছে ব্যর্থতা মানে হাল ছেড়ে দেওয়া নয়, বরং আবার উঠে দাঁড়ানো। যেদিন কলেজের শেষ পরীক্ষা শেষ হলো, সেদিন সে জানত না ভবিষ্যতে কী আছে, কিন্তু একটা জিনিস জানত—সে থামবে না। যত কষ্টই আসুক, সে এগিয়ে যাবে নিজের আলোয়, নিজের পথে। রুনি সেই মেয়ে, যে অন্ধকারের মাঝেও নিজের ভবিষ্যতের আলো দেখেছে। যার হাতে ছিল না কিছু, কিন্তু ছিল এক দৃঢ় ইচ্ছাশক্তি। সে জানে, একদিন তার এই কষ্টই তার সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে উঠবে, আর সেই দিনই হবে তার সত্যিকারের জয়।
জানিনা আপনাদের কাছে কেমন লাগলো আমার আজকের গল্পটির প্রথম পর্ব ? আপনাদের মতামত জানার অপেক্ষায় রইলাম।
আমার পরিচিতি
আমি মাকসুদা আক্তার। স্টিমিট প্লাটফর্মে আমি @maksudakawsar হিসাবে পরিচিত। ঢাকা হতে আমি আমার বাংলা ব্লগের সাথে যুক্ত আছি। আমি একজন গৃহিনী এবং চাকরিজীবী। তারপরও আমি ভালোবাসি আমার মাতৃভাষা বাংলায় নিজের মনের কথা গুলো আমার বাংলা ব্লগের প্লাটফর্মে শেয়ার করতে। আমি ভালোবাসি গান শুনতে এবং গাইতে। আমি অবসর সময়ে ভ্রমন করতে এবং সেই সাথে সুন্দর কিছু ফটোগ্রাফি নিজের ক্যামেরায় বন্দী করতে ও ভালোবাসি। মাঝে মাঝে নিজের মনের আবেগ দিয়ে দু চার লাইন কবিতা লিখতে কিন্তু আমার বেশ ভালোই লাগে। সর্বোপরি আমি ভালোবাসি আমার প্রাণপ্রিয় মাকে।
VOTE @bangla.witness as witness
OR
SET @rme as your proxy