ফটোগ্রাফি পোস্ট- "পদ্মার তীরে মাওয়া: মেঘলা আকাশে ফটোগ্রাফির দিন"
আসসালামু আলাইকুম
কেমন আছেন সবাই ? আশা করি আপনারা সবাই বেশ ভালো আছেন। চলে গেল ঈদ। সেই সাথে চলে গেল পবিত্র রমজান মাস। আবার এক বছর পর আমরা ফিরে পাবো এই রমজান মাস। জানিনা কে কতটুকু নিজেকে পরিশুদ্ধ করে নিতে পেরেছি। যাই হোক প্রতিদিনের মত করে আজও চলে আসলাম আপনাদের মাঝে আমার আরও কিছু ফটোগ্রাফি শেয়ার করার জন্য। আসলে চলতে ফিরতে এত এত ফটোগ্রাফি করেছি যে প্রতিটি ফটোগ্রাফি আমার মোবাইলে জমে একেবারে মোবাইল কে হ্যাংঙ করে দিয়েছে। এই ফটোগ্রাফি করে শেষ হবে কে জানে।
আমার কাছে ফটোগ্রাফি করা একটি আর্ট। আর সেই ফটোগ্রাফি যদি করা যায় মনের মনের মাধুরী মিশিয়ে তাহলে কিন্তু ফটোগ্রাফি হয়ে উঠে বেশ আকর্ষনীয় এবং দৃষ্টিনন্দন। অবশ্য সবার পক্ষে সুন্দর সুন্দর ফটোগ্রাফি করা হয়ে উঠে না। তবে আমরা যদি ক্যামেরার লেন্স এবং ফোকাস বুঝে একটু সময় নিয়ে ফটোগ্রাফি করতে পারি তাহলে কিন্তু আমরাও একজন দক্ষ ফটোগ্রাফার হতে পারবো। আর নিজেদের দক্ষতাকে সুন্দর করে ফুটিয়ে তুলতে পারবো। তাই আমাদের উচিত হবে সুন্দর এই শিল্পটিকে সুন্দর করে শিখে নেওয়া।
সেদিন ভোরে ঘুম ভেঙে পর্দার ফাঁক দিয়ে আকাশের দিকে তাকাতেই বুঝতে পারলাম, দিনটি হবে ভিন্নরকম। হালকা কুয়াশা মাটির কাছাকাছি ঘোরাফেরা করছে, আর উপরের দিকে ঘন মেঘের আস্তরণ। কখনো সূর্যের ফাঁকা ঝলক মেঘের ফাঁক গলে ছড়িয়ে পড়ছে চারপাশে, আবার মুহূর্তেই সেই আলো হারিয়ে যাচ্ছে নরম ধূসর ছায়ায়। এমন আবহাওয়ায় ঘুরতে যাওয়ার জন্য মন যেন কেমন করে উঠল। অনেকদিন ধরেই মাওয়ার পদ্মা নদীর তীরে যাবার ইচ্ছে পুষে রেখেছিলাম, কিন্তু নানা কারণে হয়ে উঠছিল না। এবার আর দেরি করলাম না—ক্যামেরা কাঁধে, মন ভরা উচ্ছ্বাস নিয়ে রওনা হলাম মাওয়ার পথে।
শহরের কোলাহল ধীরে ধীরে পিছনে পড়ে যাচ্ছিল। বাসের জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখতে পাচ্ছিলাম, কংক্রিটের দেওয়াল বদলে যাচ্ছে ধানের সবুজ মাঠে, মাঝে মাঝে ছোট গ্রাম আর পুকুর চোখে পড়ছে। রাস্তায় হালকা ভিড় থাকলেও মনের ভেতর ছিল এক অদ্ভুত প্রশান্তি। মাঝে মাঝে দূরে দেখা যাচ্ছিল পদ্মার বিশাল বিস্তার, যা আমাকে আরও আগ্রহী করে তুলছিল।
মাওয়ায় পৌঁছে প্রথম যে দৃশ্য চোখে পড়ল, তা ছিল মন কাড়ার মতো। বিস্তৃত পদ্মা নদী যেন এক জীবন্ত ক্যানভাস, যেখানে আকাশের মেঘ আর আলো মিশে যাচ্ছে পানির ঢেউয়ে। নদীর ওপরে ভাসছে ছোট বড় নৌকা, কেউ যাচ্ছে মাছ ধরতে, কেউ বা পাড় থেকে অন্য প্রান্তে। নদীর জলে তখন হালকা ঢেউ, বাতাস এসে সেই ঢেউয়ের শব্দ মিশিয়ে দিচ্ছিল প্রকৃতির অন্য সুরে। পদ্মার তীরে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ নিঃশব্দে তাকিয়ে থাকলাম—মনে হচ্ছিল, এখানে এসে সময় যেন থমকে গেছে।
কিছু দূরে এগিয়ে গেলেই দেখতে পেলাম স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রা। জেলে কাকারা বড় জাল মেরামত করছেন, কেউ নদীর ধারে বসে টাটকা মাছ বিক্রি করছেন। ছোট বাচ্চারা তীরে খেলছে, কেউ পানিতে নেমে ছপছপ করছে, আবার কেউ কাদায় নৌকা ঠেলতে সাহায্য করছে। তাদের হাসি-খুশির মুখ, নির্দোষ আনন্দ আমার মনকে ছুঁয়ে গেল। শহরের জীবনযাত্রার সঙ্গে এর কোনও মিল নেই—এখানে নেই কোলাহল, নেই যানজট, আছে শুধু প্রকৃতির কাছাকাছি থাকার মুক্তি।
আমি ক্যামেরা বের করলাম এবং মুহূর্তগুলো বন্দী করতে শুরু করলাম। প্রথম ছবিতেই ধরা পড়ল আকাশের প্রতিফলন নদীর জলে, যেখানে মেঘের ভাঁজ আর সূর্যের হালকা আলো মিলেমিশে অসাধারণ রঙ তৈরি করেছে। পরের ছবিগুলোতে ধরা পড়ল ট্রলারে ভেসে চলা জেলেদের দৃঢ় দৃষ্টি, তীরে শুকোতে রাখা জালের সারি, আর গরুর গাড়িতে পণ্য বহন করা গ্রামীণ মানুষদের দৈনন্দিন জীবন।
দুপুরের দিকে আকাশে মেঘের খেলা আরও নাটকীয় হয়ে উঠল। এক মুহূর্তে মনে হচ্ছিল বৃষ্টি নামবে, আবার পর মুহূর্তেই দেখা দিল সোনালি আলো। সেই আলো নদীর জলে পড়ে যেন গলিত সোনার আভা তৈরি করছিল। বাতাসে তখন শীতলতা বেড়ে গেছে, যা আমার ক্লান্তি মুছে দিচ্ছিল। আমি ধীরে ধীরে নদীর পাড় ধরে হাঁটছিলাম, আর চারপাশের প্রতিটি দৃশ্য মন ভরে উপভোগ করছিলাম।
হাঁটতে হাঁটতে একটা ছোট খাবারের দোকানের সামনে থামলাম। ভেতরে ঢুকতেই নাকে এল ভাজা ইলিশের গন্ধ। পাশে গরম ভাত, ডাল, শাক আর টাটকা সবজির থালা সাজানো। স্বাদে এমন সরল অথচ তৃপ্তিদায়ক খাবার অনেকদিন খাইনি। দোকানের মালিকের আন্তরিক হাসি, কথাবার্তায় এক ধরনের আন্তরিকতা ছিল যা শহরে প্রায় অদৃশ্য হয়ে গেছে। খাবারের সঙ্গে যেন মাওয়ার আতিথেয়তা মিশে গিয়েছিল।
খাওয়া শেষে আবার নদীর দিকে ফিরে এলাম। এবার সূর্য পশ্চিম আকাশে হেলে পড়েছে, আলো নরম হয়ে এসেছে। আকাশে লাল, কমলা আর বেগুনি রঙের মিশ্রণ তৈরি হয়েছে, আর সেই রঙ নদীর জলে প্রতিফলিত হয়ে আরও মোহনীয় হয়ে উঠেছে। দূরে জেলেরা ট্রলার নিয়ে ফিরছিল দিনের কাজ শেষ করে। তাদের চোখে-মুখে ছিল পরিশ্রমের ছাপ, কিন্তু একইসাথে দিনের সাফল্যের হাসি।
সন্ধ্যা নামতে শুরু করল। আকাশের রঙ ধীরে ধীরে গভীর হচ্ছে, নদীর জল অন্ধকার ছায়ায় ঢেকে যাচ্ছে। তবে দূরের কিছু নৌকার লণ্ঠন জ্বলে উঠেছে, যা নদীর বুক জুড়ে ছোট ছোট আলোর বিন্দু ছড়িয়ে দিয়েছে। তীরে বসে আমি সেই দৃশ্য দেখছিলাম আর মনে হচ্ছিল, এই সৌন্দর্য ভাষায় প্রকাশ করা অসম্ভব। প্রকৃতির এই নীরব অথচ গভীর মুহূর্তগুলো যেন অন্তরের ক্লান্তি ধুয়ে নিয়ে যাচ্ছিল।
রাত ঘনিয়ে এলে মাওয়ার রাস্তাগুলো শান্ত হয়ে গেল। দোকানগুলো একে একে বন্ধ হতে শুরু করল, শুধু কিছু চায়ের দোকানে এখনও ভিড় ছিল। পদ্মার তীরে তখন বাতাস আরও ঠান্ডা হয়ে এসেছে, আর আকাশে অসংখ্য তারা জ্বলজ্বল করছে। এই দৃশ্যের মাঝে দাঁড়িয়ে আমি উপলব্ধি করছিলাম, মাওয়া আমার জন্য শুধু একটি ভ্রমণ নয়, বরং নিজেকে প্রকৃতির মাঝে নতুন করে খুঁজে পাওয়ার যাত্রা।
ফেরার পথে গাড়ির জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখছিলাম অন্ধকার মাঠ, মাঝে মাঝে ঝিকিমিকি গ্রামীণ আলো। মনে হচ্ছিল, এই দিনের প্রতিটি মুহূর্ত আমার মনে গেঁথে থাকবে। ক্যামেরায় ধরা ছবিগুলো নিশ্চয়ই সুন্দর হবে, কিন্তু আসল সৌন্দর্য ছিল সেই অনুভূতিতে, যা কেবল উপস্থিত থাকলেই পাওয়া যায়। মাওয়ার পদ্মা আমার মনকে যে শান্তি দিয়েছে, তা কোনও ছবি বা লেখায় পুরোপুরি তুলে ধরা সম্ভব নয়।
জানিনা আমার আজকের ফটোগ্রাফি গুলো আপনাদের কাছে কেমন লেগেছে। আমার কাছে কিন্তু প্রতিটি ফটোগ্রাফি বেশ ভালো লেগেছে। আপনাদের মতামতের অপেক্ষায় রইলাম।
পোস্ট বিবরণ
| শ্রেণী | ফটোগ্রাফি |
|---|---|
| ক্যামেরা | Vivo y18 |
| পোস্ট তৈরি | @maksudakawsar |
| লোকেশন | ঢাকা , বাংলাদেশ |
আমার পরিচিতি
আমি মাকসুদা আক্তার। স্টিমিট প্লাটফর্মে আমি @maksudakawsar হিসাবে পরিচিত। ঢাকা হতে আমি আমার বাংলা ব্লগের সাথে যুক্ত আছি। আমি একজন গৃহিনী এবং চাকরিজীবী। তারপরও আমি ভালোবাসি আমার মাতৃভাষা বাংলায় নিজের মনের কথা গুলো আমার বাংলা ব্লগের প্লাটফর্মে শেয়ার করতে। আমি ভালোবাসি গান শুনতে এবং গাইতে। আমি অবসর সময়ে ভ্রমন করতে এবং সেই সাথে সুন্দর কিছু ফটোগ্রাফি নিজের ক্যামেরায় বন্দী করতে ও ভালোবাসি। মাঝে মাঝে নিজের মনের আবেগ দিয়ে দু চার লাইন কবিতা লিখতে কিন্তু আমার বেশ ভালোই লাগে। সর্বোপরি আমি ভালোবাসি আমার প্রাণপ্রিয় মাকে।
VOTE @bangla.witness as witness
OR
SET @rme as your proxy
একেবারে অসাধারণ কিছু ফটোগ্রাফির মধ্য দিয়ে আজকে আপনি আপনার এই পোস্ট সাজিয়ে তুলেছেন৷ যেভাবে আপনি এখানে এত চমৎকার কিছু ফটোগ্রাফি শেয়ার করেছেন তা আমাকে অনেক বেশি মুগ্ধ করেছে৷ একই সাথে এখানে ফটোগ্রাফি যখন আপনার কাছ থেকে দেখলাম তখন তা দেখে একেবারে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলাম৷ পদ্মা নদীর তীরের মাওয়া থেকে মেঘলা আকাশের যে সুন্দর ফটোগ্রাফিগুলো শেয়ার করেছেন এগুলো দেখে মুগ্ধ হওয়া ছাড়া আর কোন উপায় খুঁজে পাচ্ছিলাম না৷