ফটোগ্রাফি পোস্ট-হাতির ঝিলের কুয়াশার ভরা বিকেলের কিছু ফটোগ্রাফি

in আমার বাংলা ব্লগ8 months ago

আসসালামু আলাইকুম

কেমন আছেন সবাই ? আশা করি আপনারা সবাই বেশ ভালো আছেন। চলে গেল ঈদ। সেই সাথে চলে গেল পবিত্র রমজান মাস। আবার এক বছর পর আমরা ফিরে পাবো এই রমজান মাস। জানিনা কে কতটুকু নিজেকে পরিশুদ্ধ করে নিতে পেরেছি। যাই হোক প্রতিদিনের মত করে আজও চলে আসলাম আপনাদের মাঝে আমার আরও কিছু ফটোগ্রাফি শেয়ার করার জন্য। আসলে চলতে ফিরতে এত এত ফটোগ্রাফি করেছি যে প্রতিটি ফটোগ্রাফি আমার মোবাইলে জমে একেবারে মোবাইল কে হ্যাংঙ করে দিয়েছে। এই ফটোগ্রাফি করে শেষ হবে কে জানে।

আমার কাছে ফটোগ্রাফি করা একটি আর্ট। আর সেই ফটোগ্রাফি যদি করা যায় মনের মনের মাধুরী মিশিয়ে তাহলে কিন্তু ফটোগ্রাফি হয়ে উঠে বেশ আকর্ষনীয় এবং দৃষ্টিনন্দন। অবশ্য সবার পক্ষে সুন্দর সুন্দর ফটোগ্রাফি করা হয়ে উঠে না। তবে আমরা যদি ক্যামেরার লেন্স এবং ফোকাস বুঝে একটু সময় নিয়ে ফটোগ্রাফি করতে পারি তাহলে কিন্তু আমরাও একজন দক্ষ ফটোগ্রাফার হতে পারবো। আর নিজেদের দক্ষতাকে সুন্দর করে ফুটিয়ে তুলতে পারবো। তাই আমাদের উচিত হবে সুন্দর এই শিল্পটিকে সুন্দর করে শিখে নেওয়া।

image.png

সেদিন বিকেলটা ছিল অন্যরকম। শীতের দিন, কিন্তু সূর্যের কোনো দেখা নেই। চারদিকে যেন এক অচেনা কুয়াশার পর্দা নেমে এসেছে। রাস্তাঘাট, মানুষ, গাছপালা সব কিছুই যেন মিশে গেছে এক অদ্ভুত ধূসর আবরণে। সেই কুয়াশা ভেদ করে আমরা ঠিক করলাম, বিকেলের সময়টা হাতিরঝিলে কাটাবো। শীতের বিকেলে অনেকেই ঘরে থাকতে ভালোবাসে, কিন্তু আমাদের মনে হলো, এই কুয়াশার ভিতরেই আছে অন্যরকম সৌন্দর্য। যেন প্রকৃতি নিজেই একটু রহস্যে মোড়া হয়ে অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য। তাই কোনো দ্বিধা ছাড়াই বেরিয়ে পড়লাম আমরা। চারদিকে হালকা অন্ধকার, কিন্তু বাতাসে ছিল শীতের ঠান্ডা ছোঁয়া আর কুয়াশার গন্ধ। শহরের কোলাহল থেকেও যেন সেই মুহূর্তে দূরে কোথাও হারিয়ে গিয়েছিলাম আমরা।

image.png

হাতিরঝিলে পৌঁছে প্রথমেই চোখে পড়লো পানির উপর ঝুলে থাকা কুয়াশার পর্দা। মনে হচ্ছিল, যেন কেউ দুধ ঢেলে দিয়েছে পুরো লেকের ওপরে। দূরের বিল্ডিংগুলোর আলো কুয়াশায় ঝাপসা হয়ে গেছে, অথচ সেই ঝাপসা আলোগুলোর প্রতিফলন জলের ওপর এক অন্যরকম আলোছায়ার খেলা তৈরি করেছে। বাতাস ঠান্ডা, কিন্তু অদ্ভুতভাবে মনটাকে উষ্ণ করে দিচ্ছিল সেই দৃশ্য। চারপাশে অনেক মানুষ— কেউ বোডে উঠার অপেক্ষায়, কেউ বোড থেকে নামছে, কেউ বা কেবল পাশে দাঁড়িয়ে ছবি তুলছে। শিশুরা আনন্দে লাফাচ্ছে, বড়রা কাপে কাপে ধোঁয়া ওঠা চা হাতে গল্পে মগ্ন। মনে হচ্ছিল, শীতকেও হার মানিয়ে দিয়েছে এই বিকেলের উষ্ণতা। কুয়াশার মধ্যে এই সব হাসিমুখ, আলো, পানির ছায়া— সব মিলিয়ে যেন এক জীবন্ত ছবির মতো লাগছিল পুরো হাতিরঝিল।

image.png

image.png

আমরা ধীরে ধীরে বোড স্ট্যান্ডের দিকে এগিয়ে গেলাম। কুয়াশায় চারপাশ ঝাপসা হলেও পানির ওপর নরম বাতাসের ঢেউ যেন আমাদের পথ দেখাচ্ছিল। বোডে ওঠার অপেক্ষায় অনেকেই দাঁড়িয়ে ছিল। কেউ হাত গরম করছে নিঃশ্বাসের উষ্ণতায়, কেউ মুঠোফোনে ভিডিও করছে কুয়াশায় হারিয়ে যাওয়া আকাশ। শীতের বিকেল হলেও সেদিনের ঠান্ডা আমাদের ছুঁতে পারেনি। হয়তো ভেতরের আনন্দই আমাদের উষ্ণ রেখেছিল। বোড যখন ধীরে ধীরে চলতে শুরু করল, তখন মনে হলো আমরা যেন কোনো স্বপ্নের ভেতর ঢুকে পড়েছি। চারদিকে শুধু কুয়াশা আর হালকা আলো, বোডের চলার সঙ্গে সঙ্গে পানির ওপর ছোট ছোট ঢেউয়ের শব্দ যেন এক নরম সঙ্গীত বাজাচ্ছিল। ক্যামেরা হাতে আমি ছবির পর ছবি তুলছিলাম— প্রতিটা ফ্রেমে কুয়াশার ভেতর হারিয়ে যাওয়া মানুষ, বোড, আলো, আর জল যেন একসাথে এক শিল্প হয়ে উঠছিল।

image.png

সেদিনের আলো ছিল মৃদু কিন্তু গভীর। সূর্য দেখা না গেলেও আকাশের ভেতর থেকে এক ধরনের ধূসর নরম আলো ছড়িয়ে পড়েছিল, যা জলের ওপরে এসে তৈরি করেছিল এক অসাধারণ আভা। সেই আলোয় মানুষের ছায়াগুলো আরো জীবন্ত লাগছিল। কেউ কেউ প্রিয়জনের সঙ্গে পাশাপাশি বসে বোডে ভেসে যাচ্ছিল, কেউবা একা দাঁড়িয়ে তাকিয়ে ছিল দূরের দিকে। কে জানে, সেই কুয়াশার আড়ালে হয়তো তারা খুঁজছিল নিজের কোনো হারানো সময়কে। আমি প্রতিটি মুখে দেখছিলাম ভিন্ন ভিন্ন গল্প— কেউ হাসছে, কেউ চুপচাপ, কেউ আবার কুয়াশার দিকে তাকিয়ে চিন্তায় ডুবে আছে। ফটোগ্রাফির জন্য এর চেয়ে সুন্দর সময় আর কিছু হতে পারে না। প্রতিটি ক্লিকে যেন সময় থেমে যাচ্ছিল, প্রতিটি ছবিতে লুকিয়ে থাকছিল শীতের বিকেলের নীরব উষ্ণতা।

image.png

আমরা বোডে বসে হাতিরঝিলের মাঝখানে পৌঁছালে অনুভব করলাম, কুয়াশার পরিমাণ আরও বেড়ে গেছে। চারদিকে কিছুই স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল না। শুধু পানির ওপর দিয়ে ভেসে আসছিল অন্য বোডের আওয়াজ। মাঝে মাঝে দূর থেকে কোনো গাড়ির হর্ণ বা মানুষের হাসির শব্দ কুয়াশা ভেদ করে আমাদের কানে আসছিল। তখন মনে হচ্ছিল, শহরের কোলাহল থেকে আলাদা কোনো জগতে আমরা চলে এসেছি। এখানে সময় থেমে গেছে, শুধু চলছে কুয়াশা আর বাতাসের এক নীরব খেলা। চারদিকে আলো অন্ধকারের এমন মিশেল, যা চোখে দেখা যায় না— কেবল অনুভব করা যায়। সেই মুহূর্তে মনে হচ্ছিল, এই দৃশ্যগুলো শব্দে প্রকাশ করা যায় না, কেবল ক্যামেরার চোখেই ধরা পড়ে তার সামান্য অংশ।

image.png

image.png

বোড থেকে নামার পর আমরা হাঁটতে লাগলাম ঝিলের পাড় ঘেঁষে তৈরি পথ ধরে। কুয়াশায় ভেজা বাতাস গায়ে লাগছিল নরম ছোঁয়ার মতো। চারপাশের আলো ক্রমেই ঝাপসা হয়ে আসছিল, কিন্তু সেই ঝাপসা আলোতেই লুকিয়ে ছিল এক অন্যরকম শান্তি। রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে দেখছিলাম— কিছু তরুণ-তরুণী হাত ধরে হাঁটছে, কিছু পরিবার বসে গল্প করছে, আবার কেউ কেউ চুপচাপ বসে শুধু জল দেখছে। তাদের মুখে ছিল এক ধরনের প্রশান্তি, হয়তো শীতের এই বিকেলেই তারা খুঁজে পেয়েছে দিনের ক্লান্তি থেকে মুক্তি। আমি আবার ক্যামেরা তুলে নিলাম। এবার ফোকাস করলাম সেই হাসিগুলোয়, সেই আলোছায়ার নরম মিলনে। প্রতিটি ছবিই হয়ে উঠছিল এক একটি গল্প— যেন শীত, কুয়াশা, মানুষ আর ভালোবাসা একসাথে এক ছবিতে মিশে গেছে।

image.png

যখন সন্ধ্যা নামল, কুয়াশা আরও ঘন হয়ে গেল। চারদিকের আলো যেন কুয়াশার ভেতর হালকা বৃত্ত তৈরি করে এক এক করে নিভে যাচ্ছিল। সেই মুহূর্তে হাতিরঝিলের সৌন্দর্য যেন দ্বিগুণ বেড়ে গেল। বাতাসে তখন এক ধরনের ঠান্ডা নিঃস্তব্ধতা, কিন্তু আমাদের মন তখনও উষ্ণ। পাশে দোকানগুলোতে তখনও চায়ের গন্ধ, বাদামের সুবাস, আর মানুষের ভিড়। কেউ কেউ শেষবারের মতো বোডে চড়ছে, কেউবা শেষ আলোয় ছবি তুলছে। আমরা বসে রইলাম কিছুক্ষণ, নীরবে। শহরের মাঝে থেকেও মনে হচ্ছিল, আমরা প্রকৃতির কোলে বসে আছি। সেই কুয়াশা যেন আমাদের ঘিরে ফেলেছে এক অদৃশ্য শান্তিতে, যা শুধু অনুভব করা যায়, বলা যায় না।

image.png

image.png

শেষমেশ যখন আমরা ফিরে এলাম, তখন রাত প্রায় ঘনিয়ে এসেছে। রাস্তায় আলো জ্বলছে, কুয়াশা এখনও ঘিরে আছে পুরো পরিবেশকে। গাড়ির আলো কুয়াশা ভেদ করে এগিয়ে যাচ্ছিল, যেন প্রতিটি মুহূর্তেই শহরটা নতুন করে জন্ম নিচ্ছে। আমি পেছনে তাকিয়ে দেখলাম হাতিরঝিলের দিকটা— দূরে ঝাপসা আলো, পানির ওপর প্রতিফলন, আর সেই নরম ঠান্ডা বাতাস। মনে হলো, এই বিকেলটা শুধু একটা সময় নয়, একটা অনুভূতি হয়ে রয়ে গেল মনে। ফটোগ্রাফির বাইরে, এটি ছিল এমন একটি দিন যা ক্যামেরায় নয়, হৃদয়ে বন্দী হয়ে থাকবে সারাজীবন।

image.png

জানিনা আমার আজকের ফটোগ্রাফি গুলো আপনাদের কাছে কেমন লেগেছে। আমার কাছে কিন্তু প্রতিটি ফটোগ্রাফি বেশ ভালো লেগেছে। আপনাদের মতামতের অপেক্ষায় রইলাম।

পোস্ট বিবরণ

শ্রেণীফটোগ্রাফি
ক্যামেরাVivo y18
পোস্ট তৈরি@maksudakawsar
লোকেশনঢাকা , বাংলাদেশ

আমার পরিচিতি

আমি মাকসুদা আক্তার। স্টিমিট প্লাটফর্মে আমি @maksudakawsar হিসাবে পরিচিত। ঢাকা হতে আমি আমার বাংলা ব্লগের সাথে যুক্ত আছি। আমি একজন গৃহিনী এবং চাকরিজীবী। তারপরও আমি ভালোবাসি আমার মাতৃভাষা বাংলায় নিজের মনের কথা গুলো আমার বাংলা ব্লগের প্লাটফর্মে শেয়ার করতে। আমি ভালোবাসি গান শুনতে এবং গাইতে। আমি অবসর সময়ে ভ্রমন করতে এবং সেই সাথে সুন্দর কিছু ফটোগ্রাফি নিজের ক্যামেরায় বন্দী করতে ও ভালোবাসি। মাঝে মাঝে নিজের মনের আবেগ দিয়ে দু চার লাইন কবিতা লিখতে কিন্তু আমার বেশ ভালোই লাগে। সর্বোপরি আমি ভালোবাসি আমার প্রাণপ্রিয় মাকে।


3W72119s5BjVs3Hye1oHX44R9EcpQD5C9xXzj68nJaq3CeF5StuMqDPqgYjRhUxqFbXTvH2r2mDgNbWweA4YGBo825oLh4oqEqeynn5EZL11LdCrppngkM (1).gif

VOTE @bangla.witness as witness

witness_vote.png

OR

SET @rme as your proxy

witness_proxy_vote.png

1000206266.png

1000206267.png

❤️❤️ধন্যবাদ সকলকে❤️❤️

Sort:  
 8 months ago 

কুয়াশা ভরা জায়গাগুলিতে ঠিক এরকমটাই অনুভূতি হয় তবে নদী কিংবা পানির বিভিন্ন জলধারায় গেলে শীতকালীন সময়ে সেই কুয়াশার তীব্রতা আরো বেশি মনে হয় কেননা এই কুয়াশা পানির সাথে সুন্দর একটা সংমিশ্রণ রয়েছে হাতিরঝিলে কাটানো মুহূর্তে সুন্দর বর্ণনা শেয়ার করার জন্য ধন্যবাদ।

 8 months ago 

হাতিরঝিল বেড়াতে গিয়ে দারুন সময় কাটিয়েছেন। আর ফটোগ্রাফি গুলো দেখতে অনেক সুন্দর লাগছে আপু। দারুন একটি পোস্ট শেয়ার করার জন্য ধন্যবাদ জানাচ্ছি।

Coin Marketplace

STEEM 0.04
TRX 0.32
JST 0.082
BTC 59856.77
ETH 1554.43
USDT 1.00
SBD 0.42