ফটোগ্রাফি পোস্ট-কিছু সাদা গোলাপের ফটোগ্রাফি
আসসালামু আলাইকুম
কেমন আছেন সবাই ? আশা করি আপনারা সবাই বেশ ভালো আছেন। চলে গেল ঈদ। সেই সাথে চলে গেল পবিত্র রমজান মাস। আবার এক বছর পর আমরা ফিরে পাবো এই রমজান মাস। জানিনা কে কতটুকু নিজেকে পরিশুদ্ধ করে নিতে পেরেছি। যাই হোক প্রতিদিনের মত করে আজও চলে আসলাম আপনাদের মাঝে আমার আরও কিছু ফটোগ্রাফি শেয়ার করার জন্য। আসলে চলতে ফিরতে এত এত ফটোগ্রাফি করেছি যে প্রতিটি ফটোগ্রাফি আমার মোবাইলে জমে একেবারে মোবাইল কে হ্যাংঙ করে দিয়েছে। এই ফটোগ্রাফি করে শেষ হবে কে জানে।
আমার কাছে ফটোগ্রাফি করা একটি আর্ট। আর সেই ফটোগ্রাফি যদি করা যায় মনের মনের মাধুরী মিশিয়ে তাহলে কিন্তু ফটোগ্রাফি হয়ে উঠে বেশ আকর্ষনীয় এবং দৃষ্টিনন্দন। অবশ্য সবার পক্ষে সুন্দর সুন্দর ফটোগ্রাফি করা হয়ে উঠে না। তবে আমরা যদি ক্যামেরার লেন্স এবং ফোকাস বুঝে একটু সময় নিয়ে ফটোগ্রাফি করতে পারি তাহলে কিন্তু আমরাও একজন দক্ষ ফটোগ্রাফার হতে পারবো। আর নিজেদের দক্ষতাকে সুন্দর করে ফুটিয়ে তুলতে পারবো। তাই আমাদের উচিত হবে সুন্দর এই শিল্পটিকে সুন্দর করে শিখে নেওয়া।
বেশ কয়েকদিন আগে আরামবাগের একটি নার্সারিতে গিয়েছিলাম। ঢাকা শহরের কোলাহল পেরিয়ে যখন সেই নার্সারির ভেতরে প্রবেশ করলাম, তখন মনে হলো যেন এক অন্য জগতে চলে এসেছি। চারপাশে সবুজে ভরা, নানান রঙের ফুলের সমারোহ, পাখিদের কিচিরমিচির আর মাটির সোঁদা গন্ধে ভরে ছিল চারদিক। শহরের ধুলোবালিতে ক্লান্ত চোখের সামনে হঠাৎ এমন এক সতেজ পরিবেশে দাঁড়ালে মনটা যে কী শান্তি পায় তা ভাষায় বোঝানো যায় না। নার্সারির প্রবেশমুখে বিশাল বড় গেট, তার ওপরে ঝুলে থাকা বেলি ফুলের লতা যেন আগন্তুকদের স্বাগত জানাচ্ছে।
সেই নার্সারিটি এত বিশাল বড় ছিল যে ভেতরে ঢোকার পর কোন দিক দিয়ে চলব, কিসের ছবি আগে তুলব—একটুও বুঝে উঠতে পারছিলাম না। একেকটা দিক যেন একেকটা বাগানের গল্প বলে। কোথাও টবে সাজানো ছোট ছোট গাছ, আবার কোথাও বড় বড় পাতার সবুজ গাছের সারি। সূর্যের আলো পাতার ফাঁক গলে যখন গাছের গায়ে পড়ছিল, তখন মনে হচ্ছিল প্রকৃতি যেন নিজেই এক শিল্পী হয়ে তার রঙে রঙে সাজিয়েছে এই জায়গাটাকে। আমি ক্যামেরাটা হাতে তুলে নিলাম, মনোযোগ দিয়ে লেন্স ঠিক করে চারপাশের প্রতিটি সৌন্দর্য ধারণ করতে শুরু করলাম। প্রতিটি ক্লিকের পেছনে ছিল এক টুকরো প্রশান্তির অনুভূতি, একফালি নিঃশব্দ শান্তি।
চলতে চলতে চোখ পড়লো নানা রঙের ফুলের দিকে। লাল, হলুদ, বেগুনি, নীল, কমলা—কত রঙের যে সমাহার! প্রতিটি ফুল যেন নিজের সৌন্দর্যে গর্বিত, কেউ কারও থেকে কম নয়। ফুলের গন্ধে ভরে গেছে পুরো পরিবেশ। পাপড়ির ওপরে বসে থাকা মৌমাছি আর প্রজাপতিগুলো যেন এই সৌন্দর্যের সাথেই মিশে গেছে। আমি এক এক করে সব ফুলের ছবি তুলতে লাগলাম, কখনো কাছ থেকে, কখনো দূর থেকে, কখনো আলোছায়ার খেলায় নতুন এক ফ্রেম খুঁজে নিতে লাগলাম।
তারপর একসময় চোখে পড়ল কিছু সাদা গোলাপ। প্রথম দেখাতেই মনে হলো এই ফুলগুলো যেন অন্য সব রঙের ভিড়ে আলাদা এক সৌন্দর্যের প্রতীক। সাদা গোলাপের দিকে তাকিয়ে মনে হলো, এরা যেন নির্মলতা আর শান্তির প্রতিচ্ছবি। কোন বাড়াবাড়ি রঙ নয়, নেই চোখে লাগার মত আড়ম্বর, শুধু একরাশ পবিত্র সাদা আভা। আমি ক্যামেরা হাতে এগিয়ে গেলাম, খুব কাছে গিয়ে দেখলাম পাপড়িগুলো কেমন নরম, মিহি আর পরিপাটি। শিশিরের ফোঁটাগুলো পাপড়ির গায়ে ঝিলিক দিচ্ছে সূর্যের আলোয়। সেই দৃশ্যটা এত সুন্দর ছিল যে মনে হলো মুহূর্তটা থেমে যাক কিছুক্ষণের জন্য।
আমি একাধিক অ্যাঙ্গেল থেকে সাদা গোলাপের ছবি তুললাম। কখনো নিচ থেকে, কখনো পাশে দাঁড়িয়ে, আবার কখনো পেছনের আলোকে কাজে লাগিয়ে ব্যাকলাইট এফেক্টে একটি ছবিতে নতুন রূপ আনলাম। প্রতিটি ছবির মধ্যেই যেন ফুটে উঠছিল শান্তি আর কোমলতার গল্প। ছবি তুলতে তুলতে মনে হচ্ছিল এই সাদা গোলাপগুলো কেবল ফুল নয়, তারা যেন জীবনের এক গভীর দর্শন। যেমন বিশৃঙ্খলার মাঝেও সৌন্দর্য থাকতে পারে, যেমন কোলাহলের মাঝেও প্রশান্তি খুঁজে পাওয়া যায়, তেমনি এই সাদা গোলাপগুলোও সব রঙের ভিড়ে দাঁড়িয়ে আছে নিজেদের স্বকীয়তায়, একেবারে নিরবে কিন্তু মহিমায় পূর্ণ।
নার্সারির কর্মীদের সঙ্গে কথা বলতে জানতে পারলাম এই সাদা গোলাপগুলো স্থানীয়ভাবে চাষ করা। তারা যত্ন নিয়ে প্রতিদিন পানি দেয়, পোকামাকড় থেকে রক্ষা করে, আর সঠিক আলো-বাতাস নিশ্চিত করে। তাদের চোখে আমি দেখেছি গাছের প্রতি এক অদ্ভুত মায়া, এক নিঃস্বার্থ ভালোবাসা। আমি যখন ছবি তুলছিলাম, তারা হেসে বলল, “এই ফুলগুলো আমাদের সন্তানের মতো।” কথাটা শুনে মনে হলো প্রকৃতিকে ভালোবাসা মানে আসলে নিজের ভেতরটা পরিশুদ্ধ করা।
আমি ধীরে ধীরে নার্সারির ভেতর আরও গভীরে এগিয়ে গেলাম। জায়গাটির প্রতিটি কোণে আলাদা আলাদা সাজানো গাছের সংগ্রহ। কোথাও অর্কিড, কোথাও টিউলিপ, কোথাও আবার ক্যাকটাসের সারি। প্রতিটি গাছের রঙ, গঠন আর পটভূমি যেন আলাদা এক ফটোগ্রাফিক দৃশ্য তৈরি করছে। আমি চেষ্টা করছিলাম প্রতিটি ছবিতে সেই অনুভূতিটুকু ধরে রাখতে—যেন দর্শক শুধু একটি ফুল বা গাছ না দেখে, তার ভেতরে থাকা জীবনবোধটা অনুভব করতে পারে। ক্যামেরার ভিউফাইন্ডারে যখন ফোকাস ঠিক করছিলাম, তখন বারবার মনে হচ্ছিল, প্রকৃতি যেন আমাদের চোখ খুলে দিতে চায়। এই শহুরে ব্যস্ত জীবনে আমরা হয়তো অনেক কিছুই দেখি, কিন্তু প্রকৃতভাবে দেখি না। আমরা সময়ের পেছনে দৌড়াই, কিন্তু চারপাশের এই ছোট ছোট সৌন্দর্যগুলোকে উপভোগ করার সময় পাই না। অথচ এই নার্সারির প্রতিটি ফুল, প্রতিটি পাতাই যেন আমাদের শেখায়—কীভাবে ছোট কিছু দিয়েও পৃথিবীকে সুন্দর করে তোলা যায়।
এক পর্যায়ে বসে পড়লাম নার্সারির এক কোণে রাখা একটি কাঠের বেঞ্চে। চারপাশে ফুলের গন্ধ, পাখির ডাক, হালকা বাতাস—সব মিলে এক অপূর্ব পরিবেশ। আমি ক্যামেরার ছবিগুলো একে একে দেখতে লাগলাম। প্রতিটি ছবিতে যেন ফুটে উঠেছিল ভিন্ন ভিন্ন আবেগ—কোথাও আনন্দ, কোথাও প্রশান্তি, কোথাও এক মৃদু নিঃসঙ্গতা। কিন্তু সবচেয়ে বেশি শান্তি এনে দিয়েছিল সেই সাদা গোলাপগুলোর ছবি। সেগুলো যেন জীবনের এক নির্লিপ্ত অধ্যায়, যেখানে নেই কোলাহল, নেই প্রতিযোগিতা, শুধু আছে নিঃস্বার্থ সৌন্দর্য। নার্সারিতে কাটানো সেই সময়টা যেন এক ধরণের ধ্যান ছিল। আমি বুঝতে পারলাম, ফটোগ্রাফি শুধু ক্যামেরার লেন্সে ছবি ধরা নয়, এটা এক ধরনের অনুভূতি, এক ধরনের সংযোগ। প্রকৃতির সঙ্গে কথা বলার, তার সৌন্দর্যকে বোঝার এক নীরব ভাষা। আমি যখন সাদা গোলাপের দিকে তাকিয়ে ছবি তুলছিলাম, তখন মনে হচ্ছিল ফুলগুলোও যেন আমাকে কিছু বলছে—হয়তো বলছে, “শান্ত হও, জীবন এত কঠিন নয়।”
নার্সারি থেকে বের হওয়ার সময় সূর্য ধীরে ধীরে পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়ছিল। আলোটা একটু নরম হয়ে এসেছে, চারপাশে হালকা সোনালি আভা ছড়িয়ে পড়েছে। আমি শেষবারের মতো ফিরে তাকালাম সেই নার্সারির দিকে। মনটা কেমন এক অদ্ভুত শান্তিতে ভরে গেল। মনে হলো, প্রকৃতি সত্যিই এক অলৌকিক শিল্পী, আর আমি হয়তো তার এক ক্ষুদ্র দর্শক মাত্র। সেদিনের সেই সাদা গোলাপের ছবিগুলো এখনো আমার সংগ্রহে আছে, প্রতিবার দেখি আর মনে হয় যেন এক টুকরো শান্তির স্পর্শ পাচ্ছি। জীবনের ব্যস্ততা, ক্লান্তি, হতাশার মাঝেও মাঝে মাঝে এমন জায়গায় যাওয়া উচিত। এমন জায়গা, যেখানে প্রকৃতি তার সমস্ত সৌন্দর্যে আমাদের ছুঁয়ে দেয়। যেখানে ক্যামেরার লেন্সে ধরা প্রতিটি ছবি হয়ে ওঠে জীবনের এক নতুন উপলব্ধি। আর সেই উপলব্ধির ভেতরেই লুকিয়ে থাকে আমাদের মানসিক শান্তি, আমাদের হারিয়ে যাওয়া হাসির উৎস। সেদিন আরামবাগের সেই নার্সারিতে গিয়ে আমি শুধু কিছু ছবি তুলিনি, আমি যেন নিজের ভেতর একটা নতুন আলো খুঁজে পেয়েছিলাম—যে আলো সাদা গোলাপের মতো পবিত্র, নির্মল আর অনন্ত।
জানিনা আমার আজকের ফটোগ্রাফি গুলো আপনাদের কাছে কেমন লেগেছে। আমার কাছে কিন্তু প্রতিটি ফটোগ্রাফি বেশ ভালো লেগেছে। আপনাদের মতামতের অপেক্ষায় রইলাম।
পোস্ট বিবরণ
| শ্রেণী | ফটোগ্রাফি |
|---|---|
| ক্যামেরা | Vivo y18 |
| পোস্ট তৈরি | @maksudakawsar |
| লোকেশন | ঢাকা , বাংলাদেশ |
আমার পরিচিতি
আমি মাকসুদা আক্তার। স্টিমিট প্লাটফর্মে আমি @maksudakawsar হিসাবে পরিচিত। ঢাকা হতে আমি আমার বাংলা ব্লগের সাথে যুক্ত আছি। আমি একজন গৃহিনী এবং চাকরিজীবী। তারপরও আমি ভালোবাসি আমার মাতৃভাষা বাংলায় নিজের মনের কথা গুলো আমার বাংলা ব্লগের প্লাটফর্মে শেয়ার করতে। আমি ভালোবাসি গান শুনতে এবং গাইতে। আমি অবসর সময়ে ভ্রমন করতে এবং সেই সাথে সুন্দর কিছু ফটোগ্রাফি নিজের ক্যামেরায় বন্দী করতে ও ভালোবাসি। মাঝে মাঝে নিজের মনের আবেগ দিয়ে দু চার লাইন কবিতা লিখতে কিন্তু আমার বেশ ভালোই লাগে। সর্বোপরি আমি ভালোবাসি আমার প্রাণপ্রিয় মাকে।
VOTE @bangla.witness as witness
OR
SET @rme as your proxy