আমার জীবনে ঘটে যাওয়া একটি মর্মান্তিক ঘটনা।
কেমন আছেন " আমার বাংলা ব্লগ " পরিবারের সবাই। আশাকরি মহান সৃষ্টিকর্তার কৃপায় আপনারা সবাই সুস্থ আছেন। মহান সৃষ্টিকর্তা এবং আপনাদের আশীর্বাদে আমিও সুস্থ আছি। আসলে আজ আমি আমার ছোটবেলায় ঘটে যাওয়া এক ভীষণ দুঃখের কথা আপনাদের সাথে শেয়ার করব। আসলে এটি আমার জীবনে ঘটে যাওয়া সব থেকে দুঃখের একটা দিন।
সোর্স
যাইহোক বয়স আমার তখন সবে তিন কি সাড়ে তিন। আমার বয়সে বড় একটা দিদি ছিল আমার। আমরা টোটাল দুই ভাই বোন ছিলাম। আসলে আমরাও এখন দুই ভাই আছি। কিন্তু সেই মর্মান্তিক ঘটনার সময় আমার ছোট ভাই তখনও জন্মগ্রহণ করেনি।
আসলে পরিবারের দিদি যদি বড় হয় তাহলে মায়ের মত আরেকজন মানুষকে পাওয়া যায়। যে মায়ের মত শাসন করবে, ভালবাসবে, আদর করবে। আসলে আমার থেকে আমার দিদি প্রায় পাঁচ বছরের বড় ছিল। আসলে দিদি জন্মগ্রহণ এর আগে আমাদের পরিবারের অবস্থা খুবই খারাপ ছিল। আমাদের একটা টিনের ঘরও ছিল না। আমরা খড় কুটোর ঘরে বসবাস করতাম।
দিদি যখন জন্মগ্রহণ করে তখন আমাদের পরিবারের আর্থিক অবস্থা দিন দিন ভালো হতে থাকে। আসলে আমি তো অনেক ছোট ছিলাম তো। তখনকার কথা আমার তো মনে না থাকারই কথা। যাইহোক পরবর্তীতে মায়ের কাছে এসব ঘটনা শোনা। আমার দিদি জন্মগ্রহণের পর আমার ছোট কাকা সে মেডিকেলে চান্স পায়, আমার মেজ কাকা সে সরকারি চাকরি পায় এবং তার কিছুদিন পর আমার বাবা স্কুলের শিক্ষকতায় চাকরি পান।
আস্তে আস্তে আমাদের পরিবারের আর্থিক অবস্থা খুব ভালো হতে শুরু হয়েছিল। আর তার পাঁচ বছর পরেই আমার জন্ম। আসলে আমার দিদির কাছে আমি ছিলাম তার প্রাণের টুকরা। আমাকে কখনো সে চোখে হারাতে পারত না। আমাকে কেউ কখনো বকলে সে আগেই গিয়ে প্রতিবাদ করত। আসলে তার একটা কথা আমাকে মা বারবারই বলতো। ছোট ভাইটি কিছুই বোঝেনা। তোমরা কেন ওকে মারছো। এই দিদি তখনও তো ছোট। তাই আমাকে কোনোভাবে জড়িয়ে কোলে নিয়ে ঘুরে বেড়াতো।
তো ছোটবেলা থেকেই আমি একটু দুষ্টু প্রকৃতির। দুই আড়াই বছর বয়সের পর থেকেই আমি ঘরের জিনিসপত্র নষ্ট করতাম। কোন কিছু ফেলে দিতাম। আর তার ফলে মা আমাকে যখন বকাবকি করতো তখন দিদি এসে তার প্রতিবাদ করতো সবসময়। আসলে দিদি কি জিনিস আমি তা সঠিকভাবে অনুভব করতে পারিনি। আমাকে নাকি দিদি স্নানও করিয়ে দিত।
কিন্তু এই দিদি আমাকে এতটাই ভালোবাসতো যে আমাকে কেউ কোলে নিলে সে কোল থেকে নামিয়ে নিজের কোলে আমাকে রাখতো। আসলে আমি তো তখন দিদির ভালোবাসা অনুভব করতে পারিনি সঠিকভাবে কারণ আমি ছোট ছিলাম।
এবার মূল ঘটনায় আসা যায়, আসলে যখন আজকে পোস্টটি আমি লিখছিলাম তখন আমার চোখ দিয়ে দু একটা জল বেরিয়ে এসেছে। আসলে দিদির ভালোবাসাটা বোঝার আগেই দিদি এভাবে হারিয়ে যাবে আমরা কেউ কখনো বুঝতে পারিনি। দিদির তখন প্রায় সাড়ে পাঁচ বছর বয়স। হঠাৎ একদিন মা বারান্দায় বসে কাজ করছিল। তখন দিদি বিকালে উঠানে খেলাধুলা করছি। খেলতে খেলতে হঠাৎ মায়ের কাছে এসে দিদি বলল, মা জানো আমি সাত দিন পর মারা যাবো। আসলে ছোট মানুষের কথা তো মা অতটা গায়ে লাগায়নি।
আমার দিদির একটা ঐশ্বরিক ক্ষমতা ছিল। আসলে দিদি ছোটবেলা থেকে যেসব কাজ করতো বা যে সব কথা বলতো সব কথাই ঠিক হত। তো সেদিনের কথায় মা তেমন একটা খেয়াল করেননি।
তো এই ঘটনার চারদিন পর দিদি এবং আমার কয়েক পিসি মিলে খেলাধুলা করছিল। আসলে আমার ওই পিসিরাও কিন্তু দিদির সমবয়সী ছিল। তো তারা একটা ছোট খালের পাশেই খেলা করছিল। সময়টা তখন গ্রীষ্মকাল। অর্থাৎ ওই সময়ে খালের জল অনেকটাই কম থাকে এবং নৌকা গুলো জলের নিচে ডুবানো থাকে যাতে নৌকা গুলো নষ্ট না হয়ে যায় এবং ওই খালের উপরে একটা সাঁকো ছিল।
তো দিদিরা খেলা করতে করতে কিছুক্ষণ পর আমার দিদি বলে উঠলো জানিস আজ আমি এই সাঁকো পার হতে গিয়ে নিচে পড়ে মারা যাবো। সবাই তো ছোট তাই কেউ কারো কথা অতটা খেয়াল রাখে না। যাই হোক হঠাৎ করে একটা কুকুর এসে ঘেউ ঘেউ করে সবাইকে তাড়া করতে লাগলো। তো দিদি কি করবে না বুঝে উঠতে পেরে ওই সাঁকোর উপরে উঠে গেল। কিন্তু হঠাৎ করে দিদির পা পিছলে দিদি জলের ভিতরে পড়ে গেল। তখন একটা নৌকা ওই সাঁকোর নিচে ডুবানো ছিল। দিদি গিয়ে ওই নৌকার উপরে পড়ে মাথায় আঘাত লাগলো।
তারপর সবাই তাড়াহুড়ো করে দিদিকে তুলে নিয়ে গিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করাইলো। আসলে দিদির আঘাতটা মাথায়ই লেগেছিল। মাথার একটা শিরা কেটে গিয়েছিল তখন। তো দিদির আর কোন জ্ঞান ছিল না। আর আমি তো ছোট দিদির কি হয়েছে তাও আমি বুঝতে পারছিলাম না। চারদিনের দিন যখন দিদি পড়ে গেল তখন মায়ের মনে সেই কথাটা মনে পড়ে গেল। যাইহোক দিদি হসপিটালে তিনদিন ভর্তি ছিল অর্থাৎ মাকে যেদিন কথা বলেছিল যে আমি এক সপ্তাহ পর মারা যাবো সেই কথামতো নেই দিদি সাত দিনের দিন ভোর সকালে মারা যায় আমার দিদি।
তখন আমাদের সংসারে শোকের ছায়া নেমে এলো। আমার মার মত কষ্ট আর বোধহয় কেউই পাইনি। কারণ আমার দিদি ছিল পরিবারের সবচেয়ে বড় মেয়ে। তখন মার মুখে শোনা কথা। মা সারাদিন আমাকে জড়িয়ে ধরে কান্নাকাটি করতেন।
আসলে আরেকটু বড় হওয়ার পরেই সবার মুখে বিশেষ করে মায়ের কাছে দিদির ঘটনা জানতে পারলাম। আসলে দিদি মারা যাওয়ার পর থেকে পরিবারের কোনো সদস্যই আমাকে কোনদিনও বকাঝকা করেনি। কারন আমার দিদি বলে দিয়ে গেছিল যে আমার ভাইকে কেউ কখনো কোনদিন বকবে না।
আসলে আজকের পোস্টটি লেখার মত শক্তিটা আমাকে হয়তো ভগবানই দিয়েছে। লিখতে গিয়ে বারবার থেমে যাচ্ছিলাম। মুখ দিয়ে কথা বের হচ্ছিল না কিন্তু। যাইহোক আমার দিদি আমার জীবনে একটা বড় ভূমিকা পালন করত সব সময়। হয়তোবা দিদি বেঁচে থাকলে পৃথিবীতে আমার মত ভালোবাসা হয় তোমার কেউ পেত না।
আর পরবর্তীতে আমি আমার দিদিকে নিয়ে একটা কবিতা ও লিখেছিলাম। পরবর্তী কোনো একটা পোস্টে এই কবিতাটি আপনাদের সাথে শেয়ার করব।
সত্যি বলতে গল্পটা পড়তে গিয়ে আমার চোখ দিয়েই জল পড়লো।কি লিখবো বুঝতে পারছিনা। যাইহোক ওপারে ভালো থাকুক আপনার দিদি এই প্রত্যাশাই রাখছি দাদা।
যাইহোক আপু এটা কিন্তু গল্প নয় এটা আমার জীবনে বাস্তবে একটি ঘটনা।
ভাইয়া আপনার পোস্টটি পড়ে আমারও খুব খারাপ লাগলো। কারণ ওরকম একজন দিদি পাওয়াতো আসলেই ভাগ্যের ব্যাপার। যে আপনাকে সে পাঁচ বছর বয়সে অতটা আগলে রেখেছে না জানি বড় হলে আপনাকে কতটা আদর করতো। আর আপনার দিদির ক্ষমতা দেখে তো আমি সত্যি অবাক হয়ে গেলাম। সে আগেই তার ভবিষ্যৎ দেখতে পেতো আহারে যদি সবাই জিনিসটা আগে থেকে বুঝত তাহলে হয়তো বা ওরকম ঘটতো না। আর ওরকম শোক কোন মায়ের পক্ষে সহ্য করা আসলেই সম্ভব নয়। আপনি তো তারপরও কত কষ্ট বুকে নিয়ে এরকম একটি ঘটনা লিখলেন।
আসলে একটা দিদি পাওয়া কিন্তু ভাগ্যের ব্যাপার। আর এই দিকে যদি হঠাৎ করে চলে যায় তাহলে এর থেকে খারাপ আর কিছুই হতে পারে না।
গল্পটা পড়তে পড়তে নিজেই যেন কান্না করে দিচ্ছি।আসলে আপন কারো বিদায়ে নিজেকে কখনো ঠিক রাখা যায় না।আপনি ছোট থাকলেও আপনার দিদি আপনাকে অনেক ভালোবাসতো। আপনাকে হয়তো সব থেকে বেশি ভালবাসতো আপনার দিদি। তাছাড়া উনি মারা যাওয়ার ৭ দিন আগেই আপনার মাকে বলে দিয়েছিল সাতদিন পর মারা যাবে, এই বিষয়টাই সবচেয়ে বেশি হৃদয়বিদারক। সত্যি খুব খারাপ লাগছে বিষয়টা পড়ে।
আসলে দিদির ভিতর একটা ঐশ্বরিক ক্ষমতা ছিল। ছোট মানুষ বলে কেউ তাকেই পাত্তা দিত না তখন।
সত্যি বলতে আপনার পোস্টটা পড়ে অনেক খারাপ লাগলো। মনোযোগ সহকারে আপনার পোস্টটা পড়ছিলাম। আসলে ভাইয়া এখানে কারো হাত নেই। তবে এই বিষয় অনেক বেদনাদায়ক আপনার মাকে বলে গিয়েছে, আর তাই হয়েছে।ধন্যবাদ ভাইয়া।
আসলে আমি আমার দিদির কাছে তার প্রাণের প্রিয় ছিলাম। এই ঘটনাটা আমি কোনদিনও ভুলতে পারবো না।
সত্যি এই পোস্টটি পড়তে পড়তে আমার কান্না পেয়ে গেছে। আপনাকে কি বলে সান্ত্বনা দেব তার ভাষা আমার জানা নেই।
আসলে প্রিয়জন চলে গেলে সান্ত্বনা দেয়ার মত কিছুই থাকে না। তারপরও দিদির স্মৃতি নিয়ে বেঁচে থাকতে হবে।