এই গরমে পশু-পাখিদের হিটস্ট্রোক ও আমাদের করণীয়।
বেশ কিছুদিন থেকেই তাপপ্রবাহ চলতেছে আমাদের দেশ। যদিও মাঝে মাঝে বৃষ্টি হলে কিছুটা কমে আবার শুরু হয়। প্রতিবছরই বারান্দায় খাবার পানি ও খাবার রাখি আমি পাখিদের জন্য। এবার শুরুর দিকে রাখি নাই আমার বিড়াল এর জন্য। ও বারান্দার কার্নিশের উপর দিয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে হাঁটে ও পাখি ধরার চেষ্টা করে।
আমার বাসা যেহেতু কাটপ্রুফ না তাই পাখি ধরতে গিয়ে ওর পরে যাওয়ার সম্ভবনা প্রচুর। সেইসাথে পাখিদের সাথে ওর শত্রুতাও খেয়াল করেছি ,ওকে দেখলেই বিভিন্ন ধরণের পাখি এসে ক্যাচর ম্যাচর করতে থাকে ওর দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে।
আমি আমার বিড়ালকে সাধারণত ওর খাবার পানি দিয়ে সেদ্ধ করে দিয়ে থাকি । কিন্তু কদিন আগে ওকে ভাজা মাছ দিয়েছিলাম। কিন্তু কোনো কারণে পানি দেয়া হয় নাই। এরপরে আর মনেই ছিল না একথা।
ও আর ছেলেদের রুমে আটকে রেখে কাজ করেছি ,নাহলে ও প্রচন্ড রকম বিরক্ত করে। আমি গোছল করার সময় ওর অনেক কান্নার শব্দ পাই। আমি ভেতর থেকে ওর সাথে কথা বলে ওকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করতেছিলাম ,কিন্তু ও কান্না করেই যাচ্ছিলো।
আমি যতটা সম্ভব দ্রুত বের হওয়ার পরই দেখতে পেলাম ও আমার পা ও জুতো থেকে চেটে পানি খাওয়ার চেষ্টা করতেছে। এরপর ছেলেদরকে ডেকে ওকে পানি দিতে বললাম। ছেলেরা আমাকে জানালো যে ,ওর কান্নাকাটির জন্য ওকে ওরা রুম থেকে বের করে দিয়েছে এই ভেবে যে ও আমার জন্য কান্না করতেছে। সত্যি বলতে ওরা পানি পিপাসায় কতটা কাতর হয় সেটা কাছ থেকে দেখার আগে আমি বুঝতে পারি নাই।
তাই এই ঘটনার পর থেকে আমি বারান্দার দরজা বন্ধ রাখি যতটা সম্ভব এবং সেইসাথে আবারো বারান্দায় পানি ও খাবার রাখা শুরু করেছি পাখিদের জন্য।
আজকে এতো কিছু লিখলাম কারণ কিছক্ষন আগে সোশ্যাল মিডিয়ার একটা পোস্ট আমার নজর কেড়ে নিয়েছে।
Edited by Canva ( সোশ্যাল মিডিয়া থেকে নেয়া ছবি ) |
|---|
সেখানে যা লেখা রয়েছে সেটা সংক্ষেপে অনেকটা এরকম ' হিটস্ট্রোকে শুধু মানুষ না বরং পশু-পাখিরাও আক্রান্ত হয়। গাছ কাটুন ,নিজেও করুন ও অন্যদের ওমারুন।
এই পোস্টটা দেখার পরে আমার মনে মারাত্মকভাবে আঘাত করে ও কারামেলের ঐদিনের কথা মনে পরে যায়। এসম্পর্কে গুগল মামার কাছ থেকে আর একটু ভালোভাবে জানতে চেষ্টা করি এরকম গরম পশু-পাখিদের উপরে কিরূপ প্রভাব ফেলে।
সেখান থেকেই জানতে পারি যে ,প্রচণ্ড গরমে যেমন জনজীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠে , তেমনি বিপর্যস্ত হয়ে পরে প্রাণীকুলও। গ্রামের তুলনায় বিশেষ করে শহরাঞ্চলে কুকুর, বিড়াল, পাখি ইত্যাদি প্রাণী বাস করে থাকে তারা এই প্রচণ্ড গরমে বেশি বিপদে পরে থাকে ।
সেই সাথে এই অস্বাভাবিক গরমের কারণে বাসাবাড়ির পোষা প্রাণী- পাখির পাশাপাশি রাস্তাঘাটের পশুপাখিরাও হিটস্ট্রোক ও মৃত্যুঝুঁকিতে রয়েছে। কারণ শহরাঞ্চলে প্রাকৃতিক পরিবেশের অভাব থাকে এবং তীব্র তাপমাত্রা থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য এদের পর্যাপ্ত সুযোগ থাকে না।’
লন্ডনের রয়্যাল ভেটেরিনারি কলেজ তাদের একটি গবেষণায় বলেছে,
গ্রীষ্মের তীব্র তাপমাত্রায় হিটস্ট্রোকের ঝুঁকিতে থাকা কিছু প্রাণী রয়েছে। যেসব প্রাণীর ওজন বেশি, বয়স বেশি, লম্বা লোমযুক্ত প্রাণী, শাবক ছানা, অসুস্থ প্রাণী বেশি ঝুঁকিতে থাকে। পোষা প্রাণীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে কুকুরের চ্যাপটা মুখের প্রজাতি প্যাগ ও ফ্রেঞ্চ বুলডগ আর লম্বা লোমযুক্ত প্রজাতি বিড়াল পারসিয়ান এবং মেইন কুন।
ইদানিং আমাদের দেশে লম্বা লোমযুক্ত কুকুর-বিড়াল পালন করার প্রবণতা ক্রমশ বাড়তেছে। কিন্তু আমাদের দেশের পরিবেশ ওদের জন্য মোটেও অনুকূল না। আমাদের মাঝে খুব কম মানুষই আছে যারা এসব প্রাণীর জন্য এসি ব্যবহার করবে সবসময়। তাই এসব নিষ্পাপ প্রাণীকে কস্ট না দিয়ে বরং আমাদের দেশি প্রজাতির প্রাণী পোষ্য নেয়া ভালো।
পোষা প্রাণীদের মধ্যে কুকুর ও বিড়ালের হিটস্ট্রোকের লক্ষণগুলো অনেকটা একই ধরনের হয়ে থাকে।আক্রান্ত প্রাণীটির স্বাভাবিক শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি অনেক বেড়ে যায়। এছাড়া অনেক সময় হাঁপানির লক্ষণ দেখা দেয়, জিভ ও নাক শুকিয়ে যায়, শরীরের তাপমাত্রা স্বাভাবিক চেয়ে বেশি থাকে, স্বাভাবিক মল–মূত্রত্যাগের পরিমাণ কমে যায়। সেইসাথে প্রাণীটির মধ্যে চঞ্চলতা কমে আসে, চেহারা ফ্যাকাসে হয়ে যায়, বমি ও ডায়রিয়া দেখা দিতে পারে।
প্রাণীটির হিটস্ট্রোক হয়েছে বলে মনে হলে তাৎক্ষণিকভাবে পশুচিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে। হিটস্ট্রোক একটি জরুরি অবস্থা , তাই দ্রুত চিকিৎসা না করা হলে পরিণতি খারাপ হতে পারে। এছাড়াও প্রতিরোধের জন্য প্রাণীটিকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া যেতে পারে।
অসুস্থ প্রাণীটিকে ঠান্ডা, ছায়াযুক্ত জায়গায় নিয়ে আস্তে আস্তে পানি পান করানোর চেষ্টা করতে হবে। এরপর সম্ভব হলে প্রাণীটির সম্পূর্ণ শরীর ঠান্ডা পানি দিয়ে ধুয়ে দিতে হবে,সেই সাথে অনবরত বাতাস করতে হবে। প্রাণীটিকে যতটা সম্ভব শান্ত রাখার চেষ্টা করতে হবে।
প্রাণীটির অবস্থা যদি আরও অবনতির দিকে যায় তাহলে তাৎক্ষণিকভাবে একজন প্রাণী চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে। এই পদক্ষেপগুলো কেবলমাত্র প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য , যত তাড়াতাড়ি সম্ভব প্রাণী চিকিৎসকের সাহায্য নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
এছাড়াও এমন পরিস্থিতি এড়াতে গরমে পোষা প্রাণীর যত্ন নেওয়া সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিন ওদেরকে পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি পান করাতে হবে। বাসাবাড়িতে ছায়াযুক্ত স্থানে রাখতে হবে। পানির পাত্রগুলো নিয়মিত পরিষ্কার করতে হবে। পানির পাত্র রোদের মাঝে রাখা যাবে না।
সম্ভব হলে বিড়াল বাদে পোষা প্রাণীকে নিয়মিত গোসল করাতে হবে। ওদেরকে তাজা খাবার দেওয়ার চেষ্টা করতে হবে।এবং ওদের জন্য ছায়ার ব্যবস্থা করুন। গাছ লাগান বারান্দা কিংবা ছাদে যেখানে আপনার সুযোগ হয়। ওদের জন্য পানি ও খাবার রাখুন। আমাদের সামান্য সাহায্যের হাতই ওদের জীবন বাঁচাতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।