"চির বিদায় : পরপারে ভালো থেকো কাকিমা"
|
|---|
Hello,
Everyone,
আজ সকালে ফোনের অ্যালার্মের শব্দে নয়, ঘুম ভেঙেছে ফোনের রিং শুনে। ঘুম ঘুম চোখে ফোনের দিকে তাকিয়ে স্ক্রিনে ভেসে ওঠা নামটা দেখেই, মুহূর্তের মধ্যে সমস্ত ঘুম কেটে গেলো।
সচরাচর যে নম্বরগুলো থেকে ফোন আসে না, হঠাৎ করেই সকালবেলায় যদি সেই নম্বর থেকে ফোন আসে, তাহলে বুঝতে হবে বিশেষ কোনো কারণ ছাড়া ফোনটা আসেনি। আর আমার ফোনের স্ক্রিনে রাজার নম্বর দেখে সব থেকে খারাপ যে খবরটা পেতে পারি, সেটাই আশঙ্কা করেছিলাম।
ফোনটা রিসিভ করার পর আশঙ্কা মুহূর্তের মধ্যেই বাস্তবে পরিণত হলো। সাধারণত শুভর ফোন রাতের দিকে বন্ধই থাকে। শুভর ফোন সুইচ অফ পাওয়ার পরেই রাজা আমার ফোনে ফোন করেছিলো। গত দু-একটা পোস্টে আমি আপনাদের সাথে ওর মায়ের শারীরিক অবস্থার কথা শেয়ার করেছি, তাই আমার বিশ্বাস যারা আমার পোস্ট পড়েন, তারা বোধহয় বুঝতে পেরেছেন আজকে কি বিষয়ে আপনাদের সাথে লিখতে চলেছি।
আজ ছিল পরমা একাদশী। শ্বশুরমশাই মারা যাওয়ার পর থেকে বাড়িতে আমরা সকলেই একাদশী পালন করছি। শুভর আজ অফিসে যাওয়ার কথা ছিলো। সকালে রান্নার খুব একটা তাড়াহুড়া ছিলো না বলে একটু দেরিতেই উঠবো ঠিক করেছিলাম। কিন্তু উপরওয়ালা অন্য কিছু ঠিক করেছিলো, তাই আজ অন্যান্য দিনের তুলনায় অনেকটা সকালেই ঘুম ভাঙলো।
|
|---|
রাজার মায়ের মৃত্যুর সংবাদ পেয়ে অবাক হয়েছি একথা বলবো না। কারণ এই ঘটনা যখন তখন ঘটতে পারে, এই বিষয়ে মানসিক প্রস্তুতি রাজাদের বাড়ির সকলের সাথে সাথে আমাদের বাড়ির প্রত্যেকেও নিয়েছিলাম। তবে হ্যাঁ এমন আকস্মিক ভাবে খবরটা পাওয়াতে ভীষণ মন খারাপ হয়েছে এ কথা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। ওই মুহূর্তে শুধু রাজার পাশে গিয়ে দাঁড়াতে হবে, এইটুকু ছাড়া আর কোনো কিছু মাথায় আসেনি।
শুভকে ঘুম থেকে ডাকলাম। তারপর রাজার ফোন আসার কথা বলতেই ও বিষয়টা বুঝতে পারলো। এরপর আমরা দুজন আর দুজনের সাথে কোনো কথা বলিনি। হয়তো দুজনেই একই ভয় পেয়েছিলাম। একে অপরের সাথে কথা বললে কষ্টটা বহিঃপ্রকাশ ঘটবে। শুভ উঠে বাকি বন্ধুদের সাথে ফোনে কথা বলতে শুরু করলো, আর আমি ঘরের কাজ গোছাতে শুরু করেছিলাম।
কারণ রাজাদের বাড়িতে গেলে কখন ফিরতে পারবো জানতাম না। তারপর বাড়িতে এসে ঘরের কাজ সেরে পুজো দিতে গেলে অনেক দেরি হবে। তাই শুভ রেডি হতে হতে আমি যতটা সম্ভব কাজ গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছিলাম। ফুল তুলে, ঠাকুরের পুজোর বাসর মেজে, ঘর মুছে, সবটা গুছিয়ে নিয়েছিলাম। তারপর শুভর বন্ধুরা এলে আমরা একসাথে রাজাদের বাড়িতে গেলাম।
|
|---|
আমার শ্বশুরমশাই মারা গেছেন একবছর হয়নি। তাই অনেক নিয়ম কানুন আমাদের মানতে হচ্ছে। শুভর ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও রাজার সাথে আজ শ্মশান পর্যন্ত যেতে পারেনি। আমার ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও শেষবার কাকিমাকে একবার ছুঁয়ে দেখতে পারিনি। এই সবটাই নাকি নিয়মের মধ্যে পড়ে। যদিও কিছু নিয়মের যৌক্তিকতা আমার মাথায় ঢোকে না, তবে সমাজে বাস করতে হলে কিছু সামাজিক নিয়ম মনের বিরুদ্ধে গিয়েও মানতে হয়।
কত যে কষ্ট পাচ্ছিলেন মানুষটা সেটা শারীরিকভাবে উপলব্ধি না করতে পারলেও, তাকে দেখে, তার সম্পর্কে শুনে, ধারণা করতে পারতাম। ঈশ্বর ওনাকে এই শুভদিনে মুক্তি দিয়েছেন তার জন্য ঈশ্বরকে অনেক ধন্যবাদ। আজ এতো সুন্দর একটা দিনে উনি পরলোক গমন করেছেন, যেন ঈশ্বর এই দিনেই নিজের কাছে ওনাকে নেবেন বলে এতদিন এতো কষ্ট দিচ্ছিলেন।
তবে শেষমেষ ঈশ্বর ওনার চরণে কাকিমাকে ঠাঁই দিয়েছেন, এতেই যেন কোথাও স্বস্তি পেয়েছে বাড়ির সকলে। কারণ নিজের মানুষের কষ্ট চোখের সামনে প্রতিদিন দেখাটাও অনেকখানি কষ্টের। যারা প্রত্যহ কাকিমাকে দেখেছেন, তারই বোধহয় সবথেকে ভালো অনুভব করতে পারবেন।
মা ছাড়া বাড়িটা শূন্য হয়ে যায় এ কথা সত্যি। বাস্তব জীবনে তা উপলব্ধি করেছি আমি নিজেও। রাজাদের বাড়িতে শুধু রাজা আর ওর বাবা রয়ে গেলো। এখন এই বাড়িটাকে কে, কিভাবে আগলাবে সত্যিই জানিনা। এতো যত্ন করে গড়ে তোলার সংসারের সমস্ত কিছু ফেলে কাকিমাকে চলে যেতে হলো। ওদের বাড়িতে গিয়েই ভাবছিলাম, এতো যত্ন নিয়ে আমরা সকলেই যে সংসার গোছাই, একদিন এই সব কিছু ফেলে রেখেই আমাদের চলে যেতে হবে। তবুও মানুষ সংসারের মায়ায় বাঁধা পড়ে।
|
|---|
আত্মীয়-স্বজন সকলকেই সকালের দিকে খবর দেওয়া হয়েছিলো। নিজেদের মতো করে সকলেই বেরিয়ে পড়েছিলো তবে সকলে একসাথে এসে পৌঁছায়নি বলে এই দিকের কাজ গোছাতে অনেকটা সময় পার হয়েছিলো।
তবে শুভ ও ওর বাকি বন্ধুরা সকলে মিলে দোকান থেকে প্রয়োজনীয় জিনিস যেমন ফুল, মালা, ধূপকাঠি, দশকর্মার দোকান থেকে প্রয়োজনীয় জিনিস, রাজার জন্য ধুতি, গেঞ্জি, এই সমস্ত কিছুই জোগাড় শুরু করেছিলো। আর অন্যদিকে রাজাদের বাড়িতে গিয়ে বাকি সকলকে একটু সামলানোর চেষ্টা করেছিলাম আমি।
আসলে এই সময় মানুষের পাশে গিয়ে দাঁড়ানোটাই বোধহয় সব থেকে বড় মানবিকতা। আর রাজা ও কাকিমা কোন আত্মীয়র থেকে কম ছিলো না আমাদের কাছে। শুভর সাথে ওর সম্পর্ক এতোটাই গভীর যে, অনেক আত্মীয়র সাথেও ততটা গভীর সম্পর্ক নেই আমাদের।
এমনকি আমার শ্বশুরমশাই অসুস্থ থাকার সময় রাজা যেভাবে শুভর পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল তাতে আজ যদি ওর এই সময় আমরা গিয়ে না দাঁড়াতাম, তাহলে এর থেকে অন্যায় বোধহয় আর কিছু হতো না।
রাজার ঠাকুমা এখনও বেঁচে আছেন। যার চোখের সামনে ছেলের বউ মারা যায়, তাকে সামলানো যে কতখানি কঠিন তা নিজের ঠাকুমাকে দেখে বুঝেছি। এতো কান্না করছিলেন উনি যে, ওনাকে সামলাতে গিয়ে নিজেকেই অসহায় বোধ হচ্ছিলো।
তবে যে চলে গেছে তাকে বিদায় দিতেই হবে। ধীরে ধীরে আত্মীয়-স্বজন সকলেই এসেছেন, নিয়ম কাজ হয়েছে, ডাক্তার এসে ডেথ সার্টিফিকেট এ দিয়ে গেছে, শ্মশানে যাওয়ার জন্য গাড়িও এসেছে, এই সমস্ত কিছু করতে করতেই ঘড়ির কাঁটা কখন দুটোর কাছে পৌঁছে গেছে বুঝতেও পারিনি।
আমি ও শুভ দুজনেই একাদশী পালন করেছি আজ। তবুও শুভকে বলেছিলাম অন্তত বাইরে থেকে একটু ফল খেয়ে নিতে, না হলে ওর পক্ষে সবটা সামলানো কঠিন হতো। শেষমেষ সমস্ত কিছু গুছিয়ে কাকিমাকে একেবারে শেষ বিদায় দিয়ে যখন বাড়িতে এলাম, ঘড়ির কাঁটায় তখন প্রায় ৩টে বেজে গেছে।
বাড়িতে ফিরে আমার আর শুভর কিছু নিয়ম কাজ করার ছিলো, যেগুলো আগে থেকেই গুছিয়ে রেখে গিয়েছিলাম। সেই সমস্ত কিছু করে, জামা কাপড় ধুয়ে, স্নান সারলাম। তখন আকাশে কালো মেঘ করে বৃষ্টি এলো। কোথাও যেন প্রকৃতিও আজ কাকিমাকে হারানোর কষ্টে আমাদের মতন এই কেঁদে চলেছে বলে মনে হলো।
|
|---|
তারপর শুভ ফোন করে জানলো ওরা শ্মশানের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। বাড়িতে এসে স্নান করার পর যেন আর কোনো কাজই করতে ইচ্ছে করছিলো4 একাদশী, তাই আগে পুজোর সম্পন্ন করলাম। তারপর শুভকে খেতে দিলাম। এরপর দুজনে শুয়ে একটু বিশ্রাম করছিলাম। তবে একে অপরের সাথে কথা বলতে পারিনি।
আমি বিয়ের পর থেকে কাকিমাকে দেখছি, মানুষ হিসেবে উনি এতো ভালো ছিলেন যে সবাইকেই খুব কাছের করে নিতেন। তাই ওনার চলে যাওয়া আমাকে যতখানি কষ্ট দিয়েছে, তার থেকে অনেক বেশি কষ্ট পেয়েছে শুভ ছ কথা বলাই বাহুল্য।
কারণ একেবারে ছোটবেলা থেকেই কাকিমার কাছে ওর যাতায়াত। মাঝেমধ্যেই রাজাদের বাড়িতে খাওয়া-দাওয়া চলত ওদের, যেমন হয় বন্ধুদের ক্ষেত্রে। তাই কাকিমার চলে যাওয়া রাজার জন্য যতটা কষ্টকর, শুভর ক্ষেত্রেও তার থেকে খুব কম নয়, তাই বোধহয় এমন চুপচাপ হয়ে গেছে।
আমিও তাই আর বেশি কথা বাড়াইনি। কারণ কিছু সময় মানুষের নীরবতাই মানুষকে ভেতর থেকে বেশি শক্তিশালী করে। গত ছটা মাস ধরে কাকিমা খুব লড়াই করেছেন বেঁচে থাকার জন্য। কিন্তু সব লড়াইয়েরই একটা শেষ থাকে।
আজ কাকিমার লড়াইও শেষ হলো, চির ঘুমের দেশে নিশ্চয়ই শান্তি পেয়েছেন তিনি। ঈশ্বর ওনাকে স্বর্গবাসী করুন। পরজন্ম বলে যদি কিছু থাকে, তাহলে তা যেন ওনার পাওনা হয়। আজ এইটুকু ছাড়া বাকি আর সত্যিই কোনো প্রার্থনা নেই।
Curated by:@wirngo