"মায়ের বিদায় পর্ব"

in Incredible India7 months ago (edited)
IMG_20251123_203240.jpg
"মায়ের বিদায় বেলা"

Hello,

Everyone,

আশাকরি আপনারা সকলে ভালো আছেন, সুস্থ আছেন এবং আপনাদের সকলের আজকের দিনটি খুব ভালো কেটেছে।

প্রতিটা জিনিসের যেমন শুরু আছে, তেমনি তার শেষও আছে। আজকের পোস্টের মাধ্যমে আমি আপনাদের সাথে দিদিদের বাড়িতে শ্যামা মায়ের আরাধনার একেবারে শেষ মুহূর্তের কথা শেয়ার করবো।

গত পোস্টে আপনাদের সাথে শ্যামা মায়ের মহা যজ্ঞের কিছু মুহূর্ত ও নিয়ম কানুন শেয়ার করেছিলাম। আজকে তারপর থেকে একেবারে মায়ের বিদায় পর্যন্ত সব মুহূর্তগুলো তুলে ধরতে চলেছি।

মায়ের যজ্ঞ শেষ হতে হতেই ভোরের আলো প্রায় ফুটে উঠেছিলো। তবে তারপরেও বিসর্জনের বেশ কিছু নিয়ম বাকি ছিলো। মূলত মায়ের প্রাণ বিসর্জন পুরোহিত মশাইয়ের হাত ধরেই হয়, পরবর্তীতে আমরা শুধু মায়ের মূর্তিটাকে জলে দিয়ে বাকি নিয়মটা পালন করে থাকি।

IMG_20251123_203146.jpg
"পুরোহিত মশাই বিসর্জনের নিয়ম পালন করছিলেন"

ঠিক যেভাবে আমাদের অর্থাৎ মানুষের মৃত্যু হলে আত্মাটা দেহ থেকে বিদায় নেয়, শুধু শরীরটা পড়ে থাকে। যেটাকে কেউ আগুনে পুড়িয়ে দেয়, অথবা কেউ কবরে দিয়ে দেয়, বিষয়টা ঠিক অনেকটা সেই রকমই।

IMG_20251123_203204.jpg
"বিসর্জনের মুহুর্ত"

যাইহোক যজ্ঞের নিয়ম-কানুন শেষ করার পর পুরোহিত মশাই বিসর্জনের নিয়ম শুরু করলেন। ঠাকুরের জন্য আনা ছোট্ট একটা আয়না এবং একটা গামলার মধ্যে আনা জল দিয়ে মূলত বিসর্জনের নিয়ম পালন করা হয়।

IMG_20251123_203221.jpg
"ঘট নাড়িয়ে, লাল রঙের সুতো ছিড়ে দিয়ে বিসর্জনের নিয়ম শেষ সম্পন্ন করলেন"

আয়নার মাধ্যমে মায়ের মুখ দেখেই বিসর্জন করা হয় এবং নির্দিষ্ট কিছু মন্ত্র উচ্চারণের মাধ্যমে সেই নিয়ম পালন করার পর, পুরোহিত মশাই ঠাকুরের সামনে স্থাপন করা ঘট টা নাড়িয়ে দিলেন। আর যে লাল সুতোর সাহায্যে মায়ের চারপাশে যে চারটি তীর কাঠি বেঁধে রাখা হয়, সেই লাল সুতোটা ছিড়ে দিলেন।

IMG_20251123_203301.jpg
"ঘটের গামছাটা নামিয়ে রাখলেন পুরোহিত মশাই"

ঘটের উপরে দেওয়া গামছাটাকে তিনি নামিয়ে ফেললেন, কারণ যে ঘটটা তিনি স্থাপন করেছিলেন সেটা প্রতিমার সাথেই মাথায় করে নিয়ে জলে দিয়ে দেওয়ার নিয়ম রয়েছে।

এরপর মাকে ঘরের থেকে বের করে, দরজার সামনে রেখে আমরা যারা উপোস ছিলাম, তারা বরণ করে নিয়েছিলাম। তবে দুঃখের বিষয় সেই বরণের মুহূর্ত গুলো কেউ আর ক্যামেরাবন্দি করেনি। এরপর আমরা সবাই সবাইকে তাকে বরণ করার সিঁদুর কৌটা থেকে সিঁদুর পরিয়ে দিলাম।

IMG_20251123_203333.jpg
"মাথায় করে ঘট নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব আমার ছিলো"

ঠিক যেমন করে বাড়ির মেয়েকে বিয়ের পর বিদায় জানানো হয়, তেমন ভাবেই মাকে বিদায় জানানো হলো। এমনকি আমার দিদিকে দিয়ে কণকাঞ্জলির নিয়মও পালন করা হলো। যে কারণে দিদি আর আমাদের সাথে বিসর্জনে যেতে পারেনি। কারণ মা কে একবার কণকাঞ্জলি দেওয়ার পর মায়ের মুখ দর্শন করার নিয়ম নেই।

IMG_20251123_203401.jpg
"বিসর্জনের পথে রওনা‌ দেওয়ার মুহূর্ত"

নিয়ম অনুসারে দাদারই ঘটটা মাথায় করে নিয়ে যাওয়ার কথা। তবে আশাকরি আপনারা সকলেই জানেন দাদার ব্রেনে দুবার অপারেশন আছে, সুতরাং ওনার পক্ষে জল ভর্তি মাটির ঘটটা মাথায় করে নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। তাই যারা উপোস ছিলো, তাদের মধ্যে থেকেই কাউকে নিতে হবে। তাই দায়িত্বটা আমার উপরেই পড়লো।

IMG_20251123_202929.jpg
"রাস্তা তখন একেবারেই ফাঁকা"
IMG_20251123_202907.jpg
"ভ্যানে করেই মা কে নিয়ে যাওয়া হয়েছিলো"

সবাই মিলে হেঁটে যাত্রা শুরু করলাম সেই পুকুরের উদ্দেশ্যে, যেখানে মাকে বিসর্জন দেওয়া হবে। দিদির বাড়ি থেকে বেশ কিছুটা দূরে, তবে সকলে মিলে একত্রে আনন্দ করতে করতে গিয়েছিলাম। ভোর বেলা বলে রাস্তা তখন একেবারেই ফাঁকা ছিলো। শহর এলাকায় মূলত দশটা থেকে এগারোটার আগে কোনো দোকান খোলে না, তাই আমাদের যেতে খুব একটা কষ্ট হয়নি।

IMG_20251123_203528.jpg
"বিসর্জন দেওয়ার জায়গায় পৌঁছে তোলা ছবি"
IMG_20251123_203427.jpg
"ঘট টা তখন মাথা থেকে নামিয়ে হাতে নিয়েছিলাম"

সকলে মিলে একসাথে মজা করতে করতে কিছুক্ষণের মধ্যেই পৌঁছে গেলাম সেই পুকুরের কাছে। এরপর প্রতিমার ভ্যানটাকে ধীরে ধীরে ভিতরের দিকে নিয়ে যাওয়া হলো। পুজোর সময় ব্যবহৃত সমস্ত ফুল, ঘট, তীরকাঠি সমস্ত কিছু ব্যাগ এবং বালতিতে নিয়ে যাওয়া হয়েছিলো।

কারণ সবকিছুই সেখানে জলে দেওয়ার নিয়ম রয়েছে। একটা ভ্যান আগে থেকে ভাড়া করা হয়েছিলো। তবে ড্রাইভার পাওয়া যায়নি বলে একজন দাদাই ভ্যান টিক ঠেলে ঠেলে নিয়ে গিয়েছিলো।

IMG_20251123_203022.jpg
"প্রথমে দাদা মায়ের ঘট‌‌ টা জলে ডুবিয়ে দিলো"
IMG_20251123_202956.jpg
"মা কে পুকুরের কাছাকাছি নিয়ে আসা হচ্ছিলো"
IMG_20251123_202825.jpg
"মা কে নিয়ে তিন‌পাক ঘুরে তার পর বিসর্জন দিতে হয়। সেই ঘোরার মুহুর্তের ছবি"
IMG_20251123_224955.jpg
"জলে দেওয়ার পরের মুহূর্ত"

ওখানে গিয়ে সমস্ত জিনিসপত্র আগে জলে দিয়ে দিলাম। তারপর প্রতিমার ভ্যানটা আরেকটু ভিতরের দিকে নিয়ে, প্রতিমাকে নামানো হলো। এরপর আমার মামার ছেলে ও একজন দাদা মিলে প্রতিমাকে নিয়ে তিনবার ঘুরে নিলো। তারপর জলের মধ্যে মাকে ফেলে দিয়ে আমাদের বিসর্জনের নিয়ম শেষ হলো।

এরপর সেখানের জল সকলেই মাথায় ছড়িয়ে নিলাম। যদিও পুকুরটা যথেষ্ট নোংরা ছিলো, কিন্তু নিয়ম পালন করতে গিয়ে কিছু জিনিস তো আমাদের করতেই হয়। তাই সবকিছুই যখন হলো এটা আর বাকি থাকে কেন।

IMG_20251123_203614.jpg
"মায়ের বিসর্জনের পরে আমরা সবাই একসাথে ছবি তুললাম"

অবশেষে ফেরার আগে যারা যারা বিসর্জনে উপস্থিত ছিলাম, সকলে মিলে পুকুরের সামনে দাঁড়িয়ে একটা ছবি তুললাম। দিদি বাড়ির পূজো উপলক্ষ্যে এই সুন্দর দিনটি কাটানোর মুহূর্তটা ক্যামেরাবন্দি করে রাখার একটাই উদ্দেশ্য, যাতে পরবর্তীতে আমরা এই ছবিগুলো দেখে দিনটিকে আবার স্মরণ করতে পারি।

এইভাবে দিদিদের বাড়ির পুজোর আনন্দের মুহূর্ত গুলো শেষ হলো। আগের দিন থেকে শুরু করে পরের দিন ভোর পর্যন্ত, এই পুজোকে কেন্দ্র করে অনেক আনন্দঘন মুহূর্ত আমরা কাটিয়েছি। এতো সুন্দর ভাবে পুজো দেওয়াতে মনটা প্রশান্তিতে ভরে গিয়েছিলো।

বেশ কয়েকটি পর্বের মাধ্যমে আপনাদের সাথে পুজোর সবকটি মুহূর্ত শেয়ার করার চেষ্টা করেছি। আশা করছি আপনারাও দিদিদের বাড়ির পুজোর সাক্ষী হতে পারলেন আমার লেখা ও ছবির মাধ্যমে।

যাইহোক আরও একবার আপনাদের সকলের সুস্থতা প্রার্থনা করি। শ্যামা মা প্রত্যেকের জীবনের সমস্ত অন্ধকার দূর করে আলোয় ভরে তুলুক, এই প্রার্থনা রইলো। ভালো থাকবেন সকলে। শুভরাত্রি।

Sort:  
Loading...
 7 months ago 

Thank you for your support @adeljose 🙏.

Coin Marketplace

STEEM 0.04
TRX 0.32
JST 0.089
BTC 62036.37
ETH 1745.62
USDT 1.00
SBD 0.38