কাঁচা আম খাওয়ার যে সুখ

in Incredible India3 years ago

আসসালামু আলাইকুম/আদাব,

কেমন আছেন বন্ধুরা? আমি সৃষ্টিকর্তার অশেষ মেহেরবানীতে ভালোই আছি। আজ আমি আপনাদের মাঝে “কাঁচা আম খাওয়ার যে সুখ” শীর্ষক আমার একটি লিখনি উপস্থাপন করলাম। তাহলে শুরু করা যাকঃ-

mango-gcfdae49be_1920.jpg
source

চলুন একটু ছোটবেলায় ফিরে যাই। পল্লি কবি জসীম উদ্‌দীনের মামার বাড়ী কবিতাটি কতজনের মনে আছে। আমার মনে হয় কম বেশি সবারই মনে আছে। খুব মজা করে আমরা কবিতাটি সবাই পড়তাম। কবিতার একটি লাইন এরকম ছিলোঃ-

“ঝড়ের দিনে মামার দেশে আম কুড়াতে সুখ”

আমরা অনেকেই ছোটবেলায় এমন কিছু দিন পার করেছি। যেগুলো ছিলো অনেক আনন্দের, অনেক মজার। আমরা সাধারণত মামার বাড়ী বলতে নানা নানীর বাড়ীই বুঝি।

আমার জন্মস্থান হলো কুড়িগ্রাম জেলায়। আমার নানীবাড়ী কুড়িগ্রাম জেলার রাজারহাট উপজেলার চাকিরপশার ইউনিয়নে। আমারা যেখানে থাকি সেখান থেকে আমার নানী বাড়ীর দূরুত্ব প্রায় পঁচিশ কিলোমিটার।

আগেরকার দিনে যখন নানী বাড়ী যেতাম তখন এত রিক্সা, অটোরিক্সা, ব্যাটারিচালিত ভ্যান এসব কিছুই ছিলো না। তখনকার একমাত্র যাতায়তের মাধ্যম ছিলো গরুর গাড়ী। আমি মা আর আমার ছোট বোন গরুর গাড়ী করেই নানী বাড়ী যেতাম।

নানী বাড়ী মানেই মামার বাড়ী, আর মামার বাড়ী মানেই অনেক অনেক আনন্দ, মজা ও ফুর্তি।

আমার তিনজন মামা। আমার তিন মামা কৃষি কাজ করে ও তাদের বাজারে একটি বড় দোকান আছে। আমার তিন মামাই সেই দোকান দেখাশোনা করে।

তিন জন মামার মোট আট জন সন্তান। মানে আমার মামাতো ভাই বোন সব মিলে আট। তাই যখনি মামা বাড়ী যেতাম আমরা আট জন মিলে অনেক ঘোরাঘুরি ও আনন্দ ফূর্তি করতাম।

আমি আজ থেকে আঠারো বছর আগের কথা বলছি। তখন আমার নানী বাড়ীর পাশে তেমন কোন বাড়ী ঘর ছিলো না। অল্প কিছু ঘর বাড়ী নিয়ে একটি গ্রাম তৈরি হয়েছিলো। বাড়ীর সামনে অনেক বড় উঠান ছিলো।

উঠানের পরেই বিশাল পুকুর। আমার নানা পুকুরে মাছ চাষ করতো। আমরা গেলেই পুকুর থেকে অনেক বড় বড় রুই মাছ তুলে আমাদের খাওয়াতো। আমরাও মজা করে খেতাম।

গ্রীষ্মকালীন ছুটি আসলেই আমরা নানী বাড়ী যাওয়ার জন্য উতালা হয়ে যেতাম। বাবা অনেক বকা ঝকা করতো আমাকে আর আমার বোনকে। কিন্তু তারপরও আমাদের নানী বাড়ীতে রেখে আসার ব্যবস্থা করে দিতো। গ্রীষ্মকালে সন্ধ্যার দিকে প্রায়ই ঝড় উঠতো।

tender-mango-ge00c7c644_1920.jpg
source

একটু বাতাস উঠলেই আমরা দৌড়ে বাড়ীর উঠানে আম কুড়াতে চলে যেতাম। বাড়ীর উঠানে বড় পাঁচটি আম গাছ ছিলো। কিন্তু আমাদের ছোট মামা আমাদের খুব বকা দিতো। কারণ বাতাস বা ঝড় উঠলে আমরা বাইরে গেলে আমাদের বিপদ হতে পারে সে জন্য।

সন্ধ্যার পর ছোট মামা আমাদের পাহারা দিয়ে রাখতো যাতে আমরা বাইরে বের হতে না পারি। আমরা সর্বমোট দশ জন ছিলাম। অনেক সময় ছোট মামাকে কোন একটা কাজে ব্যস্ত রেখে আমাদের তিন চার জন ভাই চুপি চুপি আম কুড়াতে যেত। তারা অনেক আম কুরিয়ে নিয়ে আসতো।

আমরা সব ভাই বোন মিলে আমগুলো অনেক মজা করে খেতাম। নানীর ঘর থেকে খেজুরি গুড়, লবণ, কাঁচা মরিচ নিয়ে আসতাম। এগুলো দিয়ে কাঁচা আম খাওয়া অনেক দারুণ একটি ব্যপার ছিলো।

সেই স্বাদ এখনো জিহ্বায় লেগে আছে আমার।

অনেক সময় বিকেলে সবাই মিলে আম কুড়াতে বের হতাম। বিকাল বেলা সবাই গোল্লাছুট খেলতাম একসাথে। ছোট খালাও আমাদের সাথে গোল্লাছুট খেলতো। তখন ছোট খালার বিয়ে হয়নি।

গোল্লাছুট খেলে সবাই গ্রামের বিভিন্ন বাড়ীতে যেতাম আম কুরানোর জন্য। ব্যগ ভরে আম নিয়ে আসতাম। ছোট খালা আমাদের আমের আচার তৈরি করে দিয়েছিলো কয়েকবার।

এখনো সেই কথা গুলো ভাবলে আপনা আপনি মন খারাপ হয়ে যায়। আহারে! কোথায় গেলো সেসব দিন। নানী বাড়ী এখনো যাই। কিন্তু এখন আর পাঁচটি বড় গাছ নেই। মামারা সব কেটে ফেলেছে। সবাই জায়গা ভাগ করে নিয়ে নিজেদের মত বাড়ী বানিয়েছে।

তারা আবার তাদের যে ছোট উঠান আছে সেগুলোতে আম গাছ লাগিয়েছে। এখন নানা নানী বেঁচে নেই। তাই মামাদের ওখানে বেড়াতে গেলে তারাই সব আপ্যায়ন করে আমাদের। কিন্তু এখন আর সেই আম খাওয়ার মজা নেই। দিনগুলো এখন শুধুই স্মৃতি।

যখন আমরা ছোটবেলায় আম কুড়াতে যেতাম তখন সবারই চেষ্টা থাকতো কে কার আগে কতগুলো আম কুরাতে পারে। এখন দিনে দিনে গাছ কমে যাচ্ছে। মানুষ গাছপালা কেটে বসতবাড়ী নির্মান করছে। ফলে আম সহ অন্যান্য সকল ফল আমাদের কিনে খেতে হচ্ছে।

আগেরকার দিনে আমরা কখনো আম কিনে খাওয়ার কথা ভাবতাম না। কিন্তু এখন যেন ক্রয় করা আম আমাদের একমাত্র সম্বল হয়ে দাড়িয়েছে।

এই আম খাওয়ার দিনগুলোতে আরো কিছু মজার ব্যপার ছিলো। কাঁচা টক আম মরিচ লবণ দিয়ে খাওয়া কিংবা ভর্তা করে খাওয়া। আমরা সকল ভাই বোন গোল হয়ে বসে এগুলো করতাম।

আমাদের স্থানীয় ভাষায় এভাবে আম খাওয়াকে বলে আম ঝালিয়ে খাওয়া। সেই আম ঝালিয়ে খাওয়ার সেকি স্বাদ সেটা যে খেয়েছে সেই বুজবে।

আমাদের বর্তমান প্রজন্ম কতটুকু এই স্বাদের সাথে পরিচিত সেটা কিন্তু দেখার বিষয়। এখন আর আমাদের মাঝে মামা বাড়ী যাওয়ার ব্যপারটা ঠিক আর তেমন দেখা যায় না। বর্তমান ছেলে মেয়েরা তো কাঁচা আম খাওয়া ভুলেই গেছে।

mango-g27d936868_1920.jpg
source

তারা শুধু এখন স্বাদ গ্রহণ করে বাজারে ফরমালিন যুক্ত পাকা আমের। যা স্বাস্থ্যের জন্য খুবই ক্ষতিকর। তবুও জীবন থেমে থাকবে না। জীবন চলবে তার নিজ গতিতেই। সময়ের সাথে সাথে মানুষ পরিবর্তন হবে এটাই স্বাভাবিক।

এখন আমরা যারা বড়রা আছি তাদের কিছু সামাজিক দায়বদ্ধতা রয়েছে। আমাদের যাদের বাড়ীর উঠানে ফাকা যায়গা আছে, সেখানে বেশি বেশি ফলমুলের গাছ আমরা রোপন করবো।

নতুন প্রজন্মকে ফরমালিনমুক্ত ফ্রেশ ফলমুলের স্বাদ গ্রহনে উদ্ভুদ্ধ করবো। তাহলে আমরা কিছুটা হলেও সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে মুক্তি পাবো।

আজ আর নয় বন্ধুরা। সবাই ভালো থাকবেন। আল্লাহহাফেজ।

Sort:  
Loading...

কাচা আম আর পাকা আম দুটোই খেতে অনেক সুন্দর ৷ কাচা আমের আমরা আচার বানিয়ে খেয়ে থাকি কাচা আম গুলো কেটে কেটে একটি বাটিতে রেখে সেখানে লবন তৈল মরিচ হালকা চিনি দিয়ে আমের আচার তৈরি করে খেয়ে থাকি ৷ অনেক সুস্বাদু একটি আচার হয়ে থাকে ৷

আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ এত সুন্দর একটি পোস্ট আমাদের মাঝে শেয়ার করার জন্য ৷

#miwcc

 3 years ago 

ধন্যবাদ ভাইয়া, এমন একটি লেখা আমাদের সাথে ভাগ করার জন্য।

আপনার এই পোস্ট পর্যালোচনা করে দেখলাম, বিভিন্ন হাস্যরসাত্নকতার মাঝেও আপনি গাছ লাগানোর ব্যাপারটিকে প্রধান্য দিয়েছেন। আপনি সত্যি বলেছেন, আমরা যদি আমাদের ফাকা জায়গাগুলোতে বিভিন্ন ফলমূলের গাছ লাগাই তবে এখান থেকে ফরমালিনমুক্ত ফল পাওয়া সম্ভব হবে, যা আমাদের শরীরের জন্য খুবই উপকারী হবে।

#miwcc

 3 years ago 

আম কাঁচা হোক পাকা হোক দুইভাবেই খাওয়া যায় তবে পাকা আম খেতে অনেক মজা লাগে এবং আপনার আজকের আমের পোস্টটা পড়ে সেই ছোটবেলায় অনেক মজা করে আমরা কাঁচা আম পেরে বন্ধুরা মিলে খাইতাম সেই কথাগুলো আজকে মনে পড়ে গেল এবং আপনি আপনার পোষ্টের মাধ্যমে গাছ লাগানোর প্রাধান্য দিয়েছেন আসলে বর্তমানে জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে দিন দিন গাছপালা কেটে সে জায়গায় ঘর বাড়ি নির্মাণ করছে এজন্য গাছপালা কমে যাচ্ছে তাই আমাদের প্রত্যেকের উচিত প্রতিমাসে বাড়ির ফাঁকা জায়গায় একটা করে গাছ লাগানো। তাই আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ আমাদের মাঝে এত সুন্দর পোস্ট উপহার দেওয়ার জন্য ভালো থাকবেন। #miwcc

 3 years ago 

আরে বাহ আপনি তো সেই পুরনো দিনের কথা আবার মনে করিয়ে দিলেন ছোটবেলায় আমরাও যাহরের দিনে আম কুড়াতে চলে যেতাম এবং অনেক হেড়াহাড়ি করতাম আমাদের ছোট বেলার বন্ধুদের সাথে আসলে প্রতিটা মানুষের জীবনে এমন স্মৃতি জড়িয়ে আছে যাইহোক আপনার পোস্টটি পড়ে খুবই ভালো লাগলো অসংখ্য ধন্যবাদ এত সুন্দর একটি পোস্ট আমাদের মাঝে শেয়ার করার জন্য।

Coin Marketplace

STEEM 0.04
TRX 0.32
JST 0.084
BTC 62609.27
ETH 1670.67
USDT 1.00
SBD 0.42