একজন করোনা আক্রান্ত রোগীর ভোগান্তির গল্প
সুস্থতা যে কত বড় নিয়ামত তা একজন অসুস্থ মানুষের ভোগান্তি দেখলে আমরা অনুধাবন করতে পারি। ডাক্তার হওয়ার কারণে প্রতিনিয়তই অসুস্থ মানুষের দুঃখ কষ্ট গুলোর সাথী হতে হয়। করোনা আক্রান্ত মানুষের অক্সিজেন সল্পতা জনিত শ্বাসকষ্ট দেখলে প্রতিপালকের প্রতি কৃতজ্ঞতা আরো বেড়ে যায়। এরকমই একজন মহিলার কথা শোনাব আজকে।
এই ছবিটি এখান থেকে নেয়া হয়েছে
৪৭ বছর বয়স্ক একজন মহিলা। স্বামীর সাথে আমার চেম্বারে এসেছিল। চেয়ারে বসার সাথে সাথেই খেয়াল করলাম যে উনার প্রচন্ড শ্বাসকষ্ট হচ্ছে। কিন্তু অবাক হলাম যখন তার স্বামী বলল, "স্যার! একটু জ্বর টা চেক করেন। প্রেসার টা দেখেন।..."
উনার কথায় পাত্তা না দিয়ে আমি সাথে সাথেই পালস অক্সিমিটারটা উনার আঙুলে লাগালাম। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ডিসপ্লেতে (Display) ভেসে উঠলো করোনা রুগীর খুবই বিপদজনক একটা বিষয়, অক্সিজেন এর মাত্রা ৮২%। একটু কথা বলার চেষ্টা করাতেই সেটা নেমে গিয়ে দাড়াল ৭৬%। তাড়াতাড়ি একজন সিস্টারকে ডেকে অক্সিজেন লাগাতে বললাম।
সিস্টার যখন ব্যবস্থা করছিল তখন স্বামীর কাছ থেকে একটা তড়িৎ ইতিহাস নিয়ে নিলাম। গত ১০-১২ দিন ধরেই রোগীর জ্বর, সর্দি কাশি। গত ৫-৬ দিন ধরে পাতলা পায়খানা দিনে ৩-৪ বার করে এবং গত ২-৩ দিন ধরে এরকম শ্বাসকষ্ট! কোন ডাক্তারের কাছেও যায় নায়, কোন টেস্টও করায় নায়। আজকে আমার কাছে এসেছে জ্বর আর প্রেশার চেক করতে!!! বুঝেন অবস্থা! রোগীর এই খারাপ অবস্থার জন্য উনারা নিজেরাই বেশী দায়ী!
যাই হোক, প্রতি মিনিটে ৬লিটার অক্সিজেন দিয়েও তার শরীরের অক্সিজেনের মাত্রা উঠছিল ৮৯-৯০%,যেখানে একজন সুস্থ্য মানুষের এই মাত্রা ৯৬% এর উপরে। উনি উচ্চ রক্তচাপেরও রুগী।উনাদের কাংখিত জ্বর এবং প্রেশার চেক করা হল; জ্বর ছিল না এবং প্রেশার ছিল ১৪০/৯০ মিমি। যদিও উনাদের ভাষ্যমতে রুগীর ডায়াবেটিস ছিল না আগে, কিন্তু ঊনার রক্তের সুগার ছিল ২২৪ মিগ্রাম (স্বাভাবিক ২০০ এর নিচে থাকতে হয় অবশ্যই)। ফুসফুসে কল (stethoscope) লাগিয়ে দেখা গেল যে মোটামুটি পুরো বুকজুড়েই ইনফেকশানের নমুনা।
২০-২৫ মিনিট অক্সিজেন দেবা পরও স্যাটুরেশান স্বাভাবিক না হওয়ায় উনাকে বড় হসপিটালে পাঠানো ছাড়া আর কোন গত্যন্তর রইল না। ইব্রী হসপিটালের (nearest regional hospital) ইমার্জি ডাক্তারকে ফোন দিলাম। রুগীর হতিহাস শুনে তিনিও পাঠিয়ে দিতে বললেন। কিন্তু যেহেতু সিলিন্ডারের অক্সিজেন দেয়া ছাড়া শরীরের অক্সিজেন লেভেল দ্রুতই কমে যাচ্ছিল তাই অক্সিজেন দেয়া অবস্থায়ই তাকে রেফার করা লাগল।
একটা বিষয় বলা হয় নাই। তিনি বেশ মোটা একজন মহিলা। একদিকে মোটা, আরেকদিকে অক্সিজেন কম। উনার জন্যে হেটে গাড়ি পর্যন্ত যাওয়াই ছিল কষ্টসাধ্য ব্যাপার। আমি তো ভয়ে ছিলাম কখন না বার কলাপ্স (collapse) করে যায় আমার ক্লিনিকে!
ডায়াবেটিস চেক করার সময়ই রক্তের দুইটা টেস্টও দিয়েছিলাম। হাসপাতালে রওনা দেয়ার আগেই রিপোর্ট এসে গেল। CRP নামের যে টেস্ট টা আমরা করোনা বা অন্য কোন রোগের তীব্রতা দেখার জন্যে করি, তা ছিল অনেক বেশি। অর্থাৎ উনার কভিড-১৯ সিরিয়াস পর্যায়ের।
যাইহোক, শেষ পর্যন্ত, আমার ক্লিনিকে নতুন কোন জটিলতা ছাড়ায় উনাকে বড় হাসপাতালে রেখে আসা গেল। আশা করি উনি সুস্থ হয়ে বাসায় ফিরে যাবেন।
আসুন আমরা একটু পর্যালোচনা করি। উনাদের ভুল ছিল যে, করোনার লক্ষণ থাকা সত্ত্বেও কোন ডাক্তারের কাছে যান নাই, খারাপ অবস্থা হওয়ার আগেই। সবচেয়ে বড় ভুল ছিল যে প্রথম থেকেই এটাকে করোনা হিসেবে না ধরে গা এড়িয়ে চলেছেন। অথচ এখনকার সময়ের নিয়মই হচ্ছে যে, যদি কারো জ্বর হয় তাহলে ধরেই নিতে হবে করোনা, যতক্ষন না টেস্ট করে নিশ্চিত হওয়া যাবে। আরেকটি ভুল ছিল যে রোগের তীব্রতা বুঝতে না পারা।
আজকে এ পর্যন্তই। আশা করি আজকের এর কভিড-১৯ রোগীর গল্প থেকে আমরা নিজেরাও কিছু শিখতে পারলাম।
ধন্যবাদ
হাফিজ
ওমান
একদম বাস্তবিক বিষয় তুলে ধরেছেন ভাই । ভালো লিখেছেন।
জি ভাই। ধন্যবাদ।
করোনাকে অবহেলা করার জন্যই আজ এত মৃত্যুর মিছিল। একটু সচেতনতাই পারে আমাদের জীবন রক্ষা করতে
একদম সত্য কথা। এখনো অনেকেই এটাকে অবহেলা করেই যাচ্ছে।
আমাদের বাংলাদেশের অবস্থা আরো ভয়াবহ।
খুবই চিন্তার বিষয়।