চর্যাপদের পদকর্তাগণ ও লোকসংস্কৃতি

in Bulls Mind4 years ago

চর্যাপদের পদকর্তাগণ

লুইপা: সাধারণভাবে হরপ্রসাদ শাস্ত্রী সহ বেশির ভাগ বিশেষজ্ঞের মতে লুইপা-ই হলো চর্যাপদের আদি কবি। চর্যাপদের প্রথম কবিতাটি লুইপার। তিনি দুটি পদ (১ এবং ২৯ নং) রচনা করেছেন। লুইপা বাঙালি কবি ছিলেন এবং তার জন্ম উড়িষ্যায়। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর মতে তাঁর জীবনকাল ৭৩০ – ৮১০ খ্রিস্টাব্দ। সংস্কৃত ভাষায় লুইপা ৫টি গ্রন্থ রচনা করেন –

১. অভিসময় বিভঙ্গ২. বজ্ৰস্বত্ব সাধন৩.বুদ্ধোদয়৪. ভগবদাভসার৫. তত্ত্ব স্বভাব


folklore-1767450_960_720.jpg

শবরপা: ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ত্র মতে তিনি প্রাচীনতম কবি এবং লুইপার শুরু। তার জীবনকাল ৬৮০ – ৭৩২ খ্রি.। তিনি বাঙালি কবি এবং ব্যাধ (শিকারি) ছিলেন। তিনি ২টি পদ (২৮ এবং ৫০) রচনা করেছেন। সংস্কৃত ও অপভ্রংশ ভাষায় তার গ্রন্থ -১৬টি।

কাহ্নপা: চর্যাপদের সর্বাধিক সংখ্যক পদের রচয়িতা কাহ্নপা। তাঁর রচিত পদের সংখ্যা ১৩টি এর মধ্যে ১২টি পদ (৭, ৯, ১০, ১১, ১২, ১৩, ১৮, ১৯, ৩৬, ৪০, ৪২ ও ৪৫) পাওয়া যায় এবং ২৪ নম্বর পদটি পাওয়া যায়নি। তাঁর বাড়ি উড়িষ্যা এবং তিনি সোমপুর বিহারে বাস করতেন। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্র মতে তার জীবনকাল অষ্টম শতক এবং রাহুল সাংকৃত্যায়নের মতে- জীবনকালের উর্ধ্বসীমা ৮৪০ খ্রিস্টাব্দ। চর্যাপদ ছাড়াও অপভ্রংশ ভাষায় তিনি দোহাকোষ রচনা করেন।

ভুসুকুপা: তিনি দ্বিতীয় সর্বাধিক পদ রচয়িতা। তাঁর রচিত পদের সংখ্যা ৮টি (৬, ২১, ২৩, ২৭, ৩০, ৪১, ৪৩, ৪৯ নং) এদের মধ্যে ২৩ নং পদটি খণ্ডিত আকারে পাওয়া গেছে। সে হিসেবে তাঁর পদ পাওয়া গেছে ৭.৫টি। তাঁর প্রকৃত নাম শান্তিদেব। তিনি সৌরাষ্ট্রের রাজপুত্র ছিলেন, শেষ জীবনে নালন্দা বৌদ্ধ বিহারে বৌদ্ধ ভিক্ষু হিসেবে নিঃসঙ্গভাবে অবস্থান করেন।

“আজি ভুসুকু বাঙ্গালী ভইলী।
নিঅ ঘরিণী চণ্ডালে লেলী।।”

(৪৯নং) এই উক্তির কারণে তাঁকে বাঙালি কবি মনে করা হয়।

সরহপা: তৃতীয় সর্বাধিক পদ রচিয়তা, চারটি পদ রচনা করেছেন (২২, ৩২, ৩৮ ও ৩৯ নং) । তাঁর পদের ভাষা- বঙ্গ কামরূপী এবং তিনি অপভ্রংশ দোহাকোষও রচনা করেন। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্র মতে তিনি আধুনিকতম পদকর্তা।

কুক্কুরীপা: তাঁর রচিত পদের সংখ্যা ৩টি (২, ২০, ৪৮) ৪৮নং পদ পাওয়া যায়নি। তাঁকে প্রাচীনতম মহিলা কবি বলে ধারণা করা হয়। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর মতে তিনি বাংলাদেশের লোক এবং ৮ম শতকের প্রথমার্ধে বর্তমান ছিলেন। লামা তারানাথের মতে, একটি কুকুর সর্বদা সঙ্গে রাখতেন বলেই এই সিদ্ধা কুক্কুরী পা নামে পরিচিত হয়েছিলেন।

শান্তিপা: তিনি ২টি পদ রচনা করেছেন (১৫ এবং ২৬)। তাঁর পদের ভাষা-প্রাচীন মৈথিলি।

তন্ত্রীপা: তিনি পদ রচনা করেছেন ১টি (২৫ নং) কিন্তু পদটি পাওয়া যায়নি। মুনি দত্তের টীকায় এ পদের ব্যাখ্যা পাওয়া গেছে।

আর্যদেবপা: তিনি পদ রচনা করেছেন ১ টি (৩১ নং)। তারানাথের মতে তিনি মেবারের রাজা ছিলেন এবং তাঁর রচিত পদের ভাষা উড়িয়া।

মহীধরপা: তাঁর পদের ভাষা-প্রাচীন মৈথিলি। তিনি ১টি পদ রচনা করেন (১৬ নং)।

ভাদেপা: ভাদেপা পদ রচনা করেছেন ১ টি (৩৫ নং) । তিনি কাহ্নপার শিষ্য এবং পেশায় চিত্রকর ছিলেন। ঢেণ্ডনপা: তিনি পদ রচনা করেছেন ১টি (৩৩ নং) ।

লাড়ী ডোম্বীপা: প্রাপ্ত পুঁথিতে ১০নং পদের পর লাড়ী ডোম্বী পাদ নামে একজন পদকতার নাম পাওয়া যায়। তাঁর কোনো পদ পাওয়া যায়নি, মুনিদত্তও তাঁর পদের ব্যাখ্যা দেননি।

গুণ্ডরীপা: পদ রচনা করেছেন ১টি (৪ নং)। তিনি কর্মকার / লোহার ছিলেন।

মীননাথ: মীননাথকে শহীদুল্লাহ প্রথম বাঙালি কবি মনে করেন। তিনি সপ্তম শতকে বর্তমান ছিলেন। চর্যাপদে তার কোন পদ নেই, ২১ নং চর্যার টীকায় কেবল চারটি পক্তির উল্লেখ আছে।

চর্যাপদ বিষয়ক গ্রন্থ:

গ্রন্থের নামরচয়িতার নাম
Buddhist Mystic songsড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্
চর্যাপদমনীন্দ্রমোহন বসু
চর্যাপদঅতীন্দ্র মজুমদার
History of Bengaliড. নীহাররঞ্জন রায়
History of Ancient Bengalরমেশ চন্দ্র মজুমদার
চর্যাগীতিকাআনোয়ার পাশা ও আবদুল হাই
নতুন চর্যাপদসৈয়দ মুহম্মদ শাহেদ

চর্যাপদের নিদর্শন:

‘কাআ তরুবর পাঞ্চ বি ডাল।
চঞ্চল চীত্ৰ পইঠা কাল।'

(লুইপা) – এটি চর্যাপদের প্রথম পদ। অর্থ – শরীরে গাছ তাতে পাঁচখানি ডাল/চঞ্চল মনে তার ঢুকে পড়ে কাল।

‘আলি এঁ কালি এঁ বাট রুন্ধেলা।
তা দেখি কাহ্ন বিমনা ভইলা।'

(কাহ্নপা) অর্থ – আলি কালি দ্বারা পথ রুদ্ধ হল/ তা দেখে কাহ্ন বিমনা হলেন।

‘টালত মোর ঘর নাহি পড়বেশী।
হাড়ীতে ভাত নাহি নিতিআবেশী।'

(ঢেণ্ডণপা, ৩৩ নং) অর্থ- হাঁড়িতে ভাত নেই অথচ প্রতিদিন অতিথি আসে।

‘অপণা মাংসে হরিণা বৈরী।’

(ভুসুকুপা, ৬ নং) অর্থ- আপন মাংসের জন্যই হরিণ সকলের শত্রু।

“দুলি দুহি পিটা ধরণ ন জাই।
রুখের তেন্ডুলি কুম্ভীরে খাঅ”

(কুক্কুরী পা, ২ নং) অর্থ- মাদী কাছিম দোহন করে দুধ পাত্রে রাখা যাচ্ছে না। গাছের তেঁতুল কুমিরে খাচ্ছে।

‘হাথেরে কাঙ্কন আছে মা লোউ দাপণ।'

(সরহ পা, ৩২ নং) অর্থ- হাতেই কাঁকন আছে দর্পন দেখোনা, অর্থাৎ হাতে কাঁকন আছে কিনা দেখার জন্য দর্পণের দিকে তাকিয়ো না।

‘দুহিল দুধু কি বেণ্টে সামাই।'

(ঢেণ্ডণপা, ৩৩ নং) অর্থ- দোয়ানো দুধ কী বাঁটে প্রবেশ করে।

‘আণ চাহন্তে, আণ বিণঠা।'

(কঙ্কন পা, ৪৪ নং) অর্থ- এক চাইতে আরেক বিনষ্ট হল।

‘বর সূন গোহালী কি মো দুধ বলন্দে।'

(সরহ পা, ৩৯ নং) অর্থ- বরং (ভাল) শূন্য গোয়াল, কী হবে আমার দুষ্ট বলদে।

চর্যাপদ সম্পর্কে আরও কিছু তথ্য:

চর্যাপদ রচনা করেছেন – বৌদ্ধ সহজিয়া সা গণ। এগুলি ছিল তাদের সাধন সঙ্গীত।
চর্যাপদের নারী কবির নাম – কুক্কুরীপা।
চর্যাপদে কোন কবির পদ পাওয়া যায়নি – ‘তন্ত্রীপা’-এর।
চর্যাপদের অনুলিপির লিপিকাল বার শতক এর বলে পণ্ডিতগণ অনুমান করেন।
চর্যাপদে উঠে এসেছে বাংলাদেশের বাঙালি জীবন।
চর্যার কালে বাংলা ও বাঙালির জীবনে মূল অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি ছিল – কৃষিভিত্তিক।
চর্যাপদের রচনা শুরু হয় – পাল যুগে।
আধুনিক পদকর্তা – ভুসুকু পা ও সবর পা।
নবচর্যাগীতি নেপাল থেকে সংগ্রহ করেন ড. শশিভূষণ দাশগুপ্ত। এতে পদ আছে ১০১টি।
চর্যাপদের ইংরেজি অনুবাদ করেছেন হাসনা জসীম উদ্দীন মওদুদ। বইটির নাম ‘মিস্টিক পোয়েট্রি অব বাংলাদেশ'।

লোকগীতি:

বাংলা লোকসাহিত্যে গান বা গীতি বিস্তৃত অংশ জুড়ে আছে এবং এর বৈচিত্র্যও অত্যধিক। জনপ্রিয়তার দিক থেকে লোকগীতি অপরাপর লোক সাহিত্যের নিদর্শনের চেয়ে বেশি প্রতিষ্ঠিত। গীতিকার সাথে লোকগীতিতে কোনো কাহিনি থাকে না। অঞ্চলভেদে লোকগীতির পার্থক্য দেখা যায়। যেমন পশ্চিমবঙ্গের পটুয়া, ভাদু, ঝুমুর; উত্তরবঙ্গের গম্ভীরা, জাগ, ভাওয়াইয়া; পূর্ববঙ্গের জারি, ঘাটু ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।

বিষয়বস্তুর দিক থেকেও লোকগীতির স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য লক্ষণীয়। যেমন-
পটুয়া সঙ্গীতের বিষয়বস্তু – কৃষ্ণলীলা।
রামায়ণ ও ভাদু গানের বিষয় প্রকৃতি বন্দনা।
গম্ভীরার বিষয়বস্তু – শিব।
ভাওয়াইয়ার বিষয়বস্তু – প্রেম।
সারি, ঘাটু প্রভৃতির বিষয়বস্তু – রাধাকৃষ্ণপ্রেম।

ড. আশরাফ সিদ্দিকী লোকগীতিকে নিম্নলিখিত ভাবে শ্রেণিবিভক্ত করেছেন:

১. আঞ্চলিকগীতি – যা অঞ্চলবিশেষে বিশেষভাবে প্রচলিত।
২. ব্যবহারিক – বিবাহ, উৎসব ইত্যাদি উপলক্ষে যা গীত হয়।
৩. হাসির গান – হাসির বিষয় নিয়ে গীত হয়।
৪. কর্মসঙ্গীত এবং শ্রমসঙ্গীত — যা নানা কাজ অর্থাৎ কৃষিকর্ম, নৌকাবাইচ, ছাদ পিটানো ইত্যাদিতে গাওয়া হয়।
৫. প্রেমসঙ্গীত – বিরহিণী নারী ও বিরহী পুরুষের নানা হৃদয়বেদনা ও চিরন্তন প্রেম সম্ভাষণ যাতে প্রকাশিত হয়।
৬. বারমাসী – অপেক্ষাকৃত লম্বা গানে বিরহিণী নারীর বার মাসের বিরহবেদনা প্রকাশিত হয়।

লোকগীতি হিসেবে একটি ভাওয়াইয়া গানের উদাহরণ:

“পরথম যৌবনের কালে না হৈল মোর বিয়া,
আর কতকাল রহিম ঘরে একাকিনী হয়া,
রে বিধি নিদয়া।
হাইলা পৈল মোর সোনার যৌবন মলেয়ার ঝড়ে,
মাও বাপে মোর হৈল বাদী না দিল্ পরের ঘরে,
রে বিধি নিদয়া।”

ছড়া:

লোকসাহিত্যের প্রাচীনতম সৃষ্টি ছড়া। ছড়াগুলো বিশেষ কোনো ব্যক্তির সৃষ্টি বলে মনে করা যায় না, এর সৃষ্টির পিছনে সমষ্টিমনের প্রভাব কার্যকর। ছড়াগুলোতে রসের প্রাধান্য পায়, ছন্দঝঙ্কারে মন বিমুগ্ধ হয় – বুদ্ধি দিয়ে তাকে বিচার করার প্রয়োজন পড়ে না। ছড়ার সুনির্দিষ্ট কোনো রচনা কাল নেই এবং রচয়িতারও কোনো পরিচয় মিলে না। লঘুভার, অর্থহীন, সংক্ষিপ্ত ও বিচিত্র বলে ছড়া সহজেই শিশুমনকে আকৃষ্ট করে।

ছড়ার বিষয়বস্তু অত্যন্ত বৈচিত্র্যপূর্ণ। শিশু-জীবনের বিভিন্ন পর্যায় অবলম্বনে ছড়া, যেমন- ছেলেভুলানো ছড়া, খেলাধুলার ছড়া, নানা ধরনের মেয়েলি ছড়া, বিবাহ, প্রকৃতি, ব্যবহারিক জীবন, উৎসব, নীতি কৃষি ইত্যাদি বহুবিধ বিষয়াবলম্বনে অজস্র ছড়া রচিত হয়েছে।

ছড়ার একটি নমুনা –

“ঘুম পাড়ানি মাসি পিসি মোদের বাড়ি যেয়ো,
বাটা ভরা পান দেব গাল ভরে খেয়ো
শান-বাঁধানো ঘাট দেব বেসম মেখে নেয়ো
শীতল পাটি পেতে দেব শুয়ে ঘুম যেয়ো।”

প্রবাদ:

‘প্রবাদ’ লোকসাহিত্যের অন্যতম বিশিষ্ট শাখা। প্রবাদ বলতে বোঝায় মানুষের দীর্ঘকালের অভিজ্ঞতার একটি সংক্ষিপ্ত অভিব্যক্তি। ব্যক্তি বা সমাজজীবনের অভিজ্ঞতার ফলে প্রবাদের সৃষ্টি এবং নীতি ও উপদেশ বিতরণ এর লক্ষ্য। জীবনের বিচিত্র পরিসরে মানুষ বিভিন্ন বিষয়ে যে অভিজ্ঞতা লাভ করে থাকে পরবর্তী পর্যায়ে কাজে লাগানোর জন্য স্বল্প অবয়বে প্রবাদের সৃষ্টি করা হয়েছে। যেমন –

“নানান বরণ গাভীরে ভাই একই বরণ দুধ,
জগৎ ভরমিয়া দেখলাম একই মায়ের পুত।”
অথবা
“চিড়া বল পিঠা বল ভাতের মত না,
খালা বল ফুফু বল মায়ের মত না।”
অথবা
“যদি থাকে বন্ধুর মন গাঙ পারইতে কতক্ষণ।”

এমন অসংখ্য প্রবাদের মাধ্যমে মানবমনের বিচিত্র অভিজ্ঞতার সর্বজনীন রূপেরই প্রকাশ ঘটে।

ডাকের বচন:

জ্যোতিষ শাস্ত্র, ক্ষেত্রতত্ত্ব ও গৃহস্থালী সম্পর্কিত ছড়া ডাকের বচন নামে পরিচিত। ডাক তিব্বতীয় ভাষার শব্দ। যার অর্থ – ‘বৌদ্ধিক তান্ত্রিক সাধক' বা প্রজ্ঞা বা জ্ঞান। ডাকের বচনগুলো আসামের উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলে এবং বাংলাদেশের উত্তর-পূর্ব প্রান্তে রচিত হয়েছিল বলে অনেকে মনে করেন। ড. দীনেশচন্দ্র সেন ডাক ও খনার বচন রচনার কাল অষ্টম থেকে দ্বাদশ শতক বিবেচনা করেছেন। ‘ডাক’ বর্তমানে উড়িষ্যায় গীত হয়। চর্যাপদের সাথে আবিষ্কৃত হয়েছিল ‘ডাকার্ণব’ যার অর্থ ‘জ্ঞানসাগর’। ডাকের বচনের উদাহরণ:

“নিয়ড় পোখরী দূরে যায়।
পথিক দেখিয়া আউরে চায়।
পর সম্ভাষে বাটে থিকে।
ডাকে বলে এ নারী ঘরে না টিকে।”

খনার বচন:

কৃষিজ/কৃষিতত্ত্ব ও আবহাওয়া বিষয়ক উপদেশাত্মক এক প্রকার প্রচলিত ছড়া ‘খনার বচন' নামে পরিচিত। খনা তিব্বতী ভাষার শব্দ যার অর্থ বোবা। খনার বচনই আমাদের প্রাচীন কৃষি বিজ্ঞান। কেউ কেউ অবশ্য ডাক ও খনার বচন এ দুটিকে প্রাচীন যুগের সৃষ্টি বলে ধারণা করেছেন। ডঃ আবদুর গফুর সিদ্দিকীর মতে, খনার বচনের সংখ্যা প্রায় দেড় লক্ষ। খনার বচনের উদাহরণ:

“১.
খনা ডাক দিয়া বলে।
চিটা দিলে নারিকেল মূলে
গাছ হয় তাজা মোটা।
শীঘ্র শীঘ্র ধরে গোটা
নারিকেল গাছে লুনে মাটি
শীঘ্র শীঘ্র বাধে গুটি।
২.
“কলা রোয়ে না কেটো পাত।
তাতেই কাপড় তাতেই ভাত।”
৩.
“দিনে রোদ রাতে জল।
তাতে বাড়ে ধানের বল।””

ধাঁধা:

লোকসাহিত্যে ‘ধাঁধা’ অন্যতম প্রাচীন শাখা হিসেবে বিবেচিত। রূপকের সাহায্যে এবং জিজ্ঞাসার আকারে কোনো একটি ভাব সূক্ষ্ম বুদ্ধি ও চিন্তার অনুশীলনের মাধ্যমে ধাঁধায় রূপায়িত হয়। ধাঁধাকে জাতির সৃষ্টি মনে না করে বুদ্ধিবৃত্তি সম্পন্ন মানব মনের সৃষ্টি বলে অনুমিত হয়। আগে থেকে জানা না থাকলে লোকসাহিত্যের ধাঁধা উত্তর বের করা কঠিন। কারণ ধাঁধার মধ্যে বক্তব্য সাধারণত সঙ্গতিপূর্ণ থাকে না। যেমন –

“একটুখানি পুকুনি কইয়ে ডুর ভুর করে
রাজা আইলে প্রজা আইলে তুইল্যা সেলাম করে।”

এর উত্তর যে ‘হুঁকা’ – তা আগে থেকে জানা না থাকলে ধাঁধার বক্তব্য থেকে তা উদ্ধার করা চলে না।
আবার,

“বন থেকে বেরুল টিয়ে
সোনার টোপর মাথায় দিয়ে।”

আনারসের সঙ্গে এর তেমন মিল না থাকলেও এর উত্তর ‘আনারস’। অনেক সময় ধাঁধার উত্তরের সঙ্গে বক্তব্যের অর্থসঙ্গতি খুঁজে পাওয়া যায় না। ধাঁধার মধ্যে অর্থহীন পদও ছন্দের ঝংকার তোলে।

লোকনাটক:

সাধারণ মানুষের মধ্যে গল্পে গল্পে যে নাটক গড়ে ওঠে, সাধারণ মানুষের গল্প অবলম্বন করে যার কাহিনি আবর্তিত এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে কথ্যরীতিতে যে নাটক বেঁচে থাকে তাই লোকনাট্য।

Coin Marketplace

STEEM 0.04
TRX 0.32
JST 0.082
BTC 61651.23
ETH 1639.18
USDT 1.00
SBD 0.41