সামাজিক মূল্যবোধ
একটি জাতির প্রাণশক্তি হচ্ছে সংস্কৃতি এবং একটি জাতির নৈতিক মূল্যবোধকে তুলে ধরে সংস্কৃতি। নীতি ও উচিত-অনুচিত বোধ হলো নৈতিক মূল্যবোধের উৎস। নৈতিক মূল্যবোধ হচ্ছে সেসব মনোভাব এবং আচরণ যা মানুষ সবসময় ভালো, কল্যাণকর ও অপরিহার্য বিবেচনা করে মানসিকভাবে তৃপ্তিবোধ করে। শিশু তার পরিবারেই সর্বপ্রথম নৈতিকতা ও মূল্যবোধের শিক্ষা পায়। মূল্যবোধের বৈশিষ্ট্যের মধ্যে অন্যতম একটি বৈশিষ্ট্য হলো সামাজিক মাপকাঠি। যেখানে বলা হয়েছে- মূ্ল্যবোধ মানুষের আচার-ব্যবহার, ধ্যান-ধারণা, চাল-চলন ইত্যাদি নিয়ন্ত্রণ করার মাপকাঠি স্বরূপ। আধুনিক মূল্যবোধের উদাহরণ: বাল্য বিবাহ প্রতিরোধ। সমাজ পরিবর্তনশীল। এ পরিবর্তনের সাথে মূল্যবোধেরও পরিবর্তন ঘটে। এজন্যই অতীতের অনেক মূল্যবোধ এখন অর্থহীন হয়ে পড়েছে। যেমন বাল্য বিবাহ, সতীদাহ প্রথা ইত্যাদি।
● জেন লেন্নন-এর মতে, “সামাজিক মূল্যবোধ বলতে কোনো স্থান বা এলাকার ধর্মীয়, ঐতিহ্যপূর্ণ, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক বা জাতীয় গুণাবলিকে বোঝায়, যা ঐ স্থানের অধিকাংশ বা স্বল্পসংখ্যক লোক পালন করেন।”
● নিকোলাস রেসার-এর মতে, “সামাজিক মূল্যবোধ সেসব গুণাবলি, যা ব্যক্তি নিজের সহকর্মীদের মধ্যে দেখে খুশি হয় এবং নিজের সমাজ, জাতি, সংস্কৃতি ও পরিবেশকে মূল্যবান মনে করে খুশি হয়।”
● এম. ডব্লিউ. পামফ্রে-এর মতে, “মূল্যবোধ হচ্ছে ব্যক্তি বা সামাজিক দলের অভিপ্রেত ব্যবহারের সুবিন্যস্ত প্রকাশ।”
● স্টুয়ার্ড সি. ডড এর মতে, “যে সব মূল্যবোধ ব্যক্তি সমাজের নিকট থেকে আশা করে এবং যা সমাজ ব্যক্তির নিকট থেকে লাভ করে খুশি হয়, সেসব মূল্যবোধই সামাজিক মূল্যবোধ।”
বড়দের সম্মান করা তথাপি শিষ্টাচার সততা, ন্যায়পরায়ণতা, সহনশীলতা, সহমর্মিতাবোধ, দানশীলতা, শ্রমের মর্যাদা, শৃঙ্খলাবোধ, সৌজন্যবোধ প্রভৃতি সুকুমার বৃত্তি বা গুণাবলীর সমষ্টিই হলো সামাজিক মূল্যবোধ।
ইভ টিজিং প্রতিরোধে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের পাশাপাশি পারিবারিক ও সামাজিকভাবে উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। সেক্ষেত্রে-
১। সামাজিকীকরণে পরিবারের যথাযথ ভূমিকা নিশ্চিত করতে হবে।
২। ইভ টিজিং প্রতিরোধে সামাজিক আন্দোলন ও প্রতিরোধ জোরদার করতে হবে।
৩। উত্ত্যক্তকারীদের সামাজিকভাবে বয়কট করতে হবে।
সর্বোপরি সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলাই অধিকতর উপযোগী।
রাজনৈতিক চেতনা থেকে তৈরি হয় জাতীয় ঐক্য। কারণ রাজনৈতিক দলগুলো বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে দলীয় নীতি কর্মসূচী প্রণয়ন করে। ফলে ধর্ম, বর্ণ ও জাতিগত সংকীর্ণ স্বার্থ বা মনোবৃত্তি গড়ে উঠতে পারে না। তাই জাতীয় ঐক্যবোধ সৃষ্টিতে রাজনৈতিক চেতনার ভূমিকা অপরিসীম। জনমত ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির মধ্যে গভীর সম্পর্ক থাকলেও উভয়ের মধ্যে পার্থক্য কম নয়। জনমত যত দ্রুত পরিবর্তনশীল, রাজনৈতিক সংস্কৃতি তত দ্রুত পরিবর্তনশীল নয়। রাজনৈতিক সংস্কৃতি অনেকটা স্থায়ী, কিন্তু জনমত অনেকটা অস্থায়ী। রাজনৈতিক দল ও চাপসৃষ্টিকারী গোষ্ঠীর মধ্যে কিছু ক্ষেত্রে উভয়ের উৎপত্তি, লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য এবং কর্মসূচির মধ্যে পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়। উল্লেখ্য, সমমনোভাবাপন্ন সদস্যদের নিয়ে গঠিত গোষ্ঠীকে চাপসৃষ্টিকারী গোষ্ঠী বোঝায়। সুশাসন প্রতিষ্ঠায় নাগরিকের দায়িত্ব ও কর্তব্য অনেক। রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া, সৎ ও যোগ্য নেতৃত্ব নির্বাচন, সংবিধান মান্য করা, সততা ও নিষ্ঠার সাথে সরকারি কাজ সম্পাদন, জাতীয় সম্পত্তি ও শৃংখলা রক্ষা করা প্রভৃতি দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে একজন নাগরিক প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সরকার পরিচালনায় সাহায্য করে থাকে, যা যে কোনো দেশের সুশাসন প্রতিষ্ঠায় জরুরি। নিয়মিত কর প্রদান করার মাধ্যমে একজন নাগরিক সরকার পরিচালনায় সাহায্য করে থাকে। নিজের অধিকার ভোগ একান্তই নাগরিকের ব্যাপার, যার সাথে সুশাসন প্রতিষ্ঠার কোনো সম্পর্ক নেই। সৎভাবে ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনা অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সহায়ক ভূমিকা পালন করে।
কোনো কাজ যদি প্রতিযোগিতামূলক কিংবা সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়, সেখানে যদি ঘুষ নামক অবৈধ লেনদেন হয় তাহলে অবশ্যই সমবণ্টনে ব্যাহত হয়। সকলেই তাহার যোগ্য প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হয়।সরকারের বিভিন্ন বিভাগের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এজন্য লর্ড অ্যাক্টন বলেছেন যে, ‘ক্ষমতা দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেয় এবং নিরংকুশ ক্ষমতা দুর্নীতিকেও নিরংকুশ করে তোলে’ (Power Corrupts, absolute Power tends to corrupt absolutely.) UNCAC এর ভূমিকায় বলা হয়েছে যে, “দুর্নীতি সমাজ ও রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা এবং নিরাপত্তাকে বিঘ্নিত করে। কারণ এর মাধ্যমে শক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নৈতিকতা বিনষ্ট হয়, ন্যায়বিচার ও সবার সমান অধিকার, গণতন্ত্র এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা হুমকির মুখে পড়ে।” অধিকাংশ রাষ্ট্রেই দুর্নীতি দমন কমিশন বা ব্যুরো নামক প্রতিষ্ঠান থাকলেও সেগুলো স্বাধীন ও কর্মতৎপর নয়। স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশন যেকোন দুর্নীতি প্রতিরোধ করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।