বাংলাদেশে ই-গভর্নেন্স এর কার্যক্রমsteemCreated with Sketch.

in Bulls Mind4 years ago

সুশাসন ও ই-গভর্নেন্স-এর পারস্পরিক সম্পর্ক খুবই নিবিড়। ই-গভর্নেন্স নিম্নলিখিত উপায়ে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এগুলো নিম্নরণ-

১. দ্রুত যোগাযোগ: সেবা প্রদানকারী কর্মকর্তার সাথে যোগাযোগ স্থাপন ই-গভর্নেন্স-এর আওতাধীন যেকোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান ওয়েবসাইটে প্রবেশ করে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বা ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের সাথে দ্রুত যোগাযোগ স্থাপন করতে পারে। ২. স্বচ্ছতা আনয়ন: ই-গভর্নেন্সে স্বচ্ছতার বিষয়টিকে বড় করে দেখা হয়। সরকার কী কী কাজ করছে, কেন করছে, কী কী মূলনীতির ওপর সরকার সিদ্ধান্ত বা নীতি প্রণয়ন করছে তা ই-গর্ভনেন্স তা জানাতে সাহায্য করে। ৩. দক্ষ ও সাশ্রয়ী পদ্মা: ই-গভর্নেন্স-এর চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো একটি দক্ষ ও সাশ্রয়ী পন্থায় জনগণের নিকট সেবা পৌঁছানো যা সময়, শ্রম ও অর্থের অপচয় কমিয়ে দেয়। ৪.রাজনৈতিক সচেতনতা তৈরি; রাজনৈতিক সচেতনতা, জনগণের সংশ্লিষ্টতা ও আগ্রহ বাড়াতে ই-গভর্নেন্স বা ই-সরকার কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারে। ৫.তথ্যের সহজলভ্যতা: ই-গভর্নেন্স তথ্য প্রাপ্তি যেকোনো প্রক্রিয়াকে সহজ করে দিতে পারে। ৬. জনগণের ব্যাপক অংশগ্রহণ: ই-গভর্নেন্সের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো জনগণের ব্যাপক অংশগ্রহণ। ইন্টারনেটের মাধ্যমে সারাদেশের মানুষ রাজনীতিবিদ ও সরকারি চাকরিজীবীদের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করতে পারে । ৭. অবাধ ও সার্বজনীন তথ্য প্রবাহ: ই-গভর্নেন্স ব্যবস্থায় ধনী-গরিব, ধর্ম-বর্ণ-শ্রেণি নির্বিশেষে সবার জন্য সরকারি তথ্য প্রাপ্তির সুযোগ উন্মুক্ত থাকে যা প্রকৃত সাম্য প্রতিষ্ঠা করতে সাহায্য করে। ৮. আমলাতান্ত্রিক জটিলতা হ্রাস: ই-গভর্নেন্স আমলাতান্ত্রিক জটিলতার দুর্ভোগের বা হয়রানির হাত থেকে জনগণকে রেহাই দেয়। কেননা এর ফলে সরকারি অফিসে গিয়ে তথ্যের জন্য দিনের পর দিন ঘুরতে হয় না বা ঘুষ দিতে হয় না। ঘরে বসেই জনগণ এগুলো জানতে পারে।


parliament-317085_960_720.jpg

বাংলাদেশে ই-গভর্নেন্স এর কার্যক্রম:

বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক ২০০৯ সালে ঘোষিত ভিশন-২০২১ এর প্রধান লক্ষ্যই হল সরকারি সেবা ও শাসনব্যবস্থাকে ডিজিটাল করা। সরকারি সেবা জনগণের দ্বারে পৌঁছে দেবার জন্য স্থানীয় সরকারের সর্বনিম্ন স্তর ইউনিয়ন পরিষদে একটি ইউনিয়ন তথ্য সেবা কেন্দ্র বা ডিজিটাল সেন্টার চালু করেছে। তাছাড়া সরকারি সকল কার্যালয় থেকে দ্রুত তথ্য পাওয়ার জন্য একজন করে তথ্য কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়েছে। দ্রুত তথ্য পাওয়ার জন্য প্রত্যেকটি সরকারি কার্যালয়ের মৌলিক কিছু তথ্য ওয়েবসাইটে অন্তর্ভুক্তকরণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা অধিদফতরের আওতায় শিক্ষকদের পেনশন ভাতা প্রদান কার্যক্রমের অংশ হিসেবে পিআরএল এবং পেনশনের আবেদন প্রক্রিয়ার ডিজিটালাইজেশন করা হয়েছে। ই-গভর্নেন্স প্রতিষ্ঠিত হলে সর্বাগ্রে প্রাধান্য পাবে সাধারণ নাগরিক। এটি চার ধরনের কাজ করে যার কেন্দ্রে থাকে নাগরিক সেবা। এ কাজগুলো হচ্ছে ব্যক্তিকে অবগতকরণ, ব্যক্তিকে প্রতিনিধিত্বকরণ, ব্যক্তিকে পরামর্শ প্রদান এবং ব্যক্তিকে অন্তর্ভুক্তকরণ।

সুশাসন ও ই-গভর্নেন্স-এর প্রতিবন্ধকতা:

ই-গভর্নেন্সের সুবিধা অনেক, কিন্তু সম্পূর্ণভাবে এটি প্রচলন করা ব্যয়বহুল সময় সাপেক্ষ। উন্নয়নশীল দেশগুলো ই-গভর্নেন্স চালু করতে গিয়ে নানা ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হয়। বাধাগুলো নিয়ে আলোচনা করা হল। ১. দিম্পি শ্রীবাস্তব এবং কে শর্মা (২০১০), ই-গভর্নেন্স প্রতিষ্ঠার পথে সবচেয়ে বড় অন্তরায় হিসেবে ভৌগোলিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমস্যাকে চিহ্নিত করেছেন। নিরক্ষরতা ও অবকাঠামোগত সংকটের কারণেও ই-গর্ভনেন্সের সফলতার সম্ভাবনা কমে যায়। ২. উন্নয়নশীল দেশগুলোতে নাগরিক বিপুল অংশের মধ্যে সচেতনতার অভাব থাকায়, তারা ই-গভর্নেন্সের সুবিধা গ্রহণে এখনো অক্ষম। অনেক সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও বাংলাদেশের সরকারি পোর্টালে এখন প্রায় ৬৫টি সেবার ফরম পাওয়া যায়। কিন্তু সাধারণ জনগোষ্ঠীর অনেকেই এ সম্পর্কে অবগত নয়। ৩. বাংলাদেশের মত অনেক দেশে ই-গভর্নেন্স যথাযযভাবে কার্যকর করার পথে একটি প্রধান অন্তরায় বিদ্যুৎ সংযোগ ও বিদ্যুৎ ঘাটতি, পল্লী অঞ্চলে ঘনঘন লোডশেডিং, ইন্টারনেটের ধীর গতি ও উচ্চমূল্য। ৪. ব্যক্তি পর্যায়ে ই-গভর্নেন্সের সুবিধা পেতে হলে নিজস্ব কম্পিউটার থাকা জরুরী, যা দরিদ্র জনগণের পক্ষে সম্ভবপর হয় না। ৫. কম্পিউটারের সার্ভার তথ্য ভান্ডার হিসেবে কাজ করে বিধায়, প্রযুক্তিগত কারণে এ সার্ভারের কার্যক্রমে ত্রুটি দেখা দিলে রাষ্ট্রীয়, সরকারি ও ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস হবার আশঙ্কা থাকে। ৬.প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনী কাঠামোর অভাবে অনেক সময় ই-গভর্নেন্স চালুকরণের উদ্যোগ বাধাগ্রস্ত হয়। १. দক্ষ কর্মীর স্বল্পতা ই-গভর্নেন্স এর পথে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করে। ৮. ই-গভর্নেন্স ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে বিশাল অংকের অর্থ ব্যয় হয়। তার বিনিময়ে প্রাপ্ত ফলাফল এখনো আশানুরূপ নয়। ৯. ই-গভর্নেন্স সেবা ও সুবিধাগুলো অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রত্যন্ত অঞ্চলসমূহে পৌঁছায় না। ফলে যেসব মানুষ নিরক্ষর বা দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে তাদের জন্য সেবা গ্রহণ করা সত্যিই অচিন্তনীয়। ১০. ই-গভর্নেন্সের বিরোধিতাকারীরা যুক্তি দেখান যে, এর স্বচ্ছতার বিষয়টি অস্পষ্ট। কেননা সম্পূর্ণ বিষয়টি সরকার নিজেই নিয়ন্ত্রণ করে। সরকার জনগণকে না জানিয়েই যেকোনো সময় যেকোনো তথ্য যোগ বা বিয়োগ করতে পারে।

সুশাসন ও ই-গভর্নেন্স-এর প্রতিবন্ধকতা উত্তরণের উপায়:

১. সুশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ই শাসনের অন্তরায় দূর করার জন্য নিম্নলিখিত উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন। ই-গভর্নেন্স প্রতিষ্ঠার জন্য একটি কেন্দ্রীয় প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো সৃষ্টি করা সরকার। এই কাঠামোটি সরকারের বিভিন্ন স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বয় সাধনের মাধ্যমে জনগণকেন্দ্রিক ই-গভর্নেন্স প্রতিষ্ঠা করবে। ফলে ই সরকারের এর সার্বিক কর্মকাণ্ডের ওপর তত্ত্বাবধান করা সম্ভবপর হবে। ২. বাংলাদেশের মত দেশে ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা রক্ষার বিধান যুক্ত করে, ২০০৯ এর ICT Act সংশোধন করতে হবে। ২০০৯ সালে RTI Act এর দায় বাস্তবায়ন করতে হবে। এই Act এর বাস্তবায়নের ভিত্তিতে জনগণের তথ্য অধিকার প্রাপ্তির অধিকার নিশ্চিত হবে। ৩. ই-গভর্নেন্স সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে ইলেকট্রনিক এবং প্রিন্ট মিডিয়া গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। বিশেষ করে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর ওয়েবসাইটে কি ধরনের সেবা প্রদানের তথ্য রয়েছে তা সম্পর্কে জনগনকে সচেতন করা উচিত। ৪. ই-গভর্নেন্স এর সুবিধা দেশের সকল মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে হলে, এর জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো শহর থেকে প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত করতে হবে। ৫. নাগরিকদের তথ্যের গোপনীয়তা এবং নিরাপত্তা রক্ষা করতে হবে। ৬.প্রতিবন্ধকতাহীন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। ৭. তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিতে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা একান্ত অপরিহার্য। ৮. বাংলাদেশের মতো দেশে কেবল ই-গভর্নেন্স এর প্ল্যাটফর্ম ও সুবিধা তৈরি করলেই হবে না, বরং তা ব্যবহারের মতো ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিও সৃষ্টি করতে হবে। সর্বোপরি জনগণকে ই-গভর্নেন্স ব্যবহারে প্রস্তুত করা (e-readiness), এবং জনগনের মধ্যে ডিজিটাল বৈষম্য (digital divide) হ্রাসকরণে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।

Coin Marketplace

STEEM 0.04
TRX 0.32
JST 0.081
BTC 61383.18
ETH 1642.90
USDT 1.00
SBD 0.41